১,৯২০ কোটি টাকার মামলা
এয়ারটেল রিব্র্যান্ডিংয়ে কি কাটবে রবির আইনি ঝুঁকি?
শেয়ার বিজ
দেশের টেলিযোগাযোগ খাতে রবি আজিয়াটা ও প্রতিদ্বন্দ্বী অপারেটরগুলোর মধ্যে প্রায় এক দশক ধরে চলা বিরোধ সাম্প্রতিক সময়ে নতুন মাত্রা পেয়েছে। ২০১৬ সালে রবি আজিয়াটা ও এয়ারটেল বাংলাদেশের একীভূতকরণের পর একীভূতকরণের শর্ত, এয়ারটেল ব্র্যান্ডের ব্যবহার এবং ০১৬ নম্বর সিরিজ চালু রাখাকে কেন্দ্র করে যে প্রশ্ন উঠেছিল, তা এখন গড়িয়েছে আদালত পর্যন্ত।
এরই মধ্যে রবি আজিয়াটার বিরুদ্ধে ১ হাজার ৯২০ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দাবি করে মামলা করেছে বাংলালিংক। একই সঙ্গে একীভূতকরণের শর্ত বাস্তবায়ন না করার অভিযোগে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিষ্ক্রিয়তাকে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টেও রিট করা হয়েছে।
এমন পরিস্থিতির মধ্যেই গত ১৭ আগস্ট দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে বাংলাদেশে ব্যবহূত এয়ারটেল ব্র্যান্ড পরিবর্তন করে নতুন ব্র্যান্ড ‘সার্কেল’ চালু করেছে রবি আজিয়াটা। কোম্পানির ভাষ্য, মানুষের পরিবর্তিত ডিজিটাল জীবনযাপন এবং ক্রমবর্ধমান সংযুক্ত জীবনধারাকে বিবেচনায় নিয়ে নতুন ব্র্যান্ডটি চালু করা হয়েছে।
তবে রিব্র্যান্ডিংয়ের সময়কাল এবং এর আগে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানগুলোর ধারাবাহিক আইনি পদক্ষেপকে ঘিরে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—এয়ারটেল নাম পরিবর্তন করে সার্কেল করার মাধ্যমে কি পুরোনো আইনি বিরোধ থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে রবি?
রবি ও এয়ারটেলের বর্তমান বিরোধের সূত্রপাত ২০১৬ সালের একীভূতকরণ থেকে। ওই বছর রবি আজিয়াটা ও এয়ারটেল বাংলাদেশের কার্যক্রম একীভূত হয়। একীভূতকরণের পর রবি দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মোবাইল অপারেটর হিসেবে আরও শক্তিশালী অবস্থানে চলে আসে।
তবে একীভূতকরণের সময় বেশ কিছু শর্ত আরোপ করা হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর নথি ও পরবর্তী অভিযোগে উঠে এসেছে। প্রতিদ্বন্দ্বী অপারেটরগুলোর দাবি, হাইকোর্ট অনুমোদিত একীভূতকরণ পরিকল্পনায় একীভূত কোম্পানির সব সেবা রবি আজিয়াটা নামের অধীনে পরিচালনার বিষয়টি উল্লেখ ছিল।
প্রতিদ্বন্দ্বীদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এর অর্থ ছিল একীভূতকরণের পর এয়ারটেলকে পৃথক ব্র্যান্ড হিসেবে পরিচালনা না করা। এ নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী অপারেটরগুলোর পক্ষ থেকে প্রতিযোগিতার সমতা এবং একীভূতকরণের শর্ত বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। অন্যদিকে রবি এয়ারটেলকে একীভূতকরণের মাধ্যমে অর্জিত নিজস্ব ব্র্যান্ড হিসেবে বিবেচনা করে এসেছে। ফলে এয়ারটেল ব্র্যান্ড ব্যবহারকে তারা আলাদা কোনো মোবাইল অপারেটর পরিচালনার সমতুল্য মনে করেনি।
বিরোধের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ০১৬ নম্বর সিরিজ। এয়ারটেল বাংলাদেশ কার্যক্রম পরিচালনার সময় এই নম্বর সিরিজ ব্যবহার করত। একীভূত হওয়ার পর ওই নম্বর সিরিজ ব্যবহার অব্যাহত রাখা হয়।
প্রতিদ্বন্দ্বী অপারেটরগুলোর অভিযোগ, একীভূতকরণের সময় ০১৬ নম্বর সিরিজ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট বিধিনিষেধ ও সময়সীমা ছিল। নির্দিষ্ট সময়ের পর নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন ছাড়া এই নম্বর সিরিজ ব্যবহার করা যাবে না—এমন শর্ত ছিল বলে তাদের দাবি। কিন্তু প্রতিদ্বন্দ্বীদের অভিযোগ, এসব শর্তের পরও রবি দীর্ঘ সময় ধরে ০১৬ নম্বর সিরিজ ব্যবহার করেছে।
