সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১৭ কার্তিক ১৪৩৩

মাজহারুল ইসলাম কাঞ্চন, গাজীপুর 

প্রকাশ: ২৩:৪৫, ২ নভেম্বর ২০২৬

মজুরি বোর্ডের পরও সহিংসতা পুলিশের গাড়িতে আগুন

মজুরি বোর্ডের পরও সহিংসতা পুলিশের গাড়িতে আগুন

ছবি সংগৃহীত

ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন দ্বিতীয় দিনেও সহিংসতায় রূপ নিয়েছে। গত রোববারের পর আজ সোমবারও ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে অবরোধ, বিক্ষোভ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। নাওজোর এলাকায় পুলিশের একাধিক গাড়িতে আগুন ও ভাঙচুর করা হয়েছে। আন্দোলনের খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে তিনজন সাংবাদিক হামলার শিকার হয়েছেন। পাথরের আঘাতে আহত হয়েছেন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) এক সদস্য। জানা গেছে, দুদিনে এ আন্দোলনে ২৮ জন পুলিশ সদস্যসহ আরো বেশ কয়েক জন আহত হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শিল্পাঞ্চলে ১০ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েনের পাশাপাশি ২১ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করছেন। আন্দোলনের কারণে দেড় শতাধিক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে শিল্পপুলিশ। শিল্পপুলিশ সূত্রে আরও জানা গেছে, সকাল থেকে সহিংসতা পরিস্থিতি উত্তপ্ত থাকলেও বিজিবি পুলিশের তৎপরতায় বিকালে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়েছে।  
এদিকে শিল্পাঞ্চলে অস্থিরতা ও সহিংসতার মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত শিল্পকারখানার পরিস্থিতি পরিদর্শন করেছেন গাজীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য এম মঞ্জুরুল করিম রনি এবং গাজীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. মজিবুর রহমান। তারা শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলেন এবং শ্রমিকনেতাদের সঙ্গে আলোচনা করেন। আলোচনার মাধ্যমে শ্রমিকদের দাবি ও চলমান পরিস্থিতির সমাধানের চেষ্টা করছেন বলে জানা গেছে। এ সময় তারা বলেন, শ্রমিকদের আন্দোলনকে পুঁজি করে দেশকে অস্থিতিশীল করার অপচেষ্টা, নিষিদ্ধ সংগঠনের তৎপরতা, সহিংসতা ও ষড়যন্ত্র কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না। শ্রমিকদের ন্যায্য দাবির প্রতি তাদের সমর্থন রয়েছে। তবে আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে কেউ ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ কিংবা শিল্পাঞ্চলে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টা করলে তা কঠোরভাবে মোকাবিলা করা হবে। শ্রমিক ও শ্রমিকনেতাদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে সমস্যার সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও তারা জানান।
শ্রমিকদের ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবির মধ্যে গতকাল ছয় সদস্যের একটি মজুরি বোর্ড গঠন করে সরকার। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনও জারি করে। তবে বোর্ড গঠনের পরও শ্রমিকদের আন্দোলন থামেনি। গতকাল সকাল সাড়ে ৭টা থেকে কালিয়াকৈরের মৌচাক, সফিপুর ও পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় শ্রমিকেরা মহাসড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। এতে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে যান চলাচল ব্যাহত হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। বিভিন্ন স্থানে শ্রমিকদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনাও ঘটে।
দুপুরের দিকে নাওজোর এলাকায় পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সেখানে পুলিশের একাধিক গাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এ সময় পাথরের আঘাতে বিজিবির এক সদস্য আহত হন। আন্দোলনের খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে সময় টেলিভিশনের একজন প্রতিবেদক ও ক্যামেরাপারসন হামলার শিকার হন। তাদের ক্যামেরাও ভাঙচুর করা হয়েছে বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবরে জানা গেছে।
শিল্পপুলিশ সূত্রে জানা গেছে, আন্দোলন ও নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে গাজীপুরের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে দেড় শতাধিক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। এতে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক কর্মস্থলে যেতে পারেননি। কারখানার উৎপাদন বন্ধ থাকায় তৈরি পোশাকশিল্পের স্বাভাবিক কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে।
