ফার্মা এইডসের লভ্যাংশ বেড়ে ৩৫ শতাংশ
ছবি সংগৃহীত
পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ওষুধ ও রসায়ন খাতের কোম্পানি ফার্মা এইডস লিমিটেড ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ব্যবসায় শেয়ারহোল্ডারদের জন্য ৩৫ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। আগের অর্থবছরে কোম্পানিটি ৩০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দিয়েছিল। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে কোম্পানিটির লভ্যাংশের হার বেড়েছে পাঁচ শতাংশীয় পয়েন্ট। একই সময়ে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি মুনাফা (ইপিএস) এবং শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্যেও (এনএভিপিএস) উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি দেখা গেছে। ফলে মুনাফা ও সম্পদমূল্যের উন্নতির পাশাপাশি শেয়ারহোল্ডারদের জন্য লভ্যাংশ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত কোম্পানিটির আর্থিক ফলাফলকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। কোম্পানিটির পরিচালনা পর্ষদ ২০২৫-২৬ অর্থবছরের আর্থিক ফলাফল পর্যালোচনা করে ৩৫ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দেওয়ার সুপারিশ করেছে। আগের অর্থবছরে ৩০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দেওয়ায় এবার শেয়ারহোল্ডারদের জন্য লভ্যাংশের হার বেড়েছে। অর্থাৎ কোম্পানিটির ঘোষিত লভ্যাংশে পাঁচ শতাংশীয় পয়েন্ট প্রবৃদ্ধি হয়েছে। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোনো কোম্পানির লভ্যাংশ বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত বিনিয়োগকারীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয়। কারণ এর মাধ্যমে কোম্পানির মুনাফা বণ্টনের সিদ্ধান্ত এবং শেয়ারহোল্ডারদের প্রতি আর্থিক প্রতিশ্রুতির বিষয়টি প্রতিফলিত হয়।
সমাপ্ত অর্থবছরে ফার্মা এইডসের শেয়ারপ্রতি মুনাফা হয়েছে ২৮ টাকা ৫ পয়সা। আগের অর্থবছরে কোম্পানিটির ইপিএস ছিল ২০ টাকা ৪৫ পয়সা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে শেয়ারপ্রতি মুনাফা বেড়েছে ৭ টাকা ৬০ পয়সা। শতকরা হিসাবে এ প্রবৃদ্ধি প্রায় ৩৭ দশমিক ১৬ শতাংশ। কোম্পানিটির মুনাফার এই বৃদ্ধি এবং একই সময়ে নগদ লভ্যাংশ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে।
শেয়ারপ্রতি মুনাফা বা ইপিএস কোনো কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতা মূল্যায়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক। নির্দিষ্ট সময়ে কোম্পানির অর্জিত মুনাফা সাধারণ শেয়ারের বিপরীতে কতটুকু দাঁড়িয়েছে, তা ইপিএসের মাধ্যমে বোঝা যায়। এ কারণে বিনিয়োগকারীরা কোম্পানির বর্তমান আয় এবং আগের বছরের তুলনায় আয় কতটা বেড়েছে বা কমেছে, তা বিশ্লেষণে ইপিএসকে গুরুত্ব দেন। ফার্মা এইডসের ক্ষেত্রে ২০ টাকা ৪৫ পয়সা থেকে ২৮ টাকা ৫ পয়সায় উন্নীত হওয়া শেয়ারপ্রতি মুনাফা কোম্পানিটির আয় বৃদ্ধির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
তবে ইপিএস বৃদ্ধি পেলেই কোম্পানির সামগ্রিক আর্থিক অবস্থার পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যায় না। মুনাফা বৃদ্ধির পেছনে বিক্রির পরিমাণ, পণ্যের চাহিদা, উৎপাদন ব্যয়, পরিচালন ব্যয়, আর্থিক ব্যয় এবং অন্যান্য আয়-ব্যয়ের ভূমিকা থাকে। এসব উপাদানের পরিবর্তন বিশ্লেষণ করলে কোম্পানির মুনাফা বৃদ্ধির প্রকৃত কারণ সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া সম্ভব। সেজন্য শুধু ইপিএসের অঙ্ক নয়, কোম্পানির পূর্ণাঙ্গ আর্থিক প্রতিবেদনও বিনিয়োগকারীদের পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