এ নিয়ে মূল প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে—একীভূতকরণের পর রবি কতদিন পর্যন্ত ০১৬ নম্বর সিরিজ ব্যবহার করতে পারত এবং পরবর্তী সময়ে এই নম্বর সিরিজ ব্যবহারের জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার কোনো নতুন অনুমোদন প্রয়োজন ছিল কি না। বিষয়টি এখন নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও আদালতের বিবেচনার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। ২০১৬ সালের একীভূতকরণের পরও প্রায় এক দশক ধরে রবি ও এয়ারটেল—দুটি ব্র্যান্ড বাজারে ছিল। এয়ারটেল বিশেষ করে তরুণ গ্রাহকদের মধ্যে শক্তিশালী ব্র্যান্ড হিসেবে অবস্থান ধরে রাখে।
প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানগুলোর অভিযোগ, একীভূত কোম্পানি হিসেবে রবি একই সঙ্গে দুটি ব্র্যান্ড পরিচালনা করে একটি অতিরিক্ত প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা পেয়েছে। তাদের মতে, এয়ারটেলের বিদ্যমান ব্র্যান্ড পরিচিতি, গ্রাহকভিত্তি এবং ০১৬ নম্বর সিরিজ ব্যবহার করে রবি এমন বাজার সুবিধা ধরে রেখেছে, যা অন্য অপারেটরদের জন্য একইভাবে উন্মুক্ত ছিল না। এসব অভিযোগের আইনগত সত্যতা এখনো আদালতে চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হয়নি।
দীর্ঘ সময়ের বিরোধ নতুন করে সামনে আসে ২০২৫ সালে। ওই বছরের ১৬ সেপ্টেম্বর গ্রামীণফোন বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের কাছে চিঠি দিয়ে একীভূতকরণের শর্তবাস্তবায়নের দাবি জানায়। এরপর ৩০ অক্টোবর একই ধরনের অভিযোগ জানিয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে আবেদন করে বাংলালিংক।
প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানগুলোর বক্তব্য ছিল, ২০১৬ সালের একীভূতকরণের সময় নির্ধারিত শর্ত যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা হয়নি। বাংলালিংকের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, নিয়ন্ত্রক সংস্থার পক্ষ থেকে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় প্রতিষ্ঠানটি আদালতের দ্বারস্থ হয়।
এর ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালের ২৭ এপ্রিল হাইকোর্টে রিট পিটিশন করে বাংলালিংক। রিটে একীভূতকরণের শর্ত লঙ্ঘনের অভিযোগের বিষয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিষ্ক্রিয়তাকে চ্যালেঞ্জ করা হয়।
২০ মে বিটিআরসি রবি আজিয়াটাকে গ্রামীণফোন ও বাংলালিংকের উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে জবাব দিতে চিঠি দেয় বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
এর ফলে বিষয়টি আর শুধু প্রতিযোগী দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ব্যবসায়িক বিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও আদালতের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়াতেও তা প্রবেশ করে।
বিরোধের সবচেয়ে বড় মোড় আসে ৮ জুলাই ২০২৬। ওই দিন বাংলালিংক ঢাকার যুগ্ম জেলা জজ আদালতে রবি আজিয়াটার বিরুদ্ধে ১ হাজার ৯২০ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দাবি করে মামলা করে।
