শিল্পের অর্থায়নে পুঁজিবাজার কোণঠাসা
আইপিও খরায় বিপর্যস্ত মধ্যস্থতাকারীরা
ছবি সংগৃহীত
দেশের অর্থনীতির আকার গত দেড় দশকে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। বেড়েছে শিল্পায়ন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পরিধি। কিন্তু সেই তুলনায় বাড়েনি দেশের পুঁজিবাজার। বরং ২০১০ সালের ধসের পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও বাজার এখনো কাঙ্ক্ষিত গতি ফিরে পায়নি। নতুন কোম্কানি তালিকাভুক্তির খরা, কমে যাওয়া লেনদেন, ভালো কোম্কানির শেয়ারের সংকট এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতার চাপে ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে বাজারের ভিত্তি।
এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে পুঁজিবাজারের মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর। ব্রোকারেজ হাউস ও মার্চেন্ট ব্যাংকগুলো একদিকে কমে যাওয়া লেনদেনের কারণে আয় হারাচ্ছে, অন্যদিকে দীর্ঘদিনের মার্জিন ঋণ, ঋণাত্মক ইক্যুইটি ও প্রভিশন ঘাটতির চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। ফলে বাজারের সঙ্গে যুক্ত বহু প্রতিষ্ঠানের টিকে থাকাই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, শিল্পায়নের অর্থায়নেও পুঁজিবাজারের ভূমিকা ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। ব্যাংকনির্ভর অর্থায়ন বাড়লেও দীর্ঘমেয়াদি অর্থের বিকল্প উৎস হিসেবে পুঁজিবাজার কার্যত প্রান্তিক হয়ে পড়ছে। অথচ দীর্ঘমেয়াদি শিল্প ও অবকাঠামো প্রকল্পের অর্থায়নের বড় অংশ ব্যাংক খাতের ওপর নির্ভর করলে ব্যাংকের ওপর ঝুঁকি আরও বাড়ার আশঙ্কা থাকে।
শিল্প খাতে অর্থায়নের চিত্রেই পুঁজিবাজারের দুর্বল অবস্থান সবচেয়ে স্কষ্ট। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে শিল্প খাতে ব্যাংকিং মাধ্যমে অর্থায়ন হয়েছে ৯৭ হাজার ১৩৮ কোটি টাকা। একই সময়ে পুঁজিবাজার থেকে অর্থায়নের পরিমাণ ছিল মাত্র ৩০২ কোটি টাকা। অর্থাৎ শিল্প খাতে মোট অর্থায়নের মাত্র শূন্য দশমিক ৩১ শতাংশ এসেছে পুঁজিবাজার থেকে।
এর আগের ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ব্যাংকিং মাধ্যমে শিল্প খাতে অর্থায়ন ছিল ৮৮ হাজার ৭৩৮ কোটি টাকা। বিপরীতে পুঁজিবাজার থেকে এসেছে ৬৭৯ কোটি টাকা, যা মোট অর্থায়নের শূন্য দশমিক ৭৬ শতাংশ।
২০২২-২৩ অর্থবছরে ব্যাংকিং মাধ্যমে শিল্প খাতে অর্থায়ন হয় ৯৫ হাজার ১৭২ কোটি টাকা। পুঁজিবাজার থেকে অর্থায়ন ছিল ৬৪১ কোটি টাকা বা শূন্য দশমিক ৬৭ শতাংশ। আর ২০২১-২২ অর্থবছরে ব্যাংকিং মাধ্যমে অর্থায়ন ছিল ৭২ হাজার ৩৬০ কোটি টাকা। এর বিপরীতে পুঁজিবাজার থেকে এসেছে ৬৮৫ কোটি টাকা, যা মোট অর্থায়নের শূন্য দশমিক ৯৪ শতাংশ।
চার অর্থবছরের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শিল্প খাতে পুঁজিবাজারের অংশগ্রহণ এক শতাংশেরও নিচে। সর্বশেষ অর্থবছরে তা নেমে এসেছে মাত্র শূন্য দশমিক ৩১ শতাংশে। শিল্পায়নের অর্থায়নে পুঁজিবাজারের যে ভূমিকা থাকার কথা ছিল, বাস্তবে তার প্রতিফলন নেই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যাংকঋণ তুলনামূলক সহজলভ্য হওয়ায় উদ্যোক্তারা দীর্ঘমেয়াদি অর্থের জন্যও ব্যাংকের ওপর নির্ভর করছেন। ফলে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সংগ্রহের প্রবণতা কমছে।
এর ফলে একদিকে পুঁজিবাজার তার মূল ভূমিকা হারাচ্ছে, অন্যদিকে বড় ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণের চাপ বাড়ছে ব্যাংক খাতে। এর সঙ্গে খেলাপি ঋণ, তারল্য সংকট ও সম্কদের গুণগত মান নিয়ে ঝুঁকিও বাড়ছে।
বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি বড় প্রকল্পের অর্থায়নে ব্যাংক ও পুঁজিবাজারের মধ্যে একটি যৌক্তিক ভারসাম্য থাকা প্রয়োজন। বিশেষ করে নির্দিষ্ট সীমার বেশি মূলধনের প্রয়োজন হয় এমন বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও প্রকল্পের ক্ষেত্রে পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের সুযোগ বাড়ানো জরুরি।
