উন্নয়ন না নতুন পরিবেশ বিপর্যয়
শীতলক্ষ্যায় ৮৫০ কোটি টাকার টার্মিনাল
ছবি সংগৃহীত
নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদী। একদিকে শিল্পকারখানার বর্জ্য, অন্যদিকে দখল ও নাব্যতার সংকট। নদীটির পানি ও পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগের মধ্যেই এবার বরফকল-খানপুর এলাকায় প্রায় ৮৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে অভ্যন্তরীণ কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্প নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে নৌপথে পণ্য পরিবহন বাড়তে পারে, কমতে পারে দূরপাল্লার সড়কনির্ভরতা। কিন্তু তার বিপরীতে নদীর ওপর বাড়তি চাপ, ভারী ট্রাকের চলাচল, নগরজট এবং স্থানীয় পরিবেশের ক্ষতির ঝুঁকি কতটা—সেই হিসাব কি প্রকাশ্যে এসেছে?
গত ২৬ অক্টোবর প্রকল্পটি বাতিলের দাবিতে জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবিরের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছে নারায়ণগঞ্জ নাগরিক অধিকার ফোরাম। সংগঠনটির দাবি, ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় টার্মিনাল নির্মাণের আগে পরিবেশগত প্রভাব, সড়কের ধারণক্ষমতা, বিদ্যমান পানগাঁও টার্মিনালের ব্যবহার এবং প্রকল্পের অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা যাচাই করতে হবে। বিকল্প হিসেবে শান্তিরচর, কয়লাঘাট কিংবা বন্দর এলাকার তুলনামূলক বিস্তৃত জায়গার কথাও বলেছে সংগঠনটি। জেলা প্রশাসক স্মারকলিপির বক্তব্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। তবে নাগরিক সংগঠনের অভিযোগ ও আশঙ্কাই প্রকল্পের ক্ষতিকর প্রভাবের চূড়ান্ত প্রমাণ নয়; সেগুলোর সত্যতা নিরপেক্ষ সমীক্ষায় যাচাই করা জরুরি।
দূষিত নদীতে আরও চাপের আশঙ্কা: শীতলক্ষ্যার পরিবেশগত অবস্থার বিষয়ে উদ্বেগের পেছনে বৈজ্ঞানিক তথ্যও রয়েছে। ২০২৫ সালে ‘Heliyon’ সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় ২০২২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত নদীটির প্রায় ৭৫ কিলোমিটার অংশের ১০টি নমুনা সংগ্রহস্থলে পানির ১৮টি গুণগত সূচক পরীক্ষা করা হয়। গবেষণায় দেখা যায়, সময়ের সঙ্গে পানির সামগ্রিক গুণগত মান খারাপ হয়েছে; নগরাঞ্চলের নমুনায় দূষণও তুলনামূলক বেশি। শিল্পবর্জ্য ও গৃহস্থালি বর্জ্যকে এর গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
গবেষণাটিতে পানির জৈব রাসায়নিক অক্সিজেন চাহিদা ছিল প্রতি লিটারে ৬-১২ মিলিগ্রাম এবং রাসায়নিক অক্সিজেন চাহিদা ছিল ৮-১৪ মিলিগ্রাম। এসব সূচক পানিতে জৈব ও রাসায়নিক দূষণের চাপ বুঝতে সহায়তা করে। এ দুটি মান দিয়ে নদীর সব অংশের পরিবেশগত অবস্থা কিংবা প্রস্তাবিত টার্মিনালের সম্ভাব্য ক্ষতি নির্ধারণ করা যায় না।
আরও উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে। সেখানে উদ্ধৃত গবেষণা অনুযায়ী, তুরাগ ও শীতলক্ষ্যার শিল্পাঞ্চলসংলগ্ন পানির নমুনায় সিসাসহ চারটি ক্ষতিকর ভারী ধাতুর মাত্রা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নিরাপদ সীমা ছাড়িয়েছে; কিছু নমুনায় সিসার মাত্রা ছিল ওই সীমার সর্বোচ্চ ৪৫ গুণ। তবে এই ফল নির্দিষ্ট নমুনা ও সংগ্রহস্থলভিত্তিক—একে শীতলক্ষ্যার প্রতিটি অংশের অবস্থা হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।
