সরবরাহ স্বাভাবিক তবুও খাতুনগঞ্জে বাড়ছে ছোলার দাম
ছবি সংগৃহীত
রমজান শুরু হতে এখনো কয়েক মাস বাকি। তবে এরই মধ্যে চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের পাইকারি বাজারে বাড়তে শুরু করেছে ছোলার দাম। বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও মাত্র এক মাসের ব্যবধানে প্রতি কেজি ছোলার দাম বেড়েছে ১৩ থেকে ১৫ টাকা। পাইকারি পর্যায়ে এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে খুচরা বাজারেও। ব্যবসায়ীরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে বুকিং দর বৃদ্ধি ও পরিবহন ব্যয় বাড়ায় ছোলার দাম বেড়েছে। তবে ভোক্তা অধিকারকর্মীদের অভিযোগ, রমজানকে সামনে রেখে অসাধু ব্যবসায়ীরা আগেভাগেই নানা অজুহাতে পণ্যের দাম বাড়াচ্ছেন।
রমজান মাসে ইফতারের অন্যতম প্রধান উপাদান ছোলা। ব্যবসায়ীদের হিসাবে, বছরের অন্য ১১ মাসের প্রায় সমান ছোলার চাহিদা তৈরি হয় শুধু রমজান মাসেই। এ কারণে প্রতিবছরই রমজানকে সামনে রেখে পণ্যটির আমদানি বাড়ান ব্যবসায়ীরা। তবে পর্যাপ্ত আমদানি ও বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক থাকার পরও রমজানের আগে ছোলার দাম বাড়ার প্রবণতা দেখা যায়।
চট্টগ্রামের ভোগ্যপণ্যের অন্যতম প্রধান পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জে বর্তমানে প্রতি মণ ছোলা বিক্রি হচ্ছে ৩ হাজার ৭০০ থেকে ৩ হাজার ৭৫০ টাকায়। সে হিসাবে প্রতি কেজির পাইকারি দাম পড়ছে প্রায় ৯৯ থেকে ১০০ টাকা। অথচ এক মাস আগেও প্রতি কেজি ছোলা ৮৫ থেকে ৮৭ টাকায় বিক্রি হয়েছে। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে পাইকারিতে কেজিপ্রতি দাম বেড়েছে ১৩ থেকে ১৫ টাকা।
এদিকে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ৫৯ হাজার ২৭৯ টন ছোলা আমদানি হয়েছে। আমদানি ও সরবরাহ স্বাভাবিক থাকার পরও দাম বৃদ্ধির কারণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বাজারসংশ্লিষ্টদের মধ্যে।
খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ী আবুল খায়ের বলেন, এক মাসের ব্যবধানে ছোলার কেজিতে ১৩ টাকা বেড়েছে। তবে আমদানি ও সরবরাহ ঠিকঠাক রয়েছে। শীতকালে ছোলা ও ডাল জাতীয় পণ্যের চাহিদা বাড়ে। এর সঙ্গে জ্বালানির দাম বাড়ায় পণ্য পরিবহনের খরচও বেড়েছে। এসব কারণে ছোলার দাম বেড়েছে। চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ আড়তদার সাধারণ ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও ভোগ্যপণ্য আমদানিকারক মো. মহিউদ্দিন জানান, ছোলাসহ অন্যান্য ডালজাতীয় পণ্যের দাম কিছুটা বেড়েছে। তবে আমদানি ও সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে। ছোলার চাহিদা বৃদ্ধি এবং জ্বালানির দাম বাড়ার প্রভাব পড়েছে পণ্যটির বাজারদরে।
