তিস্তা সেচ প্রকল্প পুনর্বাসন
৩৫ বছর ধরে সমীক্ষা চলা প্রকল্পের অগ্রগতি ৭২ শতাংশ
ছবি সংগৃহীত
দেশের অন্যতম বৃহৎ সেচ অবকাঠামো তিস্তা সেচ প্রকল্পের কমান্ড এলাকার পুনর্বাসন ও সম্প্রসারণ প্রকল্পের বাস্তব কাজের অগ্রগতি গত ৩৫ বছরে দাঁড়িয়েছে ৭২.৫০ শতাংশে। প্রকল্পটিতে এখন পর্যন্ত আর্থিক ব্যয় হয়েছে ৮৮১ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। যা মোট প্রাক্কলিত ব্যয়ের ৬০.৭২ শতাংশ। ১ লাখ ৪ হাজার হেক্টর জমিতে নিরবচ্ছিন্ন সেচের পানি সরবরাহ এবং বার্ষিক অতিরিক্ত ১ লাখ মেট্রিক টন ধানসহ মোট ৫.২৭ লাখ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্য নিয়ে এই প্রকল্পটির বাস্তবায়ন কাজ নতুন করে শুরু হয়েছে।
১ জুলাই ২০২১ থেকে শুরু হওয়া এই প্রকল্পটির মূল মেয়াদ ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও বর্তমানে তা ২০২৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বর্ধিত করা হয়েছে। ১ হাজার ৪৫২ কোটি ৩৩ লাখ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ের এই প্রকল্পে চলতি অর্থবছরের ১৫ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত বাস্তব অগ্রগতি ২.৫০ শতাংশ এবং আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে ১৫ কোটি ১ লাখ টাকা। প্রকল্পের মোট ২৩৮টি ভৌত প্যাকেজের মধ্যে ইতোমধ্যে ২১১টির কার্যাদেশ প্রদান করা হয়েছে, যার মধ্যে ১৫৫টি প্যাকেজের কাজ পুরোপুরি সম্পন্ন হয়েছে এবং ৫৬টি প্যাকেজের কাজ বর্তমানে চলমান রয়েছে বলে জানা যায়।
এদিকে প্রকল্পে নথিতে দেখা যায়, ১.০৪ লাখ হেক্টর জমিতে নিরবচ্ছিন্নভাবে সেচের পানি সরবরাহ করার মাধ্যমে ফসলে নিবিড়তা ২৩১% থেকে ২৬৮% এ উন্নীতকরনসহ প্রতিবছরে অতিরিক্ত প্রায় ১.০০ লাখ মে. টন ধান উৎপাদন বৃদ্ধি এবং ৫.২৭ লাখ মে. টন খাদ্যশষ্য উৎপাদন বৃদ্ধিকরণ (যার বর্তমান মোট বাজার মূল্য প্রায় ১০০০,০০ কোটি টাকা), কর্মসংস্থান বৃদ্ধিকরণ (প্রায় ৮৬ লাখ জন)। এবং প্রকল্প এলাকায় পরিবেশ, ভু-গর্ভস্থ পানির স্তরের অধিকতর উন্নতিকরন, জীব-বৈচিত্র্য রক্ষা ও প্রকল্প এলাকায় বসবাসরত (৩০ লক্ষাধিক) জনগণের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নতি সাধনকরণ।
জানা যায়, রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার আলমবিদিতর ইউনিয়নে তিস্তা সেচ খাল সংস্কার ও সম্প্রসারণ প্রকল্পের কাজ শুরু হওয়ায় শতাধিক পরিবার ভিটেমাটি হারানোর শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছে। এবং প্রায় ৩৫ বছর আগের সমীক্ষার ভিত্তিতে ১ হাজার ৪৫২ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নাধীন এই প্রকল্পকে ঘিরে এলাকায় চরম উদ্বেগ ও ক্ষোভ বিরাজ করছে।
২০২২ সালে দ্বিতীয় ধাপে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের মূল সমীক্ষা করা হয়েছিল প্রায় ৩৫ বছর আগে। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিস্তা সেচ প্রকল্পের কার্যকারিতা অনেকটাই কমে গেছে। ২০১৬ সালে ৮৪ হাজার ৩৭৮ হেক্টর জমিতে সেচের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও বাস্তবে তা নেমে আসে প্রায় ১০ হাজার হেক্টরে। সর্বশেষ ২০২৬ সালে সেচের আওতা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫৭ হাজার হেক্টরে, যা এখনো লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় অনেক কম।
ব্রহ্মোত্তরপাড়া গ্রামের দুই পাশ দিয়ে ক্যানেল সম্প্রসারণের কাজ চলছে। কয়েক প্রজন্ম ধরে গড়ে ওঠা এসব বসতি এখন উচ্ছেদের মুখে পড়েছে। তিস্তা সেচ ক্যানেলের সম্প্রসারিত অংশ নির্মাণের জন্য ইতোমধ্যে সীমানা নির্ধারণ করে বাড়িঘর সরানোর নোটিশ দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
