রোববার, ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ১৮ আশ্বিন ১৪৩৩

হাফিজুর রহমান হীরা (বরিশাল ব্যুরো)

প্রকাশ: ২৩:১২, ৪ অক্টোবর ২০২৬

পর্যটনের নতুন সম্ভাবনা পেয়ারার জনপদ আটঘর-কুড়িয়ানা

পর্যটনের নতুন সম্ভাবনা পেয়ারার জনপদ আটঘর-কুড়িয়ানা

ছবি সংগৃহীত

খালের পানিতে সারি সারি ডিঙি নৌকা, নৌকাভর্তি সবুজ-হলুদ পেয়ারা, দুই পাশে বিস্তীর্ণ বাগান আর ব্যস্ত কৃষক-ব্যবসায়ীর কর্মচাঞ্চল্য। দেশের দক্ষিণাঞ্চলের পিরোজপুর জেলার নেছারাবাদ উপজেলার আটঘর-কুড়িয়ানা এখন আর শুধু পেয়ারার জনপদ নয়, সম্ভাবনাময় কৃষিভিত্তিক পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে এর খ্যাতি ছড়াচ্ছে বিদেশেও। শত বছরের ঐতিহ্য, ভাসমান পেয়ারা বাজার, খালনির্ভর জীবনযাত্রা ও গ্রামীণ প্রকৃতি মিলিয়ে এ অঞ্চলটি দেশের অন্যতম এক সম্ভাবনাময় এগ্রো-ইকো-ট্যুরিজম এলাকা হিসাবে ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। সাম্ক্রতিক সময়ে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের এ অঞ্চল কেন্দ্রিক আগ্রহ সেই সম্ভাবনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। গত ৯ আগস্ট বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন এই এলাকাঘেঁষা পাশের ঝালকাঠি জেলার ভিমরুলি ভাসমান পেয়ারা বাজার পরিদর্শনের পর নৌপথে আটঘর-কুড়িয়ানা এলাকায় যান। তিনি নৌকায় ঘুরে পেয়ারা বেচাকেনা, কৃষক-ব্যবসায়ীদের কার্যক্রম এবং খাল-বিল ও বাগানঘেরা গ্রামীণ পরিবেশ দেখেন। স্থানীয় মানুষের সঙ্গে কথাও বলেন। তার এ সফরটি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আটঘর-কুড়িয়ানার কৃষি, প্রকৃতি ও গ্রামীণ জীবনভিত্তিক পর্যটন সম্ভাবনার দৃশ্যমানতা বাড়িয়েছে। এর আগেও বিভিন্ন দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আগমন এবং অন্যান্য দেশের কূটনৈতিকদের সফরও এ অঞ্চলের প্রতি পর্যটকদের বাড়তি আগ্রহ সৃষ্টি করেছে।
পর্যটকদের চাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এ অঞ্চলের পরিবেশ ও স্থানীয় জীবনযাত্রা রক্ষার বিষয়টিও সামনে এসেছে। গত বছর স্থানীয় প্রশাসন আটঘর-কুড়িয়ানা পেয়ারা বাগান ও সংশ্লিষ্ট এলাকায় পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় কিছু নির্দেশনা জারি করেছিল। এর মধ্যে উচ্চ শব্দের বাদ্যযন্ত্র নিষিদ্ধ করা, শালীনতা বজায় রাখা এবং বড় বা উচ্চ শব্দযুক্ত ইঞ্জিনচালিত নৌযান নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালেও পর্যটকদের নিরাপদ ও শৃঙ্খলাপূর্ণ ভ্রমণ নিশ্চিত করতে নেছারাবাদ থানা পুলিশ সচেতনতামূলক কার্যক্রম শুরু করেছে। উচ্চ শব্দ ও পর্যটকদের জন্য বিরক্তিকর কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে সজাগ রয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। তবে এখন পর্যন্ত সরকারি পদক্ষেপের বড় অংশই পরিবেশ সুরক্ষা, নিরাপত্তা, শৃঙ্খলা এবং পর্যটন ব্যবস্থাপনার ভিত্তি তৈরিকে ঘিরে রয়েছে। পাশাপাশি জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পেয়ারা-বাগানকে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কার্যক্রম গ্রহণের প্রস্তাব সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে বলে জানা যায়।
এ অঞ্চলে কৃষির সঙ্গে পর্যটনের সংযোগ স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। স্থানীয় কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, আটঘর-কুড়িয়ানা ও আশপাশের ২২টি গ্রামে ৬৫৭ হেক্টর জমিতে দুই হাজার ২৫টি পেয়ারা বাগান রয়েছে। শত বছরের বেশি সময় ধরে এখানে বাণিজ্যিকভাবে পেয়ারা চাষ হয়ে আসছে। বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যমতে, ২০২৬ সালের এবারের মৌসুমে আটঘর-কুড়িয়ানার ভাসমান হাটে ২০ কোটি টাকার বেশি পেয়ারার বেচাকেনার হয়েছে। ফলে পর্যটনকে কৃষির বিকল্প নয়, বরং কৃষির সঙ্গে যুক্ত অতিরিক্ত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হয়েছে এ অঞ্চলে।
