শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১৫ কার্তিক ১৪৩৩

সাখাওয়াত সাব্বির, চট্টগ্রাম

প্রকাশ: ১০:৩৪, ৩১ অক্টোবর ২০২৬

মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য আমদানি

চট্টগ্রাম কাস্টমসে তিন মাসে আদায় ৫৮ কোটি টাকা

চট্টগ্রাম কাস্টমসে তিন মাসে আদায় ৫৮ কোটি টাকা

ছবি সংগৃহীত

চট্টগ্রাম বন্দরে মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য আমদানির প্রবণতা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকেই (জুলাই-সেপ্টেম্বর) কায়িক পরীক্ষা ও নজরদারিতে ৪৬৭টি সন্দেহভাজন চালান জব্দ করেছে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের অডিট, ইনভেস্টিগেশন অ্যান্ড রিসার্চ (এআইআর) শাখা। এসব অনিয়মের ঘটনায় কাস্টমস এ পর্যন্ত ২৭০টি মামলা দায়ের করে জরিমানা ও বকেয়া রাজস্ব বাবদ ৫৮ কোটি ২০ লাখ টাকা আদায় করেছে।
কাস্টমসের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, আগের অর্থবছরগুলোর তুলনায় এবার জালিয়াতি শনাক্তের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে জব্দকৃত চালানের সংখ্যা ছিল ৩৬১টি এবং আদায় হয়েছিল ৩১ কোটি ৭০ লাখ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে জব্দকৃত চালান ২৯ দশমিক ৪ শতাংশ বাড়লেও রাজস্ব ও জরিমানা আদায় বেড়েছে ৮৩ দশমিক ৬ শতাংশ। এর আগে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়ে মাত্র ১৬৭টি চালান জব্দ ও ২৭ কোটি ৪৪ লাখ টাকা আদায় হয়েছিল।
সাম্প্রতিক সময়ে আমদানিকৃত পণ্যের পরিমাণ বা মূল্য কম দেখানো, ভুল ট্যারিফ ক্লাসিফিকেশন এবং এক পণ্যের ঘোষণার আড়ালে সম্পূর্ণ ভিন্ন উচ্চ শুল্কের পণ্য নিয়ে আসার ঘটনা বেশি ঘটছে। সেপ্টেম্বরে ধরা পড়া দুটি চালানে এর স্পষ্ট উদাহরণ পাওয়া গেছে। কাউবয় ফুডস কোম্পানি লিমিটেড চীন থেকে জেনারেটর সেট ও এর যন্ত্রাংশ আমদানির ঘোষণা দিলেও কায়িক পরীক্ষায় মেলে ১৩ হাজার ৩৩৫ কেজি অঘোষিত পণ্য। এর মধ্যে ছিল সোলার স্ট্রিটলাইট, ইনভার্টার, পোর্টেবল পাওয়ার স্টেশন, ফুড অ্যাডিটিভস, টি-সেট ও লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি। ১ কোটি ৩৩ লাখ টাকা শুল্কায়নযোগ্য মূল্যের এই চালানে ৪৩ লাখ ৪৩ হাজার টাকার রাজস্ব ফাঁকির চেষ্টা করা হয়। কাস্টমস এতে ৫০ লাখ টাকা জরিমানা ও ৫ লাখ টাকা বিমোচন জরিমানা আরোপ করে।
অন্য একটি ঘটনায় রংপুর মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড চীন থেকে ২ লাখ ৬৪ হাজার ২০৩ কেজি সিমলেস পাইপ আনার ঘোষণা দেয়। কিন্তু কাস্টমসের পরিদর্শনে ঘোষিত পরিমাণের চেয়ে অতিরিক্ত ৭২ হাজার ৫০০ কেজি (২৭ দশমিক ৪ শতাংশ বেশি) পাইপ পাওয়া যায়। এতে সম্ভাব্য ১ কোটি ১৪ লাখ টাকার রাজস্ব ফাঁকির বিপরীতে ১ কোটি ২০ লাখ টাকা জরিমানা ও ১৫ লাখ টাকা বিমোচন জরিমানা করা হয়।
