শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১৫ কার্তিক ১৪৩৩

​​​​​​​অধ্যাপক ড. কাওছার জাহান

প্রকাশ: ১৯:৫৫, ৩১ অক্টোবর ২০২৬

পর্যটন বিকাশে শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপ থেকে বাংলাদেশের যা শেখার আছে

পর্যটন বিকাশে শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপ থেকে বাংলাদেশের যা শেখার আছে

ছবি: সংগৃহীত

পুরোনো দিনের সিনেমায় প্রায়ই দেখা যেত, নায়ক বা নায়িকা মানসিক চাপ কিংবা বিষণ্নতায় ভুগলে চিকিৎসকেরা তাদের পরিবেশ পরিবর্তনের পরামর্শ দিতেন। তখন বিষয়টি আমাদের কাছে কিছুটা হাস্যকর মনে হলেও এখন বুঝতে পারি, ব্যস্ত জীবনে এমন একটি বিরতি কিংবা পরিবেশের পরিবর্তন কতটা প্রয়োজনীয়। ধারণা করা হতো, পরিবেশের এই পরিবর্তন মনকে প্রশান্ত করে এবং নতুন উদ্যমে জীবন শুরু করার শক্তি জোগায়।

প্রকৃতপক্ষে, প্রতিদিনের একঘেয়ে জীবন থেকে মুক্তি পেতে ভ্রমণ হতে পারে এক চমৎকার উপায়। এটি আমাদের দৈনন্দিন দুশ্চিন্তা কিছুক্ষণের জন্য ভুলিয়ে দেয়, মনকে সতেজ করে এবং নতুন অভিজ্ঞতার সুযোগ তৈরি করে। ব্যস্ত ও যান্ত্রিক জীবনে ভ্রমণ সত্যিই ওষুধের মতো কাজ করতে পারে।

বাংলাদেশে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কোনো অভাব নেই। কিন্তু এই সৌন্দর্যকে পর্যটকদের জন্য নিরাপদ, আরামদায়ক ও স্মরণীয় অভিজ্ঞতায় রূপ দেওয়ার মতো একটি সুসংগঠিত ব্যবস্থার ঘাটতিরয়েছে। আমাদের দেশে নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়কে ভ্রমণের জন্য সবচেয়ে উপযোগী বলে বিবেচনা করা হয়। এ সময় আবহাওয়া মনোরম থাকায় অভ্যন্তরীণ পর্যটন বেশ জমে ওঠে। তবে বর্তমানে সারা বছরই মানুষ বিভিন্ন রিসোর্ট ও পর্যটন কেন্দ্রে ভ্রমণ করছেন। ভ্রমণ শুধু মনকে সতেজ করে না, আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিকেও প্রসারিত করে। কিন্তু আমার মনে হয়, আমাদের দেশে পর্যটন বিকাশের জন্য এখনো সত্যিকার অর্থে উপযুক্ত পরিবেশ গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি।

বিদেশ ভ্রমণ সবসময়ই নিজের দেশকে নতুনভাবে দেখার সুযোগ করে দেয়। গত বছর শেঙ্গেন ভিসায় ইউরোপের নয়টি দেশ ভ্রমণের সুযোগ হয়েছিল। সেই ভ্রমণ নিয়ে লেখার ইচ্ছা ছিল, যদিও এখনো তা লেখাও ওঠেনি। সমপ্রতি, ২০২৬ সালের ১৬ থেকে ২৩ অক্টোবর পর্যন্ত আমাদের বিভাগের সহকর্মী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে আটদিনের মালদ্বীপ ও শ্রীলঙ্কা সফরে গিয়েছিলাম। এবার আর দেরি করিনি, কারণ নিজের আনন্দ, অভিজ্ঞতা, পর্যবেক্ষণ ও উপলব্ধিগুলো অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার সুযোগটি হারাতে চাইনি।

আমাদের ভ্রমণটি অত্যন্ত আনন্দময় ছিল। তবে এই ভ্রমণ আমার মনে একটি কঠিন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপ আমাদের মতোই দক্ষিণ এশিয়ার দেশ। ২০১১ সালে ভারত ও নেপাল ভ্রমণেরও সুযোগ হয়েছিল। আমার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলো অত্যন্ত শক্তিশালীভাবে বিশ্বজুড়ে নিজেদের পর্যটনশিল্পের পরিচিতি গড়ে তুলতে পেরেছে। অথচ সমুদ্রসৈকত, বন, পাহাড়, নদী ও ঐতিহ্যের বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ এখনো আন্তর্জাতিক পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে হিমশিম খাচ্ছে।

