রবির আইনি পদক্ষেপ ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা
বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতায় আপস করবে না শেয়ার বিজ
ছবি সংগৃহীত
একটি স্বাধীন ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যমের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হলো জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় অনুসন্ধান করা, অনিয়ম ও অসংগতি তুলে ধরা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখা। এ দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে দেশের পুঁজিবাজার, করপোরেট খাত ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম নিয়ে ধারাবাহিকভাবে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে আসছে শেয়ার বিজ। এরই ধারাবাহিকতায় দেশের টেলিযোগাযোগ খাতের অন্যতম প্রতিষ্ঠান রবি আজিয়াটা পিএলসি বা রবির বিভিন্ন কার্যক্রম, অনিয়মের অভিযোগ, সেবার মান, নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদন্ত এবং করপোরেট ব্যবস্থাপনা নিয়ে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে সংবাদমাধ্যমটি। তবে এসব প্রতিবেদনের বিষয়ে তথ্যভিত্তিক ব্যাখ্যা বা আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেওয়ার পরিবর্তে আইনি নোটিশ ও মামলা করার হুমকির পথ বেছে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে রবির বিরুদ্ধে। এতে শুধু একটি সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে একটি করপোরেট প্রতিষ্ঠানের বিরোধ নয়, বরং অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার স্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের জবাবদিহিতার প্রশ্নও সামনে এসেছে।
গত ২৯ অক্টোবর প্রকাশিত ‘রবিতে সাহেদের একচ্ছত্র আধিপত্য’ শীর্ষক প্রতিবেদনকে কেন্দ্র করে শেয়ার বিজকে আইনি নোটিশ পাঠানো হয়েছে। একই সঙ্গে মামলা করার হুমকিও দেওয়া হয়েছে। অথচ প্রতিবেদনটি প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে তথ্য-উপাত্ত ও নথি যাচাই-বাছাইয়ের পাশাপাশি অভিযুক্ত পক্ষের বক্তব্য নেওয়ার প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে। শেয়ার বিজের অবস্থান হলো, প্রকাশিত প্রতিবেদনে কোনো মনগড়া বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তথ্য উপস্থাপন করা হয়নি। বরং জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো পাঠকের সামনে তুলে ধরতেই অনুসন্ধান ও তথ্য যাচাইয়ের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়েছে।
একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ উঠলে সেই অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য প্রকাশ করা সাংবাদিকতার মৌলিক নীতি। শেয়ার বিজ তার প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে এ নীতি অনুসরণের চেষ্টা করেছে। রবির বিষয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশের ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য চাওয়া হয়েছে। কিন্তু শেয়ার বিজের অভিযোগ, বারবার বক্তব্য চাওয়া সত্ত্বেও রবি অনেক ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য দেয়নি। এমনকি প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্যের বিষয়ে নির্দিষ্ট আপত্তি বা প্রতিবাদ জানিয়ে তথ্যগত অসংগতি তুলে ধরার পরিবর্তে আইনি নোটিশ ও মামলার পথে এগিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
রবির কার্যক্রম নিয়ে শেয়ার বিজের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের বিষয়টি নতুন নয়। এর আগে গত আগস্টে প্রতিষ্ঠানটির সেবার মান, বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ, পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদন্ত, এয়ারটেল ব্র্যান্ড ব্যবহার এবং অবৈধ ভিওআইপি কার্যক্রমে জরিমানাসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। এসব প্রতিবেদন প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে রবির বক্তব্য জানার চেষ্টা করা হয়েছে বলে শেয়ার বিজ জানিয়েছে। কিন্তু এসব বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে সন্তোষজনক বক্তব্য পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ সংবাদমাধ্যমটির।
