বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ১৯ কার্তিক ১৪৩৩

​​​​​​​ইমতিয়াজ আহমেদ, নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশ: ২২:৪৮, ৪ নভেম্বর ২০২৬

না.গঞ্জে শ্রমিক অসন্তোষের নেপথ্যে কারা

না.গঞ্জে শ্রমিক অসন্তোষের নেপথ্যে কারা

ছবি সংগৃহীত

৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরি। দাবিটি শ্রমিকদের। রাজপথও তাদের দখলে। কিন্তু আন্দোলন যত এগোচ্ছে, ততই সামনে আসছে নতুন নতুন প্রশ্ন। শ্রমিকদের ক্ষোভের সঙ্গে কারা যুক্ত হচ্ছেন? কারা তাদের সংগঠিত করছেন? আন্দোলনের আড়ালে কেউ কি নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছেন, নাকি দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে না পারার ক্ষোভই শ্রমিকদের রাজপথে নামিয়েছে?

নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা শিল্পাঞ্চলে টানা তিন দিনের শ্রমিক বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, টিয়ার গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপের ঘটনায় এসব প্রশ্ন সামনে এসেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পিকআপে লাঠিসোঁটাসহ একদল যুবকের চলাচলের ভিডিও এবং আন্দোলনস্থলে বহিরাগতদের উপস্থিতির অভিযোগ। স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের মাঠে নামার ঘটনাও পরিস্থিতিকে রাজনৈতিক আলোচনায় নিয়ে এসেছে।

তবে একটি বিষয় পরিষ্কার—শ্রমিকদের মজুরির দাবি বাস্তব। সেই দাবিকে কেন্দ  করে সংঘটিত প্রতিটি সহিংসতার দায় শ্রমিকদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ারও সুযোগ নেই। আবার শ্রমিকদের আন্দোলনের আড়ালে কেউ সহিংসতা বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের চেষ্টা করলে সেটিও তদন্তের বাইরে থাকতে পারে না।

তিন দিনে পরিস্থিতির অবনতি: গত সোমবার ২ নভেম্বর বেলা সাড়ে ১১টায় ফতুল্লার কুতুবাইল কাঠেরপুল এলাকায় কয়েকটি পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা জড়ো হতে শুরু করেন। পরে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সংযোগ সড়কের শিবু মার্কেট এলাকায় অবস্থান নিয়ে অবরোধ করেন তারা। মেট্রো নিটিং, পামলম গার্মেন্টস, আবির ফ্যাশন ও আজাদ-রিফাত ডাইংসহ কয়েকটি কারখানার শ্রমিকেরা এতে অংশ নেন। প্রায় চার থেকে সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা পর্যন্ত যান চলাচল ব্যাহত হয় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

মঙ্গলবার একই দাবিতে আবারও রাস্তায় নামেন শ্রমিকেরা। বিকালে জালকুড়ি এলাকায় পুলিশের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ হয়। ইটপাটকেল নিক্ষেপ, লাঠিচার্জ ও টিয়ার গ্যাসের ঘটনা ঘটে। যুগান্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শ্রমিক, পুলিশ ও সাংবাদিকসহ অন্তত ২৫ জন আহত হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পাঁচ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েনের কথাও জানায় জেলা প্রশাসন।

বুধবার সকাল ১০টায় কুতুবাইল কাঠেরপুল এলাকায় ফের শ্রমিকেরা জড়ো হন। একপর্যায়ে মূল সড়কে ওঠার চেষ্টা করলে পুলিশ টিয়ার গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। কয়েকজনকে আটক করা হয়। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তারেক আল মেহেদী বলেন, মজুরি বোর্ড গঠন হয়েছে এবং সিদ্ধান্ত আসবে জানিয়ে শ্রমিকদের নিবৃত্ত করার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু তারা না শোনায় ছত্রভঙ্গ করা হয়। কোনোভাবেই সড়ক দখল করে জনভোগান্তি তৈরি করতে দেওয়া হবে না বলেও জানান তিনি।

