বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ২২ আশ্বিন ১৪৩৩

​​​​​​​শেখ সাদী খান

প্রকাশ: ০৯:৫৪, ৮ অক্টোবর ২০২৬

২৫০০ কোটি টাকা ব্যয়:

৪৪২ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র হচ্ছে রামপালে

৪৪২ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র হচ্ছে রামপালে

ছবি সংগৃহীত

দেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতকে আরও শক্তিশালী করতে বাগেরহাটের রামপালে নির্মিত হতে যাচ্ছে ৪৪২ মেগাওয়াট পিক (ডিসি) ক্ষমতার একটি বিশাল সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিউবো) মালিকানাধীন অব্যবহূত ৬৮৫ একর জমিতে এই মেগা প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে। সমপ্রতি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) সভায় প্রকল্পটির চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বাবিউবো) ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০২৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। প্রকল্পটির মোট প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ২,৫০,২৩৯.৫৯ লাখ টাকা। এর মধ্যে বিদ্যুৎ খাত উন্নয়ন তহবিল থেকে ঋণ হিসেবে ২,১২,৭০৩.৬৫ লাখ টাকা এবং সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন থেকে ৩৭,৫৩৫.৯৪ লাখ টাকা জোগান দেওয়া হবে।

রামপালে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ কেন গুরুত্বপূর্ণ—জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) ভূতত্ত্ব বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক  ড. এসএম মাইনুল কবির শেয়ার বিজকে বলেন, পরিবেশবান্ধব এই প্রকল্পটির মাধ্যমে জীবাশ্ম জ্বালানির (গ্যাস/তেল/কয়লা) ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সরকারের ‘ফুয়েল ডাইভারসিফিকেশন’ কৌশল বাস্তবায়ন করা সহজ হবে। বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি চালু হলে কার্বন ডাই-অক্সাইডসহ অন্যান্য ক্ষতিকর গ্যাস নিঃসরণ সম্পূর্ণ শূন্য থাকবে, যা সুন্দরবনের পরিবেশগত সুরক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দেশের কার্বন ক্রেডিট অর্জনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

রামপালের ব্লক-বি এলাকায় ৪৪২ মেগাওয়াট (ডিসি) ক্ষমতাসম্পন্ন সোলার ফটোভোল্টাইক গ্রিড-কানেক্টেড পাওয়ার প্ল্যান্ট নির্মাণ বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োপযোগী উদ্যোগ হতে পারে বলে মন্তব্য করে এসএম মাইনুল কবির আরও বলেন, পৃথিবীর  সব  দেশই  নবায়নযোগ্য জ্বালানি মাধ্যমে জোর দিচ্ছে। বাংলাদেশের  জীবাশ্ম জ্বালানি সংকট অস্বাভাবিক বেশি, স্বভাবতই আমাদের জ্বালানি সেক্টর আমদানিনির্ভর। এ ধরনের বৃহৎ সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব ও টেকসই বিদ্যুৎ উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে দেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণ, গ্রিডে নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের অংশ বৃদ্ধি এবং দীর্ঘ মেয়াদে কার্বন নিঃসরণ কমাতে প্রকল্পটি ইতিবাচক অবদান রাখার সম্ভাবনা রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, প্রকল্পটির সফল বাস্তবায়নের জন্য উন্নতমানের সোলার মডিউল, ইনভার্টার, মাউন্টিং স্ট্রাকচার, ডিসি/এসি সিস্টেম, সাবস্টেশন ও গ্রিড-ইন্টারকানেকশনসহ প্রতিটি ধাপে আন্তর্জাতিক মানের প্রকৌশল ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি নিয়মিত অপারেশন ও মেইনটেন্যান্সের মাধ্যমে দীর্ঘ মেয়াদে প্ল্যান্টের সর্বোচ্চ উৎপাদনক্ষমতা বজায় রাখা সম্ভব হবে।

রামপালের এই সোলার পাওয়ার প্ল্যান্ট প্রস্তাবনা নিঃসন্দেহে সম্ভাবনাময় উদ্যোগ, তবে শুধু প্রকল্পের সক্ষমতা ঘোষণা করলেই হবে না—বাংলাদেশের বাস্তবতায় এর দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা ও অর্থনৈতিক যৌক্তিকতাও নিশ্চিত করতে হবে বলে মন্তব্য করেন মাইনুল কবির।

এসএম মাইনুল কবির বলেন, প্রথমত, বাংলাদেশের আবহাওয়া—বিশেষ করে বর্ষাকাল, অতিরিক্ত মেঘ, ধুলাবালি ও উচ্চ আর্দ্রতা সোলার প্ল্যান্টের উৎপাদনক্ষমতায় প্রভাব ফেলতে পারে। তাই ৪৪২ এমডাব্লিউ (ডিসি) ক্ষমতা থাকলেও বাস্তবে কতটা বিদ্যুৎ নিয়মিতভাবে গ্রিডে সরবরাহ করা যাবে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। প্রপার রিসার্চ দরকার এটার।

