শ্রমিককে ব্যবসায়ী সাজিয়ে রেলওয়ের টাকা আত্মসাৎ
ছবি সংগৃহীত
জাল পরিচয়পত্র ও ট্রেড লাইসেন্স ব্যবহার করে কথিত একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নামে বাংলাদেশ রেলওয়ের ৯৬ লাখ ৯০ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় বাংলাদেশ রেলওয়ে, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) ও সীমান্ত ব্যাংক পিএলসির ১৪ কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা করার অনুমোদন দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সংস্থাটির অনুসন্ধানে ভুয়া বিল তৈরি, নথি যাচাইয়ে অনিয়ম এবং ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে অসংগতির তথ্য পাওয়া গেছে।
দুদকের নথি অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর রেলওয়ের ৯৬ লাখ ৯০ হাজার টাকার চেক ইস্যু করা হয়। পরদিন ২০২৪ সালের ১ জানুয়ারি চেকটি সীমান্ত ব্যাংকের আগ্রাবাদ শাখায় মেসার্স দি কসমোপলিটন করপোরেশনের নামে খোলা হিসাবে জমা দেওয়া হয়। এরপর ২ জানুয়ারি ব্যাংকের মতিঝিল শাখা থেকে ৮০ লাখ টাকা এবং ৮ জানুয়ারি একই শাখা থেকে আরও ৮ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়। ওই দিন ব্যাংকের ধানমন্ডির প্রধান শাখা থেকে আরও ৫ লাখ টাকা তোলার তথ্য পেয়েছে দুদক। অবশিষ্ট অর্থও পরবর্তী সময়ে উত্তোলন করা হয়েছে বলে অনুসন্ধানে উল্লেখ রয়েছে।
দুদকের অনুসন্ধানে বলা হয়েছে, কথিত প্রতিষ্ঠানটির নামে ব্যাংক হিসাব খোলার সময় বার্ষিক লেনদেন দেখানো হয় ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা। অথচ প্রতিষ্ঠানটির কথিত মালিক হিসেবে ব্যবহূত কোহিনুর আক্তার পেশায় একজন শ্রমিক। তিনি তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন। তার পরিচয়পত্রের ছবি ও স্বাক্ষরের সঙ্গে ট্রেড লাইসেন্সের আবেদনে থাকা ছবি ও স্বাক্ষরের অমিল পাওয়া যায়। কোহিনুর আক্তার দুদককে জানিয়েছেন, তিনি কখনো চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের কার্যালয়ে যাননি।
দুদকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কোহিনুর আক্তারের পরিচয়ে চসিকের ১৬ নম্বর চকবাজার ওয়ার্ডে সরবরাহকারী শ্রেণিতে ট্রেড লাইসেন্সের জন্য অনলাইনে আবেদন করা হয়। আবেদনের সঙ্গে জাতীয় পরিচয়পত্রের অনুলিপি ও ছবি যুক্ত ছিল। অনুসন্ধানে লাইসেন্সে উল্লেখ করা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ঠিকানায় কোনো প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্বও পাওয়া যায়নি। প্রয়োজনীয় নথি যাচাই না করে লাইসেন্স ইস্যু করার অভিযোগ রয়েছে চসিকের লাইসেন্স পরিদর্শক মুহাম্মদ ইকবাল, সাবেক উপকর কর্মকর্তা এম মনজুর উদ্দিন চৌধুরী এবং সাবেক কর কর্মকর্তা মুহাম্মদ জসিম উদ্দিনের বিরুদ্ধে।
ওই ট্রেড লাইসেন্স ও পরিচয়পত্র ব্যবহার করে ২০২৩ সালের ৩০ নভেম্বর সীমান্ত ব্যাংকের আগ্রাবাদ শাখায় মেসার্স দি কসমোপলিটন করপোরেশনের নামে একটি স্বল্পমেয়াদি নোটিশ আমানত হিসাব খোলা হয়। দুদকের অনুসন্ধানে হিসাব খোলার নথিতে ছবি ও স্বাক্ষরের অসংগতি পাওয়া গেছে। এসব বিষয় যথাযথভাবে যাচাই না করেই হিসাব খোলার অভিযোগ রয়েছে ব্যাংকের তৎকালীন শাখা ব্যবস্থাপক গোলাম মোহাম্মদ ফরহাদ সরওয়ার, রিলেশনশিপ ব্যবস্থাপক বিদেশ বড়ুয়া ও কর্মকর্তা মো. পারভেজের বিরুদ্ধে।
