জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় ‘সবুজ ঢাল’
বরিশাল ও চট্টগ্রাম উপকূলে বিশাল ম্যানগ্রোভ বনায়নের উদ্যোগ
ছবি সংগৃহীত
জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব ও প্রলয়ংকরী প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি থেকে দেশের উপকূলীয় অঞ্চলকে রক্ষা করতে বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের উপকূলীয় অঞ্চলে ৪৮ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে ৪ হাজার ৫০১ হেক্টর জমিতে ম্যানগ্রোভ বনায়ন সৃষ্টি করতে যাচ্ছে সরকার। উপকূলের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় গৃহীত এই প্রকল্পের আওতায় বরিশালের পাঁচটি এবং চট্টগ্রামের পাঁচটি জেলার নির্দিষ্ট কিছু উপকূলীয় উপজেলা ও থানা এলাকাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের উপকূলীয় এলাকায় ম্যানগ্রোভ বনায়ন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে এবং বন অধিদপ্তরের বাস্তবায়নে এই বিশেষ প্রকল্পটি শুরু হতে যাচ্ছে বলে জানান খাতসংশ্লিষ্টরা।
বরিশাল বিভাগের বরিশাল সদর, পটুয়াখালী, দশমিনা, রাঙ্গাবালি, গলাচিপা, কলাপাড়া, বামনা, বরগুনা সদর, পাথরঘাটা, চর ফ্যাশন, মনপুরা ও তজমুদ্দিন এবং চট্টগ্রাম বিভাগের হাতিয়া, সুবর্ণচর, কবিরহাট, রামগতি, হালিশহর, আকবরশাহ, বাঁশখালী, সন্দ্বীপ, সীতাকুন্ড, কক্সবাজার, টেকনাফ ও মহেশখালী এলাকায় এই বিশাল বনায়ন কর্মসূচি বাস্তবায়িত হবে।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, নির্ধারিত চার বছর মেয়াদের মধ্যে প্রকল্পের শতভাগ কাজ সম্পন্ন করে উপকূলীয় অঞ্চলকে একটি নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব সবুজ বলয়ে রূপান্তর করতে সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই প্রকল্পের প্রধান উদ্দেশ্য হলো উপকূলীয় অঞ্চলে বনাচ্ছাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি হ্রাস করা। বিশাল এই সবুজ বেষ্টনী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের তীব্রতা থেকে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দেবে। এ ছাড়া বৈশ্বিক উষ্ণতা হ্রাসের লক্ষ্যে এই ম্যানগ্রোভ বনায়নের মাধ্যমে ১১ লাখ ১৩ হাজার ১৯১ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড মজুত বৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে, যা জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় বড় ভূমিকা রাখবে।
প্রকল্প এলাকা নির্বাচনের যৌক্তিকতা: ইকোসিস্টেম, উপকূলীয় ও সামুদ্রিক ইকোসিস্টেম এবং অভ্যন্তরীণ স্বচ্ছ পানির জলাশয় ইকোসিস্টেম। বাংলাদেশ প্রাকৃতিক সম্পদ ও জীববৈচিত্রে পরিপূর্ণ একটি দেশ। এ দেশে প্রধান ইকো-সিস্টেমগুলো হচ্ছে টেরিস্ট্রিয়াল। প্রাকৃতিক উপকূলীয় বন উপকূলীয় অঞ্চলের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইকোসিস্টেম।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশ বন অধিদপ্তর পাঁচ দশকের অধিককাল ধরে উপকূলীয় এলাকায় বনায়ন ও পুনঃবনায়নের অভিজ্ঞতা রয়েছে এ ধরনের বনায়ন কার্যক্রম সাধারণত, সমুদ্রতীরবর্তী চর বা নতুন জেগে ওঠা চরে বাস্তবায়ন করা হয়। বাংলাদেশ ম্যানগ্রোভ বাগান সৃজনে সারা বিশ্বে পথিকৃৎ। ম্যানগ্রোভ বনায়ন প্রথম ১৯৬২ সালে উপকূলীয় এলাকায় পোল্ডার বা বাঁধে বাইরে সৃজন করা হয়। উপকূলীয় এলাকার জনগোষ্ঠীকে সামুদ্রিক বন্যা, সাইক্লোন ও জলোচ্ছ্বাস থেকে রক্ষা করতে উপকূলীয় বনায়ন কার্যক্রম শুরু করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ম্যানগ্রোভ বনায়নের ক্ষেত্রে আরো অনেক অতিরিক্ত বিষয় পরিলক্ষিত হয়; যেমন নতুন চর জেগে ওঠার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করা, ভূমির স্থায়িত্ব বৃদ্ধি, নদী ও সামুদ্রিক ইকোসিস্টেমের উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি, অভ্যন্তরীণ কৃষিজমিতে লোনা পানির অনুপ্রবেশে বাধাদান প্রভৃতি।
