রোববার, ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ১৮ আশ্বিন ১৪৩৩

রামিসা রহমান 

প্রকাশ: ২৩:১৩, ১৮ আগস্ট ২০২৬

ইউসিবি গুটিয়ে নিচ্ছে ন্যাশনাল হাউজিংয়ের বিনিয়োগ

ইউসিবি গুটিয়ে নিচ্ছে ন্যাশনাল হাউজিংয়ের বিনিয়োগ

ছবি সংগৃহীত

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ন্যাশনাল হাউজিং ফাইন্যান্স পিএলসিতে থাকা নিজেদের সব শেয়ার বিক্রির ঘোষণা দিয়েছে করপোরেট উদ্যোক্তা ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি)। ব্যাংকটির হাতে থাকা ন্যাশনাল হাউজিংয়ের ৫ লাখ ৬৩ হাজার ৫৬২টি শেয়ার আগামী ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে পাবলিক মার্কেটের মাধ্যমে বিক্রি করা হবে। 
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে দেওয়া ঘোষণায় ইউসিবি জানিয়েছে, ন্যাশনাল হাউজিং ফাইন্যান্সের এই শেয়ারগুলো বাজারে বিক্রি করা হবে। ফলে প্রতিষ্ঠানটির একটি করপোরেট উদ্যোক্তার হাতে থাকা পুরো অংশীদারত্বই ধীরে ধীরে বাজারে চলে আসবে।
এদিকে ইউসিবির পুরো শেয়ার বিক্রির ঘোষণার সময়ে ন্যাশনাল হাউজিং ফাইন্যান্সের আর্থিক ফলাফলেও কিছুটা ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেছে। চলতি ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে কোম্পানিটির সমন্বিত শেয়ারপ্রতি মুনাফা ৪৩ পয়সায় দাঁড়িয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৪১ পয়সা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে শেয়ারপ্রতি মুনাফা বেড়েছে ২ পয়সা বা প্রায় ৫ শতাংশ।
তবে বছরের প্রথম ছয় মাসে মুনাফা বাড়লেও দ্বিতীয় প্রান্তিকে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি মুনাফায় কোনো পরিবর্তন হয়নি। এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত তিন মাসে সমন্বিত শেয়ারপ্রতি মুনাফা হয়েছে ১৯ পয়সা। আগের বছরের একই সময়েও কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি মুনাফা ছিল ১৯ পয়সা।
অর্থাৎ প্রথম ছয় মাসের সামান্য মুনাফা প্রবৃদ্ধির পেছনে মূলত প্রথম প্রান্তিকের ফলাফলের অবদান রয়েছে। দ্বিতীয় প্রান্তিকে মুনাফা অপরিবর্তিত থাকায় বছরের দ্বিতীয়ার্ধে কোম্পানিটির আয় কতটা বাড়াতে পারে, সেটিও বিনিয়োগকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কোম্পানিটির প্রকাশিত আর্থিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৩০ জুন শেষে শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য দাঁড়িয়েছে ১৭ টাকা ৯৪ পয়সা। ফলে কোম্পানির সম্পদভিত্তি ও আয় সক্ষমতার পাশাপাশি ইউসিবির শেয়ার বিক্রির সিদ্ধান্তও বাজারে বিনিয়োগকারীদের নজর কেড়েছে।
ন্যাশনাল হাউজিং ফাইন্যান্স মূলত একটি ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটি আবাসন অর্থায়নের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের ঋণ, আমানত, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগে অর্থায়ন এবং ইজারা অর্থায়নের কার্যক্রম পরিচালনা করে। 
ইউসিবির হাতে থাকা ৫ লাখ ৬৩ হাজার ৫৬২টি শেয়ার ন্যাশনাল হাউজিংয়ের মোট শেয়ারের তুলনায় খুব বড় অংশ নয়। তবে করপোরেট উদ্যোক্তার পুরো অংশীদারত্ব বিক্রির ঘোষণা হওয়ায় বাজারে এর তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা তৈরি হতে পারে। সাধারণত কোনো উদ্যোক্তা বা করপোরেট বিনিয়োগকারী নিজেদের অংশীদারত্ব কমানোর ঘোষণা দিলে বিনিয়োগকারীরা এর কারণ, বিক্রির সম্ভাব্য প্রভাব এবং কোম্পানির ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক অবস্থান নিয়ে আগ্রহী হন।