তাদের মতে, একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের বেশি দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের ক্ষেত্রে পুঁজিবাজারকে বাধ্যতামূলক উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হলে বাজারে ভালো কোম্কানির সরবরাহ বাড়তে পারে। এতে একদিকে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘমেয়াদি মূলধন পাবে, অন্যদিকে ব্যাংক খাতের ওপর দীর্ঘমেয়াদি ঋণের চাপ কমবে। কিন্তু বাস্তবে সেই কাঠামো তৈরি না হওয়ায় শিল্পায়নের অর্থায়নে পুঁজিবাজারের অংশ ক্রমেই কমছে।
শিল্পায়নে পুঁজিবাজারের অবদান কমার পাশাপাশি দৈনন্দিন লেনদেনেও চলছে দীর্ঘস্থায়ী খরা। ডিএসইর গত এক বছরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২৩৮টি লেনদেন দিবসে মোট লেনদেন হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৭৬ হাজার ৬০২ কোটি ৫২ লাখ টাকা। এতে দৈনিক গড় লেনদেন দাঁড়িয়েছে মাত্র ৭৪২ কোটি ৩ লাখ টাকা।
বাজারসংশ্লিষ্টদের হিসাবে ব্রোকারেজ হাউস ও মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোকে কার্যক্রম চালিয়ে যেতে দৈনিক অন্তত ২ হাজার থেকে ৩ হাজার কোটি টাকার লেনদেন প্রয়োজন। সেই তুলনায় বর্তমান গড় লেনদেন প্রয়োজনীয় মাত্রার অনেক নিচে। ২০২৫ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর ডিএসইতে লেনদেন হয়েছিল ৫৬৪ কোটি ১৮ লাখ টাকা। এক বছর পর ২০২৬ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর লেনদেন বেড়ে দাঁড়ায় ৭৫৬ কোটি ৩১ লাখ টাকা। তবে এই বৃদ্ধি বাজারের মধ্যস্থতাকারীদের টেকসই ব্যবসার জন্য যথেষ্ট নয়। গত এক বছরে কয়েক দিন লেনদেন দেড় হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। কিন্তু সেই গতি ধরে রাখা যায়নি। চলতি বছরের ১২ জুলাই সর্বোচ্চ লেনদেন হয়েছে ১ হাজার ৬৬৯ কোটি ৬৩ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। বিপরীতে সর্বনিম্ন লেনদেন হয়েছে ২০২৫ সালের ৭ ডিসেম্বর—মাত্র ২৬৭ কোটি ৬৪ লাখ ৫৮ হাজার টাকা। অর্থাৎ মাঝেমধ্যে লেনদেন বাড়লেও বাজারে স্থায়ী তারল্য তৈরি হচ্ছে না। ফলে সাময়িক উত্থান মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর আয়-ব্যয়ের কাঠামোতে স্থায়ী স্বস্তি আনতে পারছে না।
লেনদেন কমার সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রভাব পড়েছে পুঁজিবাজারের মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর। ঢাকার নিকুঞ্জে ডিএসই টাওয়ারে একসময় প্রায় ১২০টি মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানের অফিস ছিল। বর্তমানে সেখানে প্রায় ৬৫টির মতো প্রতিষ্ঠান রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
উল্লেখযোগ্যসংখ্যক প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে অফিস সরিয়ে নিয়েছে বা কার্যক্রম সংকুচিত করেছে। এখনো অনেক প্রতিষ্ঠান অফিস পরিবর্তন বা কার্যক্রম কমিয়ে আনার চিন্তা করছে।
শুধু নিকুঞ্জ নয়, মতিঝিলের পুরোনো ডিএসই ভবনেরও প্রায় ৩০ শতাংশ অফিস স্কেস খালি পড়ে আছে। পুঁজিবাজারের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এসব ভবনে অফিস খালি থাকা বাজারের ব্যবসায়িক সংকটেরই একটি দৃশ্যমান প্রতিচ্ছবি।
বাজারে মোট লেনদেন কমার পাশাপাশি লেনদেনের কেন্দ্রীভবনও ছোট ও মাঝারি ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের জন্য নতুন চাপ তৈরি করেছে। বাজারের মোট লেনদেনের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই শীর্ষ ব্রোকারেজ হাউসগুলোর মাধ্যমে হচ্ছে।
ফলে বাজারে মোট লেনদেন যতটুকু হচ্ছে, তার বড় অংশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের হাতে কেন্দ্রীভূত থাকছে। এতে ছোট ও মাঝারি ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানগুলো প্রয়োজনীয় আয় করতে পারছে না। অথচ কর্মী, অফিস, প্রযুক্তি, নিয়ন্ত্রক ব্যয় ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় নিয়মিতই বহন করতে হচ্ছে। ফলে আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য হারিয়ে অনেক প্রতিষ্ঠান অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ে পড়েছে।
মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানের সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন কোম্কানি তালিকাভুক্তির দীর্ঘ খরা। বিএসইসির তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিও অনুমোদন দেওয়া হয় ২০২৪ সালের ২৫ মার্চ টেকনো ড্রাগস লিমিটেডকে।
এরপর দীর্ঘ সময় ধরে মূল বাজারে নতুন কোনো কোম্কানির আইপিও অনুমোদন হয়নি। চলতি বছরে এসএমই প্ল্যাটফর্মের জন্য একটি কোম্কানিকে কোয়ালিফায়েড ইনভেস্টর অফার বা কিউআইও অনুমোদন দেওয়া হলেও সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মূল বাজারে নতুন আইপিও অনুমোদনের চিত্র ছিল শূন্য।
নতুন কোম্কানি না এলে বাজারের আকার কীভাবে বাড়বে—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। একই কোম্কানির সীমিত শেয়ার ঘিরে দীর্ঘদিন লেনদেন চলতে থাকলে বিনিয়োগকারীদের জন্য নতুন বিনিয়োগের সুযোগও সীমিত হয়ে পড়ে। এর পাশাপাশি ভালো কোম্কানির শেয়ারের সরবরাহও বাড়ছে না। ফলে বাজারে গুণগত বৈচিত্র্য তৈরি হচ্ছে না।
পুঁজিবাজারে নতুন কোম্কানি না আসার পেছনে দীর্ঘ আইপিও প্রক্রিয়াও একটি কারণ হিসেবে আলোচিত হচ্ছে। একটি কোম্কানিকে তালিকাভুক্তির জন্য দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। নিয়ন্ত্রক অনুমোদন, নিরীক্ষা, মূল্য নির্ধারণ ও অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতার কারণে উদ্যোক্তাদের অনেকের কাছেই আইপিও প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ হয়ে উঠছে।
ফলে অনেক কোম্কানি ব্যাংক ঋণ বা অন্যান্য উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহকেই তুলনামূলক সহজ পথ হিসেবে বেছে নিচ্ছে। এতে পুঁজিবাজারে নতুন কোম্কানি আসার প্রবাহ আরও কমে যাচ্ছে।
দীর্ঘ এই খরা কাটাতে এবার সরাসরি তালিকাভুক্তির উদ্যোগ নিয়েছে বিএসইসি। আইপিও ছাড়াই নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করে কোনো কোম্কানিকে স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্তির সুযোগ দিতে ‘ডাইরেক্ট লিস্টিং অব সিকিউরিটিজ বাই স্টক এক্সচেঞ্জ’ বিধিমালার খসড়া অনুমোদন করেছে কমিশন। প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট যোগ্যতা পূরণকারী কোম্কানি সরাসরি স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত হতে পারবে। এর ফলে আইপিওর দীর্ঘ প্রক্রিয়া এড়িয়ে তুলনামূলক দ্রুত ভালো কোম্কানিকে বাজারে আনার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বিএসইসি সূত্র জানিয়েছে, সরকারি লাভজনক প্রতিষ্ঠান, দেশে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা পরিচালনা করা বহুজাতিক কোম্কানি এবং বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকে তালিকাভুক্তির আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ইতোমধ্যে কনফিডেন্স পাওয়ার, টিকে স্টিল, র্যাংকস পেট্রোলিয়াম, র্যানকম মোটরবাইক লিমিটেড, ফাইবার অ্যাট হোমসহ ডজনখানেক কোম্কানি তালিকাভুক্তিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে বলে জানা গেছে। তবে আগ্রহ প্রকাশের পর এসব কোম্কানি বাস্তবে কত দ্রুত বাজারে আসবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়। পুঁজিবাজারের সংকট কেবল নতুন কোম্কানি না আসার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বাজারে ভালো ও মৌলভিত্তিসম্কন্ন কোম্কানির শেয়ারের ঘাটতিও দীর্ঘদিনের সমস্যা। দেশের পুঁজিবাজার দীর্ঘদিন ধরে ইকুইটিনির্ভর। কিন্তু বন্ড মার্কেট ও মিউচুয়াল ফান্ড প্রত্যাশিতভাবে শক্তিশালী হয়নি। ফলে বিনিয়োগকারীদের হাতে বিনিয়োগের বিকল্পও সীমিত।
অন্যদিকে অতীতে তালিকাভুক্ত হওয়া কিছু কোম্কানি পরবর্তী সময়ে আর্থিক দুর্বলতার কারণে লোকসানে পড়েছে কিংবা ‘জেড’ ক্যাটেগরিতে চলে গেছে। এতে নতুন কোম্কানি সম্কর্কে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের পাশাপাশি বাজারের ওপর আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে শুধু কোম্কানির সংখ্যা বাড়ালেই হবে না; বাজারে ভালো মানের কোম্কানি আনাও জরুরি। মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে দীর্ঘদিনের মার্জিন ঋণ, ঋণাত্মক ইক্যুইটি ও প্রভিশন ঘাটতি।
