শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৯ আশ্বিন ১৪৩৩

শেখ সাদী খান

প্রকাশ: ২০:৩৬, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ২০:৩৭, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলে রেলপথ রক্ষণাবেক্ষণ ও পুনর্বাসন প্রকল্প

সরকারি অর্থ ব্যয় এবং ঠিকাদার নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন

সরকারি অর্থ ব্যয় এবং ঠিকাদার নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন

ছবি সংগৃহীত

বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের দীর্ঘদিনের পুরোনো ও জরাজীর্ণ রেল নেটওয়ার্ক পুনর্গঠনে ১ হাজার ৭৯১ কোটি ৬৬ লাখ টাকার একটি বিশাল প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। তবে প্রকল্পের দরপত্র প্রক্রিয়া চলমান থাকায় মাঠপর্যায়ের মূল পূর্তকাজ ও মালামাল ক্রয়ে এখনো কোনো অর্থ ব্যয় করা সম্ভব হয়নি। ‘বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের রেলপথ রক্ষণাবেক্ষণ ও পুনর্বাসন’ শীর্ষক এই প্রকল্পটি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে দেশের পূর্বাঞ্চলীয় রেল যোগাযোগে এক নতুন দিগন্তের সূচনা হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে পূর্বাঞ্চলের রেলপথ রক্ষণাবেক্ষণ ও পুনর্বাসনে কয়েক হাজার কোটি টাকার সরকারি অর্থ ব্যয়ের আগে প্যাকেজের আকার, দরপত্রে প্রতিযোগিতা, কাজের প্রাক্কলন এবং ঠিকাদার নির্বাচনের প্রক্রিয়া-স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে বলে জানান খাতসংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা। একক দরদাতা থাকা সত্ত্বেও পছন্দের প্রতিষ্ঠানগুলোকে কাজ পাইয়ে দিতে প্রকল্পের বর্তমান পরিচালকসহ একটা চক্র সক্রিয়—এমন অভিযোগও করেছেন কয়েকজন কর্মকর্তা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মকর্তা জানান, বর্তমান প্রকল্প পরিচালক ও তার অনুসারী কয়েকজন কর্মকর্তা ব্যক্তি স্বার্থে অনৈতিক উপায়ে নিজেদের পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ দেওয়ার লক্ষ্যে আন-অফিশিয়ালি কীভাবে ই-টেন্ডার সাবমিট করতে হবে, কোন পদ্ধতি বা বিষয় উল্লেখ করতে হবে—সেসব আগে থেকেই জানিয়ে দেন। তবে প্রকল্প পরিচালক মো. তানভিরুল ইসলাম জানান, এই প্রকল্পের আওতায় প্রতিটি কাজের দরপত্র ই-জিপি পদ্ধতিতে প্রক্রিয়া করা হচ্ছে বলে এখানে ব্যক্তিবিশেষকে বা কোনো প্রতিষ্ঠানকে আনুকূল্য প্রদানের কোনো সুযোগ নেই।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, বহু বছর ধরে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাব ও অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে পূর্বাঞ্চলের অনেক রেল ট্র্যাক ও স্লিপার দুর্বল হয়ে পড়েছে। নতুন রেললাইন নির্মিত হলেও পুরনো লাইনগুলোতে পর্যাপ্ত বরাদ্দ না থাকায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল, যা নিরসনে এই পুনর্বাসন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে।

রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালের ২৭ জুলাই একনেক সভায় অনুমোদিত হওয়া এই প্রকল্পটির মেয়াদকাল নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২৯ সালের জুন পর্যন্ত। ইতোমধ্যে ২০২৫ সালের ২৮ নভেম্বর প্রকল্পের জন্য প্রকল্প পরিচালকও নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সেকশনভিত্তিক সংস্কার ও সম্ভাব্য ব্যয়প্রকল্পের আওতায় পূর্বাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকটি সেকশনের মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে, জয়দেবপুর-ময়মনসিংহ-জামালপুর-দেওয়ানগঞ্জ বাজার-জামালপুর-ইব্রাহিমাবাদ ময়মনসিংহ-গৌরীপুর, শ্যামগঞ্জ-মোহনগঞ্জ, শ্যামগঞ্জ-জারিয়া ঝাঞ্জাইল, গৌরীপুর-ভৈরববাজার-আখাউড়া-সিলেট-লাকসাম-নোয়াখালী ষোলশহর-নাজিরহাট ফতেয়াবাদ-চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রভৃতি সেকশন।

রেলপথমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম জানান,  প্রকল্পের কাজ দ্রুত শুরু করতে এরই মধ্যে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে এবং গত ৮ এপ্রিল দরপত্র উন্মুক্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া বর্তমানে কারিগরি ও আর্থিক মূল্যায়ন কার্যক্রম চলছে। এ প্রক্রিয়া শেষ হলে ঠিকাদার নিয়োগ করে সংস্কারকাজ শুরু করবে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ এবং প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে রেলপথে দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেকাংশে কমে আসবে। একই সঙ্গে যাত্রীসেবার মানোন্নয়নসহ ট্রেন ভ্রমণ আগের চেয়ে অনেক বেশি আরামদায়ক ও নিরাপদ হবে।

প্রকল্প পরিচালক মো. তানভিরুল ইসলাম শেয়ার বিজক জানান, রাজস্ব বাজেটের স্বল্পতার কারণে পূর্বাঞ্চলের বিশাল রেল নেটওয়ার্কের কাঙ্ক্ষিত রক্ষণাবেক্ষণ সম্ভব হচ্ছিল না। এই বাস্তবতায় ট্রেনের নিরাপদ ও সুষ্ঠু চলাচল নিশ্চিত করতে সম্পূর্ণ সরকারি (জিওবি) অর্থায়নে ১ হাজার ৭৯১ কোটি ৬৬ লাখ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে এই উন্নয়ন প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়।

ট্র্যাক ও অবকাঠামো সংস্কার, রেল স্লিপার ও ফিটিংস সংগ্রহ কিংবা কনস্ট্রাকশন অব ট্র্যাক মেইনটেন্যান্স ওয়ার্কে কত টাকা ব্যয় হয়েছে—জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক মো. তানভিরুল ইসলাম বলেন, রেলওয়ের আনুষ্ঠানিক উত্তর অনুযায়ী, অদ্যাবধি মূল পূর্ত কাজের মালামাল ও ফিজিক্যাল ওয়ার্কে কোনো অর্থ ব্যয় করা হয়নি। মূলত রেল ও ফিটিংস, স্লিপার এবং ব্যালাস্ট সংগ্রহের মতো অত্যন্ত ব্যয়বহুল কাজগুলোর জন্য এখন দরপত্র আহ্বান ও মূল্যায়নের প্রক্রিয়া চলছে।

বর্তমানে পি-ওয়ে মালামাল সংগ্রহের দুটি এবং পূর্ত কাজের চারটি প্যাকেজের (পাঁচটি লট) মূল্যায়ন কাজ চলমান রয়েছে জানিয়ে প্রকল্প পরিচালক বলেন, টেম্পিং মেশিন ও গ্যাং কার সরবরাহের মতো মালামালের দুটি এবং পি-ওয়ে পূর্তকাজের আরও দুটি প্যাকেজের দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। খুব শিগগিরই বাকি প্যাকেজগুলোর দরপত্র আহ্বান শেষে মাঠ পর্যায়ে মূল কাজ শুরু হবে।

তিনি আরও বলেন, কর্মকর্তাদের ভাতা ও আনুষঙ্গিক খাত প্রকল্পের প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাজের অংশ হিসেবে কিছু নির্দিষ্ট খাতে বরাদ্দ ও ব্যয়ের বিধান থাকে।  এর মধ্যে রয়েছে, বেসিক পে অফ অফিসার, এটি প্রকল্পে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের মূল বেতন-সংক্রান্ত ব্যয়। ট্রাভেলিং অ্যালাউন্স (ভ্রমণ ভাতা), যা প্রকল্পের তদারকি, মাঠপর্যায়ে পরিদর্শন এবং দাপ্তরিক প্রয়োজনে কর্মকর্তাদের যাতায়াতের জন্য দেওয়া হয়।

এদিকে কতজন কোথায় ভ্রমণ করেছেন বা কত টাকা ব্যয় হয়েছে—জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক বলেন, মূলত মাঠপর্যায়ের কাজ শুরু এবং ভ্রমণ সম্পন্ন হওয়ার পর চূড়ান্ত হিসাবের আওতায় আসবে। ফেস্টিভ্যাল অ্যালাউন্স (উৎসব ভাতা) মূলত নিয়োজিত কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ধর্মীয় উৎসবগুলোয় সরকারি বিধি মোতাবেক প্রদান করা হয়।

