বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২৬, ১৫ আশ্বিন ১৪৩৩

শেখ সাদী খান

প্রকাশ: ২৩:৩০, ১ অক্টোবর ২০২৬

পাঁচ হাজার কোটি টাকা একনেকে অনুমোদন

রংপুর বিভাগে ৫৭ উপজেলার সড়ক প্রশস্তকরণ ও শক্তিশালীকরণ প্রকল্প

রংপুর বিভাগে ৫৭ উপজেলার সড়ক  প্রশস্তকরণ ও শক্তিশালীকরণ প্রকল্প

ছবি সংগৃহীত

উত্তরাঞ্চলের কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক অভূতপূর্ব রূপান্তরের সূচনা হতে যাচ্ছে। রংপুর বিভাগের যোগাযোগ অবকাঠামো আমূল বদলে দিতে সরকার গ্রহণ করেছে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকার এক বিশাল মেগা প্রকল্প। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে (জিওবি) ৪৯৮৪ দশমিক ৭৫৮২ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘রংপুর বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা ও ইউনিয়ন সড়ক প্রশস্তকরণ ও শক্তিশালীকরণ প্রকল্প’ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। ২০২৬ সালের জুলাই থেকে শুরু হওয়া এই প্রকল্পটির বাস্তবায়ন মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে ২০৩০ সালের জুন পর্যন্ত। রংপুর বিভাগের আটটি জেলার ৫৭টি উপজেলার বিশাল পল্লি এলাকাকে আধুনিক নাগরিক সুবিধার আওতায় নিয়ে আসাই এই মহাযজ্ঞের মূল লক্ষ্য।

পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা যায়, বাস্তবায়নাধীন এলাকাগুলো হলো—পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, নীলফামারী, রংপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও গাইবান্ধা জেলার সদর, সদর, তেঁতুলিয়া, আটোয়ারী, বোদা ও দেবীগঞ্জ (৫টি), সদর, বালিয়াডাংগী, হরিপুর, পীরগঞ্জ, ও রাণীশংকৈল (৫টি), বীরগঞ্জ, কাহারোল, বোচাগঞ্জ, বিরল, সদর, খানসামা, চিরিরবন্দর, পার্বতীপুর, ফুলবাড়ী, নবাবগঞ্জ, বিরামপুর, হাকিমপুর ও ঘোড়াঘাট (১৩টি), ডোমার, ডিমলা, সদর, জলঢাকা, কিশোরগঞ্জ ও সৈয়দপুর (৬টি), গংগাচড়া, তারাগঞ্জ, বদরগঞ্জ, সদর, কাউনিয়া, পীরগাছা, মিঠাপুকুর ও পীরগঞ্জ (৮টি), ভূরুঙ্গামারী, নাগেশ্বরী, সদর, ফুলবাড়ী, রাজারহাট, উলিপুর, চিলমারী, রৌমারী (৮টি), পাটগ্রাম, হাতিবান্ধা, কালীগঞ্জ, আদিতমারী ও সদর (৫টি) ও সদর, পলাশবাড়ী, সাঘাটা, গোবিন্দগঞ্জ, সাদুল্লাপুর, ফুলছড়ি ও সুন্দরগঞ্জ (৭টি)।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, গত ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে অনুষ্ঠিত অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় ৪ হাজার ৯৪৯ কোটি ৭৫ লাখ ৮২ হাজার টাকা ব্যয়ে  প্রকল্পটি চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়। সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০৩০ সালের জুন মেয়াদের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। একনেক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী এবং সংশ্লিষ্টরা এই প্রকল্পের ‘পরামর্শক ফি’-সহ অন্যান্য অতিরিক্ত ও অপ্রয়োজনীয় খাতের ব্যয় কমানোর জন্য বিশেষভাবে নির্দেশ দিয়েছেন।

খাতসংশ্লিষ্টরা জানান, প্রকল্পের আওতায় উপজেলা সড়কের পাকা অংশের ২২ দশমিক ৭৪ শতাংশ এবং ইউনিয়ন সড়কের পাকা অংশের ৯ দশমিক ৯৩ শতাংশ প্রশস্তকরণ ও শক্তিশালীকরণ করা হবে। এর মধ্যে প্রধান কার্যক্রম হিসেবে ১১৫২ দশমিক ০৭ কিলোমিটার উপজেলা সড়ক ও ৪৬২ দশমিক ১৫ কিলোমিটার ইউনিয়ন সড়ক প্রশস্ত করা হবে। পাশাপাশি ৫৪ দশমিক ৬২ কিলোমিটার আরসিসি সড়ক, ২৫০২ দশমিক ৪৬ মিটার ব্রিজ, ১৯১১ দশমিক ৩৩ মিটার কালভার্ট এবং ১৭৬টি লেভেল ক্রসিং ও ৬৬টি বাস বে নির্মাণ করা হবে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় রোপণ করা হবে ৪ লাখ ২৫ হাজার ৪৪৩টি বৃক্ষ।

