বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১২ কার্তিক ১৪৩৩

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০০:০৪, ২৯ অক্টোবর ২০২৬

লোকসানেও লভ্যাংশ দেবে চার কোম্পানি

লোকসানেও লভ্যাংশ দেবে চার কোম্পানি

ছবি সংগৃহীত

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ৩২টি কোম্পানির লভ্যাংশ ঘোষণায় বড় ধরনের বৈচিত্র্য দেখা গেছে। কোনো কোম্পানি শেয়ারহোল্ডারদের জন্য বড় অঙ্কের নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে, আবার কোনো কোম্পানি লোকসানে থাকার পরও বিনিয়োগকারীদের হাতে সামান্য নগদ অর্থ তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিপরীতে ৯টি কোম্পানি চলতি হিসাববছরের জন্য কোনো লভ্যাংশ ঘোষণা করেনি। এতে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর আয়, মুনাফা বণ্টন এবং বিনিয়োগকারীদের প্রাপ্তির মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য ফুটে উঠেছে।

প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ৩২টি কোম্পানির মধ্যে সর্বোচ্চ ৬০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে ইউনাইটেড পাওয়ার। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে এমজেএল বাংলাদেশ। অন্যদিকে শেয়ারপ্রতি লোকসান থাকা সত্ত্বেও আলহাজ টেক্সটাইল, গোল্ডেন হার্ভেস্ট, বিবিএস কেব্লস ও ড্রাগণ সোয়েটার লভ্যাংশ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ চার কোম্পানির ঘোষিত নগদ লভ্যাংশের হার যথাক্রমে এক শতাংশ, এক শতাংশ, ০.২৫ শতাংশ ও ০.২০ শতাংশ।

গতকাল বুধবার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্য থেকে এসব বিষয় জানা গেছে। পুঁজিবাজার বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে, কোম্পানির লভ্যাংশের হার বিনিয়োগকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও শুধু এ একটি সূচক দিয়ে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা কিংবা বিনিয়োগের উপযোগিতা নির্ধারণ করা যায় না। কোম্পানির শেয়ারপ্রতি আয়, মুনাফার ধারাবাহিকতা, নগদ প্রবাহ, ঋণের পরিমাণ এবং ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক সম্ভাবনাও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে লোকসানে থাকা কোনো কোম্পানি লভ্যাংশ ঘোষণা করলে সেই অর্থের উৎস ও আর্থিক অবস্থার বিষয়টি খতিয়ে দেখা গুরুত্বপূর্ণ।

প্রকাশিত তালিকায় লভ্যাংশ ঘোষণায় এগিয়ে রয়েছে ইউনাইটেড পাওয়ার। কোম্পানিটি শেয়ারহোল্ডারদের জন্য ৬০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। তালিকাভুক্ত ৩২টি কোম্পানির মধ্যে এটিই সর্বোচ্চ ঘোষিত হার।

দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে এমজেএল বাংলাদেশ। কোম্পানিটি ৫০ শতাংশ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। শীর্ষ দুই প্রতিষ্ঠানের ঘোষিত লভ্যাংশের হারের মধ্যে ১০ শতাংশ পয়েন্টের ব্যবধান রয়েছে।

এ ছাড়া তমিজউদ্দিন টেক্সটাইল ১৩ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। আমান ফিড ও সামিট পাওয়ারের ঘোষিত নগদ লভ্যাংশের হার ১০ দশমিক ৫০ শতাংশ।

এসব কোম্পানির ঘোষিত লভ্যাংশের হার থেকে বোঝা যায়, তালিকাভুক্ত সব প্রতিষ্ঠানের মুনাফা বণ্টনের নীতি এক নয়। কোনো প্রতিষ্ঠান তুলনামূলকভাবে বেশি নগদ লভ্যাংশ দিচ্ছে, আবার কোনো প্রতিষ্ঠান সীমিত হারে লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। তবে শুধু ঘোষিত শতাংশের ভিত্তিতে কোন কোম্পানি বিনিয়োগকারীদের জন্য বেশি লাভজনক, তা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।

কারণ লভ্যাংশের শতাংশের পাশাপাশি শেয়ারের অভিহিত মূল্য, বাজারদর এবং কোম্পানির আর্থিক অবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ। একই হারে লভ্যাংশ ঘোষণা করা দুটি কোম্পানির শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ থেকে প্রাপ্ত রিটার্ন ভিন্ন হতে পারে। আবার উচ্চ লভ্যাংশ ঘোষণা করলেও কোম্পানির আয় ও নগদ প্রবাহ দুর্বল হলে ভবিষ্যতে একই ধরনের লভ্যাংশ অব্যাহত রাখা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

