রবিতে সাহেদের একচ্ছত্র আধিপত্য
শেয়ার বিজ
প্রথম সাক্ষাতে তার ব্যবহারে মুগ্ধ হবেন যে কোনো ব্যক্তি। উঁচু গলায় কথা বলা অথবা দুর্ব্যবহারও করেন না কারও সঙ্গে। আচার ব্যবহারে মুগ্ধতা ছড়ানো এ ব্যক্তির স্বার্থের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলেই সর্বনাশ। রবিতে তার অনিয়মের বিরুদ্ধে কথা বলার চেষ্টা করে এখন পর্যন্ত কেউই সুবিধা করতে পারেননি। এর মূল কারণ, তার নিয়ন্ত্রণে থাকা সাতটি গুরু দায়িত্ব। একচ্ছত্র ক্ষমতাধর এই ব্যক্তি হলেন দেশের দ্বিতীয় বৃহৎ মোবাইল সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান রবি আজিয়াটা পিএলসির চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অফিসার সাহেদ আলম।
একটি বহুজাতিক ও পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বগুলো সাধারণত পৃথক বিভাগ ও কর্মকর্তার মধ্যে বণ্টিত থাকে। আইন, নিয়ন্ত্রক যোগাযোগ, করপোরেট সুশাসন, পরিচালনা পর্ষদের কার্যক্রম এবং কোম্কানি সচিবের দায়িত্ব—প্রতিটি ক্ষেত্রের রয়েছে আলাদা গুরুত্ব ও জবাবদিহির কাঠামো। কিন্তু রবি আজিয়াটা পিএলসির দায়িত্ব কাঠামো নিয়ে সামনে এসেছে ভিন্ন এক প্রশ্ন। আর সেই প্রশ্নের কেন্দ্রে রয়েছেন মোহাম্মদ সাহেদুল আলম ওরফে সাহেদ আলম।
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে দাখিল করা রবির প্রকাশ্য প্রসপেক্টাসে সাহেদ আলমকে প্রধান করপোরেট ও নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা এবং কোম্কানি সচিব হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
রবির প্রকাশিত ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত তথ্যেও তার দীর্ঘ পেশাগত অভিজ্ঞতার কথা উঠে এসেছে। সেখানে বলা হয়েছে, তিনি ২০১০ সালের জুলাইয়ে রবিতে আইন বিভাগের প্রধান হিসেবে যোগ দেন। পরে আইন ও নিয়ন্ত্রকবিষয়ক নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট হন। ২০১৯ সালের জুনে তিনি প্রধান করপোরেট ও নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব নেন। একই নথিতে বলা হয়েছে, ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে তিনি কোম্কানি সচিবের দায়িত্ব পালন করছেন। অর্থাৎ রবির আইন, নিয়ন্ত্রক ও করপোরেট কার্যক্রমের সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের সম্কৃক্ততা রয়েছে।
রবির প্রকাশ্য নথিতে সাহেদ আলমকে একই সঙ্গে কোম্কানি সচিব এবং প্রধান করপোরেট ও নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এই দায়িত্ববণ্টন সম্কর্কে কোনো নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিরূপ সিদ্ধান্ত বা সাহেদ আলমের ব্যক্তিগত অনিয়মের কোনো প্রতিষ্ঠিত তথ্য প্রকাশ্য নথিতে পাওয়া যায়নি।
ইতোমধ্যে, ২০১৯ সালে রবি আজিয়াটা পিএলসির চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অফিসার হিসেবে সাহেদ আলমের নিয়োগ এবং অপর ৩ জন স্থানীয় চিফ অফিসারের নিয়োগ আজিয়াটার করপোরেট গভর্ন্যান্সের (সুশাসন) ব্যত্যয় হিসেবে চিহ্নিত হয়। পরবর্তীতে এর নিয়মানুগ প্রতিকার পরিকল্পনা করা হয় এবং ২২ ডিসেম্বর ২০২৩ তারিখে রবি বোর্ড কর্তৃক তা অনুমোদিত হয়; যা সংশোধিত চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ মডেল হিসেবে ১ জানুয়ারি ২০২৪ তারিখ থেকে কার্যকর হয়। ২০২৫ সালের শেষের দিকে সাহেদ আলমের বিরুদ্ধে একাধিক স্বার্থের দ্বন্দ্বের (কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট) অভিযোগ আজিয়াটা গ্রুপের দাপ্তরিক হুইসেলব্লোয়িং চ্যানেলের মাধ্যমে দায়ের করা হলেও, আজ পর্যন্ত এর কোনো দৃশ্যমান ফলাফল বা সিদ্ধান্ত দেখা যায়নি।
এখন প্রশ্ন—একজন কর্মকর্তার হাতে একটি প্রতিষ্ঠানের এত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব কেন কেন্দ্রীভূত?