প্রতিটি দেশের ভৌগোলিক অবস্থান, সম্পদ ও চ্যালেঞ্জ আলাদা। তবুও প্রতিবেশী দেশগুলো যেভাবে পর্যটকদের স্বাগত জানায়, পথনির্দেশনা দেয় এবং সেবা প্রদান করে, তা দেখে মনে হয়েছে, তাদের কাছ থেকে আমাদের শেখার মতো অনেক বাস্তব অভিজ্ঞতা রয়েছে।

মালদ্বীপ: ছোট দেশ, পর্যটন নিয়ে বড় স্বপ্ন

মালদ্বীপের জনসংখ্যা মাত্র প্রায় পাঁচ লাখ। দেশটি প্রায় ১ হাজার ১৯০টি প্রবালদ্বীপ নিয়ে গঠিত, যেগুলো ২৬টি প্রাকৃতিক অ্যাটলে বিভক্ত। এর মধ্যে প্রায় ২০০টি দ্বীপে জনবসতি রয়েছে। বাকি অনেক দ্বীপের কিছু অংশ পর্যটন রিসোর্ট হিসেবে ব্যবহূত হয়।

মালদ্বীপে পৌঁছানোর পর ভেলানা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে (মালে) নামার মুহূর্ত থেকেই আমার কাছে সবকিছু বেশ সুসংগঠিত মনে হয়েছে। আধুনিক গতিসম্পন্ন একটি স্পিডবোটে মাত্র ৪৫ মিনিটে আমরা মাফুশি নামের ছোট্ট দ্বীপে পৌঁছাই। নৌযাত্রাটিও বেশ উপভোগ্য ও রোমাঞ্চকর ছিল। সেখানে আমরা দুই রাত এক্সোটিকা ট্রাইটন হোটেলে অবস্থান করি। হোটেলের পক্ষ থেকে বিনামূল্যে বাগি গাড়িতে পুরো দ্বীপ ঘুরে দেখার ব্যবস্থা ছিল। মাত্র আধা ঘণ্টায় দ্বীপটির বিভিন্ন স্থান ঘুরে দেখার সুযোগ হয়।

মাফুশি ছোট একটি দ্বীপ হলেও পর্যটকদের জন্য নির্ধারিত এলাকাগুলো ছিল স্পষ্টভাবে চিহ্নিত এবং সহজে ঘুরে দেখার উপযোগী। অন্য অনেক পর্যটন কেন্দ্রের মতো সেখানে রাস্তারপাশে ফেরিওয়ালাদের ভিড় কিংবা যত্রতত্র ছড়িয়ে থাকা দোকানপাট চোখে পড়েনি। হোটেলগুলোর নিচে সুন্দরভাবে সাজানো ছিল অসংখ্য স্যুভেনিরের দোকান। আমাদের অবস্থান ছিল খুবই অল্প সময়ের জন্য, তাই পুরো মালদ্বীপ সম্পর্কে মন্তব্য করার সুযোগ নেই। তবে এই স্বল্প অভিজ্ঞতা থেকেই বুঝেছি, জনপরিসরের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা একজন পর্যটকের অভিজ্ঞতাকে কতটা ইতিবাচক করে তুলতে পারে।

আমার কাছে সবচেয়ে ভালো লেগেছে নিরাপত্তার অনুভূতি। রাত ১১টার পরও আমার দশবছর বয়সী ছেলেকে নিয়ে দ্বীপের বিভিন্ন স্থানে হেঁটে বেড়াতে একটুও ভয় কাজ করেনি।

পর্যটকেরা এমন একটি পরিবেশ চান, যেখানে হয়রানির শিকার হওয়ার ভয় থাকবে না, অনিরাপদ যানে চলাচল কিংবা অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের আশঙ্কা থাকবে না। বিশেষ করে পরিবার নিয়ে ভ্রমণকারীরা এমন একটি জায়গা খোঁজেন, যেখানে শিশুরা আনন্দ করতে পারবে এবং অভিভাবকেরা নিশ্চিন্তে সময় কাটাতে পারবেন। শুধু সুন্দর সমুদ্রসৈকত কিংবা ভালো হোটেল থাকলেই পর্যটকের মন জয় করা যায় না। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হয়, সম্মান দিতে হয় এবং আন্তরিকভাবে স্বাগত জানাতে হয়।

