শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ২১ কার্তিক ১৪৩৩

স্টাফ রিপোর্টার, শেয়ার বিজ ডেস্ক :

প্রকাশ: ২১:৪৬, ৬ নভেম্বর ২০২৬

শ্রমিক অসন্তোষ কাটছে, রবিবার থেকে স্বাভাবিক হচ্ছে দেশের পোশাক কারখানা

শ্রমিক অসন্তোষ কাটছে, রবিবার থেকে স্বাভাবিক হচ্ছে দেশের পোশাক কারখানা

শ্রমিক অসন্তোষ কাটছে, গার্মেন্টস কারখানার কর্মরত শ্রমিকরা। ফাইল ফটো

টানা কয়েক দিনের শ্রমিক অসন্তোষ, বিক্ষোভ ও উৎপাদন ব্যাঘাতের পর ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে উঠছে দেশের তৈরি পোশাকশিল্প। শিল্পাঞ্চলগুলোতে উত্তেজনা কমে আসায় অধিকাংশ কারখানায় আবারও পুরোদমে উৎপাদন শুরুর প্রস্তুতি চলছে। আগামী রবিবার (৮ নভেম্বর) থেকে নিয়মিত উৎপাদন কার্যক্রমে ফিরবে অধিকাংশ পোশাক কারখানা বলে আশা করছেন শিল্পমালিকেরা। একই দিনে শ্রমিকদের অক্টোবর মাসের বেতন পরিশোধের কথা রয়েছে। মালিকদের ধারণা, বেতন হাতে পেলে শ্রমিকদের মধ্যে চলমান অসন্তোষ আরও কমবে এবং কারখানাগুলোতে স্বাভাবিক কর্মপরিবেশ ফিরে আসবে।

শুক্রবার (৬ নভেম্বর) সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর, মিরপুর ও নারায়ণগঞ্জের শিল্পাঞ্চলগুলোতে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। বিশেষ করে সাভার ও আশুলিয়ার ৮৮টি পোশাক কারখানায় শ্রমিকেরা শান্তিপূর্ণভাবে কাজে যোগ দিয়েছেন। আগের কয়েক দিনের তুলনায় সড়কে বিক্ষোভ, সংঘর্ষ, অবরোধ ও উত্তেজনাও অনেকটা কমেছে। তবে কিছু কারখানায় এখনো উৎপাদন পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।

শিল্পমালিকেরা বলছেন, কয়েক দিনের অস্থিরতায় উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় যে ক্ষতি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে রবিবার থেকে সর্বোচ্চ সক্ষমতায় কারখানা চালানোর চেষ্টা করবেন তাঁরা। এ জন্য শ্রমিকদের কর্মস্থলে ফিরিয়ে আনা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং স্বাভাবিক কর্মপরিবেশ বজায় রাখাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটির দিন হলেও জরুরি রফতানি আদেশ ও পণ্য সরবরাহের প্রয়োজন বিবেচনায় আশুলিয়ার ৮৮টি পোশাক কারখানা চালু রাখা হয়। এসব কারখানায় সকাল থেকেই শ্রমিকেরা কাজে যোগ দেন। কারখানাগুলোতে উৎপাদন কার্যক্রম চলার পাশাপাশি শিল্পাঞ্চলের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও শান্তিপূর্ণ ছিল।

অন্যদিকে শনিবার (৭ নভেম্বর) জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে সরকারি সাধারণ ছুটির সঙ্গে মিল রেখে পোশাক কারখানাগুলো বন্ধ থাকবে। ছুটির পর রবিবার থেকে অধিকাংশ কারখানায় নিয়মিত উৎপাদন শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে।

শিল্পমালিকদের প্রত্যাশা, শ্রমিকদের অক্টোবর মাসের বেতন পরিশোধের মধ্য দিয়ে কর্মক্ষেত্রে আস্থা ও স্থিতিশীলতা আরও বাড়বে। কয়েক দিন ধরে চলা অসন্তোষের পেছনে মজুরি বৃদ্ধি, বেতন এবং কর্মপরিবেশসংক্রান্ত বিভিন্ন দাবি কাজ করেছে। এসব বিষয়ে আলোচনার উদ্যোগ নেওয়ায় শ্রমিকদের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।

মালিকদের মতে, নির্ধারিত সময়ে বেতন পাওয়া শ্রমিকদের তাৎক্ষণিক আর্থিক চাপ কমাতে সাহায্য করবে। পাশাপাশি কারখানার উৎপাদন সচল রাখতে শ্রমিক ও মালিকপক্ষের মধ্যে সহযোগিতাও বাড়বে।

