রোববার, ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ১৮ আশ্বিন ১৪৩৩

ইমতিয়াজ আহমেদ, নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশ: ২৩:১৬, ৪ অক্টোবর ২০২৬

অবৈধ এই কারবারের সঙ্গে জড়িত সিন্ডিকেট

তিন জেলায় বছরে বিক্রি হয় কয়েকশ কোটি টাকার বন্ড সুতা

তিন জেলায় বছরে বিক্রি হয় কয়েকশ কোটি টাকার বন্ড সুতা

ছবি সংগৃহীত

বন্ড সুবিধায় শুল্কমুক্তভাবে আমদানি করা সুতা খোলাবাজারে বিক্রি হওয়ার ঘটনা নারায়ণগঞ্জে নতুন নয়। কাস্টমস কর্মকর্তাদের মতে, প্রতি মাসে নারায়ণগঞ্জের টানবাজার, আড়াইহাজারের গোপালদী, রূপগঞ্জের গাউছিয়া, কাঞ্চন এলাকা ও নরসিংদী জেলার মাধবদীতে কয়েক কোটি টাকার বন্ডেড সুতা খোলাবাজারে বিক্রি হয়। একশ্রেণির অসাধু আমদানিকারক এ কাজে জড়িত। নারায়ণগঞ্জের টানবাজার এলাকার প্রবীণ সুতা ব্যবসায়ীরা জানান, নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর জেলায় বছরে কয়েকশ কোটি টাকার বন্ড সুবিধায় শুল্কমুক্তভাবে আমদানি করা সুতা খোলাবাজারে বিক্রি হয়। অবৈধ এই কারবারের সঙ্গে জড়িত বিরাট সিন্ডিকেট। 
ব্যবসায়ীরা বলছেন, কিছু অসাধু মালিক নামমাত্র ২০ থেকে ২৫টি মেশিন বসিয়ে পোশাক ব্যবসার নামে বন্ড-সুবিধার আওতায় সুতা আমদানি করে খোলাবাজারে বিক্রি করে। বন্ডের সুতার সরবরাহ বাড়ায় টানবাজারে বিদেশি সুতার চাহিদা বেড়েছে। তাই দেশি সুতা বিক্রি কমে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে সুতা ছেড়ে অন্য ব্যবসা ধরেছেন অনেকে। কাঁচামাল আমদানির প্রবণতাতেও এসেছে পরিবর্তন। বন্ডের সুতা বিক্রির অবৈধ কারবারের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে অনেক ব্যবসায়ী। 
নারায়ণগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী নারায়ণগঞ্জ ক্লাব এবং বাংলাদেশ ইয়ার্ন মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এম সোলায়মান বলেন, রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য বন্ড সুবিধা প্রদান করা হয়েছিল। বর্তমানে এ সুবিধার প্রচুর অপব্যবহার হচ্ছে। তাই এ সুবিধা বাতিল কিংবা বন্ড ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, ডিজিটাল ট্র্যাকিং এবং কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা জরুরি। প্রকৃত রপ্তানিমুখী শিল্প যাতে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল সহজে আমদানি করতে  পারে এবং একই সঙ্গে বন্ড সুবিধার অপব্যবহারের মাধ্যমে কেউ যাতে স্থানীয় বাজারে অন্যায্য সুবিধা নিতে না পারে, সেজন্য কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা দরকার। কেননা বন্ড সুবিধার অপব্যবহার অব্যাহত থাকলে বিপুল বিনিয়োগে গড়ে ওঠা দেশীয় প্রাইমারি টেক্সটাইল শিল্প ক্রমবর্ধমান অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে বাধ্য। এতে স্থানীয় উৎপাদন, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাকশিল্পের স্থানীয় কাঁচামাল সরবরাহ ব্যবস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
টেক্সটাইল মিল মালিকদের মতে, নরসিংদী ও নারায়ণগঞ্জের ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে না দেখে আটক পণ্যের উৎস থেকে চূড়ান্ত গন্তব্য পর্যন্ত পুরো সরবরাহব্যবস্থা অনুসন্ধান, প্রকৃত আমদানিকারক শনাক্তকরণ এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।
গত কয়েক বছরে টানবাজারে সুতার বাজার অস্থিরতার মধ্য দিয়ে গেছে। একপর্যায়ে ১০০ টাকার সুতার দাম ওঠে ১৭৭ টাকায়, যা ১০ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে নজিরবিহীন। আবার এক সময়ে বন্ডের সুতা খোলাবাজারে বিক্রি বন্ধে অভিযানের জেরে সরবরাহ কমে এক মাসের ব্যবধানে ৩০ কাউন্টের সুতার দাম পাউন্ডপ্রতি ৯৬-১০২ টাকা থেকে বেড়ে ১০০-১০৫ এবং ৪০ কাউন্টের দাম ১১২-১১৬ টাকা থেকে বেড়ে পৌঁছে ১১৮-১২০ টাকায়। 

