শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ২২ কার্তিক ১৪৩৩

স্টাফ রিপোর্টার, শেয়ার বিজ ডেস্ক :

প্রকাশ: ১১:৫৩, ৭ নভেম্বর ২০২৬

সেন্টমার্টিন যেতে জাহাজভাড়া ৪২০০ টাকা, হোটেল ও খাবার মিলিয়ে মোট খরচ কত?

সেন্টমার্টিন যেতে জাহাজভাড়া ৪২০০ টাকা, হোটেল ও খাবার মিলিয়ে মোট খরচ কত?

দীর্ঘ নয় মাসের স্থবিরতা কাটিয়ে আবারও পর্যটকদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে সেন্টমার্টিন দ্বীপ

দীর্ঘ নয় মাসের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে আবারও পর্যটকদের জন্য খুলেছে বাংলাদেশের একমাত্র প্রবালসমৃদ্ধ দ্বীপ সেন্টমার্টিন। পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল শুরু হতেই দ্বীপজুড়ে ফিরেছে প্রাণচাঞ্চল্য। চলতি মৌসুমের প্রথম দিনেই ৮৩৭ জন পর্যটক নিয়ে দ্বীপে পৌঁছেছে এমভি বার আউলিয়া। দীর্ঘদিন পর পর্যটকদের আগমনে আনন্দে ভাসছেন স্থানীয় বাসিন্দা, হোটেল মালিক ও ব্যবসায়ীরা।

তবে সেন্টমার্টিন ভ্রমণে যাওয়ার আগে অনেকের মনেই প্রশ্ন, কক্সবাজার থেকে জাহাজের ভাড়া কত? দ্বীপে হোটেল, খাবার ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে কত টাকা বাজেট রাখতে হবে? পর্যটকদের জন্য কী কী নিয়ম রয়েছে? এসব বিষয় জানা থাকলে ভ্রমণের পরিকল্পনা করা অনেক সহজ হবে।

প্রথম দিনেই সেন্টমার্টিনে ৮৩৭ পর্যটক, ফিরেছে উৎসবের আমেজ

বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সকাল সাড়ে ৭টার দিকে কক্সবাজার শহরের নুনিয়ারছড়ায় অবস্থিত বিআইডব্লিউটিএ জেটি ঘাট থেকে ৮৩৭ জন যাত্রী নিয়ে সেন্টমার্টিনের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে এমভি বার আউলিয়া।

প্রায় ছয় ঘণ্টার সমুদ্রযাত্রা শেষে দুপুর দেড়টার দিকে জাহাজটি সেন্টমার্টিন জেটিঘাটে পৌঁছায়। দীর্ঘ বিরতির পর পর্যটকবাহী জাহাজের আগমনকে কেন্দ্র করে দ্বীপে তৈরি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ। জাহাজ থেকে নামার পর পর্যটকদের ফুল দিয়ে স্বাগত জানান স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম জানান, ৮০০ জনের বেশি পর্যটক নিয়ে এমভি বার আউলিয়া দ্বীপে পৌঁছেছে। পর্যটকদের বরণ করে নেওয়ার পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণের বিষয়েও সচেতন করা হয়েছে। বিশেষ করে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে।

এ সময় জেটিঘাটে স্থানীয় কোস্টগার্ড, পুলিশ ও পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।

কক্সবাজার থেকে সেন্টমার্টিন যেতে জাহাজভাড়া কত?

সেন্টমার্টিন ভ্রমণের জন্য পর্যটকদের প্রথমে কক্সবাজার শহরের নুনিয়ারছড়ায় অবস্থিত বিআইডব্লিউটিএ জেটি ঘাটে যেতে হবে। সেখান থেকে এমভি বার আউলিয়া, এমভি কর্ণফুলীসহ অনুমোদিত পর্যটকবাহী জাহাজে দ্বীপে যাওয়া যায়।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজার শহর থেকে নুনিয়ারছড়া জেটিঘাটে টমটমে যেতে জনপ্রতি প্রায় ১৫০ টাকা খরচ হয়। জাহাজের টিকিটের মূল্য জনপ্রতি ৪ হাজার ২০০ টাকা।

অর্থাৎ কক্সবাজার শহর থেকে জেটিঘাটে যাওয়া এবং জাহাজে সেন্টমার্টিন পৌঁছানোর জন্য জনপ্রতি প্রাথমিক যাতায়াত খরচ প্রায় ৪ হাজার ৩৫০ টাকা। এর বাইরে দ্বীপে প্রবেশের জন্য পরিবেশ সংরক্ষণ ফি এবং অন্যান্য খরচ যোগ হবে।

তবে জাহাজের টিকিট কাটার আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে বর্তমান ভাড়া ও টিকিটের শর্ত যাচাই করে নেওয়া উচিত।

সেন্টমার্টিনে হোটেল ও রিসোর্ট ভাড়া কত?