পর্যটকের নৌযাত্রা, স্থানীয় খাবার, পেয়ারা ও অন্যান্য কৃষিপণ্য, নৌকা ভাড়া, গাইড, হস্তশিল্প, ক্ষুদ্র দোকান, কৃষকের সরাসরি পণ্য বিক্রি এবং স্থানীয় আবাসন—সব মিলিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ স্থানীয় অর্থনৈতিক চক্র তৈরি করা সম্ভব। এতে কৃষক, মাঝি, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, তরুণ উদ্যোক্তা ও স্থানীয় সেবাদাতাদের আয় বাড়ার পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতিও শক্তিশালী হতে পারে। পর্যটকের চাপ বাড়লেও এখানে পর্যাপ্ত মানসম্মত আবাসন, স্যানিটেশন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নিরাপদ নৌযান ও নির্ধারিত ঘাট এখনও সীমিত। অতিরিক্ত পর্যটকদের ভিড় এ অঞ্চলের বাগান, খাল ও স্থানীয় জীবনের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। প্লাস্টিক বর্জ্য, নৌযানের শব্দ, অনিয়ন্ত্রিত স্থাপনা এবং কৃষি-জমিকে বাণিজ্যিক বিনোদনকেন্দ্রে রূপান্তরের প্রবণতা অতিরিক্ত মাত্রায় বাড়তে থাকলে এখানকার মূল আকর্ষণই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই পর্যটন সম্ক্রসারণের আগে এলাকার পরিবেশগত ধারণক্ষমতা, নৌপথের নিরাপত্তা এবং স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রার ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নিরূপণ জরুরি। 
বয়বসায়ী নেতা বরিশাল চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি এবায়েদুল হক চাঁন বলেন, ‘পরিকল্পিত উন্নয়নেই টেকসই পর্যটনের পথ’। তিনি আরো বলেন, বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের একটি পরিকল্পনায় ২ দশমিক ৮ কিলোমিটার কুড়িয়ানা খালকে কেন্দ্র করে ভাসমান বাজার, বাগান, ধর্মীয় ও ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাকে সংযুক্ত করে কৃষি, সংস্কৃতি ও নৌপথভিত্তিক পর্যটন করিডর তৈরি উচিত। সেখানে ছোট নৌঘাট, ওয়াচ টাওয়ার, খাবারের স্থান, স্যানিটেশন ব্যবস্থা এবং স্থানীয় পণ্য বিপণনের বিষয়টিও নিশ্চিত করা উচিত। 
স্থানীয় পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে জড়িত মামুন বলেন, এখানে গ্রামীণ পরিবেশ ও স্থানীয় ঐতিহ্য ঠিক রেখে বড় স্থাপনা নির্মাণের পরিবর্তে ছোট ছোট স্থাপনা নির্মাণ করা উচিত। এখানে ‘লো-ইমপ্যাক্ট, হাই-ভ্যালু’ পর্যটন মডেল প্রয়োজন। সরকারি অর্থায়নে মৌলিক অবকাঠামো—নিরাপদ ঘাট, স্যানিটেশন, বর্জ্য সংগ্রহ, সাইনেজ, জরুরি চিকিৎসা ও নৌনিরাপত্তা—তৈরি করা যেতে পারে। আর খাবার, গাইড, নৌভ্রমণ, হোমস্টে, কৃষিপণ্য বিক্রি ও ছোট পর্যটনসেবা স্থানীয় উদ্যোক্তাদের হাতে রাখা যেতে পারে। পর্যটকদের কাছ থেকে সামান্য পরিবেশ ফি নিয়ে সেই অর্থ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, খাল পরিষ্কার ও বাগান সংরক্ষণে ব্যয় করা যেতে পারে। 
স্থানীয় বাসিন্দা আরিফ বলেন, কৃষকদের অংশীদার করে ‘ফার্ম ভিজিট’, পেয়ারা সংগ্রহের অভিজ্ঞতা, স্থানীয় খাবার ও সরাসরি কৃষিপণ্য বিক্রির ব্যবস্থা করা হলে পর্যটনের অর্থ স্থানীয় মানুষের কাছেই থাকবে। একই সঙ্গে পর্যটক সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, নির্দিষ্ট নৌপথ ও ঘাট ব্যবস্থাপনা, প্লাস্টিক নিষেধাজ্ঞা এবং স্থানীয় গাইডদের প্রশিক্ষণও জরুরি।