জানা যায়, মাঠপর্যায়ে ক্যানেলের নিচের মাটি কেটে ওপরে ভরাট করাসহ কিছু কিছু ক্ষেত্রে কাজের গুণগত মান নিয়ে স্থানীয় কৃষক ও তদারককারীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, প্রায় ৩৫ বছর আগের সমীক্ষাকে পুঁজি করে গৃহীত এই মেগা প্রকল্পে মাঠপর্যায়ে নিম্নমানের কাজ, অবৈধভাবে মাটি কাটা ও তদারকির অভাবসহ বিভিন্ন ধরনের অসঙ্গতি প্রকাশ্যে এসেছে।
স্থানীয় কয়েকজন জানান, সেচ ক্যানেল সংস্কারে অত্যন্ত নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করা হচ্ছে। এবং কম পুরুত্বে ঢালাই দিয়ে দ্রুত কাজ শেষ করা হচ্ছে। তারা জানান, অনেক জায়গায় কাজ শেষ হওয়ার আগেই ক্যানেলের ঢালাই করা পাড় ও বাঁধ-নালা ভেঙে পড়েছে।
এছাড়া দরপত্র অনুযায়ী দূর থেকে মাটি আনার নিয়ম থাকলেও, খরচ বাঁচাতে ঠিকাদাররা খালের তলদেশ এবং পাশের আবাদি জমির ‘টপসয়েল’ বা মাটি কেটেই বাঁধ সংস্কারের কাজ চালাচ্ছেন। এবং ক্যানেল সংস্কারের অজুহাতে সামাজিক বনায়নের প্রায় ৪ লাখ পরিপক্ব গাছ নিয়মবহির্ভূতভাবে কেটে ফেলার অভিযোগ রয়েছে।
প্রকল্পে মাটি ভরাট করাসহ কাজের গুণগত মান এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের উচ্ছেদ করা হচ্ছে সেইসঙ্গে নকশা বহির্ভূতভাবে কাজ করা হচ্ছেন স্থানীয়রা এমন অভিযোগ করছেন জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক মো. মিজানুর রহমান শেয়ার বিজকে জানান, এ সম্পর্কে আমার জানা নাই। আর তিনটা জেলা নিয়ে কাজ চলছে সুতরাং বৃহৎ পরিসর। যদি নির্দিষ্ট এলাকার কেউ এমন অভিযোগ করেন তাহলে জানাতে বলেন সেই মোতাবেক ব্যবস্থা নেয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, ইতোমধ্যে অনেক স্থানে কাজ শেষ হয়েছে, অনেক স্থানে কাজ চলমান আছে। ঢালাওভাবে অভিযোগ করলে হবেনা, সেটার সত্যতা থাকতে হবে। ৫টা ডিভিশন মিলে কাজ চলছে, সমস্যা দেখা দিলে অবশ্যই সমাধান করা হবে।
নাম প্রকাশ না করার জন্য সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের একাধিক কর্মকর্তা জানান, প্রকল্পে ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দিয়ে এবং কাজের গুণগত মান যাচাই না করে অনৈতিক সুবিধা নিয়েছে অনেকেই। বলা যায় শত কোটি টাকার অর্থ আত্মসাতের সাথে জড়িত আছেন কিছু কর্মকর্তা। এছাড়াও, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের যথাযথ তদারকির অভাব এবং ভুয়া বিল পাসের বিষয় রয়েছে।
১৯৯০ সালে মূল প্রকল্প সমাপ্তির সময় এবং ৩৫ বছর আগের সমীক্ষাগুলোর হিসাবের পর বর্তমানে ‘তিস্তা সেচ প্রকল্পের কমান্ড এলাকার পুনর্বাসন ও সম্প্রসারণ’ শীর্ষক নতুন এই বৃহৎ প্রকল্পের প্রাক্কলিত মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১,৪৫২ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। সংস্কার ও দীর্ঘমেয়াদি আধুনিকায়নের অজুহাতে আগের চেয়ে বরাদ্দ বহুগুণ বাড়ানো হয়েছে।
বাংলাদেশের সব সরকারি প্রকল্পের মতো এই প্রকল্পের মূল ও বর্ধিত কাজের জন্য প্রয়োজনীয় জমি অধিগ্রহণের মূল প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করছে সংশ্লিষ্ট জেলার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ভূমি অধিগ্রহণ শাখা। তবে প্রকল্পটির প্রস্তাবক এবং বাস্তবায়নকারী মূল সংস্থা হিসেবে মাঠপর্যায়ে কাজ করছে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (বাপাউবো)।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে উত্তরাঞ্চলের মানুষের ভাগ্যোন্নয়ন ঘটবে। এবং এই মেগা প্রকল্পের মাধ্যমে লালমনিরহাট, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী ও রংপুর এই পাঁচ জেলার প্রায় তিন কোটি মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ দূর হবে এবং প্রত্যাশা পূরণ হবে।