রেলওয়ের অর্থ ছাড়ের প্রক্রিয়ায়ও অনিয়মের অভিযোগ পেয়েছে দুদক। সংস্থাটির অনুসন্ধান অনুযায়ী, রেলওয়ের অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান হিসাব অধিকর্তা (পূর্ব) কার্যালয়ের ডিএফএ/স্টোরস শাখার তিন অডিটর পবন কুমার পালিত, মোহাম্মদ মেহেদী হাসান ও খোকন চন্দ্র দে একই আইডি ও পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে ‘আইবাস++’ ব্যবস্থায় ভুয়া বিল ও টোকেনের তথ্য অন্তর্ভুক্ত করেন। পরে হিসাব কর্মকর্তা মো. মামুন হোসেনের আইডি ব্যবহার করে বিল অনুমোদন করা হয় বলে অনুসন্ধানে উল্লেখ রয়েছে।
নথি অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর বিলগুলো বুকস অ্যান্ড বাজেট শাখায় পাঠানো হয়। অস্থায়ী কর্মচারী মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহ খান বিলগুলো নিয়ে যান। পরে অফিস সহায়ক মো. মাকসুদুর রহমান সেগুলো গ্রহণ করে হিসাবরক্ষক সৈয়দ সাইফুর রহমানের কাছে পৌঁছে দেন। দুদকের অভিযোগ, বিলের সত্যতা ও সরবরাহকারীর পরিচয় যথাযথভাবে যাচাই না করেই চেক ইস্যুর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। হিসাব কর্মকর্তা মো. আবু নাছেরও মূল ঠিকাদারের তথ্য যাচাই না করে চেকে স্বাক্ষর করেন বলে অনুসন্ধানে উল্লেখ করা হয়েছে।
দুদকের অনুসন্ধানে ‘সোহাগ আলী’ নামে এক ব্যক্তির কথাও এসেছে, যাকে কথিত প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। প্রতিষ্ঠানটির প্রকৃত মালিক নাবিল আহসান দুদককে জানিয়েছেন, সোহাগ আলীকে তিনি চেনেন না এবং ওই ব্যক্তি তার প্রতিষ্ঠানের অনুমোদিত কর্মী নন। অনুসন্ধানের সময় কোহিনুর আক্তারের পরিচয় ব্যবহারকারী ব্যক্তি ও সোহাগ আলীর প্রকৃত পরিচয় নিশ্চিত করা যায়নি বলে দুদকের নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
এ ঘটনায় অভিযুক্ত ১৪ জনের মধ্যে রেলওয়ের অস্থায়ী কর্মচারী মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহ খান, সাবেক অডিটর পবন কুমার পালিত, জুনিয়র অডিটর মোহাম্মদ মেহেদী হাসান ও খোকন চন্দ্র দে, হিসাব কর্মকর্তা মো. মামুন হোসেন, হিসাবরক্ষক সৈয়দ সাইফুর রহমান, হিসাব কর্মকর্তা মো. আবু নাছের এবং অফিস সহায়ক মো. মাকসুদুর রহমান রয়েছেন। চসিকের লাইসেন্স পরিদর্শক মুহাম্মদ ইকবাল, সাবেক উপকর কর্মকর্তা এম মনজুর উদ্দিন চৌধুরী ও সাবেক কর কর্মকর্তা মুহাম্মদ জসিম উদ্দিন এবং সীমান্ত ব্যাংকের কর্মকর্তা মো. পারভেজ, রিলেশনশিপ ব্যবস্থাপক বিদেশ বড়ুয়া ও সাবেক শাখা ব্যবস্থাপক গোলাম মোহাম্মদ ফরহাদ সরওয়ারও অভিযুক্তদের তালিকায় রয়েছেন।
দুদক চট্টগ্রাম জেলা কার্যালয়-২-এর উপপরিচালক মো. রিয়াজ উদ্দিন বলেন, অনুসন্ধানে ক্ষমতার অপব্যবহার ও ভুয়া নথিপত্র তৈরির মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ পাওয়ায় কমিশন মামলা দায়েরের অনুমোদন দিয়েছে। শিগগিরই অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।