শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ২২ কার্তিক ১৪৩৩

​​​​​​​ইমতিয়াজ আহমেদ, নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশ: ১২:০২, ৭ নভেম্বর ২০২৬

ডিসেম্বরেই খুলছে পঞ্চবটি-মুক্তারপুর এক্সপ্রেসওয়ে

ডিসেম্বরেই খুলছে পঞ্চবটি-মুক্তারপুর এক্সপ্রেসওয়ে

ছবি সংগৃহীত

নারায়ণগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জের যোগাযোগব্যবস্থায় নতুন দিগন্তের সূচনা হতে যাচ্ছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে আগামী ডিসেম্বরেই যান চলাচলের জন্য পুরোপুরি উন্মুক্ত হতে যাচ্ছে পঞ্চবটি-মুক্তারপুর এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে। প্রায় ৯ কিলোমিটার দীর্ঘ এই উড়াল সড়ক ঘিরে দুই জেলার মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে ব্যাপক প্রত্যাশা। সড়কটি চালু হলে নারায়ণগঞ্জের পঞ্চবটি, ফতুল্লা, বিসিক শিল্পনগরী, কাশীপুর ও আশপাশের এলাকার সঙ্গে মুন্সীগঞ্জের সরাসরি যোগাযোগ আরও সহজ হবে। একই সঙ্গে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-মুন্সীগঞ্জ অঞ্চলের পণ্য পরিবহন ও আঞ্চলিক বাণিজ্যে নতুন গতি আসবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এরই মধ্যে উড়াল সড়কের একটি অংশ পরীক্ষামূলকভাবে যান চলাচলের জন্য চালু করা হয়েছে। টোল আদায়ের ব্যবস্থাও কার্যকর করা হচ্ছে। প্রকল্পের মূল কাঠামোর কাজ শেষ পর্যায়ে থাকলেও সংযোগ সড়ক, টোল প্লাজা, নিরাপত্তা ও আনুষঙ্গিক কিছু কাজ সম্পন্ন করার তৎপরতা চলছে। সবকিছু ঠিক থাকলে ডিসেম্বরের দ্বিতীয় থেকে তৃতীয় সপ্তাহের মধ্যে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের লক্ষ্য রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মাধ্যমে প্রকল্পটি উদ্বোধনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম গত ১৫ অক্টোবর প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করে ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে সড়কটি যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করার আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, নির্মাণকাজের অগ্রগতি সন্তোষজনক এবং অবশিষ্ট কাজ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করার চেষ্টা চলছে।

টোল প্লাজা: পঞ্চবটি প্রবেশমুখে কোনো টোল প্লাজা নেই; সব টোল প্লাজা স্থাপন করা হয়েছে কাশিপুরে, যেখানে মোট ১০টি লেনের মাধ্যমে টোল আদায় করা হবে। এর মধ্যে ছয়টি লেন দিয়ে মূল এলিভেটেড সড়কে দ্রুত চলাচল করা যাবে।

ব্রেকডাউন লেন: মূল লেনের পাশাপাশি মাঝখানে ডটেড লাইন দিয়ে প্রায় আড়াই মিটার অতিরিক্ত জায়গা রাখা হয়েছে, যা বিকল হওয়া গাড়ি নিরাপদে সরিয়ে রাখার ব্রেকডাউন লেন হিসেবে ব্যবহার হবে। এই প্রকল্প চালুর ফলে নারায়ণগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জ অঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থা সহজ হবে এবং দীর্ঘদিনের তীব্র যানজটের নিরসন হবে।

৯ কিলোমিটার সড়ক: প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, এটি মূলত ‘পঞ্চবটি থেকে মুক্তারপুর সেতু পর্যন্ত সড়ক প্রশস্তকরণ ও দোতলা রাস্তা নির্মাণ’ প্রকল্প। এর আওতায় পঞ্চবটি থেকে চরসৈয়দপুর পর্যন্ত ৬ দশমিক ২৫ কিলোমিটার দীর্ঘ দ্বিতল সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে। এর সঙ্গে রয়েছে প্রায় ৩ কিলোমিটার সংযোগ সড়ক ও র্যাম্প। পঞ্চবটি মোড়ে তিনটি এবং কাশীপুরে দুটি র্যাম্প নির্মাণ করা হয়েছে। ফলে বিভিন্ন দিক থেকে আসা যানবাহন উড়াল সড়কে উঠতে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নিচে নামতে পারবে।

ওপরের সড়কটি ১১ মিটার প্রশস্ত। এতে দুটি চলাচলের লেনের পাশাপাশি বিকল যানবাহন সরিয়ে রাখার জন্য অতিরিক্ত জায়গা রাখা হয়েছে। নিচের অংশে থাকছে ৫৪ ফুট প্রশস্ত চার লেনের সড়ক। অর্থাৎ একই অবকাঠামোর ওপর দিয়ে একদিকে দ্রুতগতির যানবাহন চলাচল করবে, অন্যদিকে নিচের সড়ক ব্যবহার করতে পারবে স্থানীয় ও অন্যান্য যানবাহন।

