নতুন বেতনকাঠামো
একসঙ্গে মিলবে প্রায় তিন মাসের বকেয়া
ছবি সংগৃহীত
নতুন বেতনকাঠামো অনুযায়ী সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন নির্ধারণের (পে-ফিক্সেশন) কাজ শুরু হচ্ছে—আগামীকাল সোমবার। আগামী ২০ অক্টোবরের মধ্যে এ প্রক্রিয়া শেষ করার নির্দেশ দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ।
পে-ফিক্সেশন শেষ হলে নতুন বেতনের সঙ্গে প্রায় তিন মাসের বকেয়া পাওনা একসঙ্গে পাবেন সরকারি চাকরিজীবীরা। তবে কার বকেয়া কত হবে, তা নির্ভর করবে নতুন বেতন নির্ধারণ, বর্তমান মূল বেতন ও কার্যকর তারিখের ওপর।
জানা গেছে, সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন নির্ধারণ করা হবে আইবাস প্লাস প্লাসের পে-ফিক্সেশন মডিউলে। এজন্য চাকরিজীবীদের অনলাইনে নিজেদের চাকরিসংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য দিতে হবে।
এর মধ্যে জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য, জন্মতারিখ, বর্তমান পদ ও গ্রেড, চাকরিতে যোগদানের তারিখ এবং ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে প্রাপ্ত মূল বেতনের তথ্য দিতে হবে। পাশাপাশি আগের বেতন নির্ধারণের তথ্যও যাচাই করতে হবে।
নতুন কাঠামোয় প্রত্যেকের মূল বেতন কত হবে, তা পে-ফিক্সেশনের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে। নতুন ও পুরোনো মূল বেতনের পার্থক্য এবং বেতন কার্যকরের তারিখ বিবেচনায় নিয়ে বকেয়া পাওনার হিসাব করা হবে।
যার বকেয়া যত
অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, পে-ফিক্সেশন শেষ হওয়ার পর প্রায় তিন মাসের বকেয়া একসঙ্গে পরিশোধ করা হবে। তবে সবার বকেয়ার পরিমাণ এক হবে না। সংশ্লিষ্ট চাকরিজীবীর গ্রেড, ৩০ জুনের বর্তমান মূল বেতন, নতুন কাঠামোয় নির্ধারিত মূল বেতন এবং কার্যকর তারিখের ওপর বকেয়ার পরিমাণ নির্ভর করবে।
এ ক্ষেত্রে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর পদোন্নতি, বদলি, টাইম স্কেল, সিলেকশন গ্রেড বা উচ্চতর গ্রেড হয়ে থাকলে সেসব তথ্যও দিতে হবে। এসব তথ্যের পক্ষে থাকা অফিস আদেশ ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র প্রস্তুত রাখতে বলা হয়েছে।
বিশেষ করে নাম, জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, জন্মতারিখ, পদবি, গ্রেড ও বেতনসংক্রান্ত তথ্য ভালোভাবে যাচাই করতে হবে। ভুল বা অসম্কূর্ণ তথ্য থাকলে পে ফিক্সেশনে জটিলতা তৈরি হতে পারে। অনলাইনে তথ্য দেওয়ার ক্ষেত্রে আইবাস প্লাস প্লাসে নিবন্ধিত মুঠোফোন নম্বরও প্রয়োজন হবে।
কোনো চাকরিজীবীর জাতীয় পরিচয়পত্র না থাকলে চাকরির নথিতে থাকা জন্মতারিখসহ প্রয়োজনীয় তথ্য হালনাগাদ করে আবেদন করতে হবে।
দুই ধাপে মিলবে বাড়তি বেতনের টাকা
১১ বছর পর সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য গত ১৯ সেপ্টেম্বর নতুন জাতীয় বেতনকাঠামো বাস্তবায়নে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে সরকার। এতে সর্বনিম্ন মূল বেতন ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে যে মূল বেতন ছিল, তার ভিত্তিতে নতুন কাঠামোয় বেতন নির্ধারণ করা হবে। নতুন ও পুরোনো মূল বেতনের পার্থক্যের ৪০ শতাংশ চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেওয়া হবে। এরপর ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত ওই পার্থক্যের ৭০ শতাংশ দেওয়া হবে। ২০২৭ সালের ১ জুলাই থেকে পুরো নতুন মূল বেতন কার্যকর হবে।