তবে শুধু ইউসিবির শেয়ার বিক্রির ঘোষণার ভিত্তিতে ন্যাশনাল হাউজিংয়ের ব্যবসায়িক অবস্থান সম্পর্কে নেতিবাচক সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। কারণ কোনো করপোরেট উদ্যোক্তা নিজের বিনিয়োগ পুনর্বিন্যাস, তারল্য ব্যবস্থাপনা, মূলধন কাঠামো বা অন্য ব্যবসায়িক প্রয়োজনেও কোনো প্রতিষ্ঠানের শেয়ার বিক্রি করতে পারে। তাই ইউসিবির সিদ্ধান্তের প্রকৃত কারণ জানা না গেলে এটিকে কোম্পানিটির আর্থিক দুর্বলতার সরাসরি ইঙ্গিত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
অন্যদিকে ন্যাশনাল হাউজিংয়ের সামপ্রতিক আর্থিক ফলাফল বলছে, কোম্পানিটির মুনাফায় বড় ধরনের পতন হয়নি। বরং প্রথম ছয় মাসে সামান্য হলেও শেয়ারপ্রতি মুনাফা বেড়েছে। তবে দ্বিতীয় প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি না হওয়ায় মুনাফার ধারাবাহিকতা নিয়ে আরও কয়েকটি প্রান্তিকের ফলাফল দেখা প্রয়োজন।
বিনিয়োগকারীদের জন্য শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্যও গুরুত্বপূর্ণ। ৩০ জুন শেষে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য ১৭ টাকা ৯৪ পয়সা। এই সূচক কোম্পানিটির সম্পদের বিপরীতে প্রতিটি শেয়ারের হিসাবি মূল্য সম্পর্কে ধারণা দেয়। তবে বাজারে কোনো শেয়ারের মূল্য নির্ধারণে শুধু নিট সম্পদমূল্য নয়, ভবিষ্যৎ আয়, লভ্যাংশ, ঋণের মান, সম্পদের গুণগত মান এবং সামগ্রিক ব্যবসায়িক সম্ভাবনাও বিবেচনায় নিতে হয়।
ইউসিবির ঘোষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, শেয়ারগুলো একসঙ্গে কোনো নির্দিষ্ট বড় লেনদেনের মাধ্যমে বিক্রির কথা বলা হয়নি। বরং আগামী ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে পাবলিক মার্কেটের মাধ্যমে বিক্রির পরিকল্পনা করা হয়েছে। ফলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাজারে বিক্রির চাপ তৈরি হতে পারে কি না, সেটিও বিনিয়োগকারীদের নজরে থাকবে।
তবে বাস্তবে বাজারে শেয়ার বিক্রির প্রভাব নির্ভর করবে প্রতিদিন কতসংখ্যক শেয়ার বিক্রি করা হচ্ছে এবং একই সময়ে অন্য বিনিয়োগকারীদের চাহিদা কতটা রয়েছে, তার ওপর। চাহিদা শক্তিশালী থাকলে অতিরিক্ত শেয়ারবাজারে এলেও দরে বড় প্রভাব নাও পড়তে পারে। বিপরীতে চাহিদা দুর্বল হলে উদ্যোক্তার শেয়ার বিক্রি সাময়িকভাবে দরের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে।
ন্যাশনাল হাউজিংয়ের ক্ষেত্রে বর্তমান পরিস্থিতিতে তাই একদিকে রয়েছে করপোরেট উদ্যোক্তা ইউসিবির সম্পূর্ণ অংশীদারত্ব বিক্রির ঘোষণা, অন্যদিকে রয়েছে প্রথম ছয় মাসে মুনাফার সামান্য বৃদ্ধি। এই দুই তথ্যকে আলাদাভাবে মূল্যায়ন না করে কোম্পানিটির সামগ্রিক আর্থিক অবস্থার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।
কোম্পানিটির প্রথম ছয় মাসে শেয়ারপ্রতি মুনাফা ৪৩ পয়সা হওয়া আগের বছরের ৪১ পয়সার তুলনায় ইতিবাচক পরিবর্তন। কিন্তু মাত্র ২ পয়সার এই বৃদ্ধি খুব বড় ধরনের ব্যবসায়িক সমপ্রসারণের ইঙ্গিত দেয় না। একইভাবে দ্বিতীয় প্রান্তিকে মুনাফা অপরিবর্তিত থাকায় কোম্পানিটির আয় বৃদ্ধির গতি এখনো সীমিত বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে।
