রপ্তানিমুখী পণ্য উৎপাদন ব্যাহত
খুলনায় লোডশেডিংয়ে জেনারেটর চালাতে প্রতিবন্ধকতা
ছবি সংগৃহীত
একে একে বন্ধ হয়ে গেছে শিল্পাঞ্চল খুলনার ঐতিহ্যবাহী শিল্পকারখানাগুলো। ক্রিসেন্ট ও প্লাটিনামসহ সব রাষ্ট্রায়ত্ত জুট মিল এবং নিউজপ্রিন্ট ও হার্ডবোর্ড মিল বন্ধ হওয়ায় অগণিত শ্রমিক বেকার হয়ে অর্থসংকটে অনাহারে দিন কাটাচ্ছেন। এই স্থবিরতার মাঝেই কিছু বেসরকারি উদ্যোক্তা নতুন শিল্প গড়ে তুলে কর্মসংস্থান সৃষ্টির চেষ্টা করছেন। তবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো চালাতে পড়তে হচ্ছে নানা জটিলতায়।
নগরীর আড়ংঘাটা এলাকায় প্রতিষ্ঠিত ঈশানা ননওভেন ফেব্রিক্স লিমিটেড। সেখানে রপ্তানিমুখী বিভিন্ন ধরনের পন্য উৎপাদন করা হয়। এখানে প্রায় আট শতাধিক স্থানীয় শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়েছে। যে এলাকাটি একসময় পরিত্যক্ত বিল ছিল, সেখানে আজ অবকাঠামোগত উন্নয়ন ঘটেছে এবং অধিকাংশ জায়গায় নতুন বসতি গড়ে উঠেছে। শতকোটি টাকার এই কারখানাটি প্রতিবছর বিদেশে পণ্য রপ্তানি করে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে। বিদ্যুৎবিভ্রাটের কারণে জেনারেটর না চালালে প্রতি ঘণ্টায় বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হয় বলে বাধ্য হয়েই জেনারেটর চালাতে হয়।
সম্প্রতি বিদ্যুৎ চলে গেলে জেনারেটরের শব্দদূষণ হয়—এমন অভিযোগ এনে পরিবেশ অধিদপ্তরে পাঁচ সদস্যের একটি লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়। তবে পরবর্তী সময়ে অভিযোগকারীদের মধ্য থেকে কয়েকজন লিখিতভাবে জানান, ৩০ মার্চের অভিযোগপত্রে তাদের স্বাক্ষর নকল করা হয়েছে এবং তারা ওই অভিযোগ করেননি। তাদের দাবি, মূলত ব্যক্তিগত জমি বিক্রির বিরোধকে কেন্দ করে কারখানাটির বিরুদ্ধে এই অভিযোগ তোলা হয়েছে। জেনারেটরের শব্দদূষণকে কেন্দ করে জোরপূর্বক সাধারণ মানুষের স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। এর বিপরীতে কারখানাটি যেন কোনোভাবেই বন্ধ না হয় এবং উৎপাদনে ব্যাঘাত না ঘটে, সেজন্য এলাকাবাসীর পক্ষ থেকেও পরিবেশ অধিদপ্তরে পাল্টা আবেদন জমা দেওয়া হয়েছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের সরেজমিন পরিদর্শনে কারখানার পাশের বাড়িতে ৭৫ ডেসিবেল শব্দমাত্রা রেকর্ড হওয়ার কথা নথিতে উল্লেখ রয়েছে। এ কারণে জেনারেটর সাউন্ডপ্রুফ কক্ষে স্থাপন, শব্দ ও বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং উত্তর ও পূর্বদিকের জানালা ও এক্সস্ট ফ্যান বন্ধ রাখাসহ বিভিন্ন নির্দেশনা দেওয়া হয় এবং কারখানা কর্তৃপক্ষকে ৪৫ দিনের সময় বেঁধে দেওয়া হয়।
কারখানা কর্তৃপক্ষ বলছে, পরিবেশ অধিদপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী এরই মধ্যে উত্তর ও পূর্ব দিকের জানালা-এক্সস্ট ফ্যান বন্ধ রাখা, সাউন্ডপ্রুফ ব্যারিকেড ও ককশিট ব্যবহারসহ শব্দ প্রায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ কমিয়ে আনা হয়েছে। তবে পরিবেশ অধিদপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী সম্পূর্ণ আধুনিক জেনারেটর ও সাউন্ডপ্রুফ রুম তৈরি করতে অতিরিক্ত জমির প্রয়োজন।
অভিযোগকারীরা পাশের যে জমির মালিক, তারা বর্তমান বাজারমূল্যের চেয়ে প্রায় পাঁচগুণ বেশি দাম চাওয়ায় জমি ক্রয় করা কোম্পানির জন্য প্রায় অসাধ্য হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি বিদেশ থেকে আধুনিক সরঞ্জাম আমদানি করে ৪৫ দিনের মধ্যে জেনারেটর রুম তৈরি করা বাস্তবসম্মত নয়। তাই অতিদ্রুত এই সমস্যার সমাধান করা হবে বলে জানান তারা।