মামলায় বাংলালিংকের অভিযোগ, রবি প্রায় এক দশক ধরে এয়ারটেল ব্র্যান্ড চালু রাখা এবং দীর্ঘ সময় ০১৬ নম্বর সিরিজ ব্যবহার করার মাধ্যমে প্রতিযোগিতায় অন্যায্য সুবিধা পেয়েছে।
এর ফলে বাংলালিংকসহ প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানগুলো আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
মামলায় ১ হাজার ৯২০ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণের পাশাপাশি মামলা দায়েরের তারিখ থেকে অর্থ পরিশোধ না হওয়া পর্যন্ত বার্ষিক ১৫ শতাংশ সুদ, মামলার খরচ এবং অন্যান্য প্রতিকার চাওয়া হয়েছে।
তবে আদালতে মামলা করা বা কোনো পক্ষের অভিযোগ উত্থাপন করা মানেই সেই অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে—এমন নয়। অভিযোগগুলোর আইনগত সত্যতা এবং ক্ষতির পরিমাণ আদালতের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই নির্ধারিত হবে।
এদিকে মামলা ও রিটের ধারাবাহিকতার মধ্যেই গত ১৭ আগস্ট রবি আজিয়াটা এয়ারটেল ব্র্যান্ডের পরিবর্তে ‘সার্কেল’ নামে নতুন ব্র্যান্ড চালু করে।
রবির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এটি একটি স্বাভাবিক ব্র্যান্ড পরিবর্তন। মানুষের ডিজিটাল জীবনধারা পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তরুণ ও ডিজিটালনির্ভর গ্রাহকদের জন্য নতুন অভিজ্ঞতা তৈরি করতেই সার্কেল চালু করা হয়েছে।
এ কারণেই রিব্র্যান্ডিংয়ের পরও প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে—শুধু ব্র্যান্ডের নাম পরিবর্তন হলে ২০১৬ সালের একীভূতকরণের শর্ত লঙ্ঘনের অভিযোগ বা অতীতের কথিত আর্থিক ক্ষতির দাবি কি শেষ হয়ে যাবে?
আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি নির্ভর করবে আদালত ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার সিদ্ধান্তের ওপর। কারণ বাংলালিংকের ১ হাজার ৯২০ কোটি টাকার মামলার অভিযোগ শুধু বর্তমান সময়ে এয়ারটেল নাম ব্যবহারের বিষয় নয়। মামলায় মূলত দীর্ঘ সময় ধরে এয়ারটেল ব্র্যান্ড পরিচালনা এবং ০১৬ নম্বর সিরিজ ব্যবহারের কারণে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা ও আর্থিক ক্ষতির দাবি করা হয়েছে।
ফলে ২০২৬ সালে এসে এয়ারটেল নাম পরিবর্তন করে সার্কেল চালু করা হলেও ২০১৬ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত সময়ের কর্মকাণ্ডের বিষয়ে উত্থাপিত প্রশ্ন আলাদা বিষয় হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। নতুন ব্র্যান্ড চালু করা ভবিষ্যতের ব্যবসায়িক কাঠামো পরিবর্তনের অংশ হতে পারে। কিন্তু অতীতের কর্মকাণ্ড নিয়ে কোনো মামলা বা অভিযোগ থাকলে তার নিষ্পত্তি আদালতের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে।
রিব্র্যান্ডিংয়ের পরও ০১৬ নম্বর সিরিজ ব্যবহারের বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানগুলোর অভিযোগের অন্যতম ভিত্তিই এই নম্বর সিরিজ।
যদি এয়ারটেল নাম পরিবর্তন করে সার্কেল করা হলেও ০১৬ নম্বর সিরিজের ব্যবহার অব্যাহত থাকে, তাহলে একীভূতকরণের সময় নম্বর সিরিজ নিয়ে আরোপিত শর্ত কীভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে—সে প্রশ্ন থেকেই যেতে পারে, যা আদালত কর্তৃক নির্ধারণযোগ্য।
বাংলালিংক ও গ্রামীণফোনের অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে—একীভূত হওয়ার পরও এয়ারটেল ব্র্যান্ড ধরে রাখার মাধ্যমে রবি অতিরিক্ত বাজার সুবিধা পেয়েছে কি না। তাদের দাবি, এয়ারটেল বাংলাদেশের পুরোনো ব্র্যান্ড পরিচিতি ও তরুণ গ্রাহকদের মধ্যে জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে রবি বাজারে আলাদা সুবিধা পেয়েছে।
