শুক্রবার, ০২ অক্টোবর ২০২৬, ১৬ আশ্বিন ১৪৩৩

শেয়ার বিজ ডেস্ক

প্রকাশ: ২২:২৯, ২ অক্টোবর ২০২৬

রপ্তানিতে আশার আলো

তিন মাসে আয় বেড়েছে ৭৮ কোটি ডলার

তিন মাসে আয় বেড়েছে ৭৮ কোটি ডলার

ছবি সংগৃহীত

বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের মধ্যেও দেশের পণ্য রপ্তানি আয়ে ইতিবাচক ধারা অব্যাহত রয়েছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) দেশের পণ্য রপ্তানি আয় বেড়েছে ৬ দশমিক ৩৪ শতাংশ। এ সময়ে বিভিন্ন দেশে মোট ১ হাজার ৩০৯ কোটি ৪১ লাখ মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে রপ্তানি আয় হয়েছিল ১ হাজার ২৩১ কোটি ৩১ লাখ ডলার।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, তৈরি পোশাক এখনো দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস হলেও পোশাকের বাইরে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ও উদীয়মান খাতেও উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি হয়েছে। বিশেষ করে ওষুধ, পাট ও পাটজাত পণ্য, হালকা প্রকৌশল, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য এবং হোম টেক্সটাইল রপ্তানিতে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে।

ইপিবি জানিয়েছে, রপ্তানিকারক, শ্রমিক ও উদ্যোক্তাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। দীর্ঘ মেয়াদে রপ্তানি আয় বাড়াতে পণ্যের বহুমুখীকরণ, নতুন বাজার সমপ্রসারণ এবং বাণিজ্য সহজীকরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

প্রথম তিন মাসের সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি একক মাস হিসেবেও সেপ্টেম্বর মাসে রপ্তানি আয়ে ইতিবাচক ধারা বজায় ছিল। চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ ৩৯৩ কোটি ৭২ লাখ মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে এ আয় ছিল ৩৬২ কোটি ৭৫ লাখ ডলার। এক বছরের ব্যবধানে সেপ্টেম্বরে রপ্তানি আয় বেড়েছে ৩০ কোটি ৯৭ লাখ ডলার। শতাংশের হিসাবে এই প্রবৃদ্ধি ৮ দশমিক ৫৪ শতাংশ।

রপ্তানিসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বৈশ্বিক বাজারে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের মধ্যেও দেশের প্রধান রপ্তানি খাতগুলোর কার্যক্রম অব্যাহত থাকা এবং কিছু অপ্রচলিত ও উদীয়মান পণ্যের রপ্তানি বাড়ায় সামগ্রিক রপ্তানি আয়ে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

দেশের মোট রপ্তানি আয়ের সবচেয়ে বড় অংশ আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকেও এই খাতে প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রয়েছে। জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে তৈরি পোশাক খাত থেকে বাংলাদেশ ১ হাজার ৫৭ কোটি ৮৫ লাখ ৬০ হাজার মার্কিন ডলার আয় করেছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ খাত থেকে রপ্তানি আয় হয়েছিল ৯৯৭ কোটি ৪ লাখ ২০ হাজার ডলার। এ হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে তৈরি পোশাক রপ্তানি আয় বেড়েছে ৬ দশমিক ১০ শতাংশ। পোশাক খাতের মধ্যে নিটওয়্যার ও ওভেন—উভয় ধরনের পণ্যেই রপ্তানি বেড়েছে। প্রথম প্রান্তিকে নিটওয়্যার থেকে রপ্তানি আয় হয়েছে ৫৯৬ কোটি ৩৭ লাখ ৬০ হাজার ডলার। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এ খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬ দশমিক ৮৮ শতাংশ।

ওভেন পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৪৬১ কোটি ৪৮ লাখ ডলার। এ খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৫ দশমিক ১১ শতাংশ। সেপ্টেম্বর মাসের হিসাবেও পোশাক খাতের দুই প্রধান উপখাতে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। এ মাসে নিটওয়্যার রপ্তানি বেড়েছে ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশ এবং ওভেন পোশাকে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৮ দশমিক ৫৪ শতাংশ।

দেশের রপ্তানি বাণিজ্যে দীর্ঘদিন ধরে তৈরি পোশাকের আধিপত্য থাকলেও সামপ্রতিক সময়ে পোশাকের পাশাপাশি অন্যান্য পণ্যের রপ্তানি বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে সামগ্রিক রপ্তানি ঝুঁকি কমানোর পাশাপাশি নতুন বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের উপস্থিতি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

তৈরি পোশাকের বাইরে চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে ওষুধ রপ্তানিতে। জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে ওষুধ রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪০ দশমিক ৩৯ শতাংশ। শুধু সেপ্টেম্বর মাসে এ খাতে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬৪ দশমিক ৩৩ শতাংশ।

দেশীয় ওষুধশিল্পের সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি ওষুধের উপস্থিতি বাড়ার বিষয়টি এই খাতের রপ্তানি প্রবৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। ওষুধ খাতের এই প্রবৃদ্ধি রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।

রপ্তানি বাণিজ্যে তৈরি পোশাকের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে ওষুধসহ সম্ভাবনাময় খাতগুলোকে আরও সমপ্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। নতুন বাজারে প্রবেশ এবং বিদ্যমান বাজারে রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ কাজে লাগানো গেলে এ ধরনের পণ্যের অবদান আরও বাড়তে পারে।

বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী রপ্তানি পণ্য পাট ও পাটজাত পণ্যেও চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি হয়েছে। জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে পাট ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানি বেড়েছে ৩১ দশমিক ৫৫ শতাংশ। সেপ্টেম্বর মাসেও এ খাতে ইতিবাচক ধারা অব্যাহত ছিল। ওই মাসে পাট ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২২ দশমিক ৭২ শতাংশ।

পরিবেশবান্ধব ও টেকসই পণ্যের বৈশ্বিক চাহিদার প্রেক্ষাপটে পাট ও পাটজাত পণ্যের বাজার সমপ্রসারণের সুযোগ রয়েছে। নতুন বাজারে প্রবেশ এবং পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানো গেলে ঐতিহ্যবাহী এই খাত থেকে রপ্তানি আয় বৃদ্ধির সম্ভাবনাও রয়েছে।

রপ্তানি আয়ের প্রবৃদ্ধিতে হালকা প্রকৌশল খাতও অবদান রেখেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে এ খাতের রপ্তানি বেড়েছে ১৬ দশমিক ৫১ শতাংশ।

দেশের শিল্পায়ন ও উৎপাদন সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে হালকা প্রকৌশল খাতের পণ্য ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক বাজারে জায়গা করে নিচ্ছে। যন্ত্রাংশ ও বিভিন্ন প্রকৌশল পণ্যের বাজার সমপ্রসারণের সুযোগ থাকায় এই খাতকে রপ্তানি বহুমুখীকরণের একটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এদিকে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানিতেও ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। প্রথম প্রান্তিকে এ খাতে রপ্তানি বেড়েছে ১৪ দশমিক ৭৪ শতাংশ।

চামড়া বাংলাদেশের পুরোনো রপ্তানি পণ্যের একটি হলেও দীর্ঘদিন ধরে এ খাতে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এর মধ্যেও চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে প্রবৃদ্ধি হওয়া খাতটির জন্য ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তৈরি পোশাকের পাশাপাশি হোম টেক্সটাইল খাতেও রপ্তানি আয় বেড়েছে। প্রথম প্রান্তিকে এ খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১১ দশমিক ৯৪ শতাংশ। আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক ও বস্ত্রপণ্যের পাশাপাশি গৃহস্থালি ব্যবহারের বিভিন্ন টেক্সটাইল পণ্যের চাহিদাও রয়েছে। ফলে হোম টেক্সটাইলের রপ্তানি বৃদ্ধি দেশের পণ্য বহুমুখীকরণের প্রচেষ্টায় ভূমিকা রাখছে।

সামগ্রিক রপ্তানি আয়ে প্রবৃদ্ধি হলেও সব খাতেই একই ধরনের চিত্র দেখা যায়নি। চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য এবং হিমায়িত ও জীবন্ত মাছের রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। কিছু খাতে রপ্তানি কমলেও পোশাক, ওষুধ, পাট, হালকা প্রকৌশল, চামড়া ও হোম টেক্সটাইলসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে প্রবৃদ্ধি সামগ্রিক রপ্তানি আয়কে ঊর্ধ্বমুখী রাখতে ভূমিকা রেখেছে।

রপ্তানি বাণিজ্যে কোনো একটি খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে বিভিন্ন পণ্যের বাজার সমপ্রসারণের প্রয়োজনীয়তা এর মাধ্যমে আরও স্পষ্ট হয়েছে। বিশেষ করে যেসব অপ্রচলিত পণ্যে ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে, সেসব খাতে উৎপাদন সক্ষমতা, মান, বাজার ও বাণিজ্য সুবিধা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে সামগ্রিক রপ্তানি আয় বেড়েছে। একই সঙ্গে কয়েকটি অপ্রচলিত ও উদীয়মান পণ্যের রপ্তানিতেও উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি হয়েছে। রপ্তানি খাতের দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির জন্য পণ্যের বহুমুখীকরণ, নতুন বাজার সমপ্রসারণ এবং বাণিজ্য সহজীকরণকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে তৈরি পোশাকের পাশাপাশি ওষুধ, পাট, চামড়া, হালকা প্রকৌশলসহ অন্যান্য পণ্যের রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রপ্তানিকারকদের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জও তৈরি হচ্ছে। উৎপাদন ব্যয়, আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা, প্রতিযোগী দেশগুলোর সক্ষমতা এবং বাণিজ্য পরিবেশ—সবকিছু বিবেচনায় রেখে রপ্তানি খাতকে এগিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

এ অবস্থায় চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে রপ্তানি আয়ের ৬ দশমিক ৩৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি এবং সেপ্টেম্বর মাসে ৮ দশমিক ৫৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি দেশের রপ্তানি বাণিজ্যে ইতিবাচক ধারার ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে কয়েকটি খাতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি থাকায় সামগ্রিক রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে পণ্য ও বাজার বহুমুখীকরণ, নতুন বাজারে প্রবেশ এবং বিদ্যমান বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

রপ্তানিসংশ্লিষ্টদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা এবং নীতিগত সহায়তার পাশাপাশি নতুন পণ্য ও বাজারকে গুরুত্ব দিয়ে এগোতে পারলে দেশের রপ্তানি আয় আরও সমপ্রসারিত করার সুযোগ তৈরি হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।