বাংলাদেশের জন্য পর্যটন উন্নয়নের সূচনা হওয়া উচিত এখান থেকেই। প্রশিক্ষিত পর্যটন গাইড, নির্ধারিত ও স্বচ্ছ মূল্যতালিকা, উন্নত সড়ক ও পরিবহন ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত ও পরিচ্ছন্ন টয়লেট, জরুরি সহায়তা এবং অভিযোগ জানানোর সহজ ব্যবস্থা পর্যটকদের আস্থা বাড়াতে পারে। নিরাপত্তাকে পর্যটন অবকাঠামোর অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে, কোনো অতিরিক্ত সুবিধা হিসেবে নয়।

শুধু দৃশ্য নয়, অভিজ্ঞতাও গুরুত্বপূর্ণ

আমাদের অনেক সহকর্মী প্যারাসেইলিং, কায়াকিং ও নৌভ্রমণে অংশ নিয়েছিলেন। একের পর এক সহকর্মী আনন্দ ও উচ্ছ্বাস নিয়ে ফিরে আসছিলেন। প্রথমে যাঁরা অংশ নিয়েছিলেন, তাদের আনন্দ দেখে আরও অনেকে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। একটি ভালো অভিজ্ঞতা যেমন মানুষের মধ্যে আনন্দ ছড়ায়, তেমনি অন্যদেরও সেই অভিজ্ঞতা অর্জনে উৎসাহিত করে।

মালদ্বীপ মূলত স্নরকেলিং, স্কুবা ডাইভিং, কায়াকিং, প্যারাসেইলিং ও ডলফিন দেখার মতো কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে পর্যটনশিল্প গড়ে তুলেছে। সেখানে শুধু হোটেলের কক্ষ ভাড়া বা খাবার থেকেই আয় হয় না; এসব বিনোদনমূলক কার্যক্রমও পর্যটন আয়ের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। এগুলো পর্যটকদের অবস্থানের সময় বাড়ায়, ভ্রমণকে আনন্দদায়ক করে তোলে এবং স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে।

বাংলাদেশের কক্সবাজার, সেন্ট মার্টিন দ্বীপ এবং অন্যান্য উপকূলীয় এলাকায়ও এ ধরনের পর্যটন কার্যক্রম চালু করা সম্ভব। তবে এর জন্য প্রয়োজন সুপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা, প্রশিক্ষিত পরিচালনাকারী, উপযুক্ত সরঞ্জাম, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ, উদ্ধার কার্যক্রমের প্রস্তুতি এবং পরিবেশগত নিয়মকানুনের যথাযথ অনুসরণ।

মাফুশির সমুদ্রের পানির রং দিনের বিভিন্ন সময়ে গভীর নীল থেকে ফিরোজা, কখনো সবুজাভ মনে হয়েছে। শান্ত পরিবেশ, আলো আর স্বচ্ছ পানির সৌন্দর্য পুরো অভিজ্ঞতাকে যেন জাদুকরী করে তুলেছিল।

তবে সবচেয়ে বেশি মনে থাকবে বিদায়ের মুহূর্তটি। আমাদের নৌযান যতক্ষণ পর্যন্ত হোটেলের কর্মীদের দৃষ্টিসীমায় ছিল, ততক্ষণ তারা সাদা পোশাক পরে সমুদ্রসৈকতে দাঁড়িয়ে হাত নেড়ে বিদায় জানাচ্ছিলেন। তাদের এই ছোট্ট আন্তরিক আচরণ আমার মনে গভীর ছাপ ফেলেছে। হোটেলের কক্ষ, খাবার বা অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার কথা হয়তো একসময় ভুলে যাওয়া যায়, কিন্তু একজন পর্যটকের সঙ্গে কেমন আচরণ করা হয়েছিল, তা সহজে ভোলা যায় না।

বাংলাদেশিরা এমনিতেই আতিথেয়তার জন্য পরিচিত। আমার বিশ্বাস, আমাদের খাবারের বৈচিত্র্যও অসাধারণ এবং এর স্বাদ ও বৈশিষ্ট্য অন্যান্য অনেক দেশের খাবার থেকে স্বতন্ত্র। সঠিক প্রশিক্ষণ, উন্নত সেবার মান, ভালো পরিবহন ব্যবস্থা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পেরে আমরাও পর্যটনশিল্পকে অনেক দূর এগিয়ে নিতে পারব। আমাদের অন্য কোনো দেশের অনুকরণ করার প্রয়োজন নেই; নিজেদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে আরও পেশাদারভাবে উপস্থাপন করতে হবে।