আরও বড় প্রশ্ন, রবির মাদার কোম্কানি আজিয়াটার করপোরেট কাঠামোয় কোম্কানি সচিবের দায়িত্ব যদি স্বতন্ত্র রাখা হয়, তাহলে রবির ক্ষেত্রে দায়িত্ব কাঠামো কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে?
সাহেদ আলমের রবিতে দায়িত্বের বিবর্তন পর্যালোচনা করলে বিষয়টি আরও স্কষ্ট হয়।
রবির প্রকাশিত নথি অনুযায়ী, তিনি আইন বিভাগের প্রধান হিসেবে প্রতিষ্ঠানে যোগ দেওয়ার পর আইন ও নিয়ন্ত্রকবিষয়ক দায়িত্বে পদোন্নতি পান। পরবর্তীতে প্রধান করপোরেট ও নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এর পাশাপাশি কোম্কানি সচিব হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। তার পেশাগত অভিজ্ঞতার মধ্যে করপোরেট, নিয়ন্ত্রক, আইন, পরিপালন, গণমাধ্যম ও যোগাযোগ কার্যক্রমের অভিজ্ঞতার কথাও রবির নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
এখানে মূল প্রশ্ন তার অভিজ্ঞতা বা যোগ্যতা নিয়ে নয়। বরং প্রশ্নটি হলো দায়িত্বের ব্যাপ্তি ও কেন্দ্রীকরণ নিয়ে।
কারণ কোম্কানি সচিবের দায়িত্বের সঙ্গে পরিচালনা পর্ষদ, করপোরেট সুশাসন, নিয়ন্ত্রক পরিপালন এবং কোম্কানির গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশের বিষয় সরাসরি জড়িত। অন্যদিকে আইন বিভাগ দেখভাল করে আইনি ঝুঁকি, চুক্তি, মামলা ও আইনগত পরামর্শ। নিয়ন্ত্রক কার্যক্রমের সঙ্গে সরকারি ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার যোগাযোগের বিষয়ও যুক্ত।
তাই এসব গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের একাধিক ক্ষেত্র যদি একই কর্মকর্তার সঙ্গে যুক্ত থাকে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে—প্রতিটি সিদ্ধান্তের স্বাধীন যাচাই ও জবাবদিহি কীভাবে নিশ্চিত করা হচ্ছে?
এখানে রবির মাদার কোম্কানি আজিয়াটার নিজস্ব করপোরেট সুশাসন কাঠামো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
আজিয়াটার ২০২৪ সালের করপোরেট সুশাসন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গ্রুপ কোম্কানি সচিব পরিচালনা পর্ষদকে সুশাসন, নীতিমালা, করপোরেট প্রকাশনা এবং কোম্কানি ও সিকিউরিটিজ-সংক্রান্ত বিধিবিধান ও তালিকাভুক্তির শর্ত পরিপালনের বিষয়ে পরামর্শ দেন। কোম্কানি সচিবকে পরিচালনা পর্ষদের সুশাসন-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে।
আজিয়াটার ২০২৪ সালের করপোরেট সুশাসন প্রতিবেদনে মূল কোম্কানির গ্রুপ কোম্কানি সচিবের পদ অন্য কোনো পদের সঙ্গে একীভূত না রাখার কথা বলা হয়েছে; তবে একই ব্যবস্থা রবির মতো পরিচালন কোম্কানির ক্ষেত্রেও বাধ্যতামূলক কি না, তা ওই প্রতিবেদন থেকে স্কষ্ট নয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, একই প্রতিবেদনে আজিয়াটা জানিয়েছে—গ্রুপ কোম্কানি সচিবের ভূমিকা যাতে দুর্বল বা আপসকৃত না হয়, সে জন্য এই দায়িত্ব অন্য কোনো পদের সঙ্গে একীভূত করা হয়নি। কোম্কানি সচিবের নিয়োগ, পারিশ্রমিক ও অপসারণের বিষয়ও পরিচালনা পর্ষদের এখতিয়ারে রাখা হয়েছে এবং তার কার্যকারিতা মূল্যায়নও পর্ষদ করে। আজিয়াটা যেখানে গ্রুপ পর্যায়ে কোম্কানি সচিবের দায়িত্ব স্বতন্ত্র রাখাকে সুশাসনের অংশ হিসেবে দেখছে, সেখানে রবির ক্ষেত্রে কোম্কানি সচিবের দায়িত্বের সঙ্গে প্রধান করপোরেট ও নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তার দায়িত্ব কীভাবে সমন্বয় করা হয়েছে?