খাতসংশ্লিষ্টরা জানান, বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ কৃষিপ্রধান দেশে নতুন জেগে ওঠা চর ভূমির স্থায়ীকরণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে ম্যানগ্রোভ বনায়ন সবচেয়ে বেশি কার্যকর ভূমিকা পালন করে। উপকূলীয় অঞ্চলের কেন্দ্রীয় অংশে মেঘনা অববাহিকার ডেল্টা সৃজন অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করে। মেঘনাসহ তিনটি প্রধান নদী এবং অন্যান্য শত শত শাখানদী-বাহিত উর্বর পলিমাটি জমে নতুন ডেল্টা সৃষ্টি হচ্ছে।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা যায়, উপকূলীয় জেলায় জেগে ওঠা নতুন চরে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বনায়নের নিমিত্ত ১৯৭৭ সালের ২৪ মার্চ সরকার কর্তৃক জারীকৃত একটি নোটিফিকেশন সংযুক্ত করা হয়েছে। উপকূলীয় জেলা চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, বরিশাল, ভোলা, পটুয়াখালী, বরগুনা জেলা ম্যানগ্রোভ বাগান সৃজনের জন্য উপযোগী। বনায়নের জন্য বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগে উপযুক্ত স্থান থাকায় বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের ‘পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ’ কর্মসূচি বাস্তবায়নে দুই কোটি ম্যানগ্রোভ বনায়নের লক্ষ্যমাত্রা স্থির করা হয়েছে, যা এই প্রকল্পের মাধ্যমে অর্জিত হবে বলে বরিশাল ও চট্টগ্রাম উপকূলীয় অঞ্চলকে প্রকল্প এলাকা হিসেবে নির্বাচন করা যৌক্তিক।
পরিবেশ ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের দীর্ঘ উপকূলীয় এলাকাকে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও সমুদ্রের লোনা পানির অনুপ্রবেশ থেকে রক্ষা করতে ম্যানগ্রোভ বনায়ন সবচেয়ে কার্যকর প্রাকৃতিক দেয়াল হিসেবে কাজ করে।
বিশেষজ্ঞরা এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলছেন, ২০২৪ সালের স্যাটেলাইট ইমেজ এবং আন্তর্জাতিক গবেষণা (বিশ্বব্যাংক ও বন অধিদপ্তর) অনুযায়ী, উপকূলীয় অঞ্চলে বিপুল পরিমাণ কাঁদাচর ও উরি ঘাস-সমৃদ্ধ সম্ভাব্য এলাকা চিহ্নিত হয়েছে, যা ম্যানগ্রোভের জন্য অত্যন্ত উপযুক্ত।
তবে প্রকল্পটির টেকসই বাস্তবায়নের জন্য বিশেষজ্ঞরা কিছু বিষয়ে জোর দিয়েছেন। তারা বলছেন, বনায়নের জায়গাগুলোর জমির মালিকানা এবং সরেজমিনে বাস্তব অবস্থা নিখুঁতভাবে পর্যালোচনা করা জরুরি। এছাড়া প্রকল্প ২০৩০ সালে শেষ হওয়ার পর সৃজিত বনভূমির রক্ষণাবেক্ষণ কীভাবে হবে, তার সুনির্দিষ্ট ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা এখনই নিশ্চিত করতে হবে।
প্রকল্পের সুবিধা ও অসুবিধা
জলবায়ু ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি হ্রাস: সমুদ্রতীরবর্তী চর ও নতুন জেগে ওঠা চরে বনাচ্ছাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে সাইক্লোন, সামুদ্রিক বন্যা ও জলোচ্ছ্বাসের তীব্রতা থেকে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে রক্ষা করবে।
বিপুল পরিমাণ কার্বন মজুত: এই ৪৫০১ হেক্টর ম্যানগ্রোভ বনায়নের মাধ্যমে আগামী ২০ বছরে প্রায় ১১ লাখ ১৩ হাজার ১৯১ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড (ঈঙ?) মজুত বৃদ্ধি পাবে, যা বৈশ্বিক উষ্ণতা হ্রাসে ভূমিকা রাখবে।
সবুজ কর্মসংস্থান সৃষ্টি: স্থানীয় জনগণের জন্য বিশাল কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। বনায়ন পাহারাদার হিসেবে ৮১ হাজার ১৮ জন/মাস এবং অনিয়মিত শ্রমিক হিসেবে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য ৩ লাখ ৪১ হাজার জনের সবুজ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।
ভূমির স্থায়ীকরণ ও ইকোসিস্টেমের উন্নয়ন: নতুন জেগে ওঠা চরের মাটিকে স্থায়ী করতে ম্যানগ্রোভ ভূমিকা রাখবে। এর ফলে নদী ও সামুদ্রিক ইকোসিস্টেমের উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে এবং কৃষিজমিতে লোনা পানি ঢোকা বন্ধ হবে।
জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা অর্জন: বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের অংশ হিসেবে ‘পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ’ কর্মসূচির আওতাভুক্ত দুই কোটি ম্যানগ্রোভ বনায়নের লক্ষ্যমাত্রা এই প্রকল্পের মাধ্যমে পূরণ হবে।
যেসব প্রতিবন্ধকতা রয়েছে
আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের অভাব: উন্নয়ন প্রকল্পের পদ বা জনবল নির্ধারণ-সংক্রান্ত আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটির কার্যবিবরণীতে এখনো প্রকল্পের আগের নাম (গাঙ্গেয় ব-দ্বীপ বনায়ন প্রকল্প) রয়ে গেছে, যা প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি করতে পারে।
সম্ভাব্যতা সমীক্ষার ঘাটতি: কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সম্ভাব্যতা সমীক্ষা না করেই প্রকল্পটির যৌক্তিকতা সাজানো হয়েছে, যার কারণে মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নে কিছুটা ঝুঁকি থাকতে পারে।
বাস্তবায়নের সময়াবদ্ধতা ও আর্থিক পরিকল্পনা: নির্ধারিত চার বছরের (২০২৬-২০৩০) মধ্যে বছরভিত্তিক সঠিক আর্থিক ও বাস্তব পরিকল্পনা বজায় রাখা এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ।