আমদানিনির্ভরতা কমাতে ২৫.৯১ কোটি টাকার প্রকল্প
আট বিভাগে গম ও ভুট্টার গবেষণা জোরদার করছে সরকার
ছবি সংগৃহীত
দেশের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা সুসংহত করতে এবং গম ও ভুট্টার উৎপাদন বাড়িয়ে আমদানিনির্ভরতা হ্রাসের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এর অংশ হিসেবে ২৫ কোটি ৯১ লাখ টাকা ব্যয়ে ‘বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণা ও উন্নয়ন কার্যক্রম জোরদারকরণ’ শীর্ষক একটি নতুন প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে। সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে জুলাই ২০২৬ থেকে জুন ২০৩১ মেয়াদে দেশের আটটি বিভাগের নির্বাচিত উপজেলাগুলোয় এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণ, জলবায়ুসহিষ্ণু উচ্চ ফলনশীল জাত উদ্ভাবন এবং সিড ভিলেজ স্থাপনের মাধ্যমে গমের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং ভুট্টার বীজের চাহিদার আট শতাংশ দেশীয় উৎপাদন নিশ্চিত করাই এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য।
প্রকল্পের উদ্দেশ্য সম্পর্কে পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ভুট্টার বীজ সংরক্ষণে কুল রুম, অফিস-কাম-গবেষণাগার ও গবেষণা মাঠ উন্নয়ন এবং গবেষণা মাঠের সীমানা প্রাচীর নির্মাণ ও উন্নয়ন; নতুন উদ্ভাবিত জাত ও প্রযুক্তিসমূহ বিডাব্লিউএমআরআই/বিএডিসি/ডিএই/এনজিও/বীজ উৎপাদনকারী সংস্থার কর্মকর্তা, কারিগরি মাঠকর্মী এবং কৃষকদের সমন্বয়ে বিস্তারের মাধ্যমে গমের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং ভুট্টাবীজের চাহিদার আট শতাংশ উৎপাদন বৃদ্ধি নিশ্চিত করাসহ কৃষকদের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন করা। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা সক্ষম (তাপ, খরা, রোগবালাই প্রতিরোধী ও লবণাক্ততাসহিষ্ণু) উচ্চ ফলনশীল, বায়োফর্টিফাইড গম ও ভুট্টার জাত উদ্ভাবনসহ গবেষণা কার্যক্রম বাস্তবায়ন ও অন্যান্য প্রযুক্তি উদ্ভাবন, উন্নয়ন ও বিস্তার। সিড ভিলেজ স্থাপনের মাধ্যমে গমের মানঘোষিত এবং ভুট্টার প্রজনন বীজ উৎপাদন বৃদ্ধি করা এবং গম ও ভুট্টার বীজ প্রক্রিয়াজাত ও সংরক্ষণ নিশ্চিত করা। এছাড়া বিডাব্লিউএমআরআই/ বিএডিসি/ ডিএই/ এনজিও/ বীজ উৎপাদনকারী সংস্থার কর্মকর্তা, কারিগরি মাঠকর্মী এবং কৃষকদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য সময় উপযোগী প্রশিক্ষণ, কর্মশালা/ সেমিনার ও মাঠ দিবসের ব্যবস্থা করা।
প্রকল্প নথিতে দেখা যায়—
১. বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ভুট্টার বীজ সংরক্ষণের জন্য একটি কুল রুম স্থাপন, অফিস-কাম-গবেষণাগার (বিল্ডিং-১) ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ তৃতীয় তলা (উত্তর), প্রশাসনিক ভবন-কাম-গবেষণাগার (বিল্ডিং-২) ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ তৃতীয় ও চতুর্থ তলা (দক্ষিণ) এবং গবেষণা মাঠের সীমানা প্রাচীর নির্মাণ ও উন্নয়ন করা।
২. আটটি বিভাগের ৩৭টি জেলার ৫৮টি উপজেলায় পাঁচ বছরে উদ্ভাবিত গম ও ভুট্টা ফসলের উপযোগিতা যাচাইয়ের লক্ষ্যে ১ হাজার ৮০০টি জাত প্রদর্শনী, ফলন পার্থক্য নিরূপণের জন্য ১ হাজার ৩০০ প্রদর্শনী স্থাপন ও পাঁচটি (গম-তিনটি ও ভুট্টা-২) নতুন জাত এবং ১২টি জাত-বহির্ভূত প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা।
৩. বিএডিসিসহ অন্যান্য বীজ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানসমূহকে ১০০ টন গমের প্রজনন বীজ ও ১৫ টন ভুট্টার ইনব্রিড (প্রজনন) বীজ সরবরাহের মাধ্যমে ৪০ হাজার টন প্রত্যয়িত/মানঘোষিত গমবীজ এবং ১ হাজার ৩৩৫ টন হাইব্রিড ভুট্টার বীজ উৎপাদনে সহায়তা; সিড ভিলেজ স্থাপনের মাধ্যমে পাঁচ বছরে ৪০০ জন কৃষকের জমিতে (প্রতি কৃষক এক বিঘা) ১৬০ টন গমবীজ এবং ৭৫ জন কৃষকের জমিতে (প্রতি কৃষক এক একর) ৪০ টন হাইব্রিড ভুট্টা বীজ উৎপাদন করা।
৪. সিড ভিলেজ স্থাপনের মাধ্যমে পাঁচ বছরে ৪০০ কৃষকের জমিতে (প্রতি কৃষক এক বিঘা) ১৬০ টন গমবীজ এবং ৭৫ জন কৃষকের জমিতে (প্রতি কৃষক এক একর) ৪০ টন হাইব্রিড ভুট্টা বীজ উৎপাদন করা।
প্রকল্পের সংক্ষিপ্ত পটভূমি ও প্রস্তাবিত মূল কার্যক্রম: গম ও ভুট্টা বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ দানাজাতীয় ফসল এবং খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা, কৃষকের আয় বৃদ্ধি ও কৃষিভিত্তিক শিল্পের কাঁচামাল সরবরাহে এ দুই ফসলের গুরুত্ব ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে পোলট্রি, মৎস্য ও ডেইরি খাতের সম্প্রসারণের ফলে ভুট্টার চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অন্যদিকে দেশের গমের চাহিদার বড় অংশ এখনো আমদানিনির্ভর। ফলে দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধি, আমদানিনির্ভরতা হ্রাস এবং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের জন্য গম ও ভুট্টার উৎপাদনশীলতা ও আবাদ সম্প্রসারণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এদিকে পরিকল্পনা কমিশনের মতামত
১. গম ও ভুট্টার উন্নয়ন ও উৎপাদন সংশ্লিষ্ট বিষয়ে গবেষণা কার্যক্রম বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউটের নিয়মিত কার্যক্রম। নিয়মিত কার্যক্রম উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে সম্পাদনের যৌক্তিকতার বিষয়ে সভায় আলোচনা করা যেতে পারে।
২. প্রকল্পের ২নং উদ্দেশ্য অনুসারে নতুন উদ্ভাবিত জাত ও প্রযুক্তিসমূহ বিস্তারের মাধ্যমে গমের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং দুটা বীজের চাহিদার আট শতাংশ উৎপাদন বৃদ্ধি নিশ্চিত করাসহ কৃষকদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন করা হবে। এসব আউটপুটের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের ভিত্তি হিসেবে কোনো প্রাথমিক জরিপ বা বেসলাইন সার্ভে করা হয়েছে কি না, তা সভায় আলোচনা করা যেতে পারে।
৩. প্রস্তাবিত প্রকল্পের মাধ্যমে উৎপাদিত গম ও ভুট্টার প্রজনন বীজ দ্বারা জাতীয় চাহিদার কত শতাংশ পূরণ হবে, সে বিষয়ে সভায় আলোচনা করা যেতে পারে।
৪. ডিপিপির ১নং অনুচ্ছেদে মোট অনাবাসিক ভবন নির্মাণ খাতে ১৫৮৬ বর্গ মি. নির্মাণকাজ উল্লেখ রয়েছে। সংযোজনী-৫(ক) এ অনাবাসিক ভবন নির্মাণ খাতে অফিস-কাম-গবেষণাগার এবং প্রশাসনিক ভবন-কাম-গবেষণাগারের ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ ২৩৮২ ব.মি. বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে পুরো ভবন নির্মাণ করা হবে, নাকি কোনো ফ্লোর সম্প্রসারণ করা হবে, তা স্পষ্ট হওয়া দরকার। সব ক্ষেত্রে তথ্যের অমিল পরিহার করা প্রয়োজন।
