বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ১৯ কার্তিক ১৪৩৩

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২২:৪৬, ৪ নভেম্বর ২০২৬

বন্ধ বিও চালুর খবরে বড় উত্থান পুঁজিবাজারে

বন্ধ বিও চালুর খবরে বড় উত্থান পুঁজিবাজারে

ছবি সংগৃহীত

দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা বিও (বেনিফিশিয়ারি ওনার্স) হিসাব আবার চালুর অনুমোদনের খবরে দেশের পুঁজিবাজারে বড় উত্থান হয়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) এ সিদ্ধান্তে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ইতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়েছে।
এর প্রভাব পড়েছে শেয়ার কেনাবেচায়। ফলে মূল্য অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার দাম বাড়ার পাশাপাশি বেড়েছে মূল্যসূচক।
গতকাল বুধবার প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এবং অন্য পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম বাড়ার পাশাপাশি মূল্যসূচকের বড় উত্থান হয়েছে। সেই সঙ্গে ডিএসইতে ৫০০ কোটি টাকার ওপরে লেনদেন হয়েছে।
বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘদিন লেনদেনের বাইরে থাকা বিও হিসাবগুলো আবার সচল হলে বাজারে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়বে। এতে বাজারের তারল্য ও লেনদেনেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
এদিকে নিয়ন্ত্রক সংস্থার এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ডিবিএ)। সংগঠনটি বলেছে, দীর্ঘদিন ধরে স্থগিত থাকা বিও হিসাবগুলোতে আবার লেনদেনের সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত পুঁজিবাজারের জন্য ইতিবাচক। এজন্য বিএসইসিকে ধন্যবাদ জানিয়েছে সংগঠনটি।
বিভিন্ন সরকারি সংস্থার অনুরোধ এবং কমিশনের সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে মোট ৬১৭টি বিও হিসাব স্থগিত করা হয়েছিল। এ অবস্থায় গত ২০ জুলাই বিএসইসি চেয়ারম্যানের কাছে লিখিত আবেদন করে ডিবিএ। আবেদনে আইনগতভাবে কিংবা সংশ্লিষ্ট কোনো নিয়ন্ত্রক বা সরকারি সংস্থার নিষেধাজ্ঞা না থাকলে দীর্ঘদিন ধরে স্থগিত থাকা বিও হিসাবগুলো আবার চালুর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়। ডিবিএ’র ওই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বন্ধ বিও হিসাবগুলো আবার চালু এবং সেগুলোয় লেনদেনের সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএসইসি।
গতকাল বুধবার পুঁজিবাজারে লেনদেন শুরু হওয়ার আগেই এ তথ্য পেয়ে যান বিনিয়োগকারীরা। ফলে লেনদেনের শুরুতেই শেয়ারবাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার দাম বাড়ায় লেনদেনের শুরুতেই সূচকের বড় উত্থান হয়। লেনদেনের
শেষ পর্যন্ত অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার দাম বাড়ার ধারা অব্যাহত থাকে। ফলে মূল্যসূচকের বড় উত্থান দিয়েই দিনের লেনদেন শেষ হয়।
দিনের লেনদেন শেষে ডিএসইতে সব খাত মিলে ২৮২টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিট দাম বাড়ার তালিকায় নাম লিখিয়েছে। বিপরীতে ৫১টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম কমেছে। আর ৫০টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে।
এদিকে ভালো কোম্পানি বা ১০ শতাংশ অথবা তার বেশি লভ্যাংশ দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ১৪৮টির শেয়ারের দাম বেড়েছে। বিপরীতে ২৪টির দাম কমেছে এবং ১৮টি দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। মাঝারি মানের বা ১০ শতাংশের কম লভ্যাংশ দেওয়া ৫৯টি কোম্পানির শেয়ারের দাম বেড়েছে। বিপরীতে ছয়টির দাম কমেছে এবং চারটির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে।
বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ না দেওয়ার কারণে ‘জেড’ গ্রুপে স্থান হওয়া কোম্পানিগুলোর মধ্যে ৭৫টির শেয়ারের দাম বেড়েছে। বিপরীতে দাম কমেছে ২০টির এবং ২৮টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। এছাড়া ১৪টি মিউচুয়াল ফান্ডের দাম বাড়ার বিপরীতে পাঁচটির দাম কমেছে এবং ১৩টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে।