শ্রীলঙ্কা: ভ্রমণকে ব্যবসায়িক সম্ভাবনায় রূপান্তর

মালদ্বীপ থেকে আমরা বিমানে শ্রীলঙ্কার বান্দারানায়েকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে (কলম্বো) পৌঁছাই। সেখান থেকে সড়কপথে ক্যান্ডিতে যাই। সেখানে রয়্যাল রিসোর্ট হোটেলে আমাদের থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল। চারপাশের সবুজ পাহাড়, চা-বাগান ও ঝরনার দৃশ্য ছিল মনোমুগ্ধকর। আমরা একটি বৌদ্ধ মন্দির, চা-কারখানা, মসলা বাগান এবং কয়েকটি রত্ন পাথরের দোকান পরিদর্শন করি। পাশাপাশি পাহাড়ি অঞ্চলের মধ্য দিয়ে ভ্রমণ করি, যে এলাকাটি ‘লিটল ইংল্যান্ড’ নামে পরিচিত। ব্রিটিশ স্থাপত্যশৈলীর অসংখ্য ভবন সেখানে ঔপনিবেশিক আমলের স্মৃতি বহন করছে।

তবে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের চেয়েও আমাকে বেশি মুগ্ধ করেছে শ্রীলঙ্কার নিজেদের পণ্য বিক্রির দক্ষতা।

লাবুকেলি নামের একটি চা-কারখানায় একজন নারী অত্যন্ত সহজ ও সাবলীল ইংরেজিতে চা উৎপাদনের পুরো প্রক্রিয়াটি আমাদের বুঝিয়ে বলেন। তার উপস্থাপনাসিল খুবই আত্মবিশ্বাসী ও তথ্যসমৃদ্ধ। এরপর আমরা পাহাড়ের ওপর কাচে ঘেরা একটি কক্ষে বসে চারপাশের চা-বাগানের মনোরমদৃশ্য উপভোগ করতে করতে সৌজন্যমূলকভাবে পরিবেশিত চা পান করি। একই হলরুমের একপাশে ছিল বিভিন্ন ধরনের চা বিক্রির সুন্দরব্যবস্থা, আর সেখানকার দক্ষ বিক্রেতারা সবাই ছিলেন আত্মবিশ্বাসী নারী। এই চা-কর্মীদের দক্ষতা আমার কাছে মনোমুগ্ধকর মনে হয়েছে। একই সঙ্গে তা আমাদের দেশের চা-শ্রমিকদের দীনহীন, অস্বাস্থ্যকর ও শিক্ষাবঞ্চিত জীবনের কথা মনে করিয়ে দিয়েছে।

প্রথমে আমাদের অনেকেই চায়ের দাম দেখে কিছুটা দ্বিধায় পড়েছিলাম, কারণ বাংলাদেশের তুলনায় দাম বেশ বেশি মনে হচ্ছিল। কিন্তু একজন যখন একটি প্যাকেট কিনলেন, তখন অন্যরা আগ্রহী হয়ে উঠলেন। শেষ পর্যন্ত আমাদের অধিকাংশিই বিভিন্ন ধরনের চা কিনে ফিরেছি।

এরপর আমরা মসলা বাগানে যাই। সেখানে একজন আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক মসলা, ভেষজ পণ্য ও ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসাপদ্ধতির বিভিন্ন দিক অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ব্যাখ্যা করছিলেন। তার উপস্থাপনার ধরন ছিল একজন দক্ষ বিক্রয় প্রতিনিধিকেও হারমানানোরমতো। ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা সব সমস্যার সর্বজনীন সমাধান না হলেও এখান থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায়—পণ্য সম্পর্কে ভালো জ্ঞান এবং কার্যকর যোগাযোগ বিক্রয় ও বিপণনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

এই অভিজ্ঞতা আমাকে উপলব্ধি করতে সাহায্য করেছে যে শ্রীলঙ্কা শুধু তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য প্রদর্শন করে না; পর্যটনকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের চা, মসলা, রত্নপাথর ও তৈরি পোশাকের প্রচার এবং বাজার সমপ্রসারণও করে।

পরিসংখ্যান কী বলছে?

পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মালদ্বীপের সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে প্রায় ২২ লাখ ৫০ হাজার পর্যটকের আগমনের বিপরীতে দেশটি পর্যটন খাত থেকে প্রায় ৫ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করেছে। দেশের জিডিপিতে পর্যটন খাতের অবদান ২০ শতাংশেরও বেশি।

অন্যদিকে শ্রীলঙ্কা ২০২৫ সালে রেকর্ডসংখ্যক ২৩ লাখ ৬০ হাজার পর্যটক পেয়েছে এবং এ খাত থেকে প্রায় ৩ দশমিক ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করেছে। ২০২৫ সালে ভারতের পর্যটন আয় ছিল প্রায় ৩১ দশমিক ৬৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। আর উচ্চমূল্য ও সীমিতসংখ্যক পর্যটক আকৃষ্ট করার নীতি অনুসরণকারী ভুটান শুধু টেকসই উন্নয়ন ফি (Sustainable Development Fee) থেকেই প্রায় ৪৩ দশমিক ৩১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করেছে।

বাংলাদেশ পর্যটন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা ছিল মাত্র ৫ লাখ ৮৫ হাজার ১৪৫, যা ২০২৪ সালের ৬ লাখ ৩৩ হাজার ৯৪ জনের তুলনায় কম। ডব্লিউটিটিসির (WTTC) হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ভ্রমণ ও পর্যটন খাতের মোট অবদান ছিল প্রায় ১০ দশমিক ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এই হিসাবে অভ্যন্তরীণ পর্যটন এবং এ খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ২০২৪ সালে বাংলাদেশের জিডিপিতে পর্যটন খাতের অবদান প্রায় ৪ শতাংশ বলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী উল্লেখ করেছিলেন।

এখানে উল্লেখিত পরিসংখ্যানগুলো ভিন্ন ভিন্ন সূচকের ভিত্তিতে তৈরি, তাই এগুলোর মধ্যে সরাসরি তুলনা করা যথাযথ হবে না। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—প্রতিবেশী দেশগুলো পর্যটনকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক খাত হিসেবে বিবেচনা করছে, যেখানে বাংলাদেশের এখনো অনেক দূর এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। পর্যটকদের ব্যয়, হোটেল কক্ষ ব্যবহারের হার, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ সম্পর্কে আরও নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ করাও জরুরি। এসব তথ্য পর্যটন খাতের প্রকৃত সম্ভাবনা চিহ্নিত করতে নীতি নির্ধারকদের সহায়তা করবে।

এসব দেশের এত সাফল্য একদিনে অর্জিত হয়নি। শ্রীলঙ্কা ১৯৬৬ সালে পর্যটন উন্নয়নে পরিকল্পনা গ্রহণ করে এবং মালদ্বীপ ১৯৭২ সালে তাদের প্রথম পর্যটন রিসোর্ট চালু করে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, ধারাবাহিক প্রচার, বিনিয়োগ এবং পেশাদার সেবার সমন্বয়ে দেশ দুটি আজকের এই অবস্থানে পৌঁছেছে।

এছাড়া এ অঞ্চলের অন্যান্য দেশ থেকেও আমাদের অনেক কিছু শেখার আছে। অ্যাডভেঞ্চার ও ট্রেকিং পর্যটনে নেপাল, পরিবেশ ও সাংস্কৃতিক পর্যটনে ভুটান এবং ঐতিহ্য, ধর্মীয়, বন্যপ্রাণী, চিকিৎসা ও ব্যবসায়িক পর্যটনে ভারত আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হতে পারে। কোনো একটি দেশের মডেল হুবহু অনুসরণ না করে এসব দেশের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশের নিজস্ব পর্যটন মডেল তৈরি করা উচিত।

সুন্দর পর্যটন কেন্দ্র আছে, অভাব সুযোগ-সুবিধার

বাংলাদেশের রয়েছে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন, বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটির পাহাড়-ঝরনা, সিলেটের চা-বাগান ও রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্ট, কুয়াকাটার সমুদ্রসৈকত এবং প্রবালদ্বীপ সেন্ট মার্টিন। এ ছাড়া রয়েছে পাহাড়পুর, মহাস্থানগড় ও বাগেরহাটের মসজিদ নগরীর মতো ঐতিহাসিক ঐতিহ্য। জামদানি, নকশিকাঁথা, হস্তশিল্প, আঞ্চলিক খাবার এবং গ্রামীণ ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সংস্কৃতিও আমাদের পর্যটনের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ।

আমি বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, চট্টগ্রাম, সিলেট, শ্রীমঙ্গল, রংপুর, পিরোজপুর, বগুড়া, বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরে দেখেছি। আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, বাংলাদেশে সুন্দর পর্যটন স্থানের কোনো অভাব নেই। অভাব রয়েছে সেসব স্থানকে পর্যটকদের জন্য উপযোগী করে গড়ে তোলার মৌলিক অবকাঠামো ও সুযোগ-সুবিধার।