ফার্মা এইডসের শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্যেও উন্নতি হয়েছে। গত ৩০ জুন শেষে কোম্পানিটির এনএভিপিএস দাঁড়িয়েছে ১৬৩ টাকা ৩১ পয়সা। আগের অর্থবছরে একই সময়ে এ পরিমাণ ছিল ১৩৮ টাকা ৫৮ পয়সা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য বেড়েছে ২৪ টাকা ৭৩ পয়সা। শতকরা হিসাবে এ বৃদ্ধি প্রায় ১৭ দশমিক ৮৫ শতাংশ। ইপিএসের পাশাপাশি এনএভিপিএস বৃদ্ধিও কোম্পানিটির আর্থিক অবস্থার মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হিসেবে বিবেচিত হবে।
শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য বা এনএভিপিএসের মাধ্যমে কোম্পানির মোট সম্পদ থেকে মোট দায় বাদ দেওয়ার পর প্রতিটি শেয়ারের বিপরীতে নিট সম্পদের পরিমাণ বোঝা যায়। এটি কোম্পানির সম্পদভিত্তিক আর্থিক অবস্থার একটি সূচক। ফার্মা এইডসের এনএভিপিএস ১৩৮ টাকা ৫৮ পয়সা থেকে বেড়ে ১৬৩ টাকা ৩১ পয়সায় পৌঁছানোয় কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্যে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেছে। তবে সম্পদের পরিমাণ বৃদ্ধির পাশাপাশি সম্পদের গুণগত মান, দায়ের ধরন এবং ভবিষ্যতে এসব সম্পদ থেকে আয় তৈরির সক্ষমতাও বিবেচনায় রাখা জরুরি।
কোম্পানিটির আর্থিক ফলাফলের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো মুনাফা বৃদ্ধির সঙ্গে নগদ লভ্যাংশের হারও বাড়ানো। আগের অর্থবছরে ৩০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশের বিপরীতে এবার ৩৫ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করা হয়েছে। অর্থাৎ কোম্পানিটি শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে মুনাফা বিতরণের হার বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিনিয়োগকারীদের কাছে নগদ লভ্যাংশের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। কারণ নগদ লভ্যাংশের অর্থ সরাসরি শেয়ারহোল্ডারদের প্রাপ্য হিসেবে নির্ধারিত হয় এবং নিয়ম অনুযায়ী তা বিতরণ করা হয়।
নগদ লভ্যাংশের ক্ষেত্রে ঘোষিত শতাংশের ভিত্তি বোঝাও গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত কোম্পানিগুলো শেয়ারের অভিহিত মূল্যের ওপর ভিত্তি করে লভ্যাংশের হার ঘোষণা করে। ফলে ৩৫ শতাংশ নগদ লভ্যাংশের অর্থ হলো, নির্ধারিত অভিহিত মূল্যের ভিত্তিতে শেয়ারপ্রতি লভ্যাংশ হিসাব করা হবে। কোন বিনিয়োগকারী মোট কত টাকা পাবেন, তা নির্ভর করবে তাঁর কাছে থাকা শেয়ারের সংখ্যা এবং প্রযোজ্য কর ও অন্যান্য বিধিবিধানের ওপর। তাই শুধু লভ্যাংশের হার দেখে ব্যক্তিগতভাবে প্রাপ্ত অর্থের পরিমাণ নির্ধারণ করা যায় না।
পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীরা সাধারণত কোম্পানির লভ্যাংশের ধারাবাহিকতা, মুনাফার প্রবৃদ্ধি, সম্পদমূল্য এবং ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক সম্ভাবনা বিবেচনা করে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেন। ফার্মা এইডসের ক্ষেত্রে এক বছরে ইপিএস প্রায় ৩৭ দশমিক ১৬ শতাংশ বৃদ্ধি এবং এনএভিপিএস প্রায় ১৭ দশমিক ৮৫ শতাংশ বৃদ্ধির তথ্য কোম্পানিটির আর্থিক ফলাফল মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে নগদ লভ্যাংশ ৩০ শতাংশ থেকে ৩৫ শতাংশে উন্নীত হওয়ায় শেয়ারহোল্ডারদের জন্য ঘোষণাটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়েছে।