বিএসইসির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মে পর্যন্ত স্টকব্রোকার ও মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর ঋণাত্মক ইক্যুইটি এবং অনাদায়ি লোকসানের বিপরীতে মোট প্রভিশন ঘাটতি ছিল ৯ হাজার ৩৬৭ কোটি টাকা।
বাজারে লেনদেন কমে যাওয়ার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানগুলোর পুরোনো আর্থিক বোঝাও কমছে না। নতুন আয় না বাড়লে এই ঘাটতি পূরণ করা তাদের জন্য আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
পুঁজিবাজারের বর্তমান পরিস্থিতি দেখলে স্কষ্ট হয়, সমস্যা কেবল আইপিও কম হওয়া বা লেনদেন কমে যাওয়ার নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাজারে ভালো কোম্কানির ঘাটতি, বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকট, ব্যাংকনির্ভর শিল্পায়ন, মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানের আয় কমে যাওয়া, ঋণাত্মক ইক্যুইটি এবং বিপুল প্রভিশন ঘাটতি।
বিএসইসি নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আবুল কালাম শেয়ার বিজকে বলেন, পুঁজিবাজারে নতুন কোম্কানি তালিকাভুক্তির বিষয়টি কমিশনের নজরে রয়েছে। শিল্প ও বৃহৎ করপোরেট প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নে পুঁজিবাজারের অংশ বাড়াতে সরাসরি তালিকাভুক্তির সুযোগসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে বিনিয়োগকারী সুরক্ষা, কোম্কানির সুশাসন ও আর্থিক সক্ষমতার বিষয়গুলোও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ আল-আমিন শেয়ার বিজকে বলেন, বাংলাদেশে শিল্পায়নের অর্থায়ন অতিমাত্রায় ব্যাংকনির্ভর হয়ে পড়েছে। দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের জন্য শুধু ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা আর্থিক ব্যবস্থায় ঝুঁকি তৈরি করে। বড় ও প্রতিষ্ঠিত শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে পুঁজিবাজারে আনতে হলে তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়া সহজ করার পাশাপাশি স্বচ্ছতা, সুশাসন ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা নিশ্চিত করতে হবে। শিল্পের অর্থায়নে ব্যাংক ও পুঁজিবাজারের মধ্যে একটি ভারসাম্য তৈরি করা জরুরি।
ফলে নতুন কোম্কানি তালিকাভুক্ত করলেই সংকট পুরোপুরি কাটবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। নতুন কোম্কানিগুলোকে মানসম্কন্ন হতে হবে, তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে, একই সঙ্গে বাজারে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিল্প খাতে বড় অঙ্কের দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের ক্ষেত্রে ব্যাংক ও পুঁজিবাজারের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা না গেলে পুঁজিবাজারের কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা ফিরবে না। একই সঙ্গে বড় ও ভালো কোম্কানিগুলোকে বাজারে আনতে কার্যকর প্রণোদনা এবং তালিকাভুক্তির বাস্তবসম্মত কাঠামো প্রয়োজন।
অন্যদিকে মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে টিকিয়ে রাখতে লেনদেন বাড়ানোর পাশাপাশি দীর্ঘদিনের ঋণাত্মক ইক্যুইটি ও প্রভিশন ঘাটতি সমাধানের কার্যকর উদ্যোগও প্রয়োজন।
দীর্ঘদিনের পুঁজিবাজারের খরা এখন শুধু বিনিয়োগকারীদের সমস্যা নয়; এটি বাজারের মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান, শিল্পায়নের অর্থায়ন এবং সামগ্রিক আর্থিক ব্যবস্থার জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নতুন আইপিও সহজীকরণ ও সরাসরি তালিকাভুক্তির উদ্যোগ সেই খরা কাটানোর একটি সুযোগ তৈরি করেছে। কিন্তু সেই সুযোগ বাস্তবে কতটা কাজে লাগানো যায়, ভালো কোম্কানি কত দ্রুত বাজারে আসে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা কতটা ফেরানো সম্ভব হয়—তার ওপরই নির্ভর করবে পুঁজিবাজারের পরবর্তী গতি।