একটি ভালো ছুটি কাটানোর জন্য সবসময় বিলাসবহুল হোটেল কিংবা অত্যাধুনিক রেস্তোরাঁর প্রয়োজন হয় না। প্রয়োজন মানসম্মত সড়ক, নির্ভরযোগ্য পরিবহন, পরিচ্ছন্ন গণশৌচাগার, নিরাপদ পানীয় জল, কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা, মানসম্মত আবাসন, যৌক্তিক মূল্য এবং এমন পর্যটন গাইড, যাঁরা আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্য ইংরেজি কিংবা পর্যটকের বোধগম্য অন্য কোনো ভাষায় ব্যাখ্যা করতে পারবেন। আন্তর্জাতিক পর্যটকদের জন্য অনলাইনে বুকিং, অনলাইনে অর্থ পরিশোধ এবং নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রাপ্তির সুযোগও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব সুবিধা অভ্যন্তরীণ পর্যটকদের জন্যও সমানভাবে প্রয়োজনীয়।

আমাদের দেশে অভ্যন্তরীণ পর্যটন নিঃসন্দেহে অনেকটাই সমপ্রসারিত হয়েছে। এখন অনেক বাংলাদেশিই ছুটি পেলেই দেশের বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণ করেন। কিন্তু শুধু অভ্যন্তরীণ পর্যটকের সংখ্যা বাড়লেই কোনো দেশ আন্তর্জাতিক পর্যটন ব্র্যান্ড হিসেবে স্বীকৃতি পায় না। কোনো একটি ঝরনা বা প্রাকৃতিক স্থান থাকলেই সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে পর্যটন পণ্যে পরিণত হয় না। এর জন্য প্রয়োজন নিরাপদ যাতায়াত, সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, দক্ষ গাইড, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং কার্যকর প্রচারণা।

বাংলাদেশের করণীয়

১. মৌলিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা

পর্যটন উন্নয়নের শুরুতেই মৌলিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। দেশের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন কেন্দ্রে পরিচ্ছন্ন শৌচাগার, নিরাপদ পানীয় জল, বর্জ্য নিষ্কাশন ব্যবস্থা, সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা, জরুরি চিকিৎসা সেবা এবং দৃশ্যমান নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকতে হবে। উন্নত পরিচ্ছন্নতার মান শুধু বিমানবন্দর ও বড় হোটেলের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না।

২. দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা

পর্যটন গাইড, চালক, হোটেল ও রেস্তোরাঁর কর্মী, দোকানদার এবং স্থানীয় উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। তাদের কথোপকথনের ইংরেজি, গ্রাহক সেবা, স্থানীয় ইতিহাস, পণ্যের বৈশিষ্ট্য এবং প্রাথমিক চিকিৎসা সম্পর্কে প্রশিক্ষিত করে তুলতে হবে। তাদের মাতৃভাষার মতো ইংরেজি বলতে হবে, এমন কোনো কথা নেই। স্পষ্ট, আত্মবিশ্বাসী ও ভদ্রভাবে যোগাযোগ করতে পারাটাই যথেষ্ট।

৩. আমাদের পণ্যের পেছনের গল্প তুলে ধরা

শ্রীলঙ্কা যেভাবে চা ও মসলাকে পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করেছে, আমরাও সিলেটের চা-বাগান, জামদানি, নকশিকাঁথা, মধু, গ্রামীণ খাবার, ইলিশ মাছ, ঢাকাই বিরিয়ানি, নদীকেন্দ্রিক জীবন এবং মৎস্যজীবী সমপ্রদায়কে ঘিরে পর্যটন অভিজ্ঞতা তৈরি করতে পারি। পর্যটকেরা সরাসরি পণ্য তৈরির প্রক্রিয়া দেখতে পারবেন, উৎপাদকদের সঙ্গে পরিচিত হতে পারবেন এবং ন্যায্যমূল্যে মানসম্মত পণ্য কিনতে পারবেন। এর মাধ্যমে ক্ষুদ্র ব্যবসা, নারী উদ্যোক্তা ও গ্রামীণ পরিবারের আয়ের সুযোগ সৃষ্টি হবে। একটি এলাকার আকর্ষণগুলোকে একটি সমন্বিত চেইন বা প্যাকেজের আওতায় এনে বৈশ্বিক পর্যটকদের সামনে উপস্থাপন করতে হবে।