পিকআপে লাঠিসোঁটাসহ যুবক, কারা তারা: আন্দোলনের নেপথ্য নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা তৈরি হয়েছে একটি পিকআপের ভিডিও ঘিরে। নারায়ণগঞ্জ পোস্টের ৪ নভেম্বরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে পিকআপে লাঠিসোঁটা হাতে একদল যুবককে আন্দোলনস্থলের দিকে যেতে দেখা যায়। ভিডিও ধারণকারী এক যুবকের গলায় ইউরোটেক্স নিটওয়্যারের পরিচয়পত্রও দেখা গেছে।

কিন্তু পিকআপে থাকা সবাই কি ওই কারখানার শ্রমিক? তারা কোথা থেকে এসেছিলেন? কার নির্দেশে সেখানে গিয়েছিলেন? লাঠিসোঁটা বহনের উদ্দেশ্য কী ছিল? এসব প্রশ্নের নির্ভরযোগ্য উত্তর এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।

একই প্রতিবেদনে মঙ্গলবার সংঘর্ষের সময় মাইকে ঘোষণা, হুমকি এবং শ্রমিকদের জড়ো করার অভিযোগের কথাও উঠে এসেছে। তবে ভিডিওতে থাকা ব্যক্তিদের পরিচয়, তাদের সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সম্পর্ক কিংবা সহিংসতায় তাদের ভূমিকা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত কাউকে দায়ী করা যাবে না।

এখানেই প্রশাসনের জন্য বড় কাজ। ভিডিওর উৎস, সময়, স্থান, পিকআপের নম্বর এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয় শনাক্ত করা। কারখানার হাজিরা ও পরিচয়পত্রের তথ্যের সঙ্গে ভিডিও মিলিয়ে দেখা গেলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।

মাঠে বিএনপি, অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ: আন্দোলন ঘিরে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের উপস্থিতিতে। নারায়ণগঞ্জ পোস্টের আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কারখানা, যানবাহন ও রাষ্ট্রীয় সম্পদের ক্ষতি ঠেকাতে বিএনপির নেতাকর্মীরা সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। আন্দোলনের আড়ালে কেউ অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করছে বলে দলটির স্থানীয় নেতারা অভিযোগ করেছেন।

অন্যদিকে বুধবারের সংঘর্ষের প্রত্যক্ষদর্শী এক ওষুধের দোকানি জানিয়েছেন, শ্রমিকেরা জড়ো হওয়ার পর স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে তাদের প্রথমে বািবতণ্ডা হয়। পরে পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। একপর্যায়ে শ্রমিক ও পুলিশের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া শুরু হয়।

মেট্রো নিটিংয়ের এক শ্রমিকের অভিযোগ, তারা শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করছিলেন। এ সময় বিএনপির নেতারা এসে শ্রমিকদের মারধর করেন।

দুটি বক্তব্যই তদন্তের দাবি রাখে। বিএনপি নেতাদের মাঠে থাকার কারণ কী, কারা তাদের সেখানে যেতে বলেছেন এবং শ্রমিকদের সঙ্গে সংঘর্ষে কোনো নেতাকর্মী জড়িত ছিলেন কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন। একইভাবে শ্রমিকদের আন্দোলনে বহিরাগত অনুপ্রবেশের অভিযোগেরও প্রমাণ প্রয়োজন। রাজনৈতিক দলের অভিযোগ কিংবা শ্রমিকদের বক্তব্য—কোনোটিকেই তদন্তের বিকল্প হিসেবে দেখা যায় না।

৩০ হাজার টাকা কেন চাইছেন শ্রমিকেরা: রাজনৈতিক আলোচনার ভিড়ে শ্রমিকদের মূল দাবিটি যেন আড়ালে চলে যাচ্ছে। বর্তমানে পোশাকশিল্পের সর্বনিম্ন মাসিক মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা। শ্রমিকেরা সেটি বাড়িয়ে ৩০ হাজার টাকা করার দাবি জানাচ্ছেন। অর্থাৎ বর্তমান মজুরির তুলনায় প্রায় ১৪০ শতাংশ বৃদ্ধির দাবি।