সাভার ও আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে শুক্রবারের পরিস্থিতি আগের কয়েক দিনের তুলনায় অনেকটাই স্বাভাবিক ছিল। সাপ্তাহিক ছুটি থাকা সত্ত্বেও জরুরি প্রয়োজনে চালু রাখা ৮৮টি কারখানায় শ্রমিকেরা কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই কাজে যোগ দেন।

শিল্পাঞ্চল পুলিশ-১-এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শোয়েব আহম্মেদ জানান, শুক্রবার সাধারণত পোশাক কারখানাগুলো বন্ধ থাকে। তবে জরুরি উৎপাদন ও পণ্য সরবরাহের চাপ থাকলে কিছু কারখানা খোলা রাখা হয়। এবারও একই কারণে আশুলিয়ার ৮৮টি কারখানা চালু রয়েছে।

শিল্পাঞ্চল পুলিশ-১-এর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, সকাল থেকে পুরো শিল্পাঞ্চলের পরিস্থিতি শান্তিপূর্ণ ও স্বাভাবিক রয়েছে। চালু থাকা কারখানাগুলোতে শ্রমিকেরা শান্তিপূর্ণভাবে কাজে যোগ দিয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও নিয়মিত দায়িত্ব পালন করছেন।

শিল্পাঞ্চলে পরিস্থিতির উন্নতিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন শ্রমিক নেতারাও। বাংলাদেশ গার্মেন্টস ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইনবিষয়ক সম্পাদক খাইরুল মামুন মিন্টু জানান, বৃহস্পতিবার থেকেই শিল্পাঞ্চলে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বিরাজ করছে। সরকার নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করায় শ্রমিকদের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে দাবি আদায়ের একটি সুযোগ তৈরি হয়েছে।

তিনি মনে করেন, এখন শ্রমিকদের মজুরিসংক্রান্ত দাবি ও অসন্তোষ আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা উচিত। মজুরি বোর্ডের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় শ্রমিকদের কর্মস্থলে ফিরে উৎপাদন সচল রাখার আহ্বানও জানান তিনি।

তবে শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও হয়রানির বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন এই শ্রমিক নেতা। তাঁর মতে, শ্রমিকদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হলে তাঁদের কাজে ফেরানো কঠিন হবে। বাড়িতে পুলিশি তল্লাশি কিংবা হয়রানির অভিযোগের মতো পরিস্থিতি বন্ধ করে কারখানায় নিরাপদ ও স্বাভাবিক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।

শিল্পাঞ্চলগুলোতে পরিস্থিতির উন্নতি হলেও কয়েক দিনের শ্রমিক অসন্তোষ দেশের পোশাকশিল্পে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেছে। শিল্প পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত বুধবার (৫ নভেম্বর) আশুলিয়া, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের প্রায় ১৩০টি পোশাক কারখানায় উৎপাদন বন্ধ ছিল।

এর মধ্যে সাভার ও আশুলিয়ায় ৭০টি, গাজীপুরে প্রায় ৫০টি এবং নারায়ণগঞ্জে আটটি কারখানায় উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হয়। কয়েকটি কারখানায় শ্রমিকেরা উপস্থিত হলেও কাজে যোগ দিতে রাজি হননি। কোথাও কোথাও শ্রমিকদের বিক্ষোভের কারণে কর্তৃপক্ষ কারখানায় ছুটি ঘোষণা করতে বাধ্য হয়।

এ ছাড়া বিভিন্ন স্থানে শ্রমিকদের জমায়েত, সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভের ঘটনাও ঘটে। তবে আগের দিনগুলোর তুলনায় এসব ঘটনার মাত্রা কমেছে।

বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু জানিয়েছেন, শিল্পাঞ্চলের পরিস্থিতিতে কিছুটা উন্নতি হয়েছে। তবে সব কারখানায় উৎপাদন পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে আরও সময় লাগতে পারে।

শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, পোশাকশিল্পের উৎপাদন কার্যক্রম একটি নির্দিষ্ট সময়সূচির ওপর নির্ভরশীল। প্রতিদিনের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে না পারলে রফতানি আদেশের সময়সীমা মেনে চলা কঠিন হয়ে পড়ে। কয়েক দিনের অস্থিরতার কারণে অনেক কারখানাকে এখন বাড়তি উৎপাদনের মাধ্যমে ঘাটতি পূরণের পরিকল্পনা করতে হচ্ছে।

