এনসিটি পরিচালনায় ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে ১৫ বছরের চুক্তি
ছবি সংগৃহীত
দীর্ঘ আলোচনা, নানা পক্ষের আপত্তি ও প্রক্রিয়াগত জটিলতা পেরিয়ে অবশেষে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউ মুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ও ওভারফ্লো কনটেইনার ইয়ার্ড পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে দুবাইভিত্তিক কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে ১৫ বছরের চুক্তি সই করল বাংলাদেশ।
গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা ৩টা ৪০ মিনিটে এই চুক্তি সই হয়। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এসএম মনিরুজ্জামান এবং ডিপি ওয়ার্ল্ডের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সুলতান আহমেদ বিন সুলায়েম চুক্তিপত্রে সই করেন। বিশ্বব্যাংক গ্রুপের ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশন (আইএফসি) এই চুক্তির লেনদেন-সংক্রান্ত পরামর্শক ছিল। এ সময় উপস্থিত ছিলেন নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, প্রতিমন্ত্রী রাজিব আহসান, ঢাকায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রদূত আবদুল্লাহ আলী আল হুমুদি, ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী।
ইনভেস্ট বাংলাদেশ এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালের (এনসিটি) জমি, অবকাঠামো, মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে রেখে দুবাই সরকারের মালিকানাধীন আন্তর্জাতিক টার্মিনাল অপারেটর ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ১৫ বছর মেয়াদে টার্মিনালের ‘পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার’ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
চুক্তি শেষে ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, চুক্তির শুরুতে প্রায় ৬০০ কোটি টাকার অগ্রিম ফি এবং প্রথম ১০ বছরে আধুনিকায়ন, যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তিতে এক হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগের অঙ্গীকার রয়েছে। পাশাপাশি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ রাজস্ব ভাগ ও নির্ধারিত বার্ষিক ফি পাবে। কেপিআই, নিয়মিত প্রতিবেদন এবং লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হলে আর্থিক জরিমানার ব্যবস্থা থাকবে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ মনিটরিং, নিরীক্ষা ও নির্ধারিত প্রতিবেদনের মাধ্যমে তদারকি অব্যাহত রাখবে।
ইনভেস্ট বাংলাদেশ জানিয়েছে, নৌবাহিনী, কোস্ট গার্ড, ইমিগ্রেশন, কাস্টমসসহ রাষ্ট্রীয় সংস্থার নিরাপত্তা প্রটোকল আগের মতোই থাকবে।
চুক্তির বিষয়ে নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের যে সম্ভাবনা রয়েছে এবং আন্তর্জাতিক মানের সুযোগ-সুবিধা প্রয়োজন, তা পূরণের জন্যই এ চুক্তি করা হয়েছে। জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় নিয়েই ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি করা হয়েছে।
তিনি বলেন, বিশ্বের শীর্ষ পাঁচটি কোম্পানির মধ্যে তিনটিকে চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবস্থাপনায় যুক্ত করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে আগামী দিনে ভালো অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করার সূচনা হয়েছে। এ সময় তিনি বিএনপি সরকারের প্রতি আস্থা রাখার আহ্বান জানান।
ডিপি ওয়ার্ল্ড ছয় মাসের মধ্যে কাজ শুরু করবে জানিয়ে নৌপরিবহনমন্ত্রী বলেন, ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে এ চুক্তির মাধ্যমে বন্দর ইজারা দেওয়া হচ্ছে না। দুই বছর পর আলোচনা সাপেক্ষে দুই পক্ষ রাজি থাকলে আবারও ১৫ বছরের জন্য চুক্তির মেয়াদ বাড়ানো হতে পারে।
বর্তমানে কর্মরত শ্রমিক-কর্মচারীদের চাকরি হারানোর আশঙ্কা নেই বলেও জানান তিনি। বরং তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে বলে মন্তব্য করেন নৌপরিবহনমন্ত্রী।
চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে বাংলাদেশ ৬০০ কোটি টাকা পেয়েছে বলেও জানান তিনি।
উল্লেখ্য, প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ২০০৭ সালে নির্মিত এনসিটিতে পাঁচটি জেটি রয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরের ১৮টি কুইসাইড গ্যান্ট্রি ক্রেনের মধ্যে ১৪টিই এই টার্মিনালে। বন্দরের কনটেইনার ওঠানামার ৪০ শতাংশের বেশি এনসিটির মাধ্যমে পরিচালিত হয়।
দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় প্রতিষ্ঠান সাইফ পাওয়ারটেক লিমিটেড টার্মিনালটি পরিচালনা করে আসছিল। গত বছরের ৬ জুলাই প্রতিষ্ঠানটির চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরদিন বাংলাদেশ নৌবাহিনী পরিচালিত প্রতিষ্ঠান চিটাগং ড্রাই ডক এনসিটির পরিচালনার দায়িত্ব নেয়।
এনসিটিতে আন্তর্জাতিক অপারেটর নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল ২০১৯ সালে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব কাঠামোর আওতায় আন্তর্জাতিক একটি বেসরকারি অপারেটর নিয়োগের বিষয়ে ২০২৩ সালের মার্চে অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি নীতিগত অনুমোদন দেয়।
পরে অন্তর্বর্তী সরকার উদ্যোগটি পুনরুজ্জীবিত করে এবং ডিপি ওয়ার্ল্ডকে বেছে নেয়। তবে তীব্র বিরোধিতা এবং চলতি বছরের শুরুর দিকে শ্রমিকদের ধর্মঘটের মুখে প্রক্রিয়াটি স্থবির হয়ে পড়ে। বর্তমান সরকার নতুন করে আলোচনা শুরু করার পর শেষ পর্যন্ত চুক্তি স্বাক্ষর হলো।
এদিকে এনসিটি পরিচালনায় ডিপি ওয়ার্ল্ডকে যুক্ত করার বিরোধিতা করে বৃহস্পতিবার দুপুর থেকে ইনভেস্ট বাংলাদেশ অডিটোরিয়ামের সামনে অবস্থান নেয় কয়েকটি বামপন্থি রাজনৈতিক দল ও সংগঠন। এতে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ), গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টি, বাংলাদেশ জাসদ, বাসদ (মার্কসবাদী), বাংলাদেশ সাম্যবাদী আন্দোলন, সাম্রাজ্যবাদ ও যুদ্ধবিরোধী জোট, গণতান্ত্রিক ছাত্রজোট ও গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির নেতাকর্মীরা অংশ নেন। এ সময় পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের ধস্তাধস্তির ঘটনাও ঘটে।
অন্যদিকে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তির প্রতিবাদে আগামী সোমবার (১২ অক্টোবর) অনশনের ঘোষণা দিয়েছে বন্দর রক্ষা কমিটি। বৃহস্পতিবার বিকালে চট্টগ্রাম বন্দরের সামনে বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিল থেকে এ ঘোষণা দেওয়া হয়। এ সময় বিদেশি অপারেটরের হাতে এনসিটি তুলে দেওয়ায় বন্দরের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়বে বলে মন্তব্য করেন আন্দোলনকারীরা।
জনমত উপেক্ষা করে এবং চুক্তির শর্ত গোপন রেখে এ ধরনের চুক্তি করা আত্মঘাতী উল্লেখ করে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছে বন্দর রক্ষা কমিটি। সংগঠনটির পাশাপাশি শ্রমিক-কর্মচারীদের বিভিন্ন সংগঠনও এ বিক্ষোভে অংশ নেয়।