সেন্টমার্টিনে রাতযাপনের জন্য পর্যটকদের বিভিন্ন মানের হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজ রয়েছে। ভ্রমণের বাজেট এবং সুযোগ-সুবিধার ওপর নির্ভর করে পছন্দের আবাসন বেছে নেওয়া যায়।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, দ্বীপের আবাসন খরচের একটি ধারণা নিচে দেওয়া হলো।

আবাসনের ধরন প্রতি রাতের আনুমানিক ভাড়া
ইকোনমি হোটেল/রিসোর্ট ২,০০০–৩,৫০০ টাকা
স্ট্যান্ডার্ড হোটেল/রিসোর্ট ৪,৫০০–৭,০০০ টাকা
প্রিমিয়াম রিসোর্ট ৮,০০০–১২,০০০ টাকা

সাশ্রয়ী বাজেটে ভ্রমণ করতে চাইলে ইকোনমি হোটেল বা কটেজ বেছে নিতে পারেন। অন্যদিকে তুলনামূলক বেশি সুযোগ-সুবিধা ও আরামদায়ক পরিবেশ চাইলে স্ট্যান্ডার্ড কিংবা প্রিমিয়াম রিসোর্টে থাকতে পারেন।

ছুটির দিন ও পর্যটকের চাপ অনুযায়ী হোটেল ভাড়ায় পরিবর্তন হতে পারে। তাই আগে থেকে বুকিং ও ভাড়া নিশ্চিত করা ভালো।

সেন্টমার্টিনে খাবার ও অন্যান্য খরচ কত?

দ্বীপে ঘোরাঘুরির পাশাপাশি খাবারের খরচও ভ্রমণের বাজেটে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সাধারণ মানের রেস্তোরাঁয় প্রতি বেলার খাবারের জন্য জনপ্রতি প্রায় ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা খরচ হতে পারে।

তিন বেলা খাবারের জন্য প্রতিদিন জনপ্রতি আনুমানিক ৯০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা বাজেট রাখা যেতে পারে।

এ ছাড়া দ্বীপের ভেতরে যাতায়াত, ব্যক্তিগত কেনাকাটা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচের জন্য ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা রাখা ভালো।

সেন্টমার্টিন ভ্রমণের আনুমানিক খরচ

একজন পর্যটকের জন্য দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সম্ভাব্য খরচের একটি হিসাব নিচে তুলে ধরা হলো।

খরচের খাত আনুমানিক টাকা
টমটম ভাড়া ১৫০
জাহাজের টিকিট ৪,২০০
পরিবেশ সংরক্ষণ ফি ১০০
হোটেল ভাড়া (প্রতি রাত) ২,০০০–১২,০০০
তিন বেলার খাবার ৯০০–১,৫০০
অন্যান্য খরচ ৫০০–১,০০০

এ হিসাবে এক রাত অবস্থান করলে জনপ্রতি আনুমানিক ৭ হাজার ৮৫০ থেকে ১৮ হাজার ৯৫০ টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে। তবে হোটেলের ভাড়া ভাগাভাগি করে থাকা, খাবারের ধরন এবং ব্যক্তিগত খরচের ওপর মোট বাজেট নির্ভর করবে।

উল্লেখ্য, এই হিসাব দেওয়া ভাড়া ও খরচের ভিত্তিতে তৈরি। ফিরতি জাহাজভাড়া আলাদা করে যোগ করতে হবে, যদি উল্লেখিত টিকিটের মূল্য একমুখী হয়।

সেন্টমার্টিনে যেতে অনুমোদিত তিনটি জাহাজ

চলতি পর্যটন মৌসুমে সেন্টমার্টিন রুটে চলাচলের অনুমতি পেয়েছে তিনটি পর্যটকবাহী জাহাজ। এগুলো হলো এমভি বার আউলিয়া, এমভি কর্ণফুলী ও এমভি টেকনাফ।

জাহাজগুলোর যাত্রী ধারণক্ষমতা নিচে দেওয়া হলো।

জাহাজের নাম যাত্রী ধারণক্ষমতা
এমভি বার আউলিয়া ৮৫০ জন
এমভি কর্ণফুলী ৭৩২ জন
এমভি টেকনাফ ৭১৬ জন
মোট ২,২৯৮ জন

তিনটি জাহাজ মিলিয়ে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ২ হাজার ২৯৮ জন যাত্রী পরিবহনের সক্ষমতা রয়েছে। তবে জাহাজের ধারণক্ষমতা এবং দ্বীপে প্রবেশের অনুমোদিত পর্যটকসংখ্যা এক বিষয় নয়। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী পর্যটকের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করা হবে।

সেন্টমার্টিন ভ্রমণের সময়সীমা ও পর্যটকদের জন্য নতুন নিয়ম

সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১ নভেম্বর থেকে ১৫ মার্চ পর্যন্ত সেন্টমার্টিন পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত রাখার কথা রয়েছে। তবে পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল শুরু হয়েছে ৫ নভেম্বর থেকে।

এ মৌসুমে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৫০০ পর্যটক দ্বীপে যাওয়ার সুযোগ পাবেন। একই সঙ্গে দ্বীপে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৫০০ পর্যটকের রাতযাপনের সুযোগ রাখা হয়েছে।

পর্যটকদের জন্য কয়েকটি নিয়ম বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