এই প্রেক্ষাপটে টার্মিনাল নির্মাণের সময় নদীর তীর ভরাট, ড্রেজিং, পলি অপসারণ, নির্মাণসামগ্রী ও জাহাজের কার্যক্রম থেকে দূষণ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ঝুঁকি আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। প্রকল্পের নকশা ও পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন দেখে এসব ক্ষতির পরিমাণ নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব। কিন্তু নদীটির বর্তমান দূষণ পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে আগাম সতর্কতা অবলম্বনের যৌক্তিকতা রয়েছে।
প্রকল্পের ব্যয় প্রায় ৮৫০ কোটি টাকা বলে নাগরিক সংগঠনগুলোর স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়েছে। এর সম্ভাব্য বার্ষিক পণ্য পরিবহন, আয়, পরিচালন ব্যয়, নদী খননের প্রয়োজন, সড়ক উন্নয়ন, পরিবেশগত ক্ষতি এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয়ও হিসাবের মধ্যে আনতে হবে।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন পানগাঁও অভ্যন্তরীণ কনটেইনার টার্মিনালের ব্যবহার নিয়ে। নাগরিক অধিকার ফোরামের দাবি, কাছাকাছি বিদ্যমান টার্মিনালটির সক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগানো হচ্ছে না। কিন্তু পানগাঁওয়ের প্রকৃত ব্যবহার, বার্ষিক পণ্য ওঠানামা, অব্যবহূত সক্ষমতা এবং নতুন টার্মিনালের সম্ভাব্য চাহিদার তুলনামূলক সরকারি পরিসংখ্যান ছাড়া এ দাবির পূর্ণ সত্যতা নির্ধারণ করা যাবে না।
প্রশ্ন হচ্ছে, বিদ্যমান অবকাঠামোর সক্ষমতা বাড়ানো, ব্যবস্থাপনা উন্নত করা কিংবা নৌপথের সংযোগ শক্তিশালী করার মাধ্যমে একই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব কি না। নতুন টার্মিনাল নির্মাণের আগে এসব বিকল্পের ব্যয়-সুবিধা বিশ্লেষণ প্রকাশ করা হলে প্রকল্পটির যৌক্তিকতা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।
ভারী ট্রাকের চাপে নগরজট বাড়বে: টার্মিনাল চালু হলে কনটেইনার পরিবহনের জন্য ট্রাক ও ট্রেইলারের নিয়মিত চলাচল প্রয়োজন হবে। বরফকল-খানপুর এলাকায় সেই যানবাহনের প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ, সড়কের প্রস্থ, সেতুর ভারবহনক্ষমতা এবং মোড়গুলোর ধারণক্ষমতা যথেষ্ট কি না—এগুলো প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে যাচাই করা জরুরি।
নাগরিক অধিকার ফোরামের নেতারা দাবি করেছেন, আশপাশের সেতুগুলোর উচ্চতা ও ভারী যানবাহন চলাচলের উপযোগী প্রশস্ত সড়কের অভাব রয়েছে। তাদের আশঙ্কা, টার্মিনাল চালু হলে হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শহীদ মিনার ও সরকারি কার্যালয়সংলগ্ন সড়কে যানজট এবং জনদুর্ভোগ বাড়বে। এসব দাবির সত্যতা নির্ধারণে সেতুর প্রকৃত উচ্চতা, সড়কের প্রস্থ, যানবাহনের বর্তমান প্রবাহ এবং ভবিষ্যৎ ট্রাক চলাচলের সম্ভাব্য সংখ্যা নিয়ে প্রকৌশলগত সমীক্ষা প্রয়োজন।