দাম বাড়ার তালিকা বড় হওয়ায় ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স আগের দিনের তুলনায় ৫৭ পয়েন্ট বেড়ে ৫ হাজার ৩৪১ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। অন্য দুই সূচকের মধ্যে বাছাই করা ভালো ৩০ কোম্পানি নিয়ে গঠিত ডিএসই-৩০ সূচক আগের দিনের তুলনায় ১৫ পয়েন্ট বেড়ে ২ হাজার ৩৭ পয়েন্টে উঠে এসেছে। আর ডিএসই শরিয়াহ সূচক ৬ পয়েন্ট বেড়ে ১ হাজার ৩৬ পয়েন্টে অবস্থান করছে।
এই উত্থানের আগে টানা তিন কার্যদিবস পুঁজিবাজারে বড় দরপতন হয়। টানা দরপতনের মধ্যে পুঁজিবাজারে এমন বড় উত্থানের কারণ হিসেবে ডিএসইর এক সদস্য বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ৬০০ বেশি বিও হিসাব ব্লক করে রাখা হয়েছে। এর বেশিরভাগই বড় বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব। যাদের লেনদেন বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। এসব বিও হিসাবে আবার লেনদেন চালুর সুযোগ দেওয়ায় বাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
তিনি বলেন, সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ধারণা করছেন যেসব বিনিয়োগকারীর বন্ধ বিও আবার চালু করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে, তারা বাজারে সক্রিয় হবেন। এই প্রত্যাশা থেকেই অনেকেই বাজারে শেয়ার ক্রয়ে মনোযোগী হয়েছেন। ফলে বাজারে ক্রেতার আধিক্য দেখা যায়, বিপরীতে বিক্রির চাপ কম ছিল। এতেই দাম বাড়ার তালিকা বড় হয়েছে এবং সূচকের বড় উত্থান হয়েছে।
এ বিষয়ে ডিবিএ থেকে পাঠানো এক বার্তায় বলা হয়েছে, এ সিদ্ধান্তের ফলে দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা বিপুল পরিমাণ শেয়ার আবার বাজারে লেনদেনের সুযোগ পাবে। এতে পুঁজিবাজারে তারল্য প্রবাহ বাড়বে, লেনদেনের পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে এবং বিনিয়োগকারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ বাড়বে। একই সঙ্গে বাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারেও সিদ্ধান্তটি ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
ডিবিএর পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছে, এ সিদ্ধান্তের ফলে বিশেষ করে মার্জিন ঋণ প্রদানকারী স্টক ব্রোকার ও মার্চেন্ট ব্যাংকগুলো দীর্ঘদিনের আর্থিক ও বাণিজ্যিক সংকট কাটিয়ে স্বাভাবিক ব্যবসায়িক কার্যক্রমে ফিরতে পারবে। এতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক সক্ষমতা ও কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার পাশাপাশি সামগ্রিক পুঁজিবাজারের গতিশীলতা বাড়বে।
এদিকে মূল্যসূচকের বড় উত্থান হলেও ডিএসইতে লেনদেনের পরিমাণ কিছুটা কমেছে। অবশ্য ৫০০ কোটি টাকার বেশি লেনদেন হয়েছে। বাজারটিতে লেনদেন হয়েছে ৫২২ কোটি ২৮ লাখ টাকা। আগের কার্যদিবসে লেনদেন হয় ৫৬৫ কোটি ৮২ লাখ টাকা। এ হিসাবে আগের কার্যদিবসের তুলনায় লেনদেন কমেছে ৪৩ কোটি ৫৪ লাখ টাকা।
এই লেনদেনে সব থেকে বড় ভূমিকা রেখেছে মতিন স্পিনিংয়ের শেয়ার। কোম্পানিটির ৩২ কোটি ৫৫ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে। দ্বিতীয় স্থানে থাকা এনভয় টেক্সটাইলের শেয়ার লেনদেন হয়েছে ১৯ কোটি ৯৩ লাখ টাকার। ১৮ কোটি ৭৪ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেনের মাধ্যমে তৃতীয় স্থানে রয়েছে শাহজিবাজার পাওয়ার।
এছাড়া ডিএসইতে লেনদেনের দিক থেকে শীর্ষ ১০ প্রতিষ্ঠানের তালিকায় রয়েছে—সায়হাম টেক্সটাইল, ফাইন ফুডস, ফার কেমিক্যাল, সোনারগাঁও টেক্সটাইল, প্যারামাউন্ট টেক্সটাইল, ব্র্যাক ব্যাংক এবং প্রভাতী ইন্স্যুরেন্স।
অন্য পুঁজিবাজার সিএসইতে লেনদেনে অংশ নেওয়া ১৪৭টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৮১টির শেয়ার ও ইউনিটের দাম বেড়েছে। বিপরীতে ৪১টির দাম কমেছে এবং ২৫টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। এতে সিএসইর সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই বেড়েছে ১০০ পয়েন্ট। লেনদেন হয়েছে ৪ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। আগের কার্যদিবসে লেনদেন হয় ১২ কোটি ৭১ লাখ টাকা।