প্রধান অভিযোগকারী চিকিৎসক মনোরঞ্জনের ছেলে বলেছেন, ‘আমরা চাই না ফ্যাক্টরি এখান থেকে চলে যাক বা বন্ধ হয়ে যাক। এটি আমাদের জীবন-জীবিকার অন্যতম মাধ্যম। তবে শব্দদূষণ আরেকটু কমাতে পারলে ভালো হয়। মালিকপক্ষ অনেক কাজ করেছেন, এতে প্রায় ৫০ শতাংশ শব্দ কমে এসেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা বাকের ঢালী বলেন, আমি কী বলব, আমার বলার কোনো ভাষা নেই। জীবনে কোনোদিন ভাবিনি আমি হজে যেতে পারব। আমি জানি না, অথচ আমার ছেলে জয়নাল এই কোম্পানির বিরুদ্ধে আবেদন করেছে। আমার সমস্যা হচ্ছে না, তাহলে আমার ছেলের কীসের সমস্যা হবে। একটি ফ্যাক্টরি চললে জেনারেটরও চালাতে হবে। বিদ্যুৎ না থাকলে তারা কী করবে? এই ফ্যাক্টরিতে আমাদের এলাকার শত শত মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে।
এলাকার একজন দোকানদার বলেন, সমস্যার চেয়ে উপকার আমরা ৯০ শতাংশ পাই, ১০ শতাংশ সমস্যা তো মেনেই নিতে হবে। অথচ একটি পরিবারের একাধিক ব্যক্তি নিজেদের ভেতর থেকে স্বাক্ষর করে পরিবেশ অধিদপ্তরে জমা দিচ্ছে। হাজার হাজার পরিবারের জীবন-জীবিকার কথা তারা ভাবছে না।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) খুলনা জেলার সমন্বয়কারী অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, যত্রতত্র যে কেউ পরিবেশ অধিদপ্তরে গিয়ে একটা ফ্যাক্টরির বিরুদ্ধে অভিযোগ করলেই পরিবেশ অধিদপ্তর সেই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নেবে এবং তাদের বিরুদ্ধে অ্যাকশন নেবে—এটা আসলে যুক্তিসংগত নয়। যে ব্যক্তি বা সংগঠন অভিযোগ করছে, সেই সংগঠন বা সেই ব্যক্তি বা সেই প্রতিষ্ঠান অথেন্টিক কি না, এর সঙ্গে তাদের ব্যক্তিগত কোনো স্বার্থ জড়িত আছে কি না—এগুলো আগে খতিয়ে দেখতে হবে। তা না হলে খুলনা থেকে যেমন শিল্প আজ হারিয়ে যেতে বসেছে। এরই মাঝে যে কয়েকটি ফ্যাক্টরি এখনো চালু আছে, তারাও বন্ধ করে চলে যেতে বাধ্য হবে। যে কেউ আবেদন করলেই সেই অভিযোগ আমলে নিলে স্বার্থান্বেষী ব্যক্তিরা সুবিধা পাবে এবং খুলনার শিল্পগুলো ধ্বংসের মুখে পড়বে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) খুলনা বিভাগীয় সমন্বয়কারী কাজী মাহফুজুর রহমান মুকুল বলেন, আমাদের কাছে একজন সাংবাদিক মৌখিকভাবে বিষয়টি জানিয়েছেন। এত বড় একটি প্রতিষ্ঠান, তার আশপাশে কোনো নোংরা পরিবেশও নেই। সুতরাং আমরা তাকে পরিবেশ অধিদপ্তরের মাধ্যমে অভিযোগ করতে বলেছি।
ঈশানা ননওভেন ফেব্রিক্স (ইন্ডা.) লিমিটেডের জেনারেল ম্যানেজার জামিউল হাসান বলেন, আমরা এলাকার মানুষের ক্ষতি হয় এমন কোনো কাজ করব না। পরিবেশ অধিদপ্তরের নির্দেশনামতো ৫০-৬০ শতাংশ শব্দ কমিয়ে আনা হয়েছে। তবে সম্পূর্ণভাবে আধুনিক পযুক্তি সংযোজনের মাধ্যমে শব্দ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা করতে পর্যাপ্ত সময় ও প্রয়োজনীয় জায়গা লাগবে। জমিদাতারা যদি বাজারমূল্যে বা যৌক্তিক দামে জমি বিক্রি করেন এবং পরিবেশ অধিদপ্তর আমাদের সময় দেয়, তবে আমরা শব্দদূষণ সমাধানের ব্যবস্থা করতে পারব।
পরিবেশ অধিদপ্তর, খুলনার সহকারী পরিচালক মো. হারুন-অর-রশীদ বলেন, আমাদের কাছে ফ্যাক্টরির পক্ষে-বিপক্ষে একাধিক অভিযোগ এসেছে। তবে দুই পক্ষ মিলে সমাধান করলে দ্রুতই এর সমাধান করা সম্ভব। এত বড় একটি ফ্যাক্টরি বন্ধ করে দেওয়া সম্ভব নয়। আমরা ৪৫ দিনের সময় দিয়েছি, মেয়াদ শেষ হলে পরবর্তী পদক্ষেপ বিবেচনা করা হবে। তবে কারখানাটির পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র রয়েছে, যার মেয়াদ ২০২৮ সাল পর্যন্ত বহাল থাকবে।