বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩

​​​​​​​শেখ সাদী খান

প্রকাশ: ১৬:৩৮, ৫ নভেম্বর ২০২৬

মাগুরা-ঝিনাইদহ হয়ে দর্শনা-পোড়াদহ রেলসংযোগ

ভবিষ্যৎ গেম-চেঞ্জার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে

ভবিষ্যৎ গেম-চেঞ্জার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে

ছবি: সংগৃহীত

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের রেল যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক বড় দিগন্ত উন্মোচিত হতে যাচ্ছে। মাগুরা থেকে ঝিনাইদহ হয়ে ঐতিহ্যবাহী দর্শনা-পোড়াদহ সেকশনের সঙ্গে নতুন রেলসংযোগ স্থাপনের লক্ষ্যে আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে সরকার। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অবহেলিত জনপদকে অর্থনৈতিকভাবে চাঙা করতে এবং মোংলা বন্দর ও দর্শনা স্থলবন্দরের পূর্ণ সুবিধা লুফে নিতে এই নতুন রেললাইনটি ভবিষ্যতে গেম-চেঞ্জার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে বলে আশা করা হচ্ছে বলে জানান খাতসংশ্লিষ্টরা।

রেল সূত্রে জানা যায়, ১০ কোটি ১৭ লাখ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে একটি সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে, যার সম্পূর্ণ অর্থায়ন করা হবে সরকারি (জিওবি) তহবিল থেকে। রেলপথ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ রেলওয়ের যৌথ উদ্যোগে ২০২৬ সালের আগস্ট থেকে ২০২৮ সালের জানুয়ারি মাসের মধ্যে এই সমীক্ষা ও নকশা প্রণয়নের কাজ শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

প্রস্তাবিত এই রেলসংযোগটি চালু হলে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের অর্থনীতি ও যাতায়াত ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ ছাড়া মাগুরা ও ঝিনাইদহের মতো গুরুত্বপূর্ণ জেলাগুলোকে সরাসরি কুষ্টিয়ার পোড়াদহ এবং চুয়াডাঙ্গার দর্শনা আন্তর্জাতিক রেললাইনের সঙ্গে যুক্ত করবে এই প্রকল্প। এর ফলে দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে এই অঞ্চলে যাতায়াত অনেক সহজ হবে।

প্রস্তাবিত রেলসংযোগ প্রকল্প পরিচালক আহসান জাবির শেয়ার বিজকে জানান, প্রকল্পের প্রাথমিক সাম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য আট মাস নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে আমরা চেষ্টা করব দ্রুত সময়ের মধ্যে শেষ করতে। তিনি জানান বিশেষজ্ঞ নিয়োগের থেকে শুরু হয়ে আট মাস লাগবে ফিজিবিলিটি স্টাডি শেষ হতে। প্রাথমিক সাম্ভ্যব্যতা যাচাই শেষে দ্রুত সময়ের মধ্যে জমি অধিগ্রহণ বিশেষজ্ঞ নিয়োগ দেওয়া হবে। পরে বিস্তারিত নকশা পূর্ণাঙ্গ প্রণয়নসহ রেলপথ নির্মাণের জন্য ডিপিপি প্রস্তাব করব।

ফিজিবিলিটি স্টাডি সম্পন্ন করতে বিশেষজ্ঞ নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে কি না জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক জানান, বিশেষজ্ঞ নিয়োগের জন্য ইতোমধ্যে অনুমোদন হয়ে গেছে। আশা করছি আগামী তিন থেক চার মাসের মধ্যে এই কাজ শেষ হবে।

আহসান জাবির বলেন, ওপেন টেন্ডারের মাধ্যমে ফিজিবিলিটি স্টাডি করার জন্য দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে দরপত্র জমা দেওয়ার আহ্বান করা হবে। যেহেতু এটা সরকারি কাজ, সরকারি সব নিয়ম-কানুন যথাযথভাবে মেনেই দরপত্র আহ্বান করা হবে। তবে আমাদের প্রত্যাশা থাকবে ব্যয় রক্ষায় দেশি প্রতিষ্ঠানকে প্রাধান্য দেওয়া। আর এটা মূলত ব্রডগেজ রেললাইন হবে।

ফিজিবিলিটি স্টাডিতে দেশি-বিদেশি কোনো প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ কোনো পছন্দ কিংবা চাহিদার ভিত্তিতে দেওয়ার সম্ভাবনা আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, এক্ষেত্রে সে সুযোগ একেবারেই নেই। এই প্রকল্পের জন্য যেহেতু উন্মুক্ত দরপত্র আহ্ববান করা হচ্ছে, সুতরাং এমন কোন বিশেষ বিবেচনার সুযোগ নেই। যারাই কাজ করার সুযোগ পাবে তাদের নিজস্ব কাজের অভিজ্ঞতা দিয়ে পাবে। এখানে ব্যক্তিবিশেষের স্বার্থ কিংবা পছন্দের কারণ নেই। তিনি জানান, প্রজেক্ট ইমপ্লিমেন্টেশন ইউনিট (পিআইইউ) মেনেই সব প্রতিষ্ঠানকে দরপত্র জমা দিতে হবে। এবং তাদের সেই যোগ্যতা থাকতে হবে। এ ছাড়া যেসব লোকবল আমরা প্রত্যাশা করছি প্রাথমিক সাম্ভ্যবতা যাচাইয়ে তাদের অবশ্যই  শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদের পাশাপাশি মাঠে কাজ করার বাস্তব অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। সেটা মিনিমাম ১০-১৫ বছর হতে হবে। আমরা সব যোগ্যতার সনদ যাচাই-বাছাই করেই প্রকল্পের সাম্ভ্যবতা যাচাইয়ে নিয়োগ সম্পন্ন করব।    