রবির ক্ষেত্রে কি একই ধরনের নীতিমালা অনুসরণ করা হচ্ছে? নাকি বাংলাদেশের স্থানীয় পরিচালন কাঠামোর কারণে এখানে আলাদা ব্যবস্থা রয়েছে?
একটি কোম্কানির আইন বিভাগ এবং কোম্কানি সচিবের দায়িত্ব এক নয়। আইন বিভাগ মূলত কোম্কানির আইনগত ঝুঁকি, চুক্তি, মামলা ও আইনি পরামর্শের বিষয় দেখে। আর কোম্কানি সচিব পরিচালনা পর্ষদ ও করপোরেট সুশাসনের সঙ্গে সরাসরি সম্কৃক্ত।
অন্যদিকে নিয়ন্ত্রক কার্যক্রমের সঙ্গে সরকারি ও নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ, বিধিবিধান পরিপালন এবং বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক বিষয়ে কোম্কানির অবস্থান সমন্বয়ের বিষয় জড়িত। ফলে দায়িত্বগুলো একে অপরের সঙ্গে সম্কর্কিত হলেও প্রতিটির ভূমিকা আলাদা।
তাই প্রশ্ন হচ্ছে—একই কর্মকর্তার অধীনে এসব দায়িত্বের একাধিক অংশ থাকলে স্বাধীন পর্যালোচনার ব্যবস্থা কীভাবে কাজ করে?
কোনো একটি বিষয়ে কোম্কানির আইনগত অবস্থান নির্ধারণ করতে হবে। একই বিষয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। আবার বিষয়টি যদি পুঁজিবাজার-সংক্রান্ত হয়, তাহলে বিনিয়োগকারীদের জন্য তথ্য প্রকাশের প্রশ্নও আসতে পারে। এ ক্ষেত্রে দায়িত্বের সীমারেখা কতটা স্কষ্ট—সেটি জানা গুরুত্বপূর্ণ।
রবির ল’ফুল ইন্টারসেপশন সেল (এলআইসি) বিভাগের নিয়ন্ত্রণও রয়েছে সাহেদ আলমের হাতে। অপরাধীরা অপরাধ করার জন্য মোবাইল ফোন ব্যবহার করলে, তাদের যোগাযোগের তথ্য বা কল রেকর্ড (সিডিআর) সংরক্ষণ করে এই বিভাগ। এর পাশাপাশি রবির নিরাপত্তা বিভাগের কার্যক্রম সাহেদ আলমের অধীনে পরিচালিত হয়। সারা দেশে রবির সব টাওয়ার, স্থাপনা এবং কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা রিপোর্ট করেন তার বিভাগে। এ ছাড়া রবির প্রতিনিধি হিসেবে গণমাধ্যমের মুখোমুখি হওয়ার দায়িত্বটিও দীর্ঘদিন ধরে সামলাচ্ছেন সাহেদ।
অবশ্য একজন কর্মকর্তার একাধিক দায়িত্ব থাকা নিজেই কোনো অনিয়মের প্রমাণ নয়। কোম্কানির প্রয়োজন, কর্মকর্তার দক্ষতা এবং পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদনের ভিত্তিতে এমন দায়িত্ব বণ্টন হতে পারে। তবে তালিকাভুক্ত ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে দায়িত্বের সীমা, অনুমোদন এবং জবাবদিহির কাঠামো স্কষ্ট থাকা প্রয়োজন।
রবির প্রকাশিত জীবনীতে সাহেদ আলমের ২০ বছরের পেশাগত অভিজ্ঞতার মধ্যে করপোরেট, নিয়ন্ত্রক, আইন, পরিপালন, গণমাধ্যম ও যোগাযোগ কার্যক্রমের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। একই নথিতে তার রবিতে আইন বিভাগের প্রধান হিসেবে যোগ দেওয়া এবং পরবর্তীতে প্রধান করপোরেট ও নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা হওয়ার বিষয়ও উল্লেখ রয়েছে।
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন—প্রকাশ্য নথিতে তার আনুষ্ঠানিক বর্তমান পদ হিসেবে প্রধান করপোরেট ও নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা এবং কোম্কানি সচিব পদ দুটির তথ্য নিশ্চিতভাবে পাওয়া যায়। অন্য কোনো কার্যক্রমের সঙ্গে তার সম্কৃক্ততা থাকলে সেটি তার আনুষ্ঠানিক পদ, অতিরিক্ত দায়িত্ব নাকি সমন্বয়মূলক ভূমিকা—রবির কাছ থেকে সেটি স্কষ্ট করা প্রয়োজন।
আজিয়াটার প্রকাশিত করপোরেট সুশাসন কাঠামোতে দায়িত্বের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তাদের করপোরেট সুশাসন প্রতিবেদনে কোম্কানি সচিবের ভূমিকা পরিচালনা পর্ষদকে সুশাসন, পরিপালন ও করপোরেট প্রকাশনার বিষয়ে সহায়তা করার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে দায়িত্বটি অন্য কোনো পদের সঙ্গে একীভূত না করার বিষয়টিও স্কষ্ট করা হয়েছে।