এ ছাড়া রবির সঙ্গে শেয়ার বিজের পূর্ববর্তী আইনি বিরোধের বিষয়েও সংবাদ প্রকাশ করা হয়েছে। এয়ারটেল ব্র্যান্ডের রিব্র্যান্ডিং নিয়েও প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে সংবাদমাধ্যমটি। অর্থাৎ রবির বিষয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম, ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত, নিয়ন্ত্রক সংস্থার পর্যবেক্ষণ এবং জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রশ্নের ধারাবাহিক অনুসন্ধানের অংশ।
একটি তালিকাভুক্ত কোম্পানির কার্যক্রম শুধু তার ব্যবস্থাপনা বা শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে বিনিয়োগকারী, গ্রাহক, কর্মী, নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং বৃহত্তর অর্থনীতির স্বার্থ জড়িত থাকে। ফলে এমন প্রতিষ্ঠানের আর্থিক কার্যক্রম, করপোরেট সুশাসন, সেবার মান কিংবা নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদন্তের বিষয়গুলো সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়া স্বাভাবিক। এসব বিষয়ে প্রশ্ন তোলা বা তথ্য প্রকাশ করা কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়; বরং জনস্বার্থে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া।
তবে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার অর্থ এই নয় যে, কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে যাচাইহীন তথ্য প্রকাশ করা যাবে। একইভাবে কোনো প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কাকে সামনে রেখে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট অনুসন্ধানী প্রতিবেদন বন্ধ করার চেষ্টা করাও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে যেমন তথ্যের নির্ভুলতা, নিরপেক্ষতা ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য নিশ্চিত করা জরুরি, তেমনি কোনো প্রতিবেদনে আপত্তি থাকলে সেই আপত্তির সুনির্দিষ্ট ভিত্তি তুলে ধরা এবং তথ্যগত ভুল থাকলে সংশোধনের সুযোগ তৈরি করাও গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়া একটি অধিকার হলেও তার ব্যবহার যেন সংবাদ প্রকাশে অযৌক্তিক চাপ বা ভীতি তৈরির হাতিয়ার হয়ে না ওঠে, সেটিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
শেয়ার বিজের অভিযোগ অনুযায়ী, রবির সঙ্গে পূর্ববর্তী আইনি বিরোধের ক্ষেত্রেও সংবাদমাধ্যমটির বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। মধ্যরাতে আইনি নোটিশ পাঠানোর পর পরদিন সকালে মামলা দায়েরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে এ বিরোধ নতুন মাত্রা পায়। পরবর্তী সময়ে নিম্ন আদালতে মামলা গৃহীত হওয়ার আগেই হাইকোর্টে গিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদন প্রকাশে নিষেধাজ্ঞা চাওয়া হয়। পরিস্থিতি মোকাবিলায় শেয়ার বিজকে শেষ পর্যন্ত আপিল বিভাগ পর্যন্ত যেতে হয়। সংবাদমাধ্যমটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আপিল বিভাগ হাইকোর্টের আদেশ স্থগিত করেন। আদালতের এ আদেশের পর যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে রবির বিষয়ে প্রতিবেদন পুনরায় প্রকাশের উদ্যোগ নেয় শেয়ার বিজ। এ ঘটনা আবারও সামনে এনেছে, সংবাদমাধ্যমের প্রকাশিত কোনো প্রতিবেদন নিয়ে আপত্তি থাকলে তার সমাধান হওয়া উচিত যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ও তথ্যভিত্তিক যুক্তির মাধ্যমে; সংবাদ প্রকাশ বন্ধের চাপ সৃষ্টি করে নয়।
এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন—আদালতের কোনো অন্তর্বর্তী আদেশ বা স্থগিতাদেশকে মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। তবে আপিল বিভাগের আদেশের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট আইনি প্রক্রিয়ায় যে পরিবর্তন এসেছে, তা সংবাদমাধ্যমটির প্রতিবেদন প্রকাশের উদ্যোগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। বিচারাধীন বিষয়ে আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষা করা যেমন প্রয়োজন, তেমনি আদালতের বিদ্যমান আদেশ ও আইনি প্রক্রিয়া মেনে সংবাদ প্রকাশের অধিকারও সংরক্ষিত থাকা জরুরি।
