শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৯ আশ্বিন ১৪৩৩

​​​​​​​ইমতিয়াজ আহমেদ, নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশ: ২২:০৭, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নারায়ণগঞ্জের পোশাকশিল্পের হালচাল

আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানি বেড়েছে ২৫.৬৫ শতাংশ

আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানি বেড়েছে ২৫.৬৫ শতাংশ

ছবি সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিতে নতুন করে আশার আলো দেখা দিয়েছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের আগস্টে দেশটিতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি বেড়েছে ২৫ দশমিক ৬৫ শতাংশ। একক মাস হিসেবে এটিকে সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। রপ্তানি বৃদ্ধির এই ধারা দেশের পোশাকশিল্পের জন্য যেমন স্বস্তির খবর, তেমনি নারায়ণগঞ্জের পোশাক কারখানাগুলোর জন্যও নতুন অর্ডার ও উৎপাদন বাড়ানোর সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের বাজার নিয়ে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ কেউ পরিস্থিতি নিয়ে সতর্ক থাকলেও অনেকেই সামনের দিনগুলোতে রপ্তানি বাড়ার সম্ভাবনা দেখছেন। তাদের মতে, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা নতুন করে না বাড়লে এবং দেশে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পোশাক রপ্তানি ঘুরে দাঁড়াতে পারে।

বর্তমানে যে গতিতে যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি পোশাক রপ্তানি হচ্ছে, তা আগামী ১২ মাস অব্যাহত থাকলে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশটিতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশ ৮১৭ মিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। গত অর্থবছরের একই মাসে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৬৫০ দশমিক ৩৪ মিলিয়ন ডলার। জুলাই ও আগস্ট—চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ৬১ বিলিয়ন ডলারে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১১ দশমিক ৪২ শতাংশ বেশি।

নারায়ণগঞ্জ দেশের অন্যতম প্রধান পোশাক ও নিটশিল্পকেন্দ । ফতুল্লা, পঞ্চবটি, বিসিক, ইসদাইর, কাশীপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় গড়ে ওঠা অসংখ্য কারখানার উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রমের সঙ্গে জেলার অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের বড় অংশ জড়িত। সামপ্রতিক সময়ে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট, ব্যাংকিং জটিলতা, রপ্তানি আদেশের অনিশ্চয়তা ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে শিল্পোদ্যোক্তাদের মধ্যে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে রপ্তানি বৃদ্ধির খবর সেখানে কিছুটা স্বস্তি ফিরিয়েছে।

তবে উদ্যোক্তারা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে অর্ডার বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হলেও এর সুফল পেতে হলে উৎপাদনের প্রধান উপকরণগুলো নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহে স্থিতিশীলতা না থাকলে নতুন অর্ডার পেলেও সময়মতো উৎপাদন ও পণ্য সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়বে।

নারায়ণগঞ্জের ব্যবসায়ী সমাজের পরিচিত মুখ, পোশাকশিল্পের অন্যতম উদ্যোক্তা ও এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক মো. ফজলুল হক বলেন, শীতকালীন পোশাকের অর্ডার দেওয়ার শেষ সময় হওয়ায় আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি বেড়েছে। বৈশ্বিক নানা সংকটের মধ্যেও বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা রয়েছে। এ কারণেই প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও রপ্তানি বাড়ানো সম্ভব হয়েছে।

তিনি বলেন, আগামী মাসগুলোয় আগের তুলনায় ভালো অর্ডার পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে আরও বড় পরিসরে প্রবেশ করতে হলে পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়াতে হবে। শুধু প্রচলিত পোশাকের ওপর নির্ভর না করে উচ্চমূল্যের ও বৈচিত্র্যময় পোশাক উৎপাদনে সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন।

বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ও ফতুল্লা অ্যাপারেলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলে শামীম এহসানও মনে করেন, বৈশ্বিক পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে রপ্তানি বাড়ানোর একটি সুযোগ তৈরি করেছে। নারায়ণগঞ্জের উদ্যোক্তারা সেই সুযোগ কাজে লাগাতে চান। তবে এ জন্য পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ ও সরকারের নীতির ধারাবাহিকতা প্রয়োজন বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।

নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা-পঞ্চবটি বিসিক এলাকার কয়েকজন পোশাকশিল্প উদ্যোক্তা জানান, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে অর্ডার বাড়লে নারায়ণগঞ্জের কারখানাগুলোতে উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। এতে শ্রমিকদের কর্মসংস্থান ধরে রাখার পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থানেরও সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। কিন্তু শিল্পাঞ্চলগুলোতে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়া, বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার মতো সমস্যাগুলো অব্যাহত থাকলে বাড়তি অর্ডারের পুরো সুবিধা নেওয়া কঠিন হবে।

