বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩

​​​​​​​ইমতিয়াজ আহমেদ, নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশ: ০০:০৪, ৬ নভেম্বর ২০২৬

নাসিকের অনুমতি ছাড়াই চলছে নির্মাণকাজ

নাসিকের অনুমতি ছাড়াই  চলছে নির্মাণকাজ

ছবি সংগৃহীত

একেই বলে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা। যানজটে নাকাল নারায়ণগঞ্জবাসী। শহরের প্রধান সড়ক বঙ্গবন্ধু সড়ক ঘিরেই প্রতিদিন তৈরি হচ্ছে অসহনীয় যানজট। মাত্র দেড় কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে কখনো দুই থেকে তিন ঘণ্টা লেগে যায়। এর মধ্যেই শহরের প্রাণকেন্দে অভ্যন্তরীণ কনটেইনার পোর্ট ও বাল্ক টার্মিনাল। প্রকল্পটি চালু হলে শহরের যানজট পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন জনপ্রতিনিধি, নগর পরিকল্পনাবিদ ও নাগরিক সমাজ।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, এত বড় একটি প্রকল্পের অনুমোদন ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের (নাসিক) মতামত নেওয়া হলো না কেন? নগরীর ভেতরে ভারী যানবাহন চলাচলের ব্যবস্থা কীভাবে হবে, তার কোনো সুস্পষ্ট পরিকল্পনা আছে কি না, সেটিও অজানা। অথচ নির্মাণকাজ এগিয়ে চলছে। স্থানীয় সরকারের অনুমতি ছাড়াই নগর এলাকার মধ্যে এমন স্থাপনা নির্মাণের ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে প্রশাসনিক সমন্বয় নিয়েও।

শুধু তাই নয়। প্রকল্পের ব্যয় নিয়েও তৈরি হয়েছে রহস্য। শুরুতে ব্যয় ধরা হয়েছিল ৬১৫ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। প্রকল্প বাস্তবায়নের আগেই তা বাড়িয়ে প্রায় ৮৫০ কোটি টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এখানেই শেষ নয়। বিআইডব্লিউটিএর সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে, ব্যয় আরও বাড়িয়ে প্রায় ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা করার প্রস্তাব রয়েছে। অর্থাৎ কাজ শেষ হওয়ার আগেই প্রকল্পের ব্যয় দ্বিগুণের কাছাকাছি যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, কোন হিসাবের ভিত্তিতে এই ব্যয় বাড়ছে? প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই কতটা নির্ভুল ছিল? জনগণের অর্থ ব্যয়ের আগে এসব প্রশ্নের জবাব জরুরি।

সরেজমিনে দেখা গেছে, খানপুর বরফকল এলাকায় সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কনটেইনার পোর্ট নির্মাণের কাজ শুরু করেছে। প্রকল্পের উদ্দেশ্য হিসেবে বলা হচ্ছে, চট্টগ্রাম, মোংলাসহ দেশের বিভিন্ন বন্দর থেকে অভ্যন্তরীণ নৌপথে সরাসরি কনটেইনার পরিবহন সহজ করা। বাংলাদেশ-ভারত নৌ-প্রটোকলের আওতায় উপ-আঞ্চলিক বাণিজ্য ও ট্রানজিট সুবিধা সমপ্রসারণও এর অন্যতম লক্ষ্য। কাগজে-কলমে উদ্দেশ্য আকর্ষণীয়। কিন্তু বাস্তবতার সঙ্গে সেই পরিকল্পনার কতটা মিল রয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

যানবাহন চলবে কোন পথে: কনটেইনার পোর্ট চালু হলে সেখানে আসবে ভারী ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান এবং ১৬ থেকে ২০ চাকার লরি। এসব যানবাহন কী পথে চলবে? কোন মহাসড়কের সঙ্গে টার্মিনালের সংযোগ ঘটবে? শহরের ভেতর দিয়ে চলাচল করলে যানজট সামলাবে কে? এসব প্রশ্নের সুস্পষ্ট উত্তর নেই।

খানপুর ও বরফকল এলাকা ঘনবসতিপূর্ণ। আশপাশে রয়েছে বসতি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। এখানকার সড়কগুলোও ভারী যানবাহনের চাপ নেওয়ার উপযোগী কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। এমনিতেই বঙ্গবন্ধু সড়ক, খানপুর, চাষাঢ়া ও আশপাশের এলাকায় যানজট লেগেই থাকে। এর মধ্যে বন্দরের ভারী যানবাহন যুক্ত হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, নির্মাণাধীন পোর্ট থেকে মাত্র ২০০ গজের মধ্যে রয়েছে সরকারি ৩০০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল। হাসপাতালটিকে ৫০০ শয্যায় উন্নীত করার কাজও চলমান। পাশেই রয়েছে প্রস্তাবিত কুমুদিনী ক্যানসার হাসপাতাল। কয়েকশ গজের মধ্যে নারায়ণগঞ্জ হাইস্কুল ও নারায়ণগঞ্জ কলেজ। রয়েছে বিপণিবিতান, শহীদ মিনার, সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন দপ্তর ও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান।