রবির বক্তব্য, এয়ারটেল তাদের বৈধ ব্যবসায়িক সম্পদ ও ব্র্যান্ডের অংশ ছিল এবং সেটি ব্যবহার করা স্বাভাবিক ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত। এই দুই অবস্থানের মধ্যে কোনটি আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য হবে, তা নির্ধারণের জন্য একীভূতকরণের শর্ত, নিয়ন্ত্রক অনুমোদন, বাজার পরিস্থিতি এবং সংশ্লিষ্ট নথি বিবেচনা করতে হবে। বাংলালিংকের করা ১ হাজার ৯২০ কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ মামলা শুধু একটি ব্র্যান্ড ব্যবহারের বিরোধ নয়; এর সঙ্গে বড় অঙ্কের আর্থিক দাবিও যুক্ত হয়েছে। মামলায় ক্ষতিপূরণের পাশাপাশি ১৫ শতাংশ বার্ষিক সুদ চাওয়া হয়েছে। ফলে মামলা দীর্ঘায়িত হলে দাবিকৃত অর্থের পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। তবে ক্ষতিপূরণের পরিমাণ চূড়ান্ত হবে আদালতের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে। রবি-বাংলালিংক বিরোধে বিটিআরসির অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অভিযোগগুলো প্রথমে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছেই উত্থাপিত হয়।
২০২৫ সালে গ্রামীণফোন ও বাংলালিংক পৃথকভাবে বিটিআরসির কাছে বিষয়টি তুলে ধরে। পরে বাংলালিংক আদালতে রিট করে। এরপর বিটিআরসি রবির কাছে অভিযোগের বিষয়ে ব্যাখ্যা চায়। এয়ারটেল থেকে সার্কেল—রবির জন্য এটি নিঃসন্দেহে একটি বড় ব্র্যান্ড পরিবর্তন। তবে এই পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের আইনি বিরোধের সমাধান হবে কি না, সেটি এখনই বলা সম্ভব নয়।
বাংলালিংক থেকে পাঠানো এক বিবৃতে তারা শেয়ার বিজকে বলেন, এসব শর্ত যথাযথভাবে প্রতিপালিত না হওয়ায় বাজারে প্রতিযোগিতার সমান সুযোগ ব্যাহত হয়েছে এবং বাংলালিংক বাণিজ্যিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিষয়টি বর্তমানে বিচারাধীন, তাই আদালতের বাইরে আমরা হিসাবের বিস্তারিত বিষয়ে মন্তব্য করব না। আমাদের আর্জিতে উল্লিখিত দাবির পরিমাণ স্বাধীন আর্থিক ও মূল্যায়ন বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় প্রস্তুত করা হয়েছে। অনুমতিহীন ব্র্যান্ড ব্যবহারের ফলে সৃষ্ট ক্ষতি নিরূপণের স্বীকৃত পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে এবং তা এমন নথি ও তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি, যা আদালতে উপস্থাপন করা হবে। আমাদের দাবির ভিত্তির ওপর আমরা পূর্ণ আস্থাশীল এবং যথাযথ প্রক্রিয়ায় আদালত তা যাচাই করবেন।
এয়ারটেল ব্র্যান্ড চালু রাখার ফলে রবি একই সঙ্গে দুটি পৃথক ব্র্যান্ডের মাধ্যমে ভিন্ন ভিন্ন গ্রাহকগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে প্রতিযোগিতা করার সুযোগ পেয়েছে। একদিকে রবি মূলধারার বাজারে প্রতিযোগিতা করতে পেরেছে, অন্যদিকে এয়ারটেল ব্র্যান্ডের পরিচিতি কাজে লাগিয়ে নির্দিষ্ট গ্রাহকগোষ্ঠীর জন্য আকর্ষণীয় ও ভিন্নধর্মী অফার প্রদান এবং গ্রাহক আকর্ষণের সুযোগ পেয়েছে। ফলে একই অপারেটরের অধীনে দুটি ব্র্যান্ড ব্যবহারের মাধ্যমে তাদের অতিরিক্ত প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা তৈরি হয়েছে বলে বাংলালিংক মনে করে। এই সুবিধা বাংলালিঙ্ক পায়নি।
