শেরপুরে উত্তরা হাসপাতালের এমডির বিরুদ্ধে ১ কোটি ৯ লক্ষ টাকা আত্মসাৎ মামলা
যোবায়ের রহমান বিপ্লব
শেরপুর জেলা শহরের গৌরীপুর মহল্লায় অবস্থিত বেসরকারি উত্তরা স্পেশালাইজড প্রাইভেট লিমিটেড হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) যোবায়ের রহমান বিপ্লব অন্তত ১০ কোটি টাকা নিয়ে উধাও হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন হাসপাতালের শতাধিক কর্মচারী, অংশীদার, বিনিয়োগকারী ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা। কাউকে কিছু না জানিয়ে তিনি চলে যাওয়ায় হাসপাতালে ভর্তি প্রায় ৩০ রোগীসহ কর্মচারীরা বিপাকে পড়েছেন। ৫ অক্টোবর রাতে এক সংবাদ সম্মেলনে এ অভিযোগ করা হয়।
এদিকে ৮ অক্টোবর শেরপুর সদর থানায় মোঃ মোস্তাফিজুর রহমান বাদী হয়ে ১ কোটি ৯ লক্ষ টাকা আত্মসাৎ এর মামলা দায়ের করেন। ওই মামলায় ১ নং সাক্ষী খন্দকার আবিদ হাসান এর ৫০ লক্ষ টাকা এবং ২ নং সাক্ষী ডাঃ মবিনা ফেরদৌস এর ৯ লক্ষ টাকা দাবি করা হয়েছে।
তবে হাসপাতালটি বন্ধ না করে জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসাসেবা চালু রেখেছেন কর্মচারী ও চিকিৎসকেরা। বিষয়টি স্থানীয় প্রশাসন, চেম্বার অব কমার্স, হাসপাতাল মালিক সমিতি, আইনজীবী সমিতি ও শেরপুর প্রেসক্লাবকে জানানো হয়েছে।
মামলার অভিযোগকারী ও সাক্ষী এবং ভুক্তভোগীরা জানায়, ২০১৮ সালে কয়েকজন চিকিৎসক, ৮-১০ জন বিনিয়োগকারী ও অংশীদারের উদ্যোগে হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০২৫ সালে বিপ্লব কাউকে না জানিয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানিতে রূপান্তর করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এরপর থেকেই কর্মচারীদের বেতন, অংশীদারদের লভ্যাংশ ও বিভিন্ন পাওনা পরিশোধে জটিলতা দেখা দেয়। প্রতিষ্ঠানে এক চেটিয়া প্রভাব বিস্তার করতে থাকেন বিপ্লব।
গত ২৭ সেপ্টেম্বর রাতে কর্মচারী, অংশীদার, বিনিয়োগকারী ও অন্যান্য পাওনাদাররা স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে বিপ্লবের সঙ্গে পাওনা পরিশোধের বিষয়ে আলোচনা করেন। তিনি হিসাব-নিকাশের জন্য তিন দিন সময় নেন। কিন্তু নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার আগেই তিনি হাসপাতাল ছেড়ে চলে যান। এরপর থেকে তার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
হাসপাতালের পক্ষ থেকে পাওয়া অন্তত ১৫ টি চুক্তিনামা ও নথি পর্যালোচনা করে সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন, বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে বিপ্লবের দায়ের পরিমাণ অন্তত ১০ কোটি টাকা। হাসপাতাল-সংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রতিষ্ঠান থেকে মাসে প্রায় ৩০ লাখ টাকা আয় হলেও বেশ কিছুদিন ধরে সেই অর্থ থেকে কর্মচারী ও অংশীদারদের পাওনা পরিশোধ করা হয়নি। নতুন হাসপাতালসহ বিভিন্ন ব্যবসায় অর্থ বিনিয়োগের অভিযোগও রয়েছে।
সরজমিনে জানা গেছে, ওই এলাকার কোন মানুষ বলেনি হাসপাতাল দখল হয়ে গেছে। অনেক পাওনাদার হাসপাতলে টাকার জন্য ঘুরছে। প্রতিষ্ঠানে বিপ্লবের কামড়া ও চেয়ার সুরক্ষিত আছে। কর্মীদের মধ্যে বিপ্লব আতংক বিরাজ করছে। কর্মচারিরা অভিযোগ করেছে বিপ্লব মোবাইলে কর্মচারিদের হুমকি দিচ্ছে।
বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক মালিক সমিতির সভাপতি কায়ছার আহাম্মেদ ফারুক ও যুগ্মসাধারণ সম্পাদক মহসিন কবির মোরাদ বলেছেন বিপ্লবের অভিযোগ অবান্তর। পাওনাদারদের টাকা না দিয়ে তিনি গাঢাকা দিয়েছেন। বিপ্লব আমাদের সংগঠনের দায়িত্বশীল নেতা এবং আসলেই সবাই বসে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান করা যেত।কিন্ত তিনি ফেইসবুকে বিভ্রান্ত ছড়াচ্ছেন।
তবে জেলা প্রশাসন ও পুলিশ জানিয়েছে, হাসপাতাল দখলের কোনো ঘটনা তারা পাননি।
শেরপুরের পুলিশ সুপার একেএম জহিরুল ইসলাম বলেন, অভিযোগ পাওয়া গেছে হাসপাতালটি চালু রয়েছে এবং বিপ্লব অনেকের কাছ থেকে টাকা নিয়ে বর্তমানে অনুপস্থিত।
সংকটকালীন হাসপাতাল পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ডা. মবিনা ফেরদৌস বলেন, “কর্মচারী ও রোগীদের স্বার্থে হাসপাতাল খোলা রাখা হয়েছে। তিনি ফিরে এলে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান সম্ভব।
এ বিষয়ে বিপ্লবের সাথে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে তাকে পাওয়া যায়নি তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম তার ফেসবুক আইডিতে এবং অজ্ঞাত স্থান থেকে এক ভিডিও বার্তায় দাবি করেছেন, হাসপাতালটি দখল করে নেওয়া হয়েছে এবং জীবনের নিরাপত্তার কারণে তিনি সেখানে যাচ্ছেন না। আর পাওনাদারদের টাকা পরিশোধের বিষয়ে তিনি কোনো সুস্পষ্ট বক্তব্য দেননি। উল্টো বর্তমান তত্বাবধানে থাকাদের কাছে হাসপাতাল বিক্রির টাকা চেয়েছেন।
এ বিষয়ে শেরপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা খোকন চন্দ্র ঘোস জানায়, ৭ অক্টোবর রাতে এজাহার দাখিল করলে ৮ অক্টোবর তদন্তের সাপেক্ষে মামলাটি গ্রহণ করা হয়েছে এবং পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এদিকে ঘটনাটি নিয়ে শেরপুরে টক অফ দা টাউনে পরিণত হয়েছে।