প্রকল্পের এই নকশাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা। কারণ পঞ্চবটি থেকে ফতুল্লা, পঞ্চবটি-মুক্তারপুর সড়ক এবং বিসিক শিল্পাঞ্চলমুখী যানবাহনের চাপ দীর্ঘদিনের। বিশেষ করে পঞ্চবটি মোড়, কাশীপুর, ফতুল্লা ও আশপাশের এলাকায় যানজটের কারণে পণ্যবাহী ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও যাত্রীবাহী পরিবহনের দীর্ঘ সময় নষ্ট হয়। দ্বিতীয় তলার সড়ক চালু হলে দূরপাল্লার ও দ্রুতগতির যানবাহন নিচের স্থানীয় যানবাহনের সঙ্গে একই সড়কে প্রতিযোগিতা করবে না।

৩ হাজার ৩১৮ কোটি টাকার প্রকল্প: এই অবকাঠামো নির্মাণে ব্যয় হচ্ছে ৩ হাজার ৩১৮ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। ২০২১ সালের জানুয়ারিতে শুরু হওয়া প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত নির্ধারিত। একটি চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন করছে।

প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন হিসাব পাওয়া গেলেও অক্টোবরের শেষ দিকে প্রকল্পের অগ্রগতি প্রায় ৯৯ শতাংশ বলে জানানো হয়েছে। এখন মূলত টোল প্লাজার সফটওয়্যার ও হার্ডওয়্যার স্থাপন, র্যাম্পের রেলিং, নিচের সড়কে অতিরিক্ত পিচের প্রলেপ, আলোকসজ্জা এবং সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ চলছে।

প্রকল্প পরিচালক মো. ওয়াহিদুজ্জামান জানিয়েছেন, ডিসেম্বরের দ্বিতীয় থেকে তৃতীয় সপ্তাহের মধ্যে উদ্বোধনের লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে। উদ্বোধনের জন্য প্রধানমন্ত্রীর সময় চেয়ে সারসংক্ষেপ পাঠানো হয়েছে। অর্থাৎ উদ্বোধনের সম্ভাব্য সময় নির্ধারণের প্রস্তুতি থাকলেও চূড়ান্ত তারিখ এখনো নিশ্চিত নয়।

টোল দিতে হবে উড়াল সড়কে: উড়াল সড়কটি চালু হওয়ার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে টোলের বিষয়টি। সরকার এরই মধ্যে যানবাহনের শ্রেণি অনুযায়ী টোলের হার নির্ধারণ করেছে। কাশীপুরে স্থাপন করা হচ্ছে টোল প্লাজা। সেখানে ১০টি লেন থাকবে। এর মধ্যে ছয়টি লেন দিয়ে মূল এলিভেটেড সড়কে যানবাহন চলাচল করবে। অন্য চারটি লেন দিয়ে যানবাহন ওঠানামা করবে।

নির্ধারিত টোল অনুযায়ী, মোটরসাইকেলে পঞ্চবটি থেকে চরসৈয়দপুর যেতে দিতে হবে ৪০ টাকা, কাশীপুর পর্যন্ত ২০ টাকা। তিন চাকার সিএনজি অটোরিকশার ক্ষেত্রে যথাক্রমে ৫০ ও ৩০ টাকা।

প্রাইভেটকার ও জিপের জন্য টোল নির্ধারণ করা হয়েছে ১০০ ও ৫০ টাকা। মাইক্রোবাস ও পিকআপের জন্য ১৫০ ও ১০০ টাকা। মিনিবাসের জন্য ২০০ ও ১২৫ টাকা। ৩১ আসনের বেশি ধারণক্ষমতার বাসের জন্য ৩০০ ও ১৫০ টাকা।

এ ছাড়া ছয় চাকার ট্রাকের জন্য ৪০০ ও ২০০ টাকা, ১০ চাকার ট্রাকের জন্য ৬০০ ও ৪০০ টাকা এবং ট্রেইলারের জন্য ৮০০ ও ৫০০ টাকা টোল নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রথম অঙ্কটি পঞ্চবটি-চরসৈয়দপুর এবং দ্বিতীয়টি পঞ্চবটি-কাশীপুর যাতায়াতের জন্য।

তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রকাশিত প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী যান চলাচলের জন্য সড়কটি উন্মুক্ত হওয়ার দিন থেকে টোল কার্যকর হবে। টোল প্লাজার যন্ত্রপাতি ও সফটওয়্যার স্থাপনের কাজ চলা এবং পরীক্ষামূলক কার্যক্রমকে নিয়মিত টোল আদায়ের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা ঠিক হবে না।

বাড়বে শিল্প-বাণিজ্যের গতি: নারায়ণগঞ্জ বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান শিল্পাঞ্চল। ফতুল্লা, পঞ্চবটি, বিসিক, কাশীপুর ও মুন্সীগঞ্জের শিল্পকারখানার সঙ্গে পণ্য পরিবহনের একটি বড় অংশ এই সড়ক ব্যবহার করে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক, নিটওয়্যার, খাদ্যপণ্য ও বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামাল পরিবহনে সড়কটির গুরুত্ব রয়েছে।