পাশাপাশি একীভূতকরণের শর্ত অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের পরও ০১৬ নম্বর সিরিজ ব্যবহারের ফলে রবি এয়ারটেলের বিদ্যমান গ্রাহক ও নম্বর পরিচিতি ধরে রাখার সুযোগ পেয়েছে। মার্জারের শর্ত অনুযায়ী ০১৬ নম্বর সিরিজ ব্যবহারের সুযোগ উন্মুক্ত হলে অন্যান্য অপারেটরেরও এয়ারটেলের বিদ্যমান গ্রাহকদের আকৃষ্ট করার প্রতিযোগিতামূলক সুযোগ তৈরি হতে পারত।
এসব বিষয় বাজারে প্রতিযোগিতার সমান সুযোগকে নেতিবাচাক প্রভাব ফেলেছে এবং এর ফলে বাংলালিংকের বাণিজ্যিক স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ প্রেক্ষাপটেই বাংলালিংক ক্ষতিপূরণ দাবি করে মামলা করেছে।
দেখা যাচ্ছে এয়ারটেল ব্র্যান্ডের ব্যবহার বন্ধ করা হলেও, ০১৬ সিরিজটি এখনো চালু রয়েছে। ২০১৬ সালের একীভূতকরণে নির্ধারিত শর্ত এবং সেগুলোর বাস্তব প্রয়োগই এখানে মূল বিবেচ্য। বাংলালিংক ইতোমধ্যে জানিয়েছে, রিব্র্যান্ডিংয়ের ফলে মূল উদ্বেগগুলোর সমাধান হয়েছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট তথ্য ও পরিস্থিতির আলোকে মূল্যায়ন করা হবে।
তাছাড়া, ২০১৬ সাল থেকে শুরু করে গত ১০ বছরে বাংলালিংক যে রেভিনিউ হারিয়েছে সেটার জন্য ক্ষতিপূরণ চেয়ে বাংলালিংকের মানি মামলা নিষ্পত্তি হওয়া বাঞ্ছনীয়। তাই সার্কেল চালুর সিদ্ধান্তকে চলমান বিরোধের চূড়ান্ত সমাধান হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
বাংলালিংক মামলায় ১ হাজার ৯২০ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণের পাশাপাশি মামলা দায়েরের তারিখ থেকে অর্থ পরিশোধ পর্যন্ত বার্ষিক ১৫ শতাংশ সুদ চেয়েছে। একই সঙ্গে মামলার খরচ ও অন্যান্য প্রতিকারও চাওয়া হয়েছে। ক্ষতিপূরণের দাবির সঙ্গে সুদের বিষয়টিও আদালতে নিষ্পত্তির জন্য উপস্থাপন করা হয়েছে। এ বিষয়ে আদালতে উপস্থাপিত যুক্তি ও প্রযোজ্য আইনি বিবেচনার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত হবে।
বাংলালিংক ২০২৫ সালের ৩০ অক্টোবর বিটিআরসির কাছে এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ জানায়। কার্যকর ব্যবস্থা না পাওয়ার পর ২০২৬ সালের ২৭ এপ্রিল হাইকোর্টে রিট করা হয়। আমাদের প্রত্যাশা, বিটিআরসি একীভূতকরণের শর্ত ও সংশ্লিষ্ট অনুমোদন যাচাই করে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে। বিশেষ করে, এয়ারটেল ব্র্যান্ড ও ০১৬ নম্বর সিরিজ ব্যবহারের ক্ষেত্রে কোনো বৈধ অনুমোদন ছিল কি না, তা স্পষ্ট করা জরুরি। সব অপারেটরের জন্য একই নিয়ম কার্যকর থাকলেই টেলিযোগাযোগ খাতে ন্যায্য প্রতিযোগিতার পরিবেশ বজায় থাকবে। রবি আজিয়াটাকে বারবার প্রশ্ন করা হলে দিব, দিচ্ছি বলে বারবার কালক্ষেপণ করেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গ্রামীণফোনের এক কর্মকর্তা শেয়ার বিজকে বলেন, ২০১৬ সালে রবি ও এয়ারটেলের একীভূতকরণের সময় নির্ধারিত শর্তগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা হয়েছে কি না, সেটি নিয়ন্ত্রক সংস্থার মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। তাদের পক্ষ থেকে বিটিআরসির কাছে বিষয়টি উত্থাপন করা হয়েছিল। এয়ারটেল থেকে সার্কেল নামে রিব্র্যান্ডিং করা হয়েছে—এটি একীভূতকরণের সময় নির্ধারিত শর্ত পূরণের ক্ষেত্রে যথেষ্ট কি না, সেটিও নিয়ন্ত্রক সংস্থার সিদ্ধান্তের বিষয়। প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে সব অপারেটরের জন্য সমান সুযোগ ও অভিন্ন নিয়ন্ত্রক কাঠামো নিশ্চিত হওয়া জরুরি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিটিআরসির একজন কর্মকর্তা শেয়ার বিজকে বলেন, রবি ও