এ অবস্থায় ইউসিবির শেয়ার বিক্রির ঘোষণাকে কেন্দ্র করে বিনিয়োগকারীদের অতিরিক্ত আশাবাদী বা হতাশ হওয়ার পরিবর্তে কোম্পানিটির প্রকাশিত তথ্য পর্যবেক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে আগামী প্রান্তিকগুলোয় মুনাফা, ঋণ আদায়, সম্পদের মান, আয় এবং লভ্যাংশ দেওয়ার সক্ষমতায় কী ধরনের পরিবর্তন আসে, তা ন্যাশনাল হাউজিংয়ের ভবিষ্যৎ মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
ন্যাশনাল হাউজিং ফাইন্যান্স পিএলসির কোম্পানি সচিব মো. সরোয়ার কামালকে ফোন করা হলে তিনি কোনো উত্তর দেননি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের (ইউসিবি) এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা শেয়ার বিজকে বলেন, ন্যাশনাল হাউজিং ফাইন্যান্সে থাকা শেয়ার বিক্রির সিদ্ধান্ত ব্যাংকের বিনিয়োগ পোর্টফোলিও পুনর্বিন্যাসের প্রথম পৃষ্ঠার পর
অংশ। বাজার পরিস্থিতি ও বিনিয়োগ কৌশল বিবেচনা করেই শেয়ারগুলো বিক্রি করা হবে। এর সঙ্গে ন্যাশনাল হাউজিংয়ের ব্যবসা বা আর্থিক অবস্থার বিষয়ে কোনো বিশেষ মন্তব্যের সম্পর্ক নেই। 
বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আবুল কালাম শেয়ার বিজকে বলেন, ইউসিবি ন্যাশনাল হাউজিং ফাইন্যান্সের পুরো শেয়ার বিক্রির ঘোষণা দিয়েছে। এ ধরনের উদ্যোক্তা বা করপোরেট অংশীদারত্ব বিক্রির ক্ষেত্রে নির্ধারিত আইন ও প্রকাশ-সংক্রান্ত বিধিবিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে শেয়ার বিক্রির ঘোষণাকে কেন্দ্র করে বাজারে কোনো অস্বাভাবিক লেনদেন বা তথ্যের অপব্যবহার হচ্ছে কি না, সেটিও নিয়ন্ত্রক সংস্থা পর্যবেক্ষণ করে। বিনিয়োগকারীদের কোম্পানির প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ আল-আমিন শেয়ার বিজকে বলেন, ইউসিবির ন্যাশনাল হাউজিং থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তকে সরাসরি কোম্পানিটির দুর্বলতার প্রমাণ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। করপোরেট প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন সময় নিজেদের বিনিয়োগ পুনর্বিন্যাস, মূলধন ব্যবস্থাপনা বা কৌশলগত কারণে কোনো কোম্পানির অংশীদারত্ব বিক্রি করতে পারে। তবে বাজারে একটি বড় অংশীদারের শেয়ার বিক্রির ঘোষণা অবশ্যই বিনিয়োগকারীদের নজরে রাখার মতো বিষয়। বিশেষ করে ন্যাশনাল হাউজিংয়ের মুনাফা সামান্য বাড়লেও দ্বিতীয় প্রান্তিকে তা অপরিবর্তিত রয়েছে। তাই বিনিয়োগকারীদের ইউসিবির বিক্রির সিদ্ধান্তের পাশাপাশি কোম্পানিটির আয়, সম্পদ, ঋণমান ও ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক সক্ষমতাও বিশ্লেষণ করা উচিত। 
ন্যাশনাল হাউজিং ফাইন্যান্সে থাকা নিজেদের ৫ লাখ ৬৩ হাজার ৫৬২টি শেয়ার পুরোপুরি বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইউসিবি। আগামী ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে এসব শেয়ার পাবলিক মার্কেটে বিক্রি হওয়ার কথা। একই সময়ে ন্যাশনাল হাউজিংয়ের প্রথম ছয় মাসের মুনাফায় সামান্য প্রবৃদ্ধি হলেও দ্বিতীয় প্রান্তিকে কোনো বৃদ্ধি হয়নি। ফলে ইউসিবির শেয়ার বিক্রি এবং কোম্পানিটির আর্থিক ফলাফল—দুই বিষয়ই এখন বিনিয়োগকারীদের নজরে থাকবে।