রোববার, ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ১৮ আশ্বিন ১৪৩৩

নূর হোসেন মামুন, চট্টগ্রাম 

প্রকাশ: ২২:৫৯, ৪ অক্টোবর ২০২৬

চট্টগ্রাম বিমানবন্দর

সব প্রস্তুতি শেষ, তবুও চালু হয়নি কার্গো ফ্লাইট

সব প্রস্তুতি শেষ, তবুও চালু হয়নি কার্গো ফ্লাইট

ছবি সংগৃহীত

চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কার্গো সার্ভিস চালুর জন্য অবকাঠামোগত প্রস্তুতি থাকলেও অদৃশ্য জটিলতায় আটকে আছে পুরো প্রক্রিয়া। কার্গো ভিলেজে নতুন স্ক্যানার, ওজন মাপার যন্ত্র ও সুরক্ষিত ওয়্যারহাউস প্রস্তুত থাকলেও এখনো নিয়মিত কার্গো বিমান পরিচালনার ব্যবস্থা করা হয়নি। ফলে জরুরি রপ্তানি পণ্য ও আমদানি করা কাঁচামাল ছাড় করাতে ব্যবসায়ীদের ছুটতে হচ্ছে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে।
বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, চট্টগ্রাম থেকে কার্গো ফ্লাইট পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় সক্ষমতা রয়েছে। অন্তত সপ্তাহে একটি কার্গো ফ্লাইট চালুর বিষয়ে কয়েকটি আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থার সঙ্গে আলোচনা চলছে। তবে শেষ পর্যন্ত এ কার্যক্রম চালু হবে কি না, তা সংশ্লিষ্ট বিমান সংস্থার বাণিজ্যিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।
চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ নূর হোসেন জানান, চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে কার্গো ফ্লাইট পরিচালনার জন্য আমাদের যথেষ্ট সক্ষমতা রয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এবং মন্ত্রিপরিষদের সংশ্লিষ্টরাও চেষ্টা করছেন, যাতে অন্তত একটি কার্গো ফ্লাইট এখান থেকে পরিচালনা করা যায়। তবে শেষ পর্যন্ত বিষয়টি নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনস কর্তৃপক্ষের ওপর—তারা এখান থেকে ফ্লাইট পরিচালনা করবে কি না এবং করলে তা কতটা লাভজনক হবে।
বিমানবন্দর সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ১৮ অক্টোবর ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে অগ্নিকাণ্ডের পর চট্টগ্রাম শাহ আমানত বিমানবন্দরকে বিকল্প কার্গো কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রায় ১০ মাসের বেশি সময় ধরে চট্টগ্রামের কার্গো ভিলেজ প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়ে অপেক্ষায় রয়েছে।
কার্গো ভিলেজে নষ্ট হয়ে যাওয়া স্ক্যানার মেশিন সরিয়ে নতুন দুটি স্ক্যানার বসানো হয়েছে। রয়েছে দুটি ওজন মাপার যন্ত্র। রপ্তানি পণ্য রাখার জন্য দুটি সুরক্ষিত ওয়্যারহাউসও প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
এর মধ্যে ১৭ হাজার বর্গফুট আয়তনের আমদানি কার্গো ওয়্যারহাউসের ধারণক্ষমতা ১৪০ মেট্রিক টন। অন্যদিকে ২৫ হাজার বর্গফুটের রপ্তানি কার্গো ওয়্যারহাউসে একসঙ্গে ১১০ মেট্রিক টন পণ্য রাখা যায়। অর্থাৎ অবকাঠামো ও পণ্য সংরক্ষণের সক্ষমতা তৈরি হলেও নিয়মিত কার্গো পরিবহনের জন্য প্রয়োজনীয় বিমান পাওয়া যাচ্ছে না।
চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্সের প্রেসিডেন্ট আমিরুল হক বলেন, ঢাকায় কার্গো ভিলেজ পুড়ে যাওয়ার পর এখন চট্টগ্রামের কার্গো ভিলেজটি পুরোপুরি খালি পড়ে আছে। এই সক্ষমতাকে আমরা কাজে লাগাতে পারি। তিন বছরের জন্য যে ট্যারিফ কমানো হয়েছে, এর মাধ্যমে এয়ারলাইনসগুলোকে এখানে আনা সম্ভব। আর এয়ারলাইনস আনা মানেই তো ব্যবসার সুযোগ তৈরি হওয়া।
চট্টগ্রাম শাহ আমানত বিমানবন্দর ২০০০ সালে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের স্বীকৃতি পায়। এরপর ২০০৫ সালে সীমিত পরিসরে এখান থেকে রপ্তানি কার্গো পরিবহন শুরু হয়। পরে এয়ার এমিরেটস ও ইত্তেহাদসহ কয়েকটি বিমান সংস্থা আমদানি-রপ্তানি কার্গো পরিবহন করলেও করোনা মহামারির সময় ২০২১ সালে তা বন্ধ হয়ে যায়। এর পর থেকে নিয়মিত নিবেদিত কার্গো ফ্লাইট আর চালু হয়নি।
বর্তমানে যাত্রীবাহী বিমানের মাধ্যমে সীমিত পরিসরে কার্গো পরিবহন করা হচ্ছে। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের হিসাবে, ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত যাত্রীবাহী বিমানে ৬৭৬ মেট্রিক টন আমদানি কার্গো এবং ২ হাজার ৪৭ মেট্রিক টন রপ্তানি কার্গো পরিবহন হয়েছে। এ থেকে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের রাজস্ব আদায় হয়েছে প্রায় দুই কোটি টাকা।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, চট্টগ্রামে তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন শিল্পকারখানা ও রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠান থাকায় এখান থেকে নিয়মিত কার্গো ফ্লাইট চালু হলে সময় ও পরিবহন ব্যয় কমবে। বিশেষ করে জরুরি কাঁচামাল আমদানি এবং দ্রুত রপ্তানি পণ্য পাঠানোর ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীরা সরাসরি সুবিধা পাবেন।
ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ফোরামের চেয়ারম্যান এসএম আবু তৈয়ব জানান, বাংলাদেশে কার্গো মূলত ঢাকার একমাত্র বিমানবন্দরেই আসে। বিভিন্ন কারণে একটি বিকল্প ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। অগ্নিকাণ্ড, বন্যা, ঝড় বা অন্য কোনো দুর্যোগে ঢাকার কার্গো পরিবহন ব্যবস্থা ব্যাহত হলে বিকল্প বিমানবন্দর হিসেবে চট্টগ্রামকে ব্যবহার করা যেতে পারে।
তিনি বলেন, চট্টগ্রামের কার্গো সুবিধা দ্রুত কার্যকর করা দরকার। এতে শুধু চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরাই নন, ঢাকার ব্যবসায়ীরাও চট্টগ্রাম থেকে কার্গো ছাড় করিয়ে নিতে পারবেন। একইভাবে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে পণ্য ঢাকায় পাঠানোর প্রয়োজনও কমবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, চট্টগ্রাম বিমানবন্দরের কার্গো সক্ষমতা কাজে লাগানো গেলে দেশের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে বিকল্প একটি পথ তৈরি হবে। তবে নিয়মিত কার্গো ফ্লাইট চালুর জন্য বিমান সংস্থাগুলোর বাণিজ্যিক আগ্রহ তৈরি করাই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ। অবকাঠামো প্রস্তুত থাকার পরও সেই জায়গাতেই আটকে আছে চট্টগ্রামের কার্গো সার্ভিস চালুর উদ্যোগ।