খাতুনগঞ্জ ডাল ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক পরিতোষ দে বলেন, বাংলাদেশে ছোলার চাহিদার প্রায় পুরোটাই আমদানির ওপর নির্ভরশীল। অস্ট্রেলিয়া থেকে মূলত এই ছোলা আমদানি করা হয়। কিন্তু দেশটিতে ফসলের উৎপাদন কমে যাওয়ায় ছোলার বুকিং দর বেড়েছে। বর্তমানে বাড়তি দরে বুকিং দেওয়া ছোলা বাজারে আসতে শুরু করায় দামেও তার প্রভাব পড়ছে। তিনি জানান, দুই মাস আগেও অস্ট্রেলিয়া থেকে প্রতি টন ছোলা ৬৫০ থেকে ৬৮০ ডলারে বুকিং দেওয়া যেত। বর্তমানে সেই বুকিং দর ৮০০ ডলারের বেশি। ফলে আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় দেশের বাজারেও ছোলার দাম বাড়ছে। পাইকারি বাজারে দাম বৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে খুচরা পর্যায়েও। মাসখানেক আগে খুচরা বাজারে প্রতি কেজি ছোলা ১১০ থেকে ১১৫ টাকায় বিক্রি হলেও বর্তমানে তা বিক্রি হচ্ছে ১২০ টাকায়।
নগরের চকবাজার এলাকার তাহমিনা স্টোরের মালিক মো. সৈয়দ আহমেদ বলেন, চলতি বছরের এপ্রিলে খাতুনগঞ্জ থেকে প্রতি কেজি ছোলা ৮০ থেকে ৯০ টাকায় কিনেছেন। এখন কিনতে হচ্ছে ৯৮ থেকে ১০০ টাকায়। এর সঙ্গে পরিবহন, শ্রমিকের মজুরি ও দোকানভাড়াসহ অন্যান্য খরচ রয়েছে। তাই ১২০ টাকার নিচে বিক্রি করলে লোকসান গুনতে হবে।
তবে ক্রেতাদের অভিযোগ, রমজানকে সামনে রেখে ব্যবসায়ীরা আগেভাগেই ছোলার দাম বাড়াচ্ছেন। নগরের আআগ্রাবাদ এলাকার বাসিন্দা সিয়াম আহমেদ বলেন, আগামী ফেব্রুয়ারিতে রমজান শুরু হওয়ার কথা। তাই ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন অজুহাতে এখন থেকেই ছোলার দাম বাড়াচ্ছেন। এ বিষয়ে সরকারের নজর দেওয়া উচিত। জেলা প্রশাসন ও জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর বাজার তদারকি জোরদার করা প্রয়োজন।
ছোলার পাশাপাশি খাতুনগঞ্জে অন্যান্য ডালজাতীয় পণ্যের দামও বেড়েছে। এক মাসের ব্যবধানে প্রতি কেজি মটর ডালের দাম ২ টাকা বেড়ে ৫৬ টাকা, মুগ ডালের দাম ৫ টাকা বেড়ে ১৩০ টাকা, মোটা মসুর ডালের দাম ১০ টাকা বেড়ে ৭৮ টাকা এবং চিকন মসুর ডালের দাম ১৮ টাকা বেড়ে ১০৫ টাকা হয়েছে। এ ছাড়া চনার ডাল বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ১১০ টাকায়।
এদিকে বাজারে ছোলার দাম বৃদ্ধিকে অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজি বলে মন্তব্য করেছেন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন। তিনি বলেন, প্রতিবছরই রমজানের কয়েক মাস আগে ছোলা, তেল, চিনিসহ নির্দিষ্ট কিছু পণ্যের দাম বাড়ানো হয়। পরে রমজান মাসে এসব পণ্য বাড়তি দামে বিক্রি করে ভোক্তাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হয়। তিনি আরও বলেন, বাজারে প্রশাসনের যথাযথ তদারকি না থাকায় অসাধু ব্যবসায়ীরা এ ধরনের কারসাজি করে পার পেয়ে যান। রমজানে যখন বাজার তদারকি করা হয়, তখন ব্যবসায়ীরা দাবি করেন, রোজাকে কেন্দ্র করে নয়, বরং অনেক আগেই পণ্যের দাম বেড়েছে।
তবে বাজার তদারকির বিষয়ে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ের উপ-পরিচালক ফয়েজ উল্যাহ বলেন, জনবলসংকটের মধ্যেও প্রতিদিন নগরের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালানো হচ্ছে। কিছুদিন আগেও খাতুনগঞ্জে বিশেষ তদারকি কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে। ওই সময় বিভিন্ন অনিয়মের দায়ে কয়েকজনকে জরিমানা করা হয়। এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে। কোনো অপরাধ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।