৩২টি কোম্পানির মধ্যে ১০টি প্রতিষ্ঠান শুধু সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের জন্য লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। তালিকায় রয়েছে তমিজউদ্দিন টেক্সটাইল, আমান ফিড, আমান কটন, সোনারগাঁও টেক্সটাইল, ন্যাশনাল পলিমার, জেএমআই হসপিটাল, বিডি অটোকারস, গোল্ডেন হার্ভেস্ট, ওরিজা অ্যাগ্রো ও ড্রাগণ সোয়েটার।

সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ প্রদানের বিষয়টি বিনিয়োগকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কোম্পানির ঘোষিত লভ্যাংশের ধরন ও প্রাপ্যতা নির্ধারণ করে কোন শ্রেণির শেয়ারহোল্ডার কী সুবিধা পাবেন। তবে শুধু সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ দেওয়ার ঘোষণা থেকেই কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।

এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির সর্বশেষ আর্থিক প্রতিবেদন, শেয়ারপ্রতি আয় এবং পরিচালনা পর্ষদের ঘোষণার বিস্তারিত তথ্য পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি লভ্যাংশের রেকর্ড ডেট, অনুমোদন এবং বিতরণসংক্রান্ত শর্তও বিনিয়োগকারীদের নজরে রাখা উচিত।

তালিকার একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, গোল্ডেন হার্ভেস্ট ও ড্রাগণ সোয়েটার—দুটি কোম্পানিই সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ দেওয়ার তালিকায় রয়েছে। একই সঙ্গে শেয়ারপ্রতি লোকসান থাকা সত্ত্বেও লভ্যাংশ ঘোষণাকারী চার প্রতিষ্ঠানের মধ্যেও তাদের নাম রয়েছে। ফলে কোম্পানিগুলোর লভ্যাংশ ঘোষণার পাশাপাশি আর্থিক ফলাফলের বিস্তারিত বিশ্লেষণও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

প্রকাশিত তথ্যের সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো, শেয়ারপ্রতি লোকসান থাকা সত্ত্বেও চারটি কোম্পানি নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো আলহাজ টেক্সটাইল, গোল্ডেন হার্ভেস্ট, বিবিএস কেব্লস ও ড্রাগণ সোয়েটার।

তথ্য অনুযায়ী, আলহাজ টেক্সটাইল এক শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। গোল্ডেন হার্ভেস্টও এক শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অন্যদিকে, বিবিএস কেব্লস ০.২৫ শতাংশ এবং ড্রাগণ সোয়েটার ০.২০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে।

চারটি প্রতিষ্ঠানের ঘোষিত লভ্যাংশের হার তুলনামূলকভাবে কম। তবে লোকসানে থাকা কোম্পানির লভ্যাংশ ঘোষণার বিষয়টি বিনিয়োগকারীদের জন্য আলাদা গুরুত্ব বহন করে। সাধারণভাবে কোম্পানির আয় ও মুনাফা থেকে লভ্যাংশ দেওয়ার সক্ষমতা তৈরি হয়। কিন্তু কোনো প্রতিষ্ঠানের শেয়ারপ্রতি আয় ঋণাত্মক হলেই যে তার নগদ লভ্যাংশ দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই, বিষয়টি সব ক্ষেত্রে এত সরল নয়।

কোম্পানির হিসাবভিত্তিক আয় ও নগদ অর্থের প্রবাহ এক বিষয় নয়। কোনো প্রতিষ্ঠানের নির্দিষ্ট হিসাববছরে লোকসান হতে পারে, কিন্তু তার হাতে আগের বছরের সঞ্চিত মুনাফা বা অন্য বৈধ উৎস থেকে লভ্যাংশ দেওয়ার মতো অর্থ থাকতে পারে। আবার হিসাবের মুনাফা থাকলেও নগদ অর্থের সংকটের কারণে লভ্যাংশ দেওয়ার সক্ষমতা সীমিত হতে পারে।

তবে এসব সম্ভাবনার কোনোটি সংশ্লিষ্ট চার কোম্পানির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য কি না, তা নিশ্চিত হতে তাদের নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী, সঞ্চিত মুনাফার হিসাব, নগদ প্রবাহ এবং লভ্যাংশ ঘোষণার বিস্তারিত তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন। প্রকাশিত তালিকার তথ্য দিয়ে লভ্যাংশের অর্থের উৎস সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত দেওয়া যায় না।

বিশেষ করে লোকসানে থাকা কোম্পানির ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের কয়েকটি বিষয় খতিয়ে দেখা দরকার। কোম্পানিটি কত দিন ধরে লোকসানে রয়েছে, লোকসানের পরিমাণ বাড়ছে নাকি কমছে, কার্যক্রম থেকে নগদ অর্থ আসছে কি না এবং ভবিষ্যতে ব্যবসা ঘুরে দাঁড়ানোর বাস্তব সম্ভাবনা রয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর গুরুত্বপূর্ণ।