৫. ভবনের ভিত্তি কত তলা, তা ডিপিপিতে উল্লেখ করা হয়নি। অফিস-কাম-গবেষণাগার ভবন ও প্রশাসনিক ভবন-কাম-গবেষণাগার ভবনের যে ডিজাইন ডিপিপিতে সংযুক্ত করা হয়েছে, সেটি কোন প্রতিষ্ঠান/ফার্ম তৈরি করেছে, তা স্পষ্ট নয়। এ বিষয়ে সভায় আলোচনা করা যেতে পারে।
৬. গবেষণাধর্মী প্রকল্পের আওতায় অফিস-কাম-গবেষণাগার এবং প্রশাসনিক ভবন-কাম-গবেষণাগারের উর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ, সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ (৯৫৮ দশমিক ৮ রা.মি.), গবেষণা মাঠ উন্নয়ন (৩১ হাজার ৫০০ ঘ.মি.), কুলরুম নির্মাণ (১৯০ ব.মি.)-এর প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সভায় আলোচনা করা যেতে পারে।
৭. প্রকল্পের আওতায় চারটি অফিস ভাড়ার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সভায় আলোচনা করা যেতে পারে।
৮. গবেষণার বিষয়ে ১০ হাজার ৪৮৬ জন দিবস অনিয়মিত শ্রমিকের প্রয়োজনীয়তা সভায় আলোচনা করা যেতে পারে।
৯. প্রকল্পের আওতায় ১৭৮ ব্যাচ প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তা আলোচনা করা যেতে পারে। কোন বিষয়ে কর্মকর্তা, কারিগরি মাঠকর্মী ও কৃষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে, তা ডিপিপিতে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে।
১০. প্রকল্পের আওতায় ভ্রমণব্যয়, মাঠ দিবস, পরিবহন ব্যয় ও সম্মানী খাতের ব্যয় যৌক্তিক পর্যায়ে নির্ধারণ করতে হবে।
১১. গবেষণাধর্মী প্রকল্পে চুক্তিভিত্তিক যানবাহন এবং পেট্রোল, তেল ও লুব্রিকেন্ট খাতে অর্থ বরাদ্দের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে আলোচনা করা যেতে পারে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউট ২০১৭ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে উচ্চ ফলনশীল, জলবায়ুসহিষ্ণু ও বিভিন্ন প্রতিকূল পরিবেশে উপযোগী জাত এবং উৎপাদন প্রযুক্তি উদ্ভাবন, বীজ উৎপাদন ও বিতরণ, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং কৃষক প্রশিক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। তবে জলবায়ু পরিবর্তন, খরা, লবণাক্ততা ও জলাবদ্ধতা, উপযুক্ত মানসম্পন্ন বীজের সীমাবদ্ধতা, উৎপাদন ব্যয় ও বাজারের অনিশ্চয়তা এবং গবেষণার জন্য আধুনিক অবকাঠামো ও প্রযুক্তির প্রয়োজনীয়তা গম ও ভুট্টা উৎপাদনের টেকসই উন্নয়নে চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করছে।
বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার বিবেচনায় প্রস্তাবিত প্রকল্পটি কৃষক, কৃষি উন্নয়ন ও নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। প্রস্তাবিত প্রকল্পের মাধ্যমে জলবায়ু সহিষ্ণু জাত উদ্ভাবন, পরিবেশ বান্ধব ফসল ব্যবস্থাপনা, জার্মপ্লাজম সংরক্ষণ ও উন্নয়ন, মাটির স্বাস্থ্য উন্নয়ন, কৃষি যান্ত্রিকীকরণের ফলে একটি আধুনিক কৃষি ব্যবস্থা কৃষকদের মাঝে হস্তান্তরের সুযোগ রয়েছে। এসব কার্যক্রমের ফলে গম ও ভুট্টার উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, কৃষকের আয় ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং সর্বোপরি দেশের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা সুসংহত করার সুযোগ সৃষ্টি হবে।