বুধবার, ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ২১ আশ্বিন ১৪৩৩

সুলতান রহমান বাপ্পি 

প্রকাশ: ২০:৩০, ৭ অক্টোবর ২০২৬

ট্রাম্পের সঙ্গে তারেক-জুবাইদার আলোচিত ছবি নিয়ে তোলপাড় 

ট্রাম্পের সঙ্গে তারেক-জুবাইদার আলোচিত ছবি নিয়ে তোলপাড় 

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেওয়া নৈশভোজে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তাঁর স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেওয়া নৈশভোজে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তাঁর স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমানের সঙ্গে ট্রাম্পের বহুল আলোচিত একটি ছবি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা আলোচনা চলছে। ৩ অক্টোবর ছবিটি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে প্রকাশের পর প্রশ্ন ওঠে—ছবিটি কি সত্যিই হোয়াইট হাউস প্রকাশ করেছে, নাকি এটি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকেই প্রকাশ করা হয়েছে?
তবে অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য বলছে, ৩ অক্টোবর ছবিটি প্রথমবার প্রকাশিত হয়নি। এর আগেই ২২ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত নৈশভোজ-সংক্রান্ত বাসসের প্রকাশনায় একই আয়োজনের ছবির সঙ্গে ‘হোয়াইট হাউস’ ক্রেডিট ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়।
তবে এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে ছবিটিকে ‘হোয়াইট হাউসের ছবি’, ‘হোয়াইট হাউসের সৌজন্যে পাওয়া ছবি’ এবং ‘হোয়াইট হাউস প্রকাশিত ছবি’—বিভিন্নভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। ফলে ছবিটির সঙ্গে হোয়াইট হাউসের সম্পর্কের বিষয়ে শক্ত প্রমাণ থাকলেও হোয়াইট হাউসের নিজস্ব সরকারি ওয়েবসাইটে বা নির্দিষ্ট কোনো সরকারি মাধ্যমে ছবিটির প্রথম প্রকাশনার মূল লিংক এখনো শনাক্ত করা যায়নি।
জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশনে অংশ নিতে নিউইয়র্কে যাওয়া বিশ্বনেতা ও তাঁদের জীবনসঙ্গীদের সম্মানে ২২ সেপ্টেম্বর রাতে নৈশভোজের আয়োজন করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প।
নিউইয়র্কের লোটে নিউইয়র্ক প্যালেস হোটেলে আয়োজিত ওই অনুষ্ঠানে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান এবং তাঁদের জীবনসঙ্গীরা অংশ নেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তাঁর স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমানও ওই নৈশভোজে উপস্থিত ছিলেন।
বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা—বাসস ২৩ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক ইংরেজি প্রতিবেদনে ট্রাম্পের দেওয়া নৈশভোজে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তাঁর স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমানের অংশগ্রহণের কথা জানায়। পরবর্তী সময়ে বাসসের ছবির পাতায় একই নৈশভোজের একটি ছবির পরিচিতিতে ‘ছবি: হোয়াইট হাউস’ উল্লেখ করা হয়।
এই তথ্যটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর মাধ্যমে অন্তত এতটুকু নিশ্চিত হওয়া যায় যে, ৩ অক্টোবর ছবিটি প্রথমবার জনসমক্ষে আসে—এমন ধারণা সঠিক নয়।
নৈশভোজের ১১ দিন পর, ৩ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় তারেক রহমান, ডা. জুবাইদা রহমান ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের একসঙ্গে দাঁড়ানো আলোচিত ছবিটি নতুন করে প্রকাশ করে।
ছবিটি প্রকাশের পর বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনায় আসে এবং ছবিটির উৎস ও সত্যতা নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দেয়। ‘
অর্থাৎ, প্রকাশকারী প্রতিষ্ঠান এবং ছবির উৎস—দুটি বিষয়কে আলাদা করে দেখার প্রয়োজন রয়েছে।
৩ অক্টোবরের পর বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে ব্যবহৃত ভাষায় কিছুটা পার্থক্য দেখা যায়।
বাংলাদেশ পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হোয়াইট হাউস ছবিটি প্রকাশ করার পর প্রধানমন্ত্রী তাঁর ফেসবুক পাতায় ছবিটি শেয়ার করেন। ঢাকা ট্রিবিউনও একই ধরনের বক্তব্য প্রকাশ করেছে।
ছবিটির উৎস নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি হলো—হোয়াইট হাউস যদি ছবিটি প্রকাশ করে থাকে, তাহলে তাদের সরকারি ওয়েবসাইটে ছবিটি কোথায়?