হাসপাতালে আসা রোগী, অ্যাম্বুলেন্স, শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং সাধারণ মানুষের চলাচল এমনিতেই নানা ভোগান্তির মুখে পড়ে। এর সঙ্গে ভারী ট্রাক ও ট্রেইলারের চাপ যুক্ত হলে জনদুর্ভোগ কোন পর্যায়ে পৌঁছাবে, তা সহজেই অনুমেয়। জরুরি রোগী নিয়ে অ্যাম্বুলেন্স আটকে গেলে দায় নেবে কে? শিক্ষার্থীদের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করবে কে? প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে এসব বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে কি না, তা নিয়েও সংশয় রয়েছে।

পানগাঁও থাকতে নতুন টার্মিনাল কেন: নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের নগর পরিকল্পনাবিদ মঈনুল ইসলামও প্রকল্পটির যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তার মতে, খানপুরের খুব কাছেই কেরানীগঞ্জে রয়েছে পানগাঁও অভ্যন্তরীণ কনটেইনার পোর্ট। ২০১৩ সালে চালু হওয়া এই বন্দরটি ব্যবসায়ীদের পর্যাপ্ত আগ্রহের অভাবে এখনো পূর্ণ সক্ষমতায় পরিচালিত হতে পারছে না।

পানগাঁও থেকে খানপুরের দূরত্ব প্রায় ১৫-১৬ কিলোমিটার। অন্যদিকে মুক্তারপুর সামিট অ্যালায়েন্স পোর্ট থেকে দূরত্ব মাত্র ৮ থেকে ১০ কিলোমিটার। একই ধরনের আরও একটি টার্মিনাল নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা তাই প্রশ্নবিদ্ধ।

মঈনুল ইসলামের ভাষ্য, কেরানীগঞ্জের পোর্টের মাত্র ২০ শতাংশ ব্যবহার হচ্ছে। অব্যবহূত থাকছে ৮০ শতাংশ সক্ষমতা। আগে বিদ্যমান বন্দরের পূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এরপর নতুন টার্মিনালের প্রয়োজনীয়তা নির্ধারণ করা উচিত। তার আশঙ্কা, খানপুরে পোর্ট নির্মাণ হলে নগরীর সড়কে যানবাহনের চাপ বাড়বে। অথচ ওই সড়কগুলোর ধারণক্ষমতা নিয়ে প্রয়োজনীয় সমীক্ষা হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।

এখানে প্রশ্ন আরও আছে। বিদ্যমান বন্দরের অব্যবহূত সক্ষমতা কাজে লাগানো না গেলে নতুন বন্দরের অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা কোথায়? নতুন প্রকল্পের মাধ্যমে ব্যবসায়ীরা কতটা লাভবান হবেন? সরকারের বিনিয়োগের বিপরীতে কী পরিমাণ আয় হবে? এসব তথ্য জনসমক্ষে আসা প্রয়োজন।

নদীর নাব্যতা ও পরিবেশের ঝুঁকি: শুধু সড়ক নয়, শীতলক্ষ্যা নদী নিয়েও রয়েছে উদ্বেগ। নারায়ণগঞ্জ নাগরিক অধিকার ফোরামের প্রধান উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমান মাসুম বলেন, শীতলক্ষ্যা নদীর পানিদূষণ ও নাব্যতা সংকট বড় চ্যালেঞ্জ। কনটেইনারবাহী বড় জাহাজ ও কার্গো চলাচলের জন্য পর্যাপ্ত গভীরতা প্রয়োজন। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে নদীতে পর্যাপ্ত পানি না থাকলে টার্মিনালের কার্যকারিতা ব্যাহত হবে।

নদীর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ, নাব্যতা, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর প্রকল্পটির প্রভাব কী হবে, তা নিয়েও যথাযথ মূল্যায়ন জরুরি। নদীকে শুধু পণ্য পরিবহনের পথ হিসেবে দেখলে চলবে না। শীতলক্ষ্যা নারায়ণগঞ্জের পরিবেশ, জনজীবন ও অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি।

মাহবুবুর রহমান মাসুম বলেন, বরফকল এলাকায় অপরিকল্পিত ও জনস্বার্থবিরোধী কনটেইনার পোর্ট নির্মাণ অবিলম্বে বন্ধ ও বাতিল করা উচিত। প্রকল্পটি চালু হলে যানজট ও জনদুর্ভোগ বাড়বে।