তবে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে একটি অর্থবছরের ফলাফলের ওপর পুরোপুরি নির্ভর করা সমীচীন নয়। কোম্পানিটির কয়েক বছরের আয় ও লভ্যাংশের ধারাবাহিকতা, বিক্রির প্রবৃদ্ধি, পরিচালন মুনাফা, নগদ প্রবাহ এবং ঋণ পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। বিশেষ করে নগদ লভ্যাংশ ঘোষণার ক্ষেত্রে কোম্পানির প্রকৃত নগদ অর্থের প্রবাহ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ হিসাবের খাতায়মুনাফা দেখালেই সব সময় সমপরিমাণ নগদ অর্থ হাতে থাকে না। ব্যবসায়িক কার্যক্রম থেকে পর্যাপ্ত নগদ অর্থ তৈরি হচ্ছে কি না, সেটিও লভ্যাংশ বিতরণের সক্ষমতা বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
ফার্মা এইডস ওষুধ ও রসায়ন খাতের কোম্পানি হওয়ায় এ খাতের সামগ্রিক ব্যবসায়িক পরিবেশও বিনিয়োগকারীদের বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। ওষুধশিল্পের কোম্পানিগুলোর ব্যবসা কাঁচামালের প্রাপ্যতা, আমদানি ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার, উৎপাদন সক্ষমতা, বাজারের চাহিদা এবং নিয়ন্ত্রক কাঠামোর সঙ্গে সম্পর্কিত। এসব ক্ষেত্রে পরিবর্তন হলে কোম্পানির উৎপাদন ব্যয় ও মুনাফায় প্রভাব পড়তে পারে। ফলে বর্তমান অর্থবছরের ভালো আর্থিক ফলাফলের পাশাপাশি ভবিষ্যতে এ প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ।
কোম্পানিটির ঘোষিত ৩৫ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ অনুমোদনের জন্য আগামী ১৫ ডিসেম্বর বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) অনুষ্ঠিত হবে। সভায় সমাপ্ত অর্থবছরের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন, ঘোষিত লভ্যাংশ এবং অন্যান্য আলোচ্য বিষয় শেয়ারহোল্ডারদের সামনে উপস্থাপন করা হবে। পরিচালনা পর্ষদের সুপারিশ করা লভ্যাংশ শেয়ারহোল্ডারদের অনুমোদন পেলে পরবর্তী নিয়ম অনুসারে তা বিতরণের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।
এজন্য আগামী ২৫ নভেম্বর রেকর্ড ডেট নির্ধারণ করেছে কোম্পানিটি। রেকর্ড ডেট হলো নির্ধারিত এমন একটি দিন, যেদিন কোম্পানির শেয়ারহোল্ডার তালিকায় থাকা বিনিয়োগকারীরা ঘোষিত লভ্যাংশ পাওয়ার যোগ্য হিসেবে বিবেচিত হন। অর্থাৎ সংশ্লিষ্ট বিধি ও লেনদেন নিষ্পত্তির নিয়ম অনুযায়ী রেকর্ড ডেটে যাদের নামে কোম্পানির শেয়ার থাকবে, তারাই লভ্যাংশ পাওয়ার জন্য বিবেচিত হবেন। এ কারণে কোম্পানিটির শেয়ারহোল্ডারদের জন্য ২৫ নভেম্বর তারিখটি গুরুত্বপূর্ণ।
রেকর্ড ডেটের আগে ও পরে শেয়ারের দামে পরিবর্তন আসতে পারে। তবে লভ্যাংশ ঘোষণার কারণে শেয়ারের দাম বাড়বে বা কমবে—এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। বাজারে শেয়ারের চাহিদা ও সরবরাহ, কোম্পানির আর্থিক ফলাফল, সামগ্রিক পুঁজিবাজার পরিস্থিতি এবং বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশাসহ বিভিন্ন বিষয় দামের ওপর প্রভাব ফেলে। তাই শুধু লভ্যাংশ পাওয়ার প্রত্যাশায় বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত না নিয়ে কোম্পানির মৌলভিত্তি ও বাজার পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে ফার্মা এইডসের আর্থিক ফলাফলে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেছে। কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি মুনাফা ২০ টাকা ৪৫ পয়সা থেকে বেড়ে ২৮ টাকা ৫ পয়সা হয়েছে। একই সময়ে শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য ১৩৮ টাকা ৫৮ পয়সা থেকে বেড়ে ১৬৩ টাকা ৩১ পয়সায় দাঁড়িয়েছে। এর পাশাপাশি নগদ লভ্যাংশের হার আগের অর্থবছরের ৩০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩৫ শতাংশ করা হয়েছে। এখন শেয়ারহোল্ডারদের অনুমোদন এবং পরবর্তী লভ্যাংশ বিতরণ প্রক্রিয়ার দিকে নজর থাকবে বিনিয়োগকারীদের। আগামী ২৫ নভেম্বর রেকর্ড ডেট এবং ১৫ ডিসেম্বর এজিএমকে সামনে রেখে কোম্পানিটির শেয়ারহোল্ডারদের জন্য পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ ধাপ শুরু হচ্ছে।