এছাড়া লভ্যাংশ ঘোষণার পর কোম্পানির শেয়ারদরে কী ধরনের পরিবর্তন হচ্ছে, সেটিও বিনিয়োগের সিদ্ধান্তের একমাত্র ভিত্তি হওয়া উচিত নয়। বাজারদরের ওঠানামার পাশাপাশি কোম্পানির মৌলভিত্তি মূল্যায়ন করা জরুরি।

অন্যদিকে ৩২টি কোম্পানির মধ্যে ৯টি কোনো লভ্যাংশ ঘোষণা করেনি। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো আজিজ পাইপস, জিলবাংলা সুগার, শ্যামপুর সুগার, জিএসপি ফাইন্যান্স, উসমানিয়া গ্লাস, বিবিএস, ইনফরমেশন সার্ভিসেস, জাহিন স্পিনিং ও পেনিনসুলা চিটাগাং।

প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এসব কোম্পানির শেয়ারপ্রতি আয় ঋণাত্মক। অর্থাৎ সংশ্লিষ্ট হিসাবের ভিত্তিতে কোম্পানিগুলো শেয়ারপ্রতি লোকসান দেখিয়েছে। কোনো কোম্পানি লভ্যাংশ ঘোষণা না করলে বিনিয়োগকারীরা ওই হিসাববছরের জন্য সরাসরি নগদ বা শেয়ার লভ্যাংশ পান না। তবে এর অর্থ এই নয় যে, কোম্পানিটির ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা সম্পূর্ণ শেষ হয়ে গেছে। একইভাবে লভ্যাংশ না দেওয়ার সিদ্ধান্তকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ইতিবাচক বা নেতিবাচক হিসেবেও দেখা উচিত নয়।

কোম্পানি লোকসানে থাকলে ব্যবসার স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনা, ঋণ পরিশোধ, উৎপাদন সক্ষমতা ধরে রাখা, কিংবা নতুন বিনিয়োগের জন্য অর্থ সংরক্ষণ করতে পারে। সে ক্ষেত্রে লভ্যাংশ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত আর্থিক ব্যবস্থাপনার অংশ হতে পারে। অন্যদিকে দীর্ঘদিন ধরে লোকসান, ঋণের চাপ, দুর্বল নগদ প্রবাহ ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমে স্থবিরতা থাকলে তা বিনিয়োগকারীদের জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে।

তবে ৯টি কোম্পানির লভ্যাংশ না দেওয়ার পেছনে ঠিক কোন কারণ কাজ করেছে, তা নির্ধারণ করতে প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদের ঘোষণা ও আর্থিক প্রতিবেদন আলাদাভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

বিশেষ করে শেয়ারপ্রতি আয় ঋণাত্মক হওয়ার কারণ, আগের বছরের তুলনায় লোকসানের পরিবর্তন, সম্পদ ও দায়ের অবস্থা এবং ব্যবসার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বিশ্লেষণ করলে কোম্পানিগুলোর প্রকৃত অবস্থান সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে।

৩২টি কোম্পানির লভ্যাংশ ঘোষণার চিত্রে শেয়ারপ্রতি আয় ও লভ্যাংশের হারের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। কোনো কোম্পানি তুলনামূলক বেশি লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে, আবার কোনো কোম্পানি লোকসানে থেকেও নগদ অর্থ বিতরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিপরীতে কয়েকটি কোম্পানি লোকসানের মধ্যে কোনো লভ্যাংশ দেয়নি।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শেয়ারপ্রতি আয় বা ইপিএস এবং লভ্যাংশের হার এক ধরনের আর্থিক সূচক নয়। শেয়ারপ্রতি আয় থেকে নির্দিষ্ট সময়ে একটি কোম্পানি প্রতিটি শেয়ারের বিপরীতে কত আয় বা লোকসান করেছে, সে সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। অন্যদিকে লভ্যাংশের হার কোম্পানির ঘোষিত বণ্টনের পরিমাণ নির্দেশ করে।

তাই একটি কোম্পানির ইপিএস বেশি হলেই তার লভ্যাংশের হার বেশি হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। একইভাবে, কোনো কোম্পানির ইপিএস ঋণাত্মক হলেও তার সঞ্চিত মুনাফা, নগদ অর্থের অবস্থা ও প্রযোজ্য বিধিবিধানের ভিত্তিতে লভ্যাংশ ঘোষণার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ সাধারণত ব্যবসার আয়, ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের প্রয়োজন, ঋণের দায়, নগদ অর্থের প্রাপ্যতা এবং অন্যান্য আর্থিক বিষয় বিবেচনা করে লভ্যাংশের প্রস্তাব দেয়। পরে প্রযোজ্য নিয়ম অনুযায়ী সেই প্রস্তাবের অনুমোদন ও বিতরণসংক্রান্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।