নারায়ণগঞ্জ নাগরিক ফোরামের সভাপতি অ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমান ইসমাইলও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তার মতে, বিপুলসংখ্যক ভারী ট্রাক ও ট্রেইলার চলাচলের ফলে বরফকলসহ আশপাশের এলাকায় যানজট, সড়ক দুর্ঘটনা ও জনদুর্ভোগ বাড়তে পারে। তিনি বলেন, প্রায় ৮৫০ কোটি টাকার প্রস্তাবিত প্রকল্পটির প্রয়োজনীয়তা, অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা এবং ব্যয়-সুবিধা বিশ্লেষণ ছাড়া বাস্তবায়ন করা হলে রাষ্ট্রের বিপুল অর্থ অপচয়ের আশঙ্কা রয়েছে।

নাসিকের অনুমতি নেই: প্রকল্পটি নিয়ে সবচেয়ে বিস্ময়কর তথ্য দিয়েছেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান। তিনি জানিয়েছেন, বরফকল এলাকায় বিআইডব্লিউটিএ যে টার্মিনাল পোর্ট নির্মাণ করছে, সে বিষয়ে সিটি করপোরেশনকে কিছুই জানানো হয়নি।

তিনি বলেন, সিটি করপোরেশন এলাকায় কোনো স্থাপনা নির্মাণ করতে হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনাপত্তিপত্র নেওয়ার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু বিআইডব্লিউটিএ নাসিক থেকে কোনো অনাপত্তিপত্র গ্রহণ করেনি। পোর্ট চালু হলে বড় বড় কনটেইনার ও ট্রাক কোন সড়ক দিয়ে চলাচল করবে, সেটিও তাদের জানানো হয়নি।

সাখাওয়াত হোসেন খানের অভিযোগ, বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে একজন সংসদ সদস্যকে খুশি করতে প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়েছিল। নতুন করে প্রকল্পটি যাচাই-বাছাই করা প্রয়োজন। প্রয়োজনে শহরের বাইরে টার্মিনালটি স্থানান্তরের দাবি জানান তিনি।

তিনি আরও জানান, বিষয়টি জানতে বিআইডব্লিউটিএকে চিঠি দেওয়া হবে।

অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জ বিআইডব্লিউটিএর যুগ্ম পরিচালক মিজানুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি। প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট তথ্য জানতে চাইলে তিনি প্রকল্প পরিচালকের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দিয়ে ফোন কেটে দেন। প্রকল্প পরিচালকের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি: এদিকে প্রকল্পটি বন্ধ ও বাতিলের দাবিতে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি দিয়েছে নারায়ণগঞ্জ নাগরিক অধিকার ফোরাম। সংগঠনটির বক্তব্য, শীতলক্ষ্যা নদী নারায়ণগঞ্জের পরিবেশ, জনজীবন, নৌ-যোগাযোগ ও অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। নদীর নাব্যতা, স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ, নৌ-চলাচল এবং পরিবেশগত প্রভাব যথাযথভাবে যাচাই না করে এমন প্রকল্প বাস্তবায়ন করলে ভবিষ্যতে গুরুতর পরিবেশগত, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকট তৈরি হতে পারে।

তাদের অভিযোগ, প্রকল্পের ব্যয় বাড়ছে। অথচ জনস্বার্থ, অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা ও পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে পর্যাপ্ত তথ্য সামনে আসছে না।

সব মিলিয়ে খানপুরের কনটেইনার পোর্ট এখন নারায়ণগঞ্জের জন্য নতুন উদ্বেগের নাম। একদিকে যানজটে স্থবির শহর। অন্যদিকে হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও জনবসতির পাশে ভারী যানবাহননির্ভর বন্দর। তার ওপর প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধির চাপ।

উন্নয়নের নামে আরেকটি স্থাপনা নির্মাণই কি উন্নয়ন, নাকি উন্নয়নের আগে দেখতে হবে নগরীর ধারণক্ষমতা, মানুষের নিরাপত্তা ও পরিবেশের ভবিষ্যৎ? পানগাঁওয়ের বিদ্যমান সক্ষমতা অব্যবহূত রেখে নতুন টার্মিনাল নির্মাণের যৌক্তিকতা কী? আর নাসিকের অনুমতি ছাড়াই নগরীর ভেতরে এত বড় প্রকল্পের কাজ কীভাবে এগিয়ে চলছে? এসব প্রশ্নের জবাব না দিয়ে নির্মাণকাজ এগিয়ে নেওয়া হলে ভবিষ্যতে এর মাশুল দিতে হবে নারায়ণগঞ্জের সাধারণ মানুষকেই।