এর আগে গতকাল সকাল থেকেই কালিয়াকৈর, কোনাবাড়ী, কাশিমপুর ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকেরা ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবিতে বিক্ষোভ শুরু করেন। সকাল সাড়ে ৮টায় কালিয়াকৈরের সফিপুর, মৌচাক ও চন্দ্রা পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় শ্রমিকেরা সড়কে অবস্থান নেন। পরে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে অন্যান্য শিল্পাঞ্চলেও। সকাল ১০টায় কোনাবাড়ী এলাকায় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সেখানে ট্রাফিক পুলিশের একটি বক্স ভাঙচুর করে আগুন দেওয়া হয়। পুলিশের একটি মোটরসাইকেলেও আগুন দেওয়া হয়। এ ছাড়া কয়েকটি যানবাহন ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। এ সময় শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের পাল্টাপাল্টি ধাওয়া হয়। সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। নিরাপত্তার কারণে কোনাবাড়ী, কাশিমপুর ও কালিয়াকৈরের কয়েকটি কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়। ওই দিন শিল্পাঞ্চলে প্রথমে বিজিবির পাঁচ প্লাটুন সদস্য মোতায়েন করা হয়েছিল।
শ্রমিকদের আন্দোলনের মুখে গতকালই ছয় সদস্যের মজুরি বোর্ড গঠন করে সরকার। বোর্ডের চেয়ারম্যান করা হয়েছে জ্যেষ্ঠ জেলা ও দায়রা জজ শেখ আশফাকুর রহমানকে। এতে মালিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে রয়েছেন বিজিএমইএর পরিচালক এবিএম শামসুদ্দিন। শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে রয়েছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক বাবুল আখতার। বোর্ডকে দ্রুত কাজ শুরু করার কথা বলা হয়েছে।
মজুরি বোর্ড গঠনের পর শ্রমিকদের কাজে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। তিনি বলেছেন, শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণের বিষয়টি বিবেচনায় নিতে বোর্ড গঠন করা হয়েছে। তাই শ্রমিকদের কর্মস্থলে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে আন্দোলনকে কেন্দ্র করে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ করেছেন মন্ত্রী। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে তথ্য-প্রমাণ যাচাই করা প্রয়োজন।
এদিকে শ্রমিকদের একটি অংশের দাবি, তারা ন্যায্য মজুরির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করছেন। তাদের আন্দোলনের মধ্যে বহিরাগতরা ঢুকে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটাচ্ছে। অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে আন্দোলনকে কেন্দ্র করে নাশকতা ও উসকানির অভিযোগ তোলা হয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি। কারণ শ্রমিকদের ন্যায্য দাবির সঙ্গে সহিংসতা ও নাশকতাকে এক করে দেখার সুযোগ নেই। একইভাবে আন্দোলনের আড়ালে কেউ সহিংসতা ঘটালে তার দায়ও নির্ধারণ করতে হবে।
শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবি দীর্ঘদিনের। বর্তমান বাজারদর, বাসাভাড়া, খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে পোশাকশ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। ফলে তাদের মজুরি পুনর্নির্ধারণের দাবি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। তবে দাবি আদায়ের আন্দোলনে সহিংসতা, অগ্নিসংযোগ, যানবাহন ভাঙচুর কিংবা সাংবাদিকদের ওপর হামলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এতে শ্রমিকদের দাবির যৌক্তিকতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষ, শিল্পকারখানা ও অর্থনীতিও ক্ষতির মুখে পড়ছে।
বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাকশিল্প। এ খাতে প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক কাজ করেন এবং দেশের মোট রপ্তানি আয়ের বড় অংশ আসে এ শিল্প থেকে। ফলে গাজীপুরের মতো গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা তৈরি হলে তার প্রভাব শুধু শ্রমিক ও কারখানার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; রপ্তানি, কর্মসংস্থান ও সামগ্রিক অর্থনীতিতেও পড়তে পারে।
এ অবস্থায় শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরির দাবি দ্রুত নিষ্পত্তিতে মজুরি বোর্ডের কার্যকর উদ্যোগ, মালিকপক্ষের দায়িত্বশীল ভূমিকা এবং সরকারের সমন্বিত পদক্ষেপ জরুরি। একই সঙ্গে শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, কারখানার উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা এবং সহিংসতার ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। শ্রমিকদের অধিকার রক্ষা এবং শিল্পাঞ্চলে শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখা—দুটিই এখন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।