৪. একটি বিশ্বমানের সমুদ্রসৈকত গড়ে তোলা

কক্সবাজারে অন্তত একটি এলাকাকে কেন আমরা পেশাদার ব্যবস্থাপনায় বিশ্বমানের পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে পারি না, যা আমাদের জন্য বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা এনে দিতে পারে? সেখানে উন্নত সড়ক, রেল ও আকাশপথের যোগাযোগ, পর্যটন তথ্যকেন্দ্র, পরিচ্ছন্ন গণপরিসর, প্রশিক্ষিত লাইফগার্ড, নিরাপদ সাঁতারের নির্ধারিত এলাকা, তত্ত্বাবধানাধীন জলক্রীড়া, স্বাস্থ্যসম্মত খাবারের দোকান, নির্ধারিত মূল্যের স্যুভেনির শপ, সব ধরনের বাজেটের উপযোগী আবাসন এবং ডিজিটাল বুকিংয়ের ব্যবস্থা থাকতে পারে।

সরকার অবকাঠামো, নীতিমালা, নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির দায়িত্ব পালন করতে পারে। অন্যদিকে, স্বচ্ছ সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের মাধ্যমে বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা বিভিন্ন সেবা গড়ে তুলতেও পরিচালনা করতে পারেন। তবে পর্যটন কেন্দ্র যেন শুধু ধনীদের জন্য সীমাবদ্ধ না হয়। পরিবার, শিক্ষার্থী ও বিদেশি পর্যটক—সবার জন্যই সেখানে ভ্রমণের সুযোগ থাকতে হবে। এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে সম্ভাব্যতা যাচাই, পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন এবং স্থানীয় জনগণের সঙ্গে পরামর্শ করা জরুরি।

৫. প্রথমে কয়েকটি পর্যটন কেন্দ্রকে অগ্রাধিকার দেওয়া

একসঙ্গে দেশের সব পর্যটন কেন্দ্রের ব্যাপক উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই শুরুতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানকে অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে। উপকূলীয় পর্যটনের জন্য কক্সবাজার, চা-বাগান ও জলাভূমির জন্য সিলেট, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সম্মতি ও অংশগ্রহণের ভিত্তিতে প্রকৃতি ও সাংস্কৃতিক পর্যটনের জন্য পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং নিয়ন্ত্রিত পরিবেশবান্ধব পর্যটনের জন্য সুন্দরবনকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে।

কক্সবাজারের সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রাম, সিলেটের সঙ্গে রাতারগুল কিংবা সুন্দরবনের সঙ্গে বাগেরহাটকে যুক্ত করে সমন্বিত পর্যটন প্যাকেজ তৈরি করা সম্ভব। এতে পর্যটকদের অবস্থানের সময় বাড়বে এবং সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষের আয়ের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

৬. পেশাদার প্রচারণা নিশ্চিত করা

বাংলাদেশ পর্যটন বোর্ড, স্থানীয় প্রশাসন, ট্যুর অপারেটর এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। পর্যটন কেন্দ্র, যাতায়াত, মূল্যতালিকা ও নিরাপত্তা বিষয়ক নির্ভরযোগ্য তথ্যসমৃদ্ধ আকর্ষণীয় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা জরুরি। কার্যকর প্রচারণা পর্যটক আকৃষ্ট করতে পারে, কিন্তু উন্নত সেবার মানই তাদের পুনরায় ভ্রমণে উৎসাহিত করবে এবং অন্যদের কাছে ইতিবাচক অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে সাহায্য করবে।

৭. বিদ্যমান নিয়মকানুনের যথাযথ প্রয়োগ

আমার মনে হয়, শুধু অর্থায়নই পর্যটন উন্নয়নের প্রধান চ্যালেঞ্জ নয়। পর্যটকদের হয়রানি ও অতিরিক্ত মূল্য আদায়ের বিরুদ্ধে বিদ্যমান নিয়মকানুন কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। শৌচাগার নির্মাণ করলেই হবে না, সেগুলো নিয়মিত পরিষ্কার রাখতে হবে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অবকাঠামো তৈরি করলেই চলবে না, প্রতিদিন এর কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে হবে।

স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে পর্যটন উন্নয়নের অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে, যাতে তারা এ খাতের সুফল ভোগ করতে পারেন। একই সঙ্গে যেসব প্রাকৃতিক সম্পদকে কেন্দ্র করে পর্যটনের প্রচার করা হচ্ছে, সেগুলোর সুরক্ষা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। অপরিকল্পিত নির্মাণ, প্লাস্টিক দূষণ ও অতিরিক্ত পর্যটকের চাপ সমুদ্রসৈকত, বন ও জলাভূমির পরিবেশ নষ্ট করতে পারে।