আজিয়াটা তাদের নীতিমালায় বিভিন্ন কার্যক্রমের ক্ষেত্রে গ্রুপ ও পরিচালন কোম্কানিগুলোর মধ্যে সুশাসনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার ওপরও গুরুত্ব দেয়।
তাহলে বাংলাদেশের অন্যতম বড় মোবাইল অপারেটর রবির ক্ষেত্রে কোম্কানি সচিব, করপোরেট ও নিয়ন্ত্রক কার্যক্রম এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট দায়িত্বের সাংগঠনিক বিভাজন কীভাবে করা হয়েছে—সেটিই এখন জানার বিষয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—রবির পরিচালনা পর্ষদ এই সম্মিলিত দায়িত্ব কাঠামো কীভাবে অনুমোদন ও তদারকি করে, সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাত এড়াতে কী অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে এবং কোম্কানি সচিব হিসেবে সাহেদ আলমের কার্যক্রম কীভাবে স্বাধীনভাবে মূল্যায়িত হয়; এগুলো তাঁর বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ নয়, বরং একটি তালিকাভুক্ত বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব বণ্টন ও করপোরেট সুশাসন সম্কর্কে প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন।
রবির বক্তব্য: তালিকাভুক্ত কোম্কানি হিসেবে রবির ব্যবস্থাপনা কাঠামো রবির নিজস্ব গভর্ন্যান্স কাঠামো দিয়ে পরিচালিত হয় এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) করপোরেট গভর্ন্যান্স কোডের নির্দেশনা অনুযায়ী পরিচালনা হয়।
জনাব আলম একটি কৌশলগত নেতৃত্বের পদে রয়েছেন এবং তালিকাভুক্ত কোম্কানিগুলোর অন্যান্য চিফ অফিসারদের মতো তিনি সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কার্যক্রমের একটি পোর্টফোলিও তত্ত্বাবধান করেন, যেখানে দায়িত্বপ্রাপ্ত ফাংশনাল প্রধান ও বিষয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞরা কাজ করেন। বৃহৎ প্রতিষ্ঠানগুলোয় এটি একটি প্রচলিত চর্চা, যেখানে সিইও, সিএফও, সিসিএও বা সিসিআরও-এর মতো চিফ অফিসাররা একাধিক কার্যক্রমে কৌশলগত দিকনির্দেশনা ও তদারকি প্রদান করেন, আর কার্যক্রম পরিচালনার দায়দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট বিভাগের প্রধানদের ওপরই থাকে।
প্রশ্নগুলোর ভিত্তি থেকে মনে হয়, আধুনিক করপোরেশন ও তালিকাভুক্ত কোম্কানিগুলোর কাঠামো সম্কর্কে সীমিত ধারণার প্রতিফলন ঘটেছে এবং ব্যবস্থাপনা যে গভর্ন্যান্স কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হয়, তার পরিবর্তে একটি নির্দিষ্ট ব্যক্তির ওপর অসামঞ্জস্যপূর্ণ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। করপোরেট গভর্ন্যান্স কোনো একক নির্বাহীর ওপর নির্ভরশীল নয়। রবির রয়েছে শক্তিশালী গভর্ন্যান্স ব্যবস্থা, যার মধ্যে রয়েছে অর্পিত কর্তৃত্বের কাঠামো, দায়িত্বের পৃথকীকরণ, ব্যবস্থাপনা ও বোর্ড পর্যায়ের তদারকি, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, কমপ্লায়েন্স প্রক্রিয়া, স্বাধীন নিশ্চয়তা কার্যক্রম এবং নিয়মিত নিরীক্ষা। পরিচালনা পর্ষদ এবং এর সংশ্লিষ্ট কমিটিগুলো গভর্ন্যান্স, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, কমপ্লায়েন্স ও জবাবদিহিতা তদারকি করে, যাতে অনুমোদিত নীতিমালা, প্রযোজ্য আইন এবং নিয়ন্ত্রক চাহিদা অনুযায়ী ব্যবস্থাপনার সব দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা হয়।