মেগা প্রকল্পকে ঘিরে রংপুর বিভাগের আটটি জেলার প্রায় ১ কোটি ৩৮ লাখ ৪৭ হাজার মানুষের মনে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। স্থানীয় সাধারণ মানুষ ও কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বর্ষাকালে কিংবা ভারী যানবাহন চলাচলের কারণে গ্রামীণ রাস্তাগুলোর বেহাল দশা হতো। এই সড়কগুলো প্রশস্ত ও শক্তিশালী হলে তাদের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি দূর হবে।

বিশেষ করে প্রান্তিক কৃষকরা অত্যন্ত আনন্দিত।

চিলমারী, তেঁতুলিয়া কিংবা পাটগ্রামের মতো প্রত্যন্ত অঞ্চলের কৃষকদের মতে, রাস্তা চওড়া ও মজবুত হলে বড় বড় ট্রাক সরাসরি গ্রামে এসে পণ্য সংগ্রহ করতে পারবে। এতে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমবে এবং তারা সরাসরি ফসলের ন্যায্য মূল্য পাবেন। এছাড়া অসুস্থ রোগীদের দ্রুত শহরের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া এবং শিক্ষার্থীদের স্কুল-কলেজে যাতায়াত অনেক নিরাপদ ও সহজ হবে।

অর্থনীতিবিদ এবং যোগাযোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রকল্পটি বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের ‘লাস্ট মাইল’ সংযোগ নিশ্চিত করার অঙ্গীকারের এক চমৎকার বাস্তব প্রতিফলন। টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টের (এসডিজি) দারিদ্র্য বিমোচন (লক্ষ্য-১), টেকসই কৃষি (লক্ষ্য-২) এবং টেকসই অবকাঠামো (লক্ষ্য-৯) অর্জনে এটি দারুণ অনুঘটক হিসেবে কাজ করবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রংপুর বিভাগের শিক্ষার হার বর্তমানে ৫৬ শতাংশ। এই উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা গ্রামীণ অঞ্চলের শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। রাস্তা প্রশস্ত হওয়ার কারণে গ্রামীণ এলাকায় নতুন নতুন শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে, যা অনগ্রসর এই অঞ্চলের সার্বিক দারিদ্র্য বিমোচন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবে।

রংপুর বিভাগের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই প্রকল্প জাতীয় অর্থনীতিতে বিশেষ ভূমিকা রাখবে বলে মন্তব্য করে বিশেষজ্ঞরা বলেন,  উন্নত সড়ক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে উত্তরাঞ্চলের উদ্বৃত্ত কৃষিপণ্য দ্রুত ও সাশ্রয়ী মূল্যে দেশের অন্যান্য বড় বড় শিল্প নগরীতে পৌঁছে যাবে, যা জাতীয় জিডিপিতে কৃষির অবদান আরও বাড়াবে। এবং পল্লী অঞ্চলে ভারী যানবাহন চলাচলের উপযোগী রাস্তা তৈরি হওয়ার ফলে শহরের বাইরেও বেসরকারি খাতের শিল্পায়নের বিকাশ ঘটবে। এছাড়া দেশের অন্যতম দারিদ্র্যপ্রবণ এই অঞ্চলের দারিদ্র্য উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাবে, যা সামগ্রিক জাতীয় দারিদ্র্য সূচকের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে জানান তারা। 

সড়ক প্রশস্তকরণ ও শক্তিশালীকরণের ফলে সরাসরি যোগাযোগের বাইরেও বেশ কিছু বহুমুখী সুবিধা আসবে—

সরাসরি ও পরোক্ষ কর্মসংস্থান: প্রকল্প বাস্তবায়নকালীন ও পরবর্তী সময়ে স্থানীয় বিপুলসংখ্যক মানুষের জন্য স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

উন্নত সড়ক নিরাপত্তা: বাস বে ও লেভেল ক্রসিং নির্মাণের মাধ্যমে গ্রামীণ সড়কে যান চলাচল সুশৃঙ্খল হবে এবং সড়ক দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমে আসবে।

পর্যটনশিল্পের বিকাশ: পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া কিংবা কুড়িগ্রাম-লালমনিরহাটের সীমান্তবর্তী দর্শনীয় স্থানগুলোতে যাতায়াত সহজ হওয়ায় অভ্যন্তরীণ পর্যটনশিল্পের ব্যাপক প্রসার ঘটবে।

পরিবেশের উন্নয়ন: সড়কের পাশে চার লাখেরও বেশি গাছ লাগানোর ফলে এই অঞ্চলের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা পাবে এবং টেকসই ও অভিঘাত-সহনশীল অবকাঠামো গড়ে উঠবে।

পরিকল্পনা কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, এই বৃহৎ বিনিয়োগ রংপুর বিভাগের অনগ্রসর প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মান উন্নত করে দেশের মূল অর্থনৈতিক স্রোতধারার সাথে তাদের সরাসরি যুক্ত করবে।