এদিকে চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির মাসিক গড় দাঁড়িয়েছে ৮০৬ দশমিক ৪৬ মিলিয়ন ডলার। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মোট রপ্তানিকে ১২ মাসের গড় হিসেবে ধরলে মাসিক গড় ছিল ৬৪৫ দশমিক ৩৮ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ নতুন অর্থবছরের শুরুতেই যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির গড় আয় আগের অর্থবছরের গড়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

তবে এই প্রবৃদ্ধিকে দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা হিসেবে দেখার ক্ষেত্রে সতর্কতারও প্রয়োজন রয়েছে। কারণ জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় সামান্য দশমিক ১৮ শতাংশ কমেছিল। ফলে প্রথম দুই মাসের প্রবৃদ্ধির বড় অংশই এসেছে আগস্টের শক্তিশালী রপ্তানি থেকে।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশ মোট ৭ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে। দেশটি বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় একক বাজার। একই অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের মোট পণ্য রপ্তানি ছিল প্রায় ৯ দশমিক ০৪ বিলিয়ন ডলার। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পোশাক রপ্তানির সামান্য পরিবর্তনও বাংলাদেশের সামগ্রিক রপ্তানি আয় ও পোশাকশিল্পে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, আগামী ১২ মাসে বর্তমান গতি ধরে রাখা সম্ভব হলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর সম্ভাবনার কথা বলা হচ্ছে। তবে অন্য একটি হিসাব অনুযায়ী, জুলাই-আগস্টের ১১ দশমিক ৪২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি পুরো অর্থবছরে বজায় থাকলে রপ্তানি প্রায় ৮ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। অর্থাৎ ৯ বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে বর্তমান প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি উচ্চমূল্যের পোশাক, পণ্যের বৈচিত্র্য, গুণগত মান এবং উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে হবে।

এ অবস্থায় নারায়ণগঞ্জের পোশাকশিল্পের সামনে সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ দুটিই রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে নতুন অর্ডার বাড়লে ফতুল্লা-পঞ্চবটি ও বিসিক শিল্পাঞ্চলের কারখানাগুলোতে উৎপাদন বাড়তে পারে। কিন্তু সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ, ব্যাংকিং সুবিধা, কাঁচামাল আমদানিতে গতি, সময়মতো শিপমেন্ট এবং নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা জরুরি।

ব্যবসায়ীদের মতে, শুধু রপ্তানি বৃদ্ধির পরিসংখ্যান দিয়ে শিল্পের স্বাস্থ্য নির্ধারণ করা যাবে না। কারখানা সচল থাকা, শ্রমিকের কর্মসংস্থান, উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং উদ্যোক্তাদের হাতে পর্যাপ্ত কার্যাদেশ থাকা—এসব বিষয়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে আগস্টের সাফল্য নারায়ণগঞ্জের পোশাকশিল্পের জন্য নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলেছে। এখন সেই সম্ভাবনাকে টেকসই উৎপাদন ও রপ্তানি প্রবৃদ্ধিতে রূপ দিতে পারাটাই বড় চ্যালেঞ্জ।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পোশাকের চাহিদা ধরে রাখতে হলে শুধু রপ্তানির পরিমাণ বাড়ালেই হবে না, পণ্যের ধরন ও মানেও বৈচিত্র্য আনতে হবে। বিশেষ করে তুলনামূলক বেশি মূল্য সংযোজন করা পোশাক উৎপাদন, নতুন নকশার পণ্য তৈরি এবং ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী পণ্যের পরিসর বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। এতে একই বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় আরও বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

পোশাক রপ্তানিকারকদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে সামপ্রতিক প্রবৃদ্ধি যেমন নতুন সুযোগ তৈরি করছে, তেমনি প্রতিযোগিতার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রেতাদের চাহিদা, উৎপাদন ব্যয়, জ্বালানি সরবরাহ, পণ্যের মান এবং বাণিজ্যিক শর্ত—সবকিছুর ওপর রপ্তানি কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা নির্ভর করে। ফলে আগস্টের প্রবৃদ্ধিকে দীর্ঘমেয়াদি রপ্তানি বৃদ্ধিতে রূপ দিতে উৎপাদন সক্ষমতা ও সরবরাহ ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা প্রয়োজন বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।