রবি স্বচ্ছতা এবং অংশীজনদের সঙ্গে গঠনমূলক সম্কৃক্ততার প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে কোম্কানি বা এর কর্মীদের সুনাম অন্যায্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে—এমন কোনো বিভ্রান্তিকর, অনুমাননির্ভর বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অধিকারও রবি সংরক্ষণ করে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিটিআরসি এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা শেয়ার বিজকে বলেন, টেলিযোগাযোগ খাতের কোনো লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানে নিয়ন্ত্রক পরিপালন, আইনগত বিষয় এবং করপোরেট দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কোম্কানিকে প্রযোজ্য আইন, বিধিমালা ও নিয়ন্ত্রক নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণ করতে হয়। কোনো প্রতিষ্ঠানে এসব দায়িত্ব একই ব্যক্তির হাতে থাকলে তা নিজেই অনিয়মের প্রমাণ নয়। তবে নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ, তথ্য প্রদান এবং বিধিবিধান পরিপালনের ক্ষেত্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার ভূমিকা ও জবাবদিহি স্কষ্ট থাকা প্রয়োজন। কোনো নির্দিষ্ট কোম্কানির দায়িত্ব বণ্টন বা ব্যবস্থাপনা কাঠামো নিয়ে অভিযোগ বা প্রশ্ন উঠলে তা সংশ্লিষ্ট নথি ও প্রযোজ্য বিধিবিধানের আলোকে বিবেচনা করা হয়ে থাকে।
স্বাধীন করপোরেট সুশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, একজন কর্মকর্তার হাতে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থাকা নিজেই কোনো অনিয়মের প্রমাণ নয়। তবে দায়িত্বের ধরন যদি এমন হয় যে একই ব্যক্তিকে একই সঙ্গে কোম্কানির নিয়ন্ত্রক পরিপালন, করপোরেট কার্যক্রম এবং কোম্কানি সচিবের দায়িত্ব পালন করতে হয়, তাহলে দায়িত্বের ভারসাম্য ও জবাবদিহির বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিশেষ করে কোম্কানি সচিব হিসেবে পরিচালনা পর্ষদকে স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে পরামর্শ দেওয়ার সক্ষমতা যাতে কোনোভাবেই প্রশ্নবিদ্ধ না হয়, সেটি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে কোম্কানির অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ও দায়িত্ব বণ্টন কতটা কার্যকর, সেটিই মূল বিষয়।
করপোরেট আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, কোম্কানি সচিবের দায়িত্ব শুধু প্রশাসনিক নয়; পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্ত, করপোরেট তথ্য প্রকাশ, আইন ও বিধিবিধান পরিপালন এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যথাযথভাবে সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ফলে কোম্কানি সচিবকে এমনভাবে দায়িত্ব পালন করতে হয়, যাতে তিনি পরিচালনা পর্ষদকে প্রয়োজনীয় বিষয়ে নিরপেক্ষ পরামর্শ দিতে পারেন। একই ব্যক্তির হাতে কোম্কানি সচিবের পাশাপাশি করপোরেট ও নিয়ন্ত্রক কার্যক্রমের দায়িত্ব থাকলে সরাসরি আইনগত বাধা আছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট আইন ও কোম্কানির কাঠামোর ওপর নির্ভর করবে। তবে স্বার্থের সংঘাতের সম্ভাবনা এবং দায়িত্বের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে কোম্কানির সুশাসন কাঠামো থেকেই তার যথাযথ ব্যাখ্যা থাকা প্রয়োজন।
সাহেদ আলমের দীর্ঘ পেশাগত অভিজ্ঞতা নিয়ে রবির প্রকাশ্য নথিতে যথেষ্ট তথ্য রয়েছে। আইন, নিয়ন্ত্রক, করপোরেট ও পরিপালন কার্যক্রমে তার দীর্ঘ সম্কৃক্ততার কথাও কোম্কানির নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
একজন কর্মকর্তার হাতে কতটা দায়িত্ব থাকবে, কোন দায়িত্ব কার কাছে থাকবে, কে কাকে জবাবদিহি করবে এবং কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের স্বাধীন পর্যালোচনা কোথায় হবে—এসবই একটি তালিকাভুক্ত বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা ও সুশাসনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আর যখন আজিয়াটা নিজস্ব করপোরেট সুশাসন প্রতিবেদনে কোম্কানি সচিবের দায়িত্ব অন্য কোনো পদের সঙ্গে একীভূত না করার কথা স্কষ্টভাবে জানিয়েছে, তখন রবির দায়িত্ব কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।