এয়ারটেলের একীভূতকরণের শর্ত, এয়ারটেল ব্র্যান্ডের ব্যবহার এবং ০১৬ নম্বর সিরিজ নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী অপারেটরদের কাছ থেকে অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিষয়গুলো কমিশনের সংশ্লিষ্ট বিভাগ পর্যালোচনা করছে। রবির কাছ থেকেও এ বিষয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। রিব্র্যান্ডিংয়ের মাধ্যমে আগের অভিযোগ বা একীভূতকরণের শর্তসংক্রান্ত কোনো দায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিষ্পত্তি হয়েছে কি না, সেটি সংশ্লিষ্ট নথি, অনুমোদন ও আইনগত কাঠামো পর্যালোচনা করেই নির্ধারণ করা হবে। কমিশনের প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে চূড়ান্ত মন্তব্য করা সমীচীন নয়।
এ বিষয়ে একজন টেলিযোগাযোগ আইন বিশেষজ্ঞ শেয়ার বিজকে বলেন, কোনো কোম্পানি একটি ব্র্যান্ড পরিবর্তন করে নতুন নামে সেবা চালু করলেই অতীতের কার্যক্রম-সংক্রান্ত আইনগত দায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে শেষ হয়ে যায় না। একীভূতকরণের সময় আদালত বা নিয়ন্ত্রক সংস্থা যে শর্ত আরোপ করেছিল, সেগুলোর প্রকৃতি ও পরিধিই এখানে মূল বিষয়। যদি অভিযোগটি অতীতে কোনো শর্ত লঙ্ঘন বা তার ফলে প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানের কথিত ক্ষতির সঙ্গে সম্পর্কিত হয়, তাহলে পরবর্তী সময়ে ব্র্যান্ড পরিবর্তন করলেও সেই অতীতের কর্মকাণ্ডের আইনগত পরিণতি আলাদাভাবে বিবেচিত হতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ আল-আমিন শেয়ার বিজকে বলেন, একীভূতকরণের সময় নির্ধারিত শর্ত, পরবর্তী সময়ে ব্র্যান্ড পরিবর্তন এবং প্রতিযোগিতামূলক বাজারে এর প্রভাব—এই তিনটি বিষয় আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। কোনো কোম্পানি ব্র্যান্ড পরিবর্তন করলেই অতীতে সংঘটিত হয়েছে বলে অভিযোগ করা কোনো অনিয়ম বা চুক্তিগত বিরোধ স্বয়ংক্রিয়ভাবে শেষ হয়ে যায় না। বিষয়টি নির্ভর করবে একীভূতকরণের শর্ত, নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর আইনি অধিকারের ওপর। একই সঙ্গে ১ হাজার ৯২০ কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ দাবির যৌক্তিকতা নির্ধারণে প্রকৃত আর্থিক ক্ষতি ও তার প্রমাণ গুরুত্বপূর্ণ।
একীভূতকরণের শর্ত লঙ্ঘনের অভিযোগের একটি অংশ অতীতের কর্মকাণ্ডকে কেন্দ্র করে। একইভাবে ১ হাজার ৯২০ কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ মামলাতেও দীর্ঘ সময় ধরে এয়ারটেল ব্র্যান্ড ও ০১৬ নম্বর সিরিজ ব্যবহারের কারণে কথিত আর্থিক ক্ষতির দাবি করা হয়েছে।
রবির জন্য এখন কয়েকটি প্রশ্ন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ২০১৬ সালের একীভূতকরণের শর্ত আদালত ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা কীভাবে ব্যাখ্যা করবে? একীভূত হওয়ার পর এয়ারটেল ব্র্যান্ড ব্যবহারের অনুমোদন কতটা ছিল? ০১৬ নম্বর সিরিজ ব্যবহারের ক্ষেত্রে পরবর্তী অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল কি না? দীর্ঘ সময় দুটি ব্র্যান্ড পরিচালনার ফলে প্রতিযোগিতায় কোনো আর্থিক সুবিধা তৈরি হয়েছিল কি না? এবং বাংলালিংকের দাবি করা ১ হাজার ৯২০ কোটি টাকার ক্ষতির সঙ্গে রবির কর্মকাণ্ডের সরাসরি সম্পর্ক আদালতে প্রমাণিত হবে কি না?
এসব প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট নথি, নিয়ন্ত্রক সংস্থার সিদ্ধান্ত এবং আদালতের পর্যবেক্ষণের ওপর।