মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১৮ কার্তিক ১৪৩৩

মীর আনিস

প্রকাশ: ২২:৫১, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ছয় শিশুর মৃত্যু 

তিন মাসেও মেলেনি ক্ষতিপূরণের টাকা

তিন মাসেও মেলেনি ক্ষতিপূরণের টাকা

ছবি সংগৃহীত

‘সেবাই ধর্ম’ এমন স্লোগান পুঁজি করেই ব্যবসা করছে আদ্-দ্বীন হাসপাতাল। এই ধর্মকে পুজি করেই অধর্মের কাজ করছে তারা। হাসপাতালের লাইসেন্স ফিরে  পেয়েই চোখ পাল্টি দেয় আদ্-দ্বীন  হাসপাতাল আইসিইউতে অবহেলাজনিত কারণে মৃত ছয় নবজাতকের পরিবারের সঙ্গে। প্রতিশ্রুত জনপ্রতি ৮০ লাখ টাকার মধ্যে ১০ লাখ দিয়েই তারা আর কোনো টাকা দিচ্ছে না, শুধু তালবাহানা করছে।
রাজধানীর মগবাজারের আদ-দ্বীন হাসপাতালে হাসপাতালের আইসিইউতে (ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট) অবহেলাজনিত কারণে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ছয় নবজাতকের মৃত্যুর প্রায় তিন মাস পার হতে চললেও এখনো প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ক্ষতিপূরণের টাকা পায়নি ভুক্তভোগী পরিবারগুলো। সুবিচারের আশায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও বিভিন্ন দপ্তরে বারবার গিয়েও খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে বলে অভিযোগ স্বজনদের। 
গত ২৭ মে ভোরে পোস্ট-অপারেটিভ ও আইসিইউ ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন অবস্থায় কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ছয় নবজাতকের করুণ মৃত্যু হয়। ঘটনার পরপরই গঠিত উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে হাসপাতালের অবকাঠামোগত ত্রুটি, অব্যবস্থাপনা এবং চিকিৎসক-নার্সদের চরম গাফিলতির প্রমাণ পাওয়া যায়। ঘটনার সময় ওয়ার্ডে কোনো দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক উপস্থিত ছিলেন না। সংকটময় মুহূর্তে শিশুদের যথাযথ চিকিৎসা দেওয়া হয়নি। হাসপাতাল ভবন ও সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের পরিবেশ অবকাঠামোগতভাবে অনুপযুক্ত ছিল।
৪ জুন ওই প্রতিবেদন প্রকাশের দিনই আদ-দ্বীন হাসপাতালকে কারণ দর্শাও নোটিস দেয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় হাসপাতালের লাইসেন্স কেন বাতিল করা হবে না, তা জানতে চাওয়া হয় নোটিসে।
তদন্ত প্রতিবেদনে হাসপাতালের অ বহেলার স্কষ্ট প্রমাণ মেলায় ‘মেডিকেল প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিকস অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজ অধ্যাদেশ, ১৯৮২’ লঙ্ঘনের দায়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর গত ১১ জুন আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের ঘোষণা দেয়। একই সঙ্গে লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ৩০ দিনের ভিতরে আপিল করার অনুমতি দেওয়া হয়।
এরপর হাসপাতাল কর্তৃক্ষ সরকারের কাছে আপিল করে। আপিল ও তদন্তসংক্রান্ত  নথি পর্যালোচনার পর স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ ২৭ জুলাই তিনটি শর্তে হাসপাতালের বহির্বিভাগের কার্যক্রম আবার চালু করার অনুমতি দেয়।
এই ঘটনার পর গত ০৭ জুন আদ-দ্বীন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের আইনজীবী ব্যারিস্টার শিশির মনিবের মধ্যস্থতায় ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে ৮০ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়। এই ঘোষণাটি ছিল শুভংকরের ফাঁকি।
ঘটনাটি নিয়ে তীব্র সমালোচনা সৃষ্টি হলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ প্রাথমিকভাবে কিছু আশ্বাস ও সামান্য অঙ্কের অর্থ হস্তান্তরের কথা বলেছে, কিন্তু দীর্ঘ তিন মাস ধরে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো পূর্ণাঙ্গ ক্ষতিপূরণের দাবির জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরেও কোনো সুরাহা পায়নি।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তালবাহানা ও অবহেলার বিচারে হাইকোর্টে একাধিক আইনজীবী রিট দায়ের করেছেন। হাইকোর্টে নিহত প্রতিটি শিশুর পরিবারের জন্য এক কোটি টাকা করে ক্ষতিপূরণ দাবি এবং দায়ী চিকিৎসকদের বিচার চেয়ে শুনানি সচল রয়েছে। 