শ্রমিকদের বক্তব্য, বাড়িভাড়া, খাবার, চিকিৎসা, যাতায়াত ও সন্তানদের শিক্ষার খরচ মেটাতে বর্তমান মজুরি যথেষ্ট নয়। একজন শ্রমিকের হাতে মাস শেষে কত টাকা থাকে, সেটি বিবেচনা না করে শুধু উৎপাদন ও রপ্তানির হিসাব দিয়ে শিল্পের সাফল্য বিচার করা যায় না।

তাদের পাঁচ দফা দাবির মধ্যে রয়েছে—ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ, সব কারখানায় রেশনিং ব্যবস্থা চালু, ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার নিশ্চিত, শ্রমিক হত্যার বিচার এবং বেআইনি ছাঁটাই বন্ধসহ শ্রম আইন বাস্তবায়ন।

মজুরি নির্ধারণে নতুন বোর্ড গঠন হলেও শ্রমিকদের মধ্যে অনিশ্চয়তা রয়েছে। তাদের আশঙ্কা, আলোচনার নামে শেষ পর্যন্ত সামান্য মজুরি বাড়িয়ে বিষয়টি নিষ্পত্তির চেষ্টা হতে পারে। ফলে বোর্ড গঠনের ঘোষণাও আন্দোলন থামাতে পারেনি।

শিল্পের সংকটও উপেক্ষা করার নয়: অন্যদিকে মালিকপক্ষও চাপের বাইরে নেই। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা এবং ক্রয়াদেশের অনিশ্চয়তা পোশাকশিল্পকে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে ফেলেছে। রয়টার্সের ৪ নভেম্বরের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পে শ্রমিক অসন্তোষের পাশাপাশি উৎপাদন ব্যয়, জ্বালানি ও পরিবহন খরচ এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের মূল্যচাপের বিষয়টি উঠে এসেছে।

বাংলাদেশের প্রায় ৪০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান এবং রপ্তানি আয়ের বড় অংশ এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। ফলে নারায়ণগঞ্জের মতো শিল্পাঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা শুধু শ্রমিক বা মালিকের ক্ষতি করবে না; এর প্রভাব পড়তে পারে জাতীয় অর্থনীতিতেও।

উত্তর খুঁজছে নারায়ণগঞ্জ: এখন কয়েকটি বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি। প্রথমত, আন্দোলনের মূল সংগঠক কারা এবং শ্রমিকদের সঙ্গে তাদের সাংগঠনিক সম্পর্ক কী? দ্বিতীয়ত, পিকআপে লাঠিসোঁটাসহ যাওয়া যুবকদের পরিচয় কী? তৃতীয়ত, মাইকে উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগের সত্যতা কতটুকু? চতুর্থত, শ্রমিকদের ওপর হামলার অভিযোগে কোনো রাজনৈতিক নেতাকর্মী জড়িত ছিলেন কি না? পঞ্চমত, সংঘর্ষের সময় পুলিশ প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত বল প্রয়োগ করেছে কি না?

এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে সিসিটিভি ফুটেজ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য, কারখানার হাজিরা এবং গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের পরিচয় যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে শ্রমিক সংগঠন, মালিকপক্ষ, প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্যও নিতে হবে।

নারায়ণগঞ্জের শিল্পাঞ্চলে এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন উত্তেজনা কমিয়ে আলোচনার পরিবেশ তৈরি করা। শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরির দাবি উপেক্ষা করলে অসন্তোষ আরও বাড়তে পারে। আবার আন্দোলনের নামে সহিংসতা ও জনদুর্ভোগ চলতে থাকলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে শ্রমিকদেরই কর্মসংস্থান।

৩০ হাজার টাকার দাবি নিয়ে আলোচনা হতে পারে, মজুরি বোর্ড সিদ্ধান্ত দিতে পারে। কিন্তু আন্দোলনের নেপথ্যে কারা, বহিরাগতরা কেন মাঠে এবং রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ভূমিকা কী—এসব প্রশ্নের উত্তর না মিললে সন্দেহ থেকেই যাবে। নারায়ণগঞ্জবাসী এখন অভিযোগ নয়, তথ্যভিত্তিক তদন্ত ও স্বচ্ছ জবাব চান।