এ কারণে বিনিয়োগকারীদের শুধু লভ্যাংশের শতাংশ দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। একটি কোম্পানি কেন বেশি লভ্যাংশ দিচ্ছে, সেই অর্থের উৎস কী, আয় কতটা টেকসই এবং ভবিষ্যতে ব্যবসার প্রবৃদ্ধির সুযোগ কেমন—এসব প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে লভ্যাংশ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়। বিশেষ করে নিয়মিত আয় প্রত্যাশী বিনিয়োগকারীরা সাধারণত নগদ লভ্যাংশ প্রদানকারী কোম্পানির প্রতি আগ্রহ দেখান। তবে লভ্যাংশের হার বেশি হলেই বিনিয়োগ ঝুঁকি কম হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।

উদাহরণ হিসেবে, কোনো কোম্পানি উচ্চ হারে লভ্যাংশ ঘোষণা করলেও তার আয় যদি অনিয়মিত হয় বা ব্যবসার নগদ প্রবাহ দুর্বল থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে একই হারে লভ্যাংশ দেওয়া কঠিন হতে পারে। অন্যদিকে, কোনো কোম্পানি চলতি বছরে লভ্যাংশ না দিলেও উৎপাদন সমপ্রসারণ, ঋণ কমানো কিংবা ব্যবসার পুনর্গঠনে অর্থ ব্যয় করে ভবিষ্যতে ভালো ফল অর্জন করতে পারে। তবে এমন সম্ভাবনা যাচাই করতে বাস্তব আর্থিক তথ্য প্রয়োজন।

বিনিয়োগকারীদের আরও একটি বিষয় মনে রাখতে হবে, ঘোষিত লভ্যাংশ এবং বাস্তবে পাওয়া অর্থ এক বিষয় নয়। লভ্যাংশের ধরন, অনুমোদন, রেকর্ড ডেট ও বিতরণের সময়সূচি সংশ্লিষ্ট কোম্পানির আনুষ্ঠানিক ঘোষণার ভিত্তিতে যাচাই করা উচিত। বিশেষ করে নগদ লভ্যাংশের ক্ষেত্রে ঘোষিত হারটি কোন ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়েছে, তা জানা প্রয়োজন।

এ ছাড়া শেয়ারের বাজারদর, কোম্পানির শেয়ারপ্রতি আয়, নিট মুনাফা, ঋণের পরিমাণ, নগদ প্রবাহ এবং আগের কয়েক বছরের লভ্যাংশের ধারাবাহিকতা একসঙ্গে বিবেচনা করা দরকার। এসব তথ্যের সমন্বিত বিশ্লেষণ ছাড়া শুধু লভ্যাংশের হার দেখে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিলে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

সামগ্রিকভাবে ৩২টি কোম্পানির ঘোষিত লভ্যাংশের চিত্র পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক অবস্থান ও মুনাফা বণ্টনের নীতিতে বৈচিত্র্য তুলে ধরেছে। ইউনাইটেড পাওয়ারের ৬০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ থেকে শুরু করে লোকসানে থাকা চার প্রতিষ্ঠানের সীমিত হারের লভ্যাংশ এবং নয়টি কোম্পানির লভ্যাংশ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত—সব মিলিয়ে বিনিয়োগকারীদের জন্য কোম্পানিভিত্তিক বিশ্লেষণের গুরুত্ব সামনে এসেছে।

তবে প্রকাশিত তালিকার তথ্যের ভিত্তিতে সব কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতা সম্পর্কে একই ধরনের সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। লভ্যাংশের হার, শেয়ারপ্রতি আয় ও লোকসানের তথ্যের পাশাপাশি প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী এবং পরিচালনা পর্ষদের ঘোষণাও বিবেচনায় নিতে হবে।

বিশেষ করে লোকসানে থাকা কোম্পানিগুলোর লভ্যাংশের অর্থের উৎস, নগদ প্রবাহ এবং ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক সম্ভাবনা বিনিয়োগকারীদের নজরে রাখা প্রয়োজন। একইভাবে উচ্চ লভ্যাংশ ঘোষণাকারী কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রেও আয় ও নগদ প্রবাহের ধারাবাহিকতা যাচাই করা জরুরি।

পুঁজিবাজারে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে শেষ পর্যন্ত শুধু লভ্যাংশের হার নয়, বরং কোম্পানির আয় করার সক্ষমতা, আর্থিক স্বচ্ছতা, ব্যবসার স্থিতিশীলতা এবং ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনাই গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য হয়ে ওঠে।