সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১৭ কার্তিক ১৪৩৩

মাজহারুল ইসলাম কাঞ্চন, গাজীপুর

প্রকাশ: ১০:০০, ২ নভেম্বর ২০২৬

ন্যূনতম মাসিক ৩০ হাজার টাকা মজুরির দাবি

গাজীপুরে সহিংসতা, পুলিশ বক্সে আগুন

গাজীপুরে সহিংসতা, পুলিশ বক্সে আগুন

ছবি সংগৃহীত

ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলন সহিংস রূপ নিয়েছে। গতকাল রোববার সকাল থেকে কালিয়াকৈর, কোনাবাড়ী ও আশপাশের এলাকায় মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন শ্রমিকরা। একপর্যায়ে কোনাবাড়ীতে ট্রাফিক পুলিশ বক্সে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। পুলিশের একটি মোটরসাইকেলেও আগুন দেওয়া হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষ ও ধাওয়া পাল্টা-ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শিল্পাঞ্চলে পাঁচ প্লাটুন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মোতায়েন করা হয়েছে। শ্রমিকদের আন্দোলনের মধ্যেই নতুন মজুরি কাঠামো নির্ধারণে ছয় সদস্যের মজুরি বোর্ড গঠন করেছে সরকার। রোববার শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এ বোর্ড গঠন করে। শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জানিয়েছেন, একই দিন এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন বা গেজেট প্রকাশ করা হবে। একদিকে শ্রমিকদের ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবি, অন্যদিকে শিল্পাঞ্চলে সহিংসতা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় দেশের পোশাকশিল্পের স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে শ্রমিকদের ন্যায্য দাবির সমাধানের পাশাপাশি সহিংসতার নেপথ্যে কোনো স্বার্থান্বেষী মহলের উসকানি বা পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র রয়েছে কি না, তা নিরপেক্ষভাবে তদন্তের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

রোববার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে কালিয়াকৈর উপজেলার সফিপুর, মৌচাক, চন্দ্রা পল্লী বিদ্যুৎ ও আশপাশের এলাকার বিভিন্ন পোশাক কারখানার শ্রমিকরা সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। পরে অন্যান্য কারখানার শ্রমিকরাও তাদের সঙ্গে যোগ দেন। এতে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। সৃষ্টি হয় দীর্ঘ যানজট। সকাল ১০টার দিকে কোনাবাড়ী এলাকায় আন্দোলন আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা কোনাবাড়ী ট্রাফিক পুলিশ বক্সে ভাঙচুর চালিয়ে আগুন ধরিয়ে দেন। এ সময় পুলিশের একটি মোটরসাইকেলেও আগুন দেওয়া হয়। মহাসড়কে চলাচলকারী কয়েকটি যানবাহন ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ও শিল্প পুলিশের সদস্যরা ঘটনাস্থলে গেলে শ্রমিকদের সঙ্গে সংঘর্ষ শুরু হয়। পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। একপর্যায়ে দুই পক্ষের মধ্যে দফায় দফায় ধাওয়া পাল্টা-ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এতে কয়েকজন শ্রমিক ও পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। শ্রমিক অসন্তোষের কারণে কোনাবাড়ী, কাশিমপুর ও কালিয়াকৈর শিল্পাঞ্চলের অন্তত ৮ থেকে ১০টি পোশাক কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে বলে শিল্প পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।

শিল্পাঞ্চলে নিরাপত্তা জোরদার করতে পাঁচ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। চন্দ্রা, সফিপুর, মৌচাক, কোনাবাড়ী ও ভোগড়া বাইপাসসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় বিজিবি সদস্যরা অবস্থান নিয়েছেন। গাজীপুর শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার জানিয়েছেন, আপাতত পাঁচ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন থাকবে। প্রয়োজনে বিজিবির সদস্যসংখ্যা বাড়ানো হতে পারে।

শ্রমিকদের আন্দোলনের মধ্যে রোববার ছয় সদস্যের নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করেছে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। পোশাকশ্রমিকদের জন্য নতুন মজুরি কাঠামো নির্ধারণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এই বোর্ডকে। শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জানিয়েছেন, রোববারই এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন বা গেজেট প্রকাশ করা হবে। মজুরি বোর্ড গঠন নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় শ্রমমন্ত্রী বলেন, ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা শ্রমিকদের ব্যবহার করে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে চাইছেন। মজুরি বোর্ডকে কেন্দ্র করে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা চলছে। তবে এ ধরনের পরিস্থিতি হতে দেওয়া হবে না। শ্রমিকদের উদ্দেশে মন্ত্রী বলেন, মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়েছে। এখন অরাজকতা বন্ধ হবে এবং শ্রমিকরা কারখানায় ফিরে যাবেন বলে তিনি আশা করছেন।

তবে মজুরি বোর্ড গঠনকে শ্রমিকদের দাবির সমাধানের একটি প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ হিসেবে দেখা হলেও এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে বোর্ডের সুপারিশ, শ্রমিক-মালিকপক্ষের মতামত এবং সরকারের পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপর। নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপে শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবি কতটা বাস্তবসম্মতভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে শ্রমিকদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের অধিকার অক্ষুণ্ন রেখে সহিংসতা, অগ্নিসংযোগ ও সরকারি সম্পদ ধ্বংসের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন।

এর আগে শনিবার রাতেও কালিয়াকৈরের চন্দ্রা পল্লী বিদ্যুৎ ও আনসার একাডেমির ৩ নম্বর ফটক এলাকায় মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন শ্রমিকরা। প্রায় ৫ ঘণ্টা পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও রোববার সকালে নতুন করে আন্দোলন শুরু হয়। দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য পোশাকশিল্প অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এমন পরিস্থিতিতে শ্রমিকদের অসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে কোনো স্বার্থান্বেষী মহল শিল্পাঞ্চলে অরাজকতা সৃষ্টি, সরকারকে বিব্রত কিংবা দেশের অর্থনৈতিক পরিবেশ অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। তবে তদন্তের আগে কোনো পক্ষকে দায়ী না করে সহিংসতার প্রকৃত কারণ ও নেপথ্যের ব্যক্তিদের শনাক্ত করাই হবে দায়িত্বশীল পদক্ষেপ।

গাজীপুর দেশের অন্যতম প্রধান পোশাকশিল্পাঞ্চল। এখানকার কারখানাগুলোয় উৎপাদন ব্যাহত হলে তার প্রভাব পড়ে জাতীয় রপ্তানি আয়, কর্মসংস্থান ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে। ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে যান চলাচল এবং পণ্য পরিবহনও বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরির দাবি বাস্তবায়নে কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়ার পাশাপাশি শিল্পাঞ্চলে শান্তি, নিরাপত্তা ও উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা এখন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।