পর্যটন ব্যবসায় বাড়ছে ক্ষতির শঙ্কা
সমঝোতা হয়নি, ষষ্ঠ দিনেও সাজেক সড়কে অবরোধ, যান চলাচল বন্ধ
ছবি সংগৃহীত
রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক সড়কে অনির্দিষ্টকালের অবরোধের ষষ্ঠ দিন আজ। অবরোধের কারণে সাজেকের সঙ্গে সারা দেশের সড়ক যোগাযোগ কার্যত বন্ধ রয়েছে। গত সোমবার আন্দোলনকারীদের সঙ্গে প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হলেও কোনো সমঝোতা হয়নি। ফলে অবরোধ অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছে আন্দোলনকারী দুই সংগঠন সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন। এতে দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র সাজেক ভ্যালিতে পর্যটন কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থায় পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
আন্দোলনকারীদের দাবির মধ্যে রয়েছে সাজেক এলাকা থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) সন্তু লারমা-সমর্থিত সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে নেওয়া এবং আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহার। এ দাবিগুলো নিয়ে প্রশাসনের সঙ্গে একাধিকবার আলোচনা হলেও এখন পর্যন্ত সংকটের কোনো স্থায়ী সমাধান আসেনি।
গত সোমবার বিকালে সাজেকের উজো বাজার এলাকায় সরকারি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। তবে সাজেক থেকে সন্তু লারমা-সমর্থিত সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি না পাওয়ায় সমঝোতা হয়নি বলে জানিয়েছে সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটি। সংগঠনটির পক্ষ থেকে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, দাবি পূরণে কার্যকর সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত অবরোধ চলবে।
এর আগে সাজেকসহ পার্বত্য চট্টগ্রামের চলমান অস্থিরতা নিরসনে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে সংলাপের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির সংসদ সদস্যরা। ২৫ অক্টোবর রাঙামাটি জেলা প্রশাসকের সম্মেলনকক্ষে দুই জেলার হেডম্যান ও কারবারিদের সঙ্গে প্রশাসনের বৈঠকে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনা শুরুর জন্য তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। তবে এসব উদ্যোগের পরও এখন পর্যন্ত সংকট নিরসনে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি।
অবরোধের কারণে সাজেক সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকায় পর্যটকদের যাতায়াত ব্যাহত হচ্ছে। এর আগে গত ২২ অক্টোবর নিরাপত্তাব্যবস্থার মধ্যে সেনাবাহিনী ও পুলিশের সহায়তায় প্রায় তিন হাজার পর্যটককে সাজেক থেকে খাগড়াছড়ির দিকে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। পর্যটকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার পর সাজেকের পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে স্বাভাবিক ভ্রমণ কার্যক্রম কার্যত বন্ধ হয়ে পড়ে।
গত ১১ অক্টোবরও একই ধরনের অবরোধের কারণে সাজেকে পর্যটক প্রবেশ ও বের হওয়ার ক্ষেত্রে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছিল। পরে দুর্গাপূজা উপলক্ষে ১৬ থেকে ২১ অক্টোবর অবরোধ শিথিল থাকলেও ২২ অক্টোবর থেকে নতুন করে অবরোধ শুরু হয়। ফলে স্বল্প সময়ের জন্য পর্যটন কার্যক্রম চালু হওয়ার পর আবারও অচলাবস্থায় পড়েছে সাজেক।
সাজেকের পর্যটন অর্থনীতির বড় অংশ নির্ভর করে রিসোর্ট-কটেজ, পরিবহন, রেস্তোরাঁ, স্থানীয় দোকানপাট ও পর্যটকসেবা খাতের ওপর। অবরোধের কারণে পর্যটকদের যাতায়াত বন্ধ থাকায় এসব ব্যবসায় স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। পর্যটক না থাকায় রিসোর্ট ও কটেজের বুকিং, চাঁদের গাড়ি ও অন্যান্য যানবাহনের ভাড়া, খাবারের দোকান এবং ক্ষুদ্র ব্যবসার আয় কমে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