দেশের তৈরি পোশাকশিল্পে সাম্প্রতিক শ্রমিক অসন্তোষের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল মজুরি বৃদ্ধি। শ্রমিকেরা দীর্ঘদিন ধরে ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবি জানিয়ে আসছেন। তাঁদের অভিযোগ, বর্তমান বেতন দিয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাড়তি দাম, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও অন্যান্য খরচ সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে সরকার নতুন করে ন্যূনতম মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। গত বুধবার (৪ নভেম্বর) বোর্ডের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন মজুরিকাঠামো কার্যকরের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে শ্রমিকেরা নতুন কাঠামো অনুসারে বেতন পাবেন।

মজুরি বোর্ড গঠনের বিষয়টিকে শ্রমিকদের দাবি পূরণের পথে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁদের মতে, দীর্ঘদিনের মজুরি নিয়ে অনিশ্চয়তা কিছুটা কমলে শ্রমিকদের মধ্যে আস্থা ফিরতে পারে। তবে নতুন মজুরিকাঠামো চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত শ্রমিকদের প্রত্যাশা ও মালিকপক্ষের সক্ষমতার মধ্যে সমন্বয় তৈরি করা জরুরি।

শ্রমিক প্রতিনিধিরা বলছেন, শুধু মজুরি বোর্ড গঠন করলেই হবে না, শ্রমিকদের দাবি যথাযথভাবে বিবেচনা করে বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। অন্যদিকে শিল্পমালিকদেরও উৎপাদন ব্যয়, আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতিযোগিতা এবং রফতানি আদেশের বিষয়গুলো বিবেচনায় রাখতে হচ্ছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তৈরি পোশাকশিল্প অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের রফতানি আয়ের বড় একটি অংশ আসে এই খাত থেকে। একই সঙ্গে লাখ লাখ শ্রমিকের কর্মসংস্থানও তৈরি করেছে পোশাকশিল্প। ফলে এই খাতে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা তৈরি হলে তার প্রভাব শুধু কারখানার উৎপাদনেই সীমাবদ্ধ থাকে না, দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ও রফতানি বাণিজ্যেও পড়ে।

শ্রমিক অসন্তোষের কারণে উৎপাদন বন্ধ থাকলে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ করা কঠিন হয়ে যায়। এতে ক্রেতাদের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে নতুন রফতানি আদেশ পাওয়ার ক্ষেত্রেও ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

বিশেষ করে আন্তর্জাতিক পোশাকবাজারে বাংলাদেশকে চীন, ভিয়েতনাম, ভারতসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হয়। সময়মতো পণ্য সরবরাহ, পণ্যের মান এবং উৎপাদন খরচ—সবকিছুই ক্রেতাদের সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই শিল্পমালিকেরা দ্রুত উৎপাদন স্বাভাবিক করার ওপর জোর দিচ্ছেন।

সব মিলিয়ে কয়েক দিনের অস্থিরতা কাটিয়ে দেশের তৈরি পোশাকশিল্পে স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরে আসার ইতিবাচক ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। শুক্রবার বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে শান্তিপূর্ণ পরিস্থিতি এবং আশুলিয়ার ৮৮টি কারখানায় উৎপাদন চালু থাকা সেই সম্ভাবনাকে আরও জোরালো করেছে।

শনিবারের সাধারণ ছুটির পর রবিবার অধিকাংশ কারখানা খুলে দেওয়া এবং শ্রমিকদের অক্টোবর মাসের বেতন পরিশোধের মধ্য দিয়ে উৎপাদন কার্যক্রম পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে বলে আশা করছেন শিল্পমালিকেরা।

তবে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য শুধু কারখানা খুলে দেওয়াই যথেষ্ট নয়। শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, নিরাপত্তা, কর্মপরিবেশ এবং মালিকপক্ষের সঙ্গে নিয়মিত আলোচনার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে শ্রমিকদের দাবিদাওয়া শান্তিপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।

শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, শ্রমিক ও মালিকপক্ষের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা তৈরি করা গেলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি কমবে। এতে একদিকে শ্রমিকদের কর্মসংস্থান ও অধিকার সুরক্ষিত হবে, অন্যদিকে বাংলাদেশের পোশাক রফতানির ধারাবাহিকতাও বজায় থাকবে।