দ্বিতীয়ত, এত বড় প্রকল্পে জমির ব্যবহার, পরিবেশগত প্রভাব, প্যানেলের কার্যকর জীবনকাল শেষে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পানি ও নিয়মিত মেইনটেন্যান্সের বিষয়গুলো শুরু থেকেই স্বচ্ছভাবে বিবেচনা করা দরকার। পাশাপাশি গ্রিডের সক্ষমতা পর্যাপ্ত না হলে উৎপাদিত বিদ্যুতের একটি অংশ কার্যকরভাবে ব্যবহার করা নাও যেতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—প্রকল্পের মোট ব্যয়, বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ, সরকারি ভর্তুকি বা আর্থিক সুবিধা এবং দীর্ঘ মেয়াদে জনগণের ওপর এর প্রকৃত অর্থনৈতিক প্রভাব জনসম্মুখে পরিষ্কারভাবে প্রকাশ করা উচিত, যেটা বাংলাদেশের মতো দেশে নিশ্চিত করা অতীব কঠিন।

বাংলাদেশের জন্য শুধু বড় প্রকল্প নয়, দরকার সাশ্রয়ী, নির্ভরযোগ্য, পরিবেশবান্ধব ও দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই বিদ্যুৎ। তাই প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পাশাপাশি স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, পরিবেশ সুরক্ষা ও অর্থনৈতিক দক্ষতা নিশ্চিত করাও জরুরি।

এদিকে পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) কর্তৃক বাগেরহাট জেলার রামপাল উপজেলায় ২০১২ সালে মেট একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়, যা ব্লক-এ, (৯১৫.৫০ একর) এবং ব্লক-বি (৯১৮.৫০ একর)-এ বিভক্ত। ব্লক-এ  অংশে বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি (প্রা.) লিমিটেডের ২০৬৬০ মেগাওয়াট মৈত্রী সুপার থার্মাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মিত হয়েছে। অপরদিকে ব্লক-বি অংশের জমি বর্তমানে বিপিডিবির আওতায় রয়েছে এবং সেখানে ভূমি উন্নয়ন, সংরক্ষণ ও বাউন্ডারি ওয়াল নির্মাণের কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।

সূত্র জানায়, বাংলাদেশের জ্বালানি খাত প্রধানত জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল, যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং সংবেদনশীল। প্যারিস জলবায়ু চুক্তি, কোপ-২৬-এর সিদ্ধান্ত, এসডিজির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন, ইন্টিগ্রেটেড এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার মাস্টার প্ল্যান (আইইপিএমপি) ২০২৩ এবং সুন্দরবনের পরিবেশগত সুরক্ষা নিশ্চিতকরণসহ সব দিক বিবেচনা করে সরকারের সিদ্ধান্তের আলোকে জীবাশ্ম জ্বালানির পরিবর্তে নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে আলোচ্য প্রকল্পটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের পরিবর্তে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প হিসেবে প্রস্তাব করা হয়েছে।

জানা যায়, প্রস্তাবিত রামপাল ৪৪২ মে.ও. পিক (ডিসি) সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মাধ্যমে জীবাশ্ম জ্বালানির (গ্যাস/তেল/কয়লা) ওপর নির্ভরতা হ্রাস করে সরকারের জ্বালানি বহুমুখীকরণ কৌশল বাস্তবায়নে সহায়ক হবে এবং কার্বন ডাই-অক্সাইড, সালফার অক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড, বস্তুকণা/ক্ষুদ্র কণিকা নিঃসরণ সম্পূর্ণ শূন্য থাকবে, যা সুন্দরবন বাফার জোনের পরিবেশগত সুরক্ষা নিশ্চিত করবে এবং একইসঙ্গে কার্বন ক্রেডিট অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বাবিউবোর বোর্ড সভার সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে ব্লক-বি এলাকায় সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের লক্ষ্যে ২০২২ সালে ইন-হাউস সম্ভাব্যতা যাচাই সম্পন্ন করা হয়। প্রস্তাবিত প্রকল্পের অর্থায়নের নিমিত্তে ২০২২ সালের ২২ মে বিইআরসি কর্তৃক প্রকল্পের মোট ব্যয়ের ৮৫ শতাংশ অর্থাৎ ২ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা অর্থায়নের নীতিগত অনুমোদন প্রদান করা হয়।

প্রস্তাবিত প্রকল্পটি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বিস্তারিত ‘সম্ভাব্যতা সমীক্ষা’ সম্পাদন করার নিমিত্তে তৃতীয় পক্ষ পরামর্শক সরকারি প্রতিষ্ঠান আইআইএফসি কর্তৃক সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ২০২৫ সালের মে মাসে সম্পন্ন করা হয়েছে। সম্ভাব্যতা সমীক্ষার সুপারিশ অনুযায়ী, প্রকল্পের প্রস্তুতকৃত ডিপিপি ২০২৫ সালের ৪ জুন বিদ্যুৎ বিভাগে প্রেরণ করা হয়। এ বছর ২৫ ফেব্রুয়ারি প্রকল্পের যাচাই কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। যাচাই কমিটির সভার সিদ্ধান্ত/সুপারিশের আলোকে বিদ্যুৎ বিভাগ কর্তৃক ডিপিপি পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর নীতিগত সম্মতি রয়েছে।