রেলের সিংহভাগ ইজারা সালাউদ্দিন রিপনের কবজায়, দুদকে মামলা
এক দশকে রাষ্ট্রের শতকোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি
ছবি সংগৃহীত
নতুন কোনো দরপত্র (বিডিং) ছাড়াই রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ রেলওয়ের ২৪টি ট্রেনের ইজারা চুক্তি নবায়নের মাধ্যমে বিশাল অঙ্কের রাজস্ব আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ও রেলওয়ে শ্রমিক লীগের উপদেষ্টা সালাউদ্দিন রিপনের বিরুদ্ধে।
রেলওয়ের বাণিজ্যিক কার্যক্রমে চরম আধিপত্য বিস্তারকারী এই ‘রেলসম্রাট’ ও তার পরিবারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত ৩৭টি ট্রেনের মধ্যে ৩২টিই, যা মোট ট্রেনের প্রায় ৯০ শতাংশ। নিয়মবহির্ভূতভাবে বারবার চুক্তি নবায়ন করে রাষ্ট্রকে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত করার পাশাপাশি সাড়ে ৩৫ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে মামলা দায়ের করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
রেলওয়ে সংশ্লিষ্ট একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র ও কর্মকর্তাদের কাছ থেকে জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রীদের আশীর্বাদে দরপত্র প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল রিপন ও তার সিন্ডিকেট। রাজধানীর মতিঝিলের একই ঠিকানা ব্যবহার করে মেসার্স এসআর ট্রেডিং, এলআর ট্রেডিং, এনএল ট্রেডিং এবং তার স্ত্রী মিফতাহুল জান্নাত লুনার মালিকানাধীন টিএম ট্রেডিং নামে একাধিক বেনামি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়। একই দরপত্রে রিপনের নিয়ন্ত্রণাধীন একাধিক প্রতিষ্ঠান অংশ নেওয়ার ফলে কোনো ধরনের সুস্থ প্রতিযোগিতা ছাড়াই নামমাত্র মূল্যে ট্রেন পরিচালনার কাজ বাগিয়ে নিত এই চক্র। এর ফলে রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলে পরিচালিত বলাকা, মহুয়া, জামালপুর, দেওয়ানগঞ্জ, কর্ণফুলী, তিতাস ও সাগরিকা কমিউটারসহ গুরুত্বপূর্ণ ট্রেনগুলোর ইজারা বছরের পর বছর ধরে এই দম্পতির পকেটেই গেছে। সর্বশেষ দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বরিশাল-৫ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে অংশ নেওয়া রিপনের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার ও টেন্ডারবাজির অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা শেয়ার বিজকে জানান, ‘চুক্তি অনুযায়ী প্রাথমিক ইজারা মাত্র চার বছরের জন্য দেওয়া হলেও ওপরের মহলের অদৃশ্য ইশারায় কোনো নতুন দরপত্র আহ্বান করা সম্ভব হয়নি। বারবার আগের চুক্তিই নবায়ন করতে আমরা বাধ্য হয়েছি। কোনো কর্মকর্তা এর বিরোধিতা করলে তাকে তাৎক্ষণিক বদলি বা নানাভাবে হয়রানি করা হতো। একটি মাত্র পরিবারের কাছে রেলের ৯০ শতাংশ ট্রেনের বাণিজ্যিক কার্যক্রম জিম্মি হয়ে পড়া রাষ্ট্রীয় পরিবহন সংস্থার জন্য চরম লজ্জাজনক।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে রেলের এক কর্মকর্তা জানান, আওয়ামী লীগ নেতা হাসনাত আবদুল্লাহর মাধ্যমে তৎকালীন রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক ও তার ব্যক্তিগত পিএস কিবরিয়ার মাধ্যমে রেলের ঠিকাদারি কাজ নিয়ন্ত্রণ করতেন।
তিনি আরও বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তী পরিস্থিতিতে রিপন নিজের রাজনৈতিক ভোল পাল্টে রাতারাতি বৈষম্যবিরোধী নেতা হয়ে যান। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তার নিয়ন্ত্রণাধীন ২৪টি রেলের ইজারা বাতিল করে দেন এবং তৎকালীন উপদেষ্টা ফয়জুল কবিরকে দিয়ে কৌশলে রেলের কাজ স্থগিত রাখেন রিপন। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর আবার রেলের ঠিকাদারি কাজ শুরু করেছেন সাবেক এই ছাত্রলীগ নেতা বলেও জানান এই কর্মকর্তা।
এদিকে রেলের আরেক কর্মকর্তা জানান, ঢাকা বিভাগের মধ্যে বলাকা, তুরাগ, দেওয়ানগঞ্জ কমিউটার, মহুয়া, কর্ণফুলী, তিতাস, জামালপুর কমিউটার—এই সাত জোড়া কমিউটার ট্রেন বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় চলছে। এছাড়া পশ্চিমাঞ্চলের নকশিকাঁথা এবং রাজশাহী কমিউটার ঢাকা পর্যন্ত আসে, যেগুলোর ইজারা ছাত্রলীগ নেতা সালাউদ্দিন রিপনের নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে সম্পর্ক আছে।
সাবেক ছাত্রলীগ নেতা সালাউদ্দিন রিপনের নিয়ন্ত্রণাধীন এখন পর্যন্ত কতগুলো রেল আছে—জানতে চাইলে অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) মোহাম্মদ নাজমুল ইসলাম কোনো মন্তব্য করেননি।
বিশেষজ্ঞদের অর্থনৈতিক ও আইনি পর্যবেক্ষণ: যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রতিযোগিতাহীন এই ইজারা ব্যবস্থার কারণে বাংলাদেশ রেলওয়ে তার প্রকৃত আয়ের সক্ষমতা হারিয়েছে। এ বিষয়ে পরিবহন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. শামছুল হক শেয়ার বিজকে বলেন, ‘গণপরিবহন খাতে যখন কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা সিন্ডিকেটের একচেটিয়া আধিপত্য তৈরি হয়, তখন সেখানে সেবার মান নিশ্চিত করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। দরপত্র ছাড়া চুক্তি নবায়ন স্পষ্টতই পিপিআরের (পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস) লঙ্ঘন। এর ফলে রেল খাত থেকে রাষ্ট্র যে কোটি কোটি টাকা রাজস্ব পেতে পারত, তা চলে গেছে ব্যক্তিবিশেষের পকেটে। রেলের লোকসান কমানোর জন্য এই ধরনের সিন্ডিকেট অবিলম্বে ভেঙে দেওয়া উচিত এবং দীর্ঘমেয়াদি ইজারা প্রথার আধুনিকায়ন জরুরি।’
কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর এক প্রতিনিধি বলেন, ‘বেসরকারি ব্যবস্থাপনার মূল উদ্দেশ্যই ছিল যাত্রীসেবার মান বাড়ানো এবং রেলের আয় বৃদ্ধি করা। কিন্তু রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে এটি এখন একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর লুণ্ঠন ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। এর দায় রেলওয়ে প্রশাসন এড়াতে পারে না।’
বিশিষ্টজনদের প্রতিক্রিয়া: রেল খাতে এমন নজিরবিহীন দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন দেশের বিশিষ্টজনরা। তার বলেন, ‘ছাত্রলীগের পরিচয় ব্যবহার করে এবং রেলওয়ে শ্রমিক লীগের উপদেষ্টা সেজে সালাউদ্দিন রিপন যেভাবে রেলকে নিজের ব্যক্তিগত সম্পত্তি বানিয়েছিলেন, তা চরম লুটপাটের একটি প্রকট উদাহরণ। বিগত সরকারের আমলে এভাবে একটা গণমুখী রাষ্ট্রীয় সংস্থাকে লুটেপুটে খাওয়া হয়েছে। আমরা দাবি জানাচ্ছি, শুধু রিপনই নয়, রেলের যেসব প্রভাবশালী মন্ত্রী ও কর্মকর্তা এই অবৈধ নবায়নের পেছনে জড়িত ছিলেন, তাদের প্রত্যেককে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হোক।’
অন্যদিকে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) স্থানীয় এক প্রতিনিধি মন্তব্য করেন, ‘রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় টেন্ডারবাজি এবং একই ঠিকানায় একাধিক ভুয়া কোম্পানি খুলে প্রতিযোগিতা বন্ধ করার এই সংস্কৃতি দেশের অর্থনীতিকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে। দুদকের এই মামলা যেন শুধু কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে এবং লুণ্ঠিত রাষ্ট্রীয় অর্থ অবিলম্বে ফেরত আনার ব্যবস্থা করতে হবে।’
বর্তমানে দুদকের দায়ের করা সাড়ে ৩৫ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের মামলার পর রিপন ও তার সিন্ডিকেটের অন্যান্য সহযোগীদের বিরুদ্ধে তদন্ত আরও জোরদার করা হয়েছে বলে জানা গেছে। রেলকে লোকসানের হাত থেকে বাঁচাতে এবং সাধারণ যাত্রীদের অধিকার ফিরিয়ে দিতে এসব রুটের ইজারা বাতিল করে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় নতুন দরপত্র আহ্বানের জোরালো দাবি উঠেছে।