হোয়াইট হাউসের সরকারি ওয়েবসাইটে ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনকে কেন্দ্র করে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিভিন্ন কর্মসূচির একটি সরকারি আলোকচিত্র প্রদর্শনী রয়েছে। সেখানে ট্রাম্পের বিভিন্ন কার্যক্রমের ছবি প্রকাশ করা হয়েছে।
তবে ওই সরকারি আলোকচিত্র প্রদর্শনীতে তারেক রহমান, ডা. জুবাইদা রহমান ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের নৈশভোজের আলোচিত ছবিটি আলাদাভাবে পাওয়া যায়নি।
এখানে একটি বিষয় বিবেচনায় রাখা জরুরি। কোনো ছবি হোয়াইট হাউসের সঙ্গে সম্পর্কিত হলেই সেটি অবশ্যই হোয়াইট হাউসের মূল ওয়েবসাইটের নির্দিষ্ট গ্যালারিতে থাকতে হবে—এমনটি ধরে নেওয়া যায় না। সরকারি ছবি বিভিন্ন সরকারি যোগাযোগমাধ্যম, প্রেস ব্যবস্থাপনা বা ছবি বিতরণব্যবস্থার মাধ্যমেও সরবরাহ করা হতে পারে।
তাই সরকারি ওয়েবসাইটের নির্দিষ্ট গ্যালারিতে ছবিটি না পাওয়া যাওয়াকে এককভাবে ছবিটির হোয়াইট হাউস-সম্পর্ক অস্বীকারের প্রমাণ হিসেবে দেখা যায় না।
রয়টার্স, বিবিসি ও সিএনএনসহ বড় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এই নির্দিষ্ট ছবি এবং এর উৎস নিয়ে স্বাধীনভাবে প্রকাশিত কোনো প্রতিবেদন এই অনুসন্ধানে পাওয়া যায়নি।
তাই আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনের অনুপস্থিতিকে ছবিটি সত্য বা মিথ্যা—কোনোটিরই প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা সমীচীন হবে না।
বর্তমানে ছবিটির উৎসের পক্ষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণগুলো হলো—হোয়াইট হাউস ক্রেডিটসহ প্রকাশিত ছবি, বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন এবং সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের বক্তব্য।
৩ অক্টোবর ছবিটি প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবিটি কৃত্রিম বা পরিবর্তিত—এমন দাবি ছড়িয়ে পড়ে।
তবে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং এসব দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। 
প্রেস উইং একই সঙ্গে ছবিটিকে কৃত্রিম প্রমাণের চেষ্টা এবং অন্য একটি কৃত্রিম ছবি ব্যবহার করে বিভ্রান্তি তৈরির অভিযোগও করেছে।
অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্যগুলো একত্রে বিচার করলে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট।২২ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেওয়া নৈশভোজে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও ডা. জুবাইদা রহমান উপস্থিত ছিলেন।নৈশভোজের ছবি ৩ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় নতুন করে প্রকাশ করে।ছবিটির উৎস হিসেবে হোয়াইট হাউসের নাম একাধিক সংবাদমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়েছে। বাসসের প্রকাশনায় নৈশভোজের ছবির সঙ্গে ‘ছবি:হোয়াইট হাউস’ ক্রেডিট পাওয়া যায়। কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে বলা হয়েছে, হোয়াইট হাউস ছবিটি প্রকাশ করার পর প্রধানমন্ত্রী তা তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করেন।হোয়াইট হাউসের সরকারি ওয়েবসাইটের ২২ সেপ্টেম্বরের আলোকচিত্র প্রদর্শনীতে আলোচিত ছবিটি আলাদাভাবে পাওয়া যায়নি।
উপলব্ধ তথ্য ও দেশীয় সংবাদমাধ্যমের প্রকাশিত বিভিন্ন সূত্র একত্রে বিচার করলে সবচেয়ে সতর্ক ও তথ্যনির্ভর সিদ্ধান্ত হলো—তারেক রহমান, ডা. জুবাইদা রহমান ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের নৈশভোজের আলোচিত ছবিটির সঙ্গে হোয়াইট হাউসের সরাসরি সম্পর্কের একাধিক প্রমাণ রয়েছে।
বিশেষ করে ২২ সেপ্টেম্বরের নৈশভোজ-সংক্রান্ত বাসসের ছবির প্রকাশনায় ‘ছবি: হোয়াইট হাউস’ ক্রেডিট পাওয়া গেছে। ৩ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ছবিটি নতুন করে প্রকাশ করেছে এবং একাধিক সংবাদমাধ্যম ছবিটিকে হোয়াইট হাউসের সৌজন্যে পাওয়া ছবি হিসেবে উল্লেখ করেছে। কিছু সংবাদমাধ্যম আরও জানিয়েছে, হোয়াইট হাউস ছবিটি প্রকাশ করার পর প্রধানমন্ত্রী তা তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করেন।
অতএব, ৩ অক্টোবর ছবিটি প্রথমবার অস্তিত্বে এসেছে বা ওই দিনই প্রথম জনসমক্ষে এসেছে—এমন দাবি সঠিক নয়। অন্তত ২২ সেপ্টেম্বরের নৈশভোজ-সংক্রান্ত প্রকাশনা থেকেই ছবিটির হোয়াইট হাউস-সম্পর্কিত ক্রেডিটের প্রমাণ পাওয়া যায়।
তবে একই সঙ্গে এটিও বলা জরুরি—হোয়াইট হাউসের নিজস্ব সরকারি ওয়েবসাইট বা অন্য কোনো নির্দিষ্ট সরকারি মাধ্যমে ছবিটির প্রথম প্রকাশনার মূল উৎস এখনো শনাক্ত করা যায়নি