শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ২১ কার্তিক ১৪৩৩

আন্তর্জাতিক ডেক্স :

প্রকাশ: ১১:৪৪, ৬ নভেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ১১:৪৬, ৬ নভেম্বর ২০২৬

ইরানকে নতুন করে সামরিক হামলার হুঁশিয়ারি ট্রাম্পের, বাড়ছে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা

ইরানকে নতুন করে সামরিক হামলার হুঁশিয়ারি ট্রাম্পের, বাড়ছে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা

ইরানকে ধ্বংস করার হুমকি ট্রাম্পের

ইরানের বিরুদ্ধে আবারও বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালানোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যদিও ইরানকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করার কোনো ইচ্ছা তাঁর নেই বলে জানিয়েছেন তিনি, তবে পরিস্থিতির প্রয়োজনে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হতে পারে বলেও সতর্ক করেছেন মার্কিন এই প্রেসিডেন্ট। একই সঙ্গে ওয়াশিংটনের অনুমোদন ছাড়া তেহরান কোনোভাবেই তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি এগিয়ে নিতে পারবে না বলে স্পষ্ট অবস্থান জানিয়েছেন তিনি।

স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প ইরান পরিস্থিতি নিয়ে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ইরানের বাকি অংশ ধ্বংস করতে চান না। তবে পরিস্থিতি এমন দিকে এগোলে তাঁকে সেই সিদ্ধান্তও নিতে হতে পারে। এ বিষয়ে শিগগিরই আরও বিস্তারিত জানা যাবে বলেও ইঙ্গিত দেন তিনি।

ট্রাম্পের এমন বক্তব্যে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সামরিক সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা এবং দুই দেশের মধ্যে চলমান কূটনৈতিক অচলাবস্থা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রম নিয়ে শুরু থেকেই কঠোর অবস্থান বজায় রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র। ট্রাম্পও এ বিষয়ে কোনো ধরনের ছাড় দিতে রাজি নন বলে জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ওয়াশিংটনের সম্মতি ছাড়া তেহরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কোনো অগ্রগতি অর্জন করতে পারবে না।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট দাবি করেছেন, ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রমের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নজরদারি রয়েছে। ফলে দেশটি গোপনে কিংবা একতরফাভাবে পারমাণবিক কর্মসূচি এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ পাবে না।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা সীমিত রাখাই ওয়াশিংটনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। অন্যদিকে তেহরান নিজেদের পারমাণবিক কর্মসূচিকে জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌম অধিকারের বিষয় হিসেবে বিবেচনা করে। দুই দেশের এই বিপরীত অবস্থানের কারণে সমঝোতায় পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান দলের প্রত্যাশিত ফল না আসায় রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। দীর্ঘ আট মাস ধরে চলমান ইরান যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও অসন্তোষ বাড়ছে।

বিশেষ করে সামরিক সংঘাতের অর্থনৈতিক প্রভাব সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় চাপ তৈরি করেছে। জ্বালানি তেলের ধারাবাহিক মূল্যবৃদ্ধি এবং যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট অনিশ্চয়তা মার্কিন ভোটারদের মধ্যে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে বলে মনে করা হচ্ছে।

নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের আসন বৃদ্ধির পেছনেও এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের ধারণা।

ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো একদিকে ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান ধরে রাখা, অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরে যুদ্ধবিরোধী জনমত ও অর্থনৈতিক চাপ সামাল দেওয়া। দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত মার্কিন অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির ওপর আরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

নির্বাচনের আগেও একাধিকবার ইরানকে সামরিক হামলার হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন ট্রাম্প। তাঁর বক্তব্য ছিল, যুক্তরাষ্ট্রের গ্রহণযোগ্য শর্ত মেনে তেহরান চুক্তিতে না এলে দেশটির বিরুদ্ধে নতুন করে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালানো হতে পারে।

ওয়াশিংটনের দাবি, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণে আনতে একটি কার্যকর সমঝোতা প্রয়োজন। তবে সেই সমঝোতার শর্ত কী হবে, তা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে এখনো মতপার্থক্য রয়েছে।

অন্যদিকে ইরানও যুক্তরাষ্ট্রের চাপের কাছে নতি স্বীকার করতে আগ্রহী নয়। তেহরান মনে করে, সামরিক হুমকি ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার পরিবেশে সমান ভিত্তিতে আলোচনা সম্ভব নয়।

ফলে কূটনৈতিক আলোচনার সম্ভাবনা থাকলেও সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি পুরোপুরি কাটছে না।

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সংঘাতের প্রভাব শুধু দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথগুলোতেও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে।

বিশেষ করে লোহিত সাগরে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের হামলা এবং এর জবাবে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বাহিনীর সামরিক পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

লোহিত সাগর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি জলপথ। এই অঞ্চলে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হলে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি পণ্য পরিবহনের খরচও বেড়ে যেতে পারে।

অন্যদিকে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে সেখানে সামরিক উত্তেজনা বাড়লে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম এবং জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, সংঘাত আরও বিস্তৃত হলে মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও এর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব অনুভূত হবে।

সামরিক উত্তেজনার পাশাপাশি কূটনৈতিক সমাধানের পথও খোলা রাখার চেষ্টা করছে তেহরান। জানা গেছে, কাতারের মধ্যস্থতায় ইরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে নতুন একটি প্রস্তাব পাঠিয়েছে।

তবে আলোচনায় বসার আগে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি পূরণের শর্ত দিয়েছে ইরান। দেশটির দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—

- ইরানের ওপর আরোপিত অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার।
- বিদেশে আটকে থাকা ইরানের সম্পদ অবমুক্ত করা।
- যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ প্রদান।
- ইরানের জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান প্রদর্শন।

তেহরানের অবস্থান হলো, এসব দাবি বিবেচনায় না নিলে আনুষ্ঠানিক আলোচনায় বসার পরিবেশ তৈরি হবে না।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পাঠানো প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করছে বলে জানা গেছে। তবে কূটনৈতিক আলোচনার পাশাপাশি সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেননি ট্রাম্প।

বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতার সম্ভাবনা এবং নতুন করে সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা পাশাপাশি অবস্থান করছে। একদিকে তেহরান নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও ক্ষতিপূরণের দাবি জানাচ্ছে, অন্যদিকে ওয়াশিংটন পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণে নিজেদের শর্ত বাস্তবায়নে অনড় রয়েছে।

ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্য থেকে বোঝা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র আপাতত ইরানের ওপর চাপ অব্যাহত রাখতে চায়। তবে নতুন করে সামরিক অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নিলে তার পরিণতি শুধু দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে।

বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগরের নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার এবং মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

সব মিলিয়ে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংকট এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পর্যায়ে রয়েছে। কাতারের মধ্যস্থতায় পাঠানো ইরানের নতুন প্রস্তাব শেষ পর্যন্ত কোনো সমঝোতার পথ তৈরি করতে পারে কি না, সেটিই এখন আন্তর্জাতিক মহলের অন্যতম আগ্রহের বিষয়। তবে কূটনৈতিক উদ্যোগ ব্যর্থ হলে মধ্যপ্রাচ্যে আবারও বড় ধরনের সামরিক সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।