কেবল এই দুটি চালান থেকেই জরিমানা ও বিমোচন চার্জ ব্যতীত প্রায় ১ কোটি ৫৭ লাখ টাকার রাজস্ব ফাঁকি প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়েছে। এ ছাড়া সম্প্রতি স্ক্র্যাপের আড়ালে দামি গাড়ি ও যন্ত্রপাতি, মডেলিং ক্লে-র আড়ালে প্রসাধনী এবং অন্যান্য সাধারণ পণ্যের আড়ালে স্মার্টফোন আনার মতো জালিয়াতিও ধরা পড়েছে।
কাস্টমসের তথ্য অনুযায়ী, বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের পুরো সময়ে এআইআর শাখা মোট ১ হাজার ৪৫১টি চালান জব্দ এবং ৮৪৩টি মামলা করে। ওই এক বছরে জরিমানা বাবদ ৫৯ কোটি ৬৩ লাখ টাকা এবং বকেয়া রাজস্ব বাবদ ৫২ কোটি ৮ লাখ টাকাসহ সর্বমোট ১১১ কোটি ৭২ লাখ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা হয়।
চট্টগ্রাম কাস্টমস এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক কাজী মাহমুদ ইমাম জানান, বিগত চার দশকের পেশাগত অভিজ্ঞতায় মিথ্যা ঘোষণার বিরুদ্ধে এত ব্যাপক তদারকি ও মামলা আগে দেখিনি। কাস্টমসের গুরুত্বপূর্ণ পদে যোগ্য কর্মকর্তাদের পদায়ন এবং নজরদারি নজিরবিহীনভাবে জোরদার করার কারণেই অনিয়মগুলো বেশি ধরা পড়ছে।
তবে এই তদারকি যেন বৈধ ব্যবসায়ীদের জন্য ভোগান্তির কারণ না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক করেছেন বিজিএমইএর সাবেক সহ-সভাপতি নাসির উদ্দিন চৌধুরী। তিনি বলেন, অনেক সময় সংঘবদ্ধ চক্র প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে এই অনিয়ম করে, যা মূল প্রতিষ্ঠানের সুনাম ক্ষুণ্ন করে। শুধু জরিমানা করে ছেড়ে না দিয়ে জড়িতদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে সব চালানে ঢালাও তল্লাশি না করে ‘রিস্ক ম্যানেজমেন্ট’ বা ঝুঁকিভিত্তিক তল্লাশি বাড়াতে হবে, যাতে বৈধ পণ্যের খালাস দ্রুত হয়।
চট্টগ্রাম কাস্টমসের সহকারী কমিশনার ও মুখপাত্র শরীফ আল আমিন জানান, মিথ্যা ঘোষণা বন্ধে অটোমেশন ও প্রযুক্তিগত তদারকি বাড়ানো হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘ন্যাশনাল সিঙ্গেল উইন্ডোর (এনএসডাব্লিউ) আওতায় সব সেবা একীভূত করার কাজ চলছে। ঝুঁকিভিত্তিক চালান চিহ্নিত করে কায়িক পরীক্ষা আরও জোরদার করা হবে, যাতে একদিকে রাজস্ব ফাঁকি রোখা যায় এবং অন্যদিকে বৈধ পণ্যের দ্রুত খালাস নিশ্চিত হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জব্দ ও মামলার সংখ্যা বাড়ার অর্থ এই নয় যে বন্দরে হঠাৎ অপরাধের মাত্রা এক লাফেই এতটা বেড়ে গেছে। বরং কাস্টমসের কঠোর আইন প্রয়োগ ও তদারকির কারণেই অতীতে অধরা থেকে যাওয়া জালিয়াতিগুলো এখন বেশি ধরা পড়ছে।