ভুক্তভোগী পরিবারের একজন শেয়ার বিজকে জানান, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই মাসে যদি টাকা না দিতে পারে তাহলে তারা টাকা দেওয়ার একটা রোডম্যাপ দিবে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ব্যবহার ও আচারে মনে হয় না, তাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবে। তারা শুধু তালবাহানা করে সময়ক্ষেপণ করছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের পেছনে ঘুরতে ঘুরতে জুতার তলা ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে। তিনি অতিদ্রুত প্রতিশ্রুত ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং দায়ী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। 
এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তদন্ত প্রতিবেদনের আলোকেই আদালতের নির্দেশনানুযায়ী পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
এব্যাপারে আদ-দ্বীন হাসপাতালের পরিচালক (প্রশাসন) তারিকুল ইসলাম মুকুলকে ফোন ও ক্ষুদেবার্তা দেওয়া হলেও তিনি সাড়া দেননি।
আদ-দ্বীন হাসপাতালের পরিচালক (প্রশাসন) তারিকুল ইসলাম মুকুলের পক্ষে ডা. রুদ্র নামে একজন প্রতিবেদককে ফোন করে বলেন, আপনি 
আদ্-দ্বীন হাসপাতালের মহাপরিচালক ম্যামের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। তিনি কোনো মতামত দিতে পারবেন না বলে অপরাগতা জানান। 
আদ্-দ্বীন হাসপাতালের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাহিদ ইয়াসমিন শেয়ার বিজকে বলেন, আপনি কোন বিষয়ের ওপর জানতে চান, সেই বিষয়টা টেক্সট করেন আমি আপনাকে উত্তর লিখে পাঠাবে। তিনি ভয়েস মেসেস পাঠিয়ে বলেন, বিষয়টা নিয়ে আদালতে মামলা আছে বলে আমি কোনোা মতামত দিতে পারব না। 
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাসকে বারবার ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
অন্যদিকে যশোর আদ্-দ্বীন সখিনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসকদের অবহেলায় ইমরান (৩৫) নামে একজন মাছ ব্যবসায়ীর মৃত্যুর অভিযোগ নিয়ে তুলকালাম ঘটনা ঘটে।  যশোরের পুলেরহাটে অবস্থিত আদ্-দ্বীন সখিনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এই ঘটনা ঘটে এই বছরের ১১ জুন দিবাগত রাতে। 
এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে হাসপাতাল চত্বরে ব্যাপক উত্তেজনা সৃষ্টি হয় এবং নিহতের স্বজনসহ স্থানীয় জনতা দফায় দফায় বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। নিহত ইমরান যশোর জেলার শার্শা উপজেলার বাগআঁচড়া গাজীপাড়ার শওকত আলী বিশ্বাসের ছেলে।
নিহতের পরিবার ও প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগে জানা গেছে, তীব্র জ্বর ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে ইমরানকে বৃহস্কতিবার বিকাল ৫টায় আদ্-দ্বীন সখিনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে ভর্তি করে পুরুষ মেডিসিন ওয়ার্ডে পাঠান।
এই ওয়ার্ডে কর্তব্যরত সহকারী রেজিস্টার ডাক্তার রাহাত ও মেডিকেল অফিসার ডা. মুন্নি রোগীকে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই একের পর এক ইনজেকশন প্রয়োগ করেন।
নিহতের খালাতো ভাই ইসমাইল হোসেন অভিযোগ করেন, প্রথম ইনজেকশন দেওয়ার পর থেকেই ইমরান তীব্র অস্বস্তি বোধ করছিলেন। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের জানানো হলেও তারা গুরুত্ব দেননি। 
এরপর পরবর্তী ইনজেকশন দেওয়ার সাথে সাথেই ইমরানের মুখ দিয়ে ফেনা বের হতে শুরু করে এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি নিস্তেজ হয়ে পড়েন। এ সময় রোগীকে দ্রুত হাসপাতালের আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে রাত সাড়ে ১১টার দিকে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
এদিকে ভুল ইনজেকশন ও অবহেলায় ইমরানের মৃত্যু হয়েছে—এমন খবর ছড়িয়ে পড়লে নিহতের স্বজন, প্রতিবেশী ও স্থানীয় লোকজন হাসপাতালের সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। 
তারা ‘দায়ী’ চিকিৎসকদের বিচার ও শাস্তির দাবিতে স্লোগান দেন। খবর পেয়ে কোতোয়ালি মডেল থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি শান্ত করে।
ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্য ও স্থানীয়দের দাবি, এই হাসপাতালে চিকিৎসা অবহেলায় রোগী মৃত্যুর ঘটনা এটাই প্রথম নয়। এর আগেও একাধিকবার ভুল চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যু এবং সিজার, অপারেশন ও বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার নামে অতিরিক্ত অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। সাধারণ মানুষ ইতিপূর্বেও এই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে স্বাস্থ্য বিভাগে লিখিত অভিযোগ দিলেও কোনো সুফল পাননি।