অবরোধের আগে দুর্গাপূজার ছুটিকে কেন্দ্র করে সাজেকের অধিকাংশ রিসোর্ট-কটেজে অগ্রিম বুকিং ছিল বলে পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছিলেন। কিন্তু অবরোধ ও নিরাপত্তাজনিত বিধিনিষেধের কারণে পর্যটকদের ভ্রমণ বাতিল বা স্থগিত হওয়ায় ব্যবসায়ীরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। দীর্ঘদিন এ অবস্থা চলতে থাকলে কর্মচারীদের বেতন, পরিবহন ব্যয়, রিসোর্ট পরিচালনা এবং ঋণের কিস্তি পরিশোধ নিয়েও চাপ বাড়তে পারে।
এর আগে পর্যটন কার্যক্রম বন্ধ থাকায় সাজেকের রিসোর্ট-কটেজ ও পরিবহন খাতে কয়েক কোটি টাকার ব্যবসায়িক ক্ষতির আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছিল। চলমান অবরোধ দীর্ঘায়িত হলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা। তবে বর্তমান অবরোধে মোট ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণে সংশ্লিষ্ট খাতগুলোর হালনাগাদ তথ্য প্রয়োজন।
সাজেকের রুইলুই রিসোর্টের পরিচালক মিশু দে বলেন, সাজেক সড়কে অবরোধ ও প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞায় পর্যটন কেন্দ্র বন্ধ রয়েছে। মৌসুমের শুরুতে এমন অচলাবস্থা চলায় ব্যবসায়ী, কর্মচারী এবং সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সংকটের দ্রুত সমাধান না হলে এই ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা আমাদের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়বে।
সাজেকের বর্তমান পরিস্থিতিতে একদিকে আন্দোলনকারীরা দাবি পূরণের নিশ্চয়তা চাইছেন, অন্যদিকে পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও স্থানীয় বাসিন্দারা স্বাভাবিক জীবনযাত্রা এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ফিরে পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন। সড়ক যোগাযোগ বন্ধ থাকায় পর্যটনকেন্দ্রটির স্বাভাবিক কার্যক্রমের পাশাপাশি স্থানীয় পরিবহন ও ব্যবসা-বাণিজ্যেও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে সংলাপের মাধ্যমে সংকট নিরসনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও গতকালের বৈঠকে সমঝোতা না হওয়ায় পরিস্থিতির দ্রুত অবসান নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। পর্যটন খাতের ক্ষতি কমাতে এবং স্থানীয় মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ফিরিয়ে আনতে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে কার্যকর আলোচনা ও গ্রহণযোগ্য সমাধান জরুরি বলে মনে করছেন পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
সাজেক রিসোর্ট ও কটেজ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মতিজয় ত্রিপুরা বলেন, আমাদের ১৩০টির মতো রিসোর্ট ও কটেজ রয়েছে, যা এখন পর্যটকশূন্য। এ ছাড়া এখানকার রেস্টুরেন্ট, টি স্টল, মুদি দোকান, ফুডকোর্ট ও ভাসমান হকার মিলিয়ে কয়েকশ মানুষ বেকার। পাশাপাশি স্থানীয়দের উৎপাদিত নানা ফলফলাদি ও ফসল বিক্রি বন্ধ হয়ে গেছে। মূলত সাজেক এখন সম্পূর্ণ অকার্যকর হয়ে পড়েছে। দ্রুত এই সংকটের সমাধান চাই আমরা।
এদিকে আন্দোলনকারী দুই সংগঠন অবরোধ অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেওয়ায় সাজেক সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হওয়ার বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো সময়সীমা পাওয়া যায়নি। ফলে পর্যটনকেন্দ্রটির স্বাভাবিক কার্যক্রম কবে ফিরবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটছে না।
এ বিষয়ে জানতে সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সংযোগ পাওয়া সম্ভব হয়নি।