1. দ্বীপে প্রবেশের জন্য জনপ্রতি ১০০ টাকা পরিবেশ সংরক্ষণ ফি দিতে হবে।

2. ভ্রমণের জন্য ট্রাভেল পাস সংগ্রহ করতে হবে।

3. কিউআর কোডযুক্ত টিকিট ছাড়া দ্বীপে প্রবেশ করা যাবে না।

4. দ্বীপে অবস্থানকালে পরিবেশ সংরক্ষণসংক্রান্ত নির্দেশনা মেনে চলতে হবে।

5. একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে।

এসব ব্যবস্থার উদ্দেশ্য হলো পর্যটকদের চলাচল নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি দ্বীপের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা।

সেন্টমার্টিনে যেসব কাজ নিষিদ্ধ

প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় দ্বীপে বেশ কিছু কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাখা হয়েছে। বিশেষ করে রাতের পরিবেশ ও সামুদ্রিক প্রাণীদের নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।

রাতে সৈকত ও আশপাশের এলাকায় আলো জ্বালানো, উচ্চ শব্দ সৃষ্টি এবং বারবিকিউ পার্টির আয়োজন করা নিষিদ্ধ। পাশাপাশি কেয়াবনে প্রবেশ, কেয়া ফল সংগ্রহ ও কেনাবেচাও করা যাবে না।

এ ছাড়া সামুদ্রিক কাছিম, পাখি, প্রবাল, শামুক, ঝিনুক, তারামাছ, রাজকাঁকড়া, সামুদ্রিক ঘাস ও শৈবালের ক্ষতি হয়—এমন কোনো কার্যক্রম চালানো যাবে না।

পর্যটকদের এসব নিয়ম মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। কারণ, সেন্টমার্টিনের সৌন্দর্যের মূল আকর্ষণ এর স্বাভাবিক পরিবেশ ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য।

পর্যটকদের ফিরে আসায় স্বস্তিতে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা

দীর্ঘ নয় মাস পর্যটন কার্যক্রম বন্ধ থাকায় সেন্টমার্টিনের স্থানীয় অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব পড়ে। হোটেল, রেস্তোরাঁ, দোকান, নৌযান ও পর্যটননির্ভর বিভিন্ন পেশার মানুষের আয় কমে যায়।

স্থানীয় রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী হামিদ হোসেন জানান, পর্যটক না থাকায় দীর্ঘদিন দোকান চালানো কঠিন হয়ে পড়েছিল। পর্যটকদের আগমন শুরু হওয়ায় আবার দোকান খুলেছেন তিনি।

স্থানীয় বাসিন্দা মো. জয়নালও দীর্ঘদিন পর দ্বীপে পর্যটকদের দেখে স্বস্তি প্রকাশ করেন। তাঁর ভাষায়, পর্যটন বন্ধ থাকায় সংসার চালাতে অনেক কষ্ট হয়েছে। এখন আবার মানুষের আনাগোনা শুরু হওয়ায় দ্বীপটি যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পেয়েছে।

পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত তরুণ মোহাম্মদ রহমতও আশা করছেন, নতুন মৌসুমে পর্যটকদের আগমনে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান বাড়বে।

প্রথমবার সেন্টমার্টিনে গিয়ে আবেগাপ্লুত পর্যটক

প্রথমবারের মতো সেন্টমার্টিনে আসা ঢাকার পর্যটক মোহাম্মদ নাহিদের কাছে দ্বীপে পৌঁছানোর অভিজ্ঞতা ছিল বিশেষ আবেগের।

তিনি জানান, দীর্ঘ অপেক্ষার পর প্রথমবার দ্বীপে পা রাখতে পেরে তাঁর খুব ভালো লেগেছে। সমুদ্রযাত্রা ছিল দারুণ। দ্বীপে পৌঁছে চারপাশের পরিবেশ দেখে মনে হয়েছে যেন স্বর্গে চলে এসেছেন।

প্রবেশের সময় কিউআর কোড স্ক্যান ও তথ্য যাচাইয়ের ব্যবস্থাও তাঁর ভালো লেগেছে। নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা দেখে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন তিনি।

পরিবেশ রক্ষা করেই পর্যটন চালুর প্রত্যাশা

সেন্টমার্টিনে পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল শুরু হওয়ায় স্থানীয় অর্থনীতি ও পর্যটন খাতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে দ্বীপের পরিবেশ রক্ষা করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

পর্যটকদের নিরাপত্তা, নিয়ম মেনে চলা এবং হয়রানি প্রতিরোধে প্রশাসন প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়েছে বলে জানিয়েছেন টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম অনীক চৌধুরী।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রত্যাশা, পর্যটকেরা সরকারি নির্দেশনা মেনে চললে সেন্টমার্টিনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অক্ষুণ্ন রাখা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে পর্যটননির্ভর স্থানীয় মানুষের জীবিকাও সচল থাকবে।

দীর্ঘ বিরতির পর ৮৩৭ পর্যটকের আগমন তাই শুধু নতুন পর্যটন মৌসুমের সূচনা নয়, সেন্টমার্টিনের হাজারো মানুষের জীবনে নতুন আশার বার্তাও নিয়ে এসেছে।