পর্যটনের সাফল্য শুধু পর্যটকের সংখ্যা দিয়ে বিচার করা উচিত নয়। পর্যটকদের সন্তুষ্টি, অবস্থানের সময়কাল, ব্যয়ের পরিমাণ, স্থানীয় কর্মসংস্থান এবং পরিবেশের গুণগত মানকেও মূল্যায়নের সূচক হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

এক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পর্যটন, আতিথেয়তা, ভাষা ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন বিষয়ে শিক্ষাক্রম ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালুর মাধ্যমে দক্ষমানবসম্পদ তৈরিতে তারা অবদান রাখতে পারে।

যে বাংলাদেশকে নিয়ে আমরা বাংলাদেশকে স্বাগত জানাতে চাই

মাফুশি থেকে আমাদের নৌযান যখন ছেড়ে যাচ্ছিল, তখন হোটেলের কর্মীরা দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে যাওয়া পর্যন্ত হাত নেড়ে বিদায় জানাচ্ছিলেন। সেই দৃশ্য আজও আমার মনে গেঁথে আছে। একই সঙ্গে তা নিজের দেশের পর্যটন সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে স্বপ্ন দেখার ইচ্ছাও জাগিয়েছে।

আমি এমন একটি বাংলাদেশ দেখতে চাই, যেখানে পরিবারগুলো নিশ্চিন্তে সমুদ্রসৈকতে ভ্রমণ করতে পারবে, বিদেশি পর্যটকেরা সহজেই আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্য ঘুরে দেখতে পারবেন এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠী একটি সমৃদ্ধ পর্যটন অর্থনীতির সুফল ভোগ করবে। মালদ্বীপ দেখিয়েছে, ছোট একটি দ্বীপরাষ্ট্রও কীভাবে পর্যটনকে কেন্দ্র করে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। শ্রীলঙ্কা দেখিয়েছে, পর্যটনের মাধ্যমে কীভাবে একটি দেশের নিজের পণ্যকে বিশ্ববাজারে পরিচিত করা যায়। বাংলাদেশকেও নিজস্ব ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য, সংস্কৃতি ও জনগোষ্ঠীকে ভিত্তি করে নিজস্ব পথ তৈরি করতে হবে।

বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অভাব নেই। প্রয়োজন এই সৌন্দর্যকে সুশৃঙ্খলভাবে সাজানো, সংরক্ষণ করা এবং বিশ্বের সামনে যথাযথভাবে উপস্থাপনের দৃঢ় প্রত্যয়। কাজটি সময়সাপেক্ষ হলেও শিক্ষণীয় বিষয়গুলো স্পষ্ট—আমাদের শিখতে হবে, পরিকল্পনা করতে হবে এবং কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

আমাদের নতুন প্রধানমন্ত্রী ‘সবার আগে বাংলাদেশ’—এই ভাবনাকে সামনে রেখে দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে যে প্রত্যাশার কথা ব্যক্ত করেছেন, তার সঙ্গে সংগতি রেখে আমরাও বাংলাদেশের পর্যটনশিল্পের একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ দেখতে চাই। আমরা সেই দিনের অপেক্ষায় আছি, যেদিন সাদা পাথর, রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্টসহ দেশের বিভিন্ন মনোরম পর্যটন কেন্দ্রে নিরাপদে, স্বচ্ছন্দে ও নিশ্চিন্তে ভ্রমণ করতে পারব।

বাংলাদেশের পর্যটন খাতের উন্নয়নে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আরও বেশি মনোযোগ দেওয়ার এবং প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণের সময় এখনই। যথাযথ পরিকল্পনা, উন্নত অবকাঠামো, মানসম্মত সুযোগ-সুবিধা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং কার্যকর প্রচারণার মাধ্যমে বাংলাদেশ দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করার বিপুল সম্ভাবনা রাখে।

আমরা আশা করি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পর্যটন খাতকে তার প্রাপ্য গুরুত্ব দেবে এবং এই স্বপ্ন বাস্তবায়নে সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। আমরা তাদের ইতিবাচক সাড়া ও কার্যকর উদ্যোগের অপেক্ষায় রইলাম।

 

শিক্ষক, অ্যাকাউন্টিং বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়