এ বিষয়ে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, নরসিংদী ও নারায়ণগঞ্জে আটক সুতার বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত আমদানিকারক, সরবরাহকারী এবং বন্ড সুবিধার আওতায় পণ্য খালাস ও পরিবহণের পুরো প্রক্রিয়াটি অনুসরণ করা হলে বন্ড ব্যবস্থার সম্ভাব্য অপব্যবহারের প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে। তিনি আরও বলেন, এ ধরনের ঘটনায় শুধু পণ্য আটক করাই যথেষ্ট নয়। পণ্যটি কার নামে আমদানি হয়েছে, কোন প্রতিষ্ঠানের বন্ড লাইসেন্সের আওতায় এসেছে, কীভাবে সংশ্লিষ্ট গোডাউনে পৌঁছেছে এবং কোথায় যাওয়ার কথা ছিল—এসব বিষয় তদন্তের আওতায় এনে দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
গত বছরের মার্চে রাজস্ব বোর্ডে পাঠানো পুলিশের বিশেষ ব্রাঞ্চের এক প্রতিবেদনে বন্ড সুবিধা অপব্যবহারের আদ্যোপান্ত তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের অধিকাংশ গার্মেন্টের মালিক চোরাচালানের সঙ্গে সম্কৃক্ত। কিছু অসাধু মালিক নামমাত্র ২০ থেকে ২৫টি মেশিন বসিয়ে এবং ভুয়া উৎপাদন দেখিয়ে পোশাক ব্যবসার নামে বন্ড-সুবিধার আওতায় কাপড়, সুতা ও অন্যান্য সামগ্রী আমদানি করে তা খোলাবাজারে বিক্রি করে দেন। এছাড়া গার্মেন্টপণ্য রপ্তানিকারকদের একটি অংশ প্রয়োজনের চেয়ে বেশি পরিমাণ কাঁচামালের প্রাপ্যতা দেখিয়ে আমদানি করা অতিরিক্ত পণ্য অবৈধভাবে খোলাবাজারে বিক্রি করে দেন। আবার কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও তাদের বন্ডেড লাইসেন্স বিভিন্ন পন্থায় কার্যকর দেখিয়ে সুবিধা আদায় করে নিচ্ছে একটি চক্র।
এতে আরও বলা হয়, ভারত ও চীন থেকে বন্ড-সুবিধায় আনা পণ্য প্রথমে চট্টগ্রামের টেরিবাজার নামক স্থানে জাহাজ থেকে আনলোড বা খালাস করা হয়। এসব পণ্য ওয়্যারহাউসে না নিয়ে নারায়ণগঞ্জ, কেরানীগঞ্জ ও নরসিংদীতে রাতের অন্ধকারে গাড়ি আনলোড করা হয়। নরসিংদী ও নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ডের আশপাশে আগে থেকে অনেক বাড়ি ভাড়া নিয়ে রাখা হয়। পরে ভ্যানযোগে পণ্যগুলো ঢাকায় পাঠানো হয়। বিভিন্ন কোম্কানির ওয়্যারহাউস থেকে অবৈধ কাপড়বোঝাই ট্রাক সাধারণত রাত ১২টার পর সরাসরি ইসলামপুর ও সদরঘাটের বিভিন্ন মার্কেটে চলে যায়। মার্কেটগুলোর মধ্যে সদরঘাটের বিক্রমপুর সিটি গার্ডেন মার্কেট, ইসলামপুরের নূর ম্যানশন, সাউথ প্লাজা, গুলশান আরা সিটি, মনসুর ক্যাসেল, হাবিবুল্লাহ মার্কেট ও ইসলাম প্লাজা অন্যতম।
সুতা আমদানির বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, থান কাপড়ের মতো সুতা আমদানির ক্ষেত্রেও ওয়েস্টেজ বেশি দেখিয়ে বন্ড-সুবিধায় অতিরিক্ত সুতা আমদানি করা হয়। এছাড়া অসাধু আমদানিকারকরা কার্টনে সুতা আনার ক্ষেত্রে কাস্টমসের সঙ্গে যোগসাজশ করে সুতার গ্রেড পরিবর্তন করে (৩০ কাউন্টের ঘোষণা দিয়ে ৮০ কাউন্টের সুতা) বেশি মূল্যের সুতা নিয়ে আসেন, যার ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ নরসিংদী, সিরাজগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন মার্কেটে বিক্রি করা হয়। আগে বৈধ পথে আনা ভ্যাট চালানের রসিদ ব্যবহার করে বন্ড-সুবিধায় আনা বিপুল পরিমাণ কাপড় খোলাবাজারে বিক্রি করে দেওয়া হয়।
সাম্ক্রতিক এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কাঁচা তুলা সরবরাহে ভারতকে পেছনে ফেলেছে ব্রাজিল। কিন্তু উন্নত স্কিনিং সক্ষমতা ও কম লজিস্টিক ব্যয়ের কারণে সুতা সরবরাহে ভারত এগিয়ে। ফলে দেশীয় স্কিনিং মিলনির্ভর টানবাজারের ব্যবসায়ীরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন। সুতার ব্যবসা ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে চলে এসেছে বন্ড সুতার চোরাকারবারিদের জন্য। 
টানবাজারের সুতা ব্যবসায় বড় সংকট তৈরি করেছে অবৈধভাবে বাজারজাত হওয়া বন্ডেড সুতা। কিছু সিন্ডিকেটের মাধ্যমে শুল্ক রেয়াত সুবিধায় রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য আমদানি করা কোটি কোটি টাকার সুতা প্রতিদিন খোলাবাজারে চলে আসছে। এই বন্ডের আওতায় আমদানি হওয়া প্রচুর সুতা কম দামে স্থানীয় বাজারে সরবরাহ হওয়ায় দেশি স্কিনিং মিলগুলোর বিক্রি উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে এবং মিল মালিকদের লোকসান গুনতে হচ্ছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) চলতি বছরের মাঝামাঝি সময়ে বন্ড ব্যবস্থাপনা পুরোপুরি অটোমেশনের আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে, ইউটিলাইজেশন পারমিটসহ প্রায় সব সেবা ডিজিটাল করা হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, সীমিত জনবল ও নজরদারির অভাবে বন্ড সুবিধার অপব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করা যায়নি।