শুধু যানজট নয়, ভারী যানবাহনের ধোঁয়া, শব্দ, সড়ক দুর্ঘটনা ও স্থানীয় বসতির ওপর প্রভাবও মূল্যায়ন করতে হবে। টার্মিনালের জন্য নির্দিষ্ট প্রবেশপথ, ট্রাকের অপেক্ষমাণ স্থান এবং শহরের ব্যস্ত সড়ক এড়িয়ে চলাচলের ব্যবস্থা না থাকলে নদীপথে পণ্য পরিবহনের সুবিধা নগরবাসীর জন্য নতুন দুর্ভোগ তৈরি করতে পারে।
পরিবেশগত সমীক্ষা কি জনসমক্ষে: এই বিতর্কের কেন্দ্রীয় প্রশ্নগুলোর একটি হলো প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন এবং ব্যয়-সুবিধা বিশ্লেষণের নথি। এসব নথিতে নদীর পানির মান, পলি ও নাব্যতা, জলজ প্রাণী, তীরবর্তী পরিবেশ, ড্রেজিংয়ের প্রয়োজন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং নির্মাণকাজের বিকল্প নকশা সম্পর্কে কী বলা হয়েছে, তা জনসমক্ষে থাকা প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে নথি সংগ্রহ করে বিষয়টি নিশ্চিত করা দরকার। প্রকল্পের পরিবেশগত ছাড়পত্র, অনুমোদনের শর্ত এবং সেগুলো বাস্তবায়নের তদারকির ব্যবস্থাও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
২০২৫ সালের মে মাসে শীতলক্ষ্যা দূষণ নিয়ে এক রিটের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট পরিবেশ অধিদপ্তর ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়কে দূষণের মাত্রা এবং পরিবেশগত ক্ষতির আর্থিক মূল্য নিরূপণে যৌথ কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছিলেন। নদীদূষণের ক্ষতি নিরূপণ ও দায়ীদের জবাবদিহিতার প্রশ্ন যখন বিচারিক পর্যায়েও গুরুত্ব পেয়েছে, তখন নতুন অবকাঠামো নির্মাণের সিদ্ধান্তে পরিবেশগত ঝুঁকি যথাযথভাবে বিবেচনা করা আরও জরুরি।
উন্নয়ন হোক, নদী ও নগরকে ঝুঁকিতে ফেলে নয়: নারায়ণগঞ্জের অর্থনীতি, শিল্প ও নৌবাণিজ্যের জন্য আধুনিক টার্মিনালের প্রয়োজনীয়তা উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। নৌপথে পণ্য পরিবহন বাড়লে সড়কের ওপর চাপ কমানোর সম্ভাবনাও রয়েছে। কিন্তু সে সুফল পেতে হলে টার্মিনালের অবস্থান, সড়ক-নৌ সংযোগ, পরিবেশ সুরক্ষা এবং বিদ্যমান অবকাঠামোর সঙ্গে সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে।
নাগরিক অধিকার ফোরাম প্রকল্পটি বাতিল করে বিকল্প স্থানে নেওয়ার দাবি জানিয়েছে। অন্যদিকে প্রকল্পটির পক্ষে অর্থনৈতিক ও পরিবহনগত যুক্তি থাকলে সেগুলোও তথ্য-উপাত্ত দিয়ে জনসমক্ষে তুলে ধরা উচিত। আবেগ বা রাজনৈতিক অভিযোগের ভিত্তিতে নয়, বরং নিরপেক্ষ সমীক্ষা, প্রকাশ্য ব্যয়-সুবিধা বিশ্লেষণ এবং স্থানীয় মানুষের মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়াই হবে দায়িত্বশীল পথ।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু ৮৫০ কোটি টাকার টার্মিনাল নির্মাণের নয়। প্রশ্ন হলো—শীতলক্ষ্যার দূষণ নিয়ন্ত্রণ, নগরীর যানজট, বিদ্যমান টার্মিনালের ব্যবহার এবং পরিবেশগত ক্ষতির হিসাব না মিটিয়ে নতুন প্রকল্প নিলে নারায়ণগঞ্জ কতটা লাভবান হবে? উন্নয়নের সুফল যদি নদী ও নগরবাসীর ওপর নতুন চাপ তৈরি করে, তবে সেই উন্নয়নের নকশা পুনর্বিবেচনা করাই হবে জনস্বার্থের দাবি।