নতুন বেতনকাঠামো ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ অর্থবছরে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। মূল বেতন তিন ধাপে কার্যকর হবে। আর নতুন কাঠামোর ভাতা কার্যকর হবে ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে।
অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরে দুই দফায় মূল বেতনের ৭০ শতাংশ দেওয়ার জন্য প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
অনলাইনে তথ্য দিলেই শেষ নয়
চাকরিজীবীরা অনলাইনে তথ্য দেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ কার্যালয় তা যাচাই করবে। দেওয়া তথ্য ও দাখিল করা নথির মধ্যে কোনো অসংগতি থাকলে তা সংশোধন করতে হবে। ফলে শুধু অনলাইনে তথ্য পূরণ করলেই পে-ফিক্সেশন শেষ হবে না, আগের চাকরির ইতিহাস, বেতন নির্ধারণ ও পদোন্নতির তথ্যের সঙ্গে নতুন তথ্যের সামঞ্জস্য থাকতে হবে।
অনলাইনে তথ্য দিতে কোনো সমস্যা হলে সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার সহায়তা নেওয়া যাবে।
পে-ফিক্সেশন চূড়ান্ত হওয়ার পর নতুন মূল বেতনের ভিত্তিতে বেতন বিল তৈরি করা হবে। একই সঙ্গে নতুন ও পুরোনো বেতনের পার্থক্য অনুযায়ী বকেয়া পাওনার হিসাবও চূড়ান্ত হবে।
হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ
পে-ফিক্সেশন সুষ্ঠুভাবে শেষ করতে হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনলাইন প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। অর্থ বিভাগের ‘সেবা দেওয়া সক্ষম করতে সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা শক্তিশালীকরণ কর্মসূচি’র (এসপিএফএমএস) আওতায় আইবাস প্লাস প্লাস এ প্রশিক্ষণ দিচ্ছে।
প্রশিক্ষণে প্রধান হিসাব ও অর্থ কর্মকর্তা (সিএএফও), বিভাগীয় হিসাব নিয়ন্ত্রক (ডিসিএ), জেলা হিসাব ও অর্থ কর্মকর্তা (ডিএএফও) এবং উপজেলা হিসাব কর্মকর্তা (ইউএও) কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অংশ নিচ্ছেন।
উচ্চতর গ্রেড নিয়ে জটিলতা
নতুন বেতনকাঠামোর হিসাব করতে গিয়ে কিছু ক্ষেত্রে জটিলতা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে আগের বেতনকাঠামোয় টাইম স্কেল, সিলেকশন গ্রেড বা উচ্চতর গ্রেড পাওয়া কর্মচারীদের ক্ষেত্রে নতুন কাঠামোয় বেতন নির্ধারণ নিয়ে জটিলতা রয়েছে। বিষয়টি সমাধানে কাজ করছে অর্থ বিভাগ।
নতুন বেতন আদেশ অনুযায়ী, কোনো স্থায়ী কর্মচারী পদোন্নতি ছাড়া একই পদে আট বছর পূর্ণ করলে এবং চাকরি সন্তোষজনক হলে পরবর্তী উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সুযোগ পাবেন। প্রথম উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার পর একই পদে আরও ছয় বছর চাকরি করলে দ্বিতীয় উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার বিধান রয়েছে।
তবে আগের বেতনকাঠামোয় একই পদে দুই বা ততোধিক সিলেকশন গ্রেড, টাইম স্কেল বা উচ্চতর গ্রেড পেয়ে থাকলে নতুন বেতনকাঠামোয় ওই পদে আর উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সুযোগ থাকবে না।
অন্যদিকে, ৩০ জুন ২০২৬ পর্যন্ত একই পদে একটিমাত্র উচ্চতর স্কেল বা গ্রেড পাওয়া থাকলে পরবর্তী ছয় বছর পূর্তির পর দ্বিতীয় উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার বিধান রয়েছে।
জানা গেছে, ৫ থেকে ২০ অক্টোবরের মধ্যে পে-ফিক্সেশনের সময় শুধু বর্তমান বেতন নয়, আগের পদোন্নতি, উচ্চতর গ্রেড এবং বেতন নির্ধারণের ইতিহাসও সঠিকভাবে যাচাই করতে হবে। এসব তথ্য ঠিক থাকলেই নতুন বেতন ও বকেয়া পাওনার হিসাব নির্ভুলভাবে করা সম্ভব হবে।