খাতসংশ্লিষ্টরা জানান, দর্শনা ল্যান্ড পোর্ট (স্থলবন্দর) এবং কুষ্টিয়া-যশোর অঞ্চলের শিল্পপণ্য পরিবহনে এই রুটটি অন্যতম প্রধান লাইফলাইন হিসেবে কাজ করবে। মাগুরা ও ঝিনাইদহের কৃষি পণ্য সরাসরি ঢাকা কিংবা মোংলা বন্দরে কম খরচে পৌঁছানো সম্ভব হবে। এছাড়া দর্শনা সেকশনটি ভারতের সঙ্গে রেল যোগাযোগের অন্যতম প্রধান রুট। এই নতুন সংযোগের ফলে আঞ্চলিক বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক ইমিগ্রেশন-প্যাসেঞ্জার ট্রেন চলাচলের ক্ষেত্রে মাগুরা ও ঝিনাইদহ সরাসরি সুফল পাবে।

সমীক্ষা প্রকল্পের মূল ব্যয় ও কার্যক্রমের বিবরণ: প্রকল্পের নথির তথ্য অনুযায়ী, মোট ১০ কোটি ১৭ লাখ টাকার মধ্যে সিংহভাগ খরচ হবে পরামর্শক ও কারিগরি জরিপ খাতে। এছাড়া মূল কনসালটেন্সি সেবায় খরচ ধরা হয়েছে প্রায় ৭৮৬ দশমিক ২৫ লাখ টাকা, যার মধ্যে আইটি-ভ্যাট অন্তর্ভুক্ত এবং প্রকল্পের আওতায় ৯০ লাখ টাকা ব্যয়ে টপোগ্রাফিক ও ইউটিলিটি সার্ভে, ১০০ লাখ টাকায় সয়েল ইনভেস্টিগেশন (মাটি পরীক্ষা), ৫০ লাখ টাকায় ট্রাফিক সার্ভে এবং ৮০ লাখ টাকা করে পরিবেশগত ও হাইড্রোলজিক্যাল (পানি ও নদী প্রবাহ) সমীক্ষা চালানো হবে।

প্রকল্প নথিতে আরও দেখা যায়, প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট ইউনিটের জন্য ৩৯ দশমিক ৫ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যার মধ্যে গাড়ি ভাড়া, স্টেশনারি ও বিভিন্ন কমিটির সম্মানী অন্তর্ভুক্ত। তবে প্রজেক্ট ইমপ্লিমেন্টেশন ইউনিটে (পিআইইউ) কর্মরত রেলের নিজস্ব কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা রেলওয়ের নিয়মিত বাজেট থেকেই বহন করা হবে। ফলে এই খাতে অতিরিক্ত কোনো রাজস্ব ব্যয় দেখানো হয়নি।

এদিকে বাংলাদেশ রেলওয়ের পরিকল্পনা উইংয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ‘মাগুরা ও ঝিনাইদহ অঞ্চলকে রেল নেটওয়ার্কের মূল ধারায় নিয়ে আসার জন্য এই সমীক্ষাটি অত্যন্ত সময়োপযোগী। আমরা শুধু রেললাইন নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাই করছি না, বরং একই সঙ্গে এর ডিটেইল ডিজাইন (বিস্তারিত নকশা) এবং টেন্ডার ডকুমেন্টও প্রস্তুত করে ফেলব। সমীক্ষা শেষ হওয়ামাত্রই যেন মূল নির্মাণ কাজ দ্রুত শুরু করা যায়, সেই লক্ষ্যেই ২০২৮ সালের জানুয়ারির মধ্যে কাজ সম্পন্ন করার পরিকল্পনা সাজানো হয়েছে।’

যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের অধ্যাপকদের মতে, যেকোনো বড় রেল অবকাঠামো নির্মাণের আগে এই ধরনের নিখুঁত হাইড্রোলজিক্যাল ও সয়েল ইনভেস্টিগেশন সমীক্ষা অত্যন্ত জরুরি। তারা বলছেন, মাগুরা-ঝিনাইদহ রুটে বেশ কিছু ছোট-বড় নদী ও জলাশয় রয়েছে, তাই ৮০ লাখ টাকার হাইড্রোলজিক্যাল এবং ১০০ লাখ টাকার সয়েল টেস্টের সঠিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়ে বলেন, মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামোতে (এমটিবিএফ) রেলের আর্থিক সক্ষমতা বা ‘ফিসকাল স্পেস’ কিছুটা ঋণাত্মক অবস্থানে থাকায় সমীক্ষা শেষে মূল প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য এখনই দূরদর্শী অর্থায়ন পরিকল্পনা তৈরি রাখা আবশ্যক।