বর্তমানে যানজটের কারণে অনেক সময় নির্ধারিত সময়ে পণ্য পরিবহন সম্ভব হয় না। ট্রাক ও কাভার্ডভ্যানকে দীর্ঘ সময় সড়কে আটকে থাকতে হয়। এতে জ্বালানি খরচ বাড়ে, পরিবহন ব্যয় বাড়ে এবং সময়মতো পণ্য সরবরাহ ব্যাহত হয়।

এলিভেটেড সড়ক চালু হলে এসব সমস্যা কিছুটা কমবে বলে আশা করছেন ব্যবসায়ীরা। বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জ থেকে মুন্সীগঞ্জ এবং ঢাকার সঙ্গে পণ্য পরিবহনে নতুন সুবিধা তৈরি হবে। তবে শুধু উড়াল সড়ক নির্মাণ করলেই শিল্পাঞ্চলের সব যানজট দূর হবে না। পঞ্চবটি, ফতুল্লা, বিসিক ও শহরের প্রবেশমুখের সড়ক ব্যবস্থাপনা উন্নত করা না গেলে নতুন সড়কের সুফলও সীমিত হতে পারে।

প্রকল্পের সমীক্ষায় বলা হয়েছে, অবকাঠামোটি পুরোপুরি চালু হলে যাতায়াতের সময় প্রায় ৬২ দশমিক ৮৯ শতাংশ কমতে পারে। যানবাহনের গড় গতি বর্তমানের তুলনায় প্রায় ৪ দশমিক ৪৫ গুণ বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যানজটজনিত বিলম্ব কমতে পারে প্রায় ৭৪ দশমিক ৭৪ শতাংশ। তবে এগুলো প্রকল্পের সমীক্ষাভিত্তিক পূর্বাভাস, বাস্তবে সুফল কতটা পাওয়া যাবে তা নির্ভর করবে যান চলাচল ব্যবস্থাপনার ওপর।

নিচের সড়ক ও স্থানীয় মানুষের স্বার্থ: প্রকল্পটির একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, উড়াল সড়কের নিচের চার লেনের রাস্তা টোলমুক্ত রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে যারা স্বল্প দূরত্বে চলাচল করবেন কিংবা স্থানীয় গন্তব্যে যাবেন, তাদের জন্য বিকল্প সড়ক ব্যবহারের সুযোগ থাকবে। অন্যদিকে দ্রুত যাতায়াত করতে ইচ্ছুক যানবাহনকে টোল দিয়ে ওপরের সড়ক ব্যবহার করতে হবে।

তবে টোলের হার নিয়ে এরই মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। মুন্সীগঞ্জের কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) পক্ষ থেকে নির্ধারিত টোলকে ব্যয়বহুল উল্লেখ করে তা কমানোর দাবি জানানো হয়েছে। বিশেষ করে স্বল্প দূরত্বে চলাচলকারী যানবাহনের জন্য টোলের বিষয়টি পুনর্বিবেচনার দাবি রয়েছে।

সড়কটি চালু হলে স্থানীয় পরিবহন শ্রমিক, ব্যবসায়ী ও সাধারণ যাত্রীদের ওপর এর প্রভাব কী হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। টোলের কারণে কেউ যদি ওপরের সড়ক ব্যবহার না করে নিচের সড়কে অতিরিক্ত যানবাহন নিয়ে আসে, তাহলে নিচের অংশে আবারও যানজট তৈরি হতে পারে। তাই উভয় স্তরের সড়কে যানবাহন চলাচলের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা প্রয়োজন।

উদ্বোধনের অপেক্ষায় দুই জেলা: পঞ্চবটি-মুক্তারপুর এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে শুধু একটি উড়াল সড়ক নয়, এটি নারায়ণগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জের অর্থনৈতিক যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। দীর্ঘদিনের যানজট, পণ্য পরিবহনে বিলম্ব এবং আঞ্চলিক যোগাযোগের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠার ক্ষেত্রে প্রকল্পটি নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।

তবে প্রকল্পের সফলতা নির্ভর করবে শুধু উদ্বোধনের ওপর নয়; নির্ভর করবে সড়কটির মান, নিরাপত্তা, টোল ব্যবস্থাপনা, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং আশপাশের সড়কের সক্ষমতার ওপর। বিশেষ করে পঞ্চবটি থেকে চাষাঢ়া এবং ফতুল্লা থেকে বিসিক পর্যন্ত সংযোগ সড়কগুলোর যানজট নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

ডিসেম্বরের দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে এই নতুন যোগাযোগ অবকাঠামোর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হওয়ার প্রত্যাশা রয়েছে। এখন দুই জেলার মানুষের অপেক্ষা—কবে থেকে পুরোপুরি ব্যবহার করা যাবে বহুল প্রতীক্ষিত এই উড়াল সড়ক। তাদের প্রত্যাশা, উদ্বোধনের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার পর যেন প্রকল্পটি কাগজে-কলমে নয়, বাস্তবেই যানজটমুক্ত ও গতিশীল যোগাযোগের সুফল এনে দেয়।