রবির মতো বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একটি সংবাদমাধ্যমের বিরোধে ক্ষমতা ও প্রভাবের অসমতার বিষয়টিও উপেক্ষা করা যায় না। একটি প্রতিষ্ঠানের হাতে রয়েছে বড় আইনজীবী দল, আর্থিক সক্ষমতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগের সুযোগ। বিপরীতে সংবাদমাধ্যমকে প্রতিদিনের প্রকাশনা, সাংবাদিকতা এবং জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুসন্ধানের পাশাপাশি আইনি ব্যয় ও সময়ের চাপও সামলাতে হয়। এমন পরিস্থিতিতে আইনি নোটিশ বা মামলা করার হুমকি সংবাদমাধ্যমের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে এ ধরনের চাপ সাংবাদিক ও সম্পাদকদের মধ্যে ভীতি সৃষ্টি করলে তা শেষ পর্যন্ত পাঠকের তথ্য জানার অধিকারকেই সংকুচিত করবে।
একটি গণতান্ত্রিক সমাজে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা শুধু সাংবাদিকদের পেশাগত অধিকার নয়; এটি নাগরিকের তথ্য জানার অধিকার এবং জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থারও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। করপোরেট প্রতিষ্ঠান, আর্থিক খাত কিংবা নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যক্রম নিয়ে সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে গণমাধ্যমকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। একই সঙ্গে সংবাদমাধ্যমকেও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে তথ্য যাচাই, নথি পর্যালোচনা,বক্তব্য গ্রহণ এবং ভুল হলে সংশোধনের নীতি অনুসরণ করতে হবে।
শেয়ার বিজ মনে করে, কোনো প্রতিবেদনে তথ্যগত ভুল বা অসংগতি থাকলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের উচিত সুনির্দিষ্ট তথ্য ও নথি দিয়ে তার প্রতিবাদ জানানো। প্রয়োজনে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য, ব্যাখ্যা কিংবা সংশোধনী প্রকাশের দাবি তোলা যেতে পারে। কিন্তু তথ্যের জবাব তথ্য দিয়ে না দিয়ে আইনি পদক্ষেপের মাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া হলে তা গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করে। এতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠার অবকাশ তৈরি হয়।
শেয়ার বিজের অবস্থান পরিষ্কার—জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের দায়িত্ব থেকে সরে আসার সুযোগ নেই। কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির চাপ, হুমকি কিংবা আইনি জটিলতার আশঙ্কায় বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার চর্চা বন্ধ করা হবে না। তবে প্রকাশিত প্রতিটি প্রতিবেদনের তথ্যের যথার্থতা নিশ্চিত করা, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্যকে গুরুত্ব দেওয়া এবং আইনি প্রক্রিয়ার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা অব্যাহত থাকবে। রবির বিষয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোর ক্ষেত্রেও এই নীতির ব্যত্যয় ঘটেনি বলে শেয়ার বিজের দাবি।
আমরা বিশ্বাস করি, সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কোনো প্রতিষ্ঠানের মতপার্থক্য থাকতেই পারে। কিন্তু সেই মতপার্থক্যের সমাধান হওয়া উচিত যুক্তি, তথ্য, নথি ও আইনসম্মত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। সংবাদমাধ্যমের দায়িত্ব প্রশ্ন তোলা, তথ্য অনুসন্ধান করা এবং জনস্বার্থে তা প্রকাশ করা। আর করপোরেট প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব হলো নিজেদের কার্যক্রম সম্পর্কে স্বচ্ছ থাকা এবং যৌক্তিক প্রশ্নের জবাব দেওয়া। এই দুই দায়িত্বের মধ্যে ভারসাম্য থাকলেই একটি জবাবদিহিমূলক পরিবেশ তৈরি হতে পারে।
শেয়ার বিজ সত্য ও বস্তুনিষ্ঠতার পক্ষে থেকে রবির আইনি পদক্ষেপ মোকাবিলা করবে। কোনো প্রতিবেদন নিয়ে আপত্তি থাকলে তার তথ্যভিত্তিক জবাব দেওয়ার সুযোগ সবসময় উন্মুক্ত। কিন্তু আইনি হয়রানি বা মামলা করার হুমকি দিয়ে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার পথ রুদ্ধ করা যাবে না। পাঠকের কাছে দায়বদ্ধতা, তথ্যের প্রতি শ্রদ্ধা এবং জনস্বার্থের প্রশ্নে আপসহীন অবস্থান নিয়েই শেয়ার বিজ তার দায়িত্ব পালন করে যাবে। এ লড়াই শুধু একটি সংবাদমাধ্যমের প্রকাশনার স্বাধীনতার প্রশ্ন নয়; এটি সত্য প্রকাশ, জবাবদিহিতা এবং স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশ রক্ষারও প্রশ্ন। এ ক্ষেত্রে পাঠক, সাংবাদিক সমাজ ও সচেতন নাগরিকদের সহযোগিতা ও সমর্থন শেয়ার বিজের জন্য বাড়তি অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।