রেল সূত্রে জানা যায়, রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, সরঞ্জামসহ প্রায় ১ হাজার ৭৬১ কোটি টাকার প্রকল্পের আওতায় পূর্বাঞ্চলের ট্র্যাক রক্ষণাবেক্ষণ ও পুনর্বাসনের জন্য ৮৮৩ কোটি ৭২ লাখ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয় অনুমোদন করা হয় ২০২৫ সালের ১৭ জুলাই। ট্র্যাকের কাজগুলো আটটি প্যাকেজে ভাগ করা হয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রামের ষোলোশহর থেকে ফতেয়াবাদ হয়ে নাজিরহাট এবং ফতেয়াবাদ থেকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত কাজের প্রাক্কলিত ব্যয় ৫৮ কোটি ৯০ লাখ ৬৪ হাজার টাকা।

এছাড়া লাকসাম-নোয়াখালী সেকশনে ৪৬ কোটি ৩০ লাখ ৯ হাজার এবং জয়দেবপুর-শ্রীপুর অংশে ৩৯ কোটি ৭৬ লাখ ২৮ হাজার টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। ময়মনসিংহ-বেগুনবাড়ী, ময়মনসিংহ-মোহনগঞ্জ, শ্যামগঞ্জ জংশন-জারিয়া জাঞ্জাইল এবং গৌরীপুর-ময়মনসিংহ জংশন-আঠারোবাড়ী অংশে ২৩৫ কোটি ৬ লাখ ১৭ হাজার টাকা প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে।

এর মধ্যে বেগুনবাড়ী-দেওয়ানগঞ্জ বাজার, জগন্নাথগঞ্জ ঘাট-তারাকান্দি এবং তারাকান্দি-বঙ্গবন্ধু সেতু পূর্ব অংশে ২০০ কোটি ২২ লাখ ৬০ হাজার টাকা; ভৈরব বাজার জংশন-আঠারোবাড়ী অংশে ৫৩ কোটি ৬৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা; আখাউড়া-সাটিয়াজুরী অংশে ৫৯ কোটি ২৩ লাখ ২৮ হাজার টাকা এবং সিলেট-সাটিয়াজুরী অংশে ১৯০ কোটি ৫৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা প্রাক্কলিত ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে।

রেলের ট্র্যাক রক্ষণাবেক্ষণ কাজে অভিজ্ঞ একাধিক ঠিকাদার নাম প্রকাশ না করার শর্তে শেয়ার বিজকে বলেন, অতীতে একই ধরনের কাজ দুই থেকে পাঁচ কিংবা সাত কোটি টাকার তুলনামূলক ছোট প্যাকেজে দেওয়া হতো। এতে স্থানীয় এবং ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলোও দরপত্রে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেত। এবার বিভিন্ন এলাকার কাজ একত্র করে বড় প্যাকেজ করা হয়েছে। ফলে বড় অঙ্কের কাজের অভিজ্ঞতা ও আর্থিক সক্ষমতার শর্ত পূরণ করতে না পারায় অনেক প্রতিষ্ঠান দরপত্রে অংশ নেওয়ার আগেই বাদ পড়ে যাচ্ছে।

এদিকে কাজের ভলিউম অনুযায়ী অনেক প্যাকেজে মাত্র দুই থেকে চারটি প্রতিষ্ঠান অংশ নেওয়ার যোগ্যতা রাখে। এতে দরপত্রে স্বাভাবিক প্রতিযোগিতার পরিবেশ কতটা বজায় থাকছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে বলে জানা যায়।

রেলের একাধিক কর্মকর্তা জানান, সামপ্রতিক দুটি দরপত্রে অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল খুবই কম। এর মধ্যে ২৩৫ কোটি ৬ লাখ টাকার একটি প্যাকেজে মাত্র একটি প্রতিষ্ঠান দরপত্র জমা দিয়েছে বলে তারা জানান। অন্যদিকে ৩৯ কোটি ৭৬ লাখ টাকার প্যাকেজে অংশ নেয় দুটি প্রতিষ্ঠান।

খাতসংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা জানান, প্রকল্পের সুফল রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ আশা করছে, ২০২৯ সালের মধ্যে প্রকল্পটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে পূর্বাঞ্চলের যাত্রীদের ট্রেন যাত্রা হবে নির্বিঘ্ন, স্বস্তিদায়ক ও আরামপ্রদ। একই সঙ্গে ট্রেনের ভ্রমণ সময় উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাবে। উন্নত পরিকাঠামোর কারণে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা সহজ হবে, যা সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশ রেলওয়ের রাজস্ব আয় বহুলাংশে বৃদ্ধি করবে।