নিজস্ব প্রতিবেদক, নারায়ণগঞ্জ
প্রকাশ: ২০:৩৪, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ২০:৩৭, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
জ্বালানির দামের চাপে দিশাহারা না.গঞ্জের নিম্নআয়ের মানুষ
ছবি সংগৃহীত
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং এর প্রভাবে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাড়তি দামে চাপে পড়েছেন নারায়ণগঞ্জের নিম্নআয়ের মানুষ। শিল্পকারখানায় গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট, উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং কর্মসংস্থান কমে যাওয়ার সঙ্গে যোগ হয়েছে বাজারের বাড়তি খরচ। ফলে আয় কমলেও সংসারের ব্যয় কমছে না। বরং বাড়িভাড়া, খাবার, যাতায়াত ও চিকিৎসাসহ প্রায় প্রতিটি খাতেই ব্যয় সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে শ্রমজীবী পরিবারগুলোকে।
নারায়ণগঞ্জের পঞ্চবটি বিসিক শিল্পনগরী ও আশপাশের এলাকায় এ পরিস্থিতির প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে শ্রমিকদের ওপর। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে বেশ কিছু ছোট-বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানে উৎপাদন কমেছে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শ্রমিকেরা চাকরি হারিয়েছেন। আবার অনেক কারখানায় নিয়মিত বেতন না পাওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
পঞ্চবটি বিসিকের একটি ছোট পোশাক কারখানায় কাজ করতেন ৫৫ বছর বয়সি রাবেয়া খাতুন। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে কারখানাটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তিনি এখন কর্মহীন। তার তিন মাসের বেতন পাওনা ছিল। এর মধ্যে কর্তৃপক্ষ এক মাসের বেতন পরিশোধ করেছে। সেই টাকা হাতে নিয়ে ঘরভাড়া পরিশোধ করার পর অবশিষ্ট অর্থ নিয়ে বাজারে গিয়ে তিনি বুঝতে পারেন, সংসার চালানো কতটা কঠিন হয়ে পড়েছে।
রাবেয়া খাতুন বলেন, ‘বেতন যা পাই, তার বড় একটি অংশ ঘরভাড়ায় চলে যায়। বাকি টাকা দিয়ে বাজার করতে গেলে কিছুই কেনা যায় না। আগে যে টাকায় কয়েক দিনের বাজার করা যেত, এখন সেই টাকায় প্রয়োজনীয় জিনিসও ঠিকমতো পাওয়া যায় না।’
চার সদস্যের সংসারে এখন খাবারের তালিকাও ছোট হয়ে এসেছে। তিনি জানান, অনেক দিন আলু ভর্তা ও ডাল দিয়ে দুবেলা খেয়ে থাকতে হচ্ছে। সংসারের আরেক উপার্জনক্ষম ব্যক্তি তার ছেলে। কিন্তু ছেলেরও বর্তমানে কোনো কাজ নেই। ছেলের স্ত্রী নারায়ণগঞ্জের ফারিয়া গার্মেন্টসে সামান্য বেতনে চাকরি করছেন। তার আয়ে চার সদস্যের সংসারের ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
শুধু রাবেয়া খাতুন নন, পঞ্চবটি, বিসিক, ফতুল্লা, পাগলা ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলের অনেক শ্রমিক পরিবারের একই অবস্থা। শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় শ্রমিকদের কাজের নিশ্চয়তা কমছে। কোথাও কর্মঘণ্টা কমানো হচ্ছে, কোথাও উৎপাদন বন্ধ থাকায় শ্রমিকদের বসিয়ে রাখা হচ্ছে। আবার কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে লোকসান সামাল দিতে না পেরে কার্যক্রম গুটিয়ে নিচ্ছে।
শিল্পোদ্যোক্তারা বলছেন, গ্যাসের চাপ কমে গেলে উৎপাদন ব্যাহত হয়। বিদ্যুৎ সরবরাহে সমস্যা হলে বিকল্প হিসেবে জেনারেটর চালাতে হয়। এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়। জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে সেই ব্যয় আরও বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলো এ বাড়তি ব্যয় বহন করতে গিয়ে টিকে থাকার সংকটে পড়ে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে শ্রমিকদের ওপর।
নারায়ণগঞ্জ দেশের অন্যতম প্রধান শিল্পাঞ্চল। পোশাক, নিট, হোসিয়ারি, ডাইং, ফিনিশিংসহ বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক কর্মরত। এসব শিল্পের উৎপাদন ব্যাহত হলে শুধু কারখানার মালিক নয়, শ্রমিক, পরিবহন শ্রমিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, দোকানদার ও শিল্পের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন শ্রেণির মানুষও ক্ষতিগ্রস্ত হন।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাব শুধু কারখানার উৎপাদন ব্যয়েই সীমাবদ্ধ থাকছে না। পণ্য পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বাজারেও এর প্রভাব পড়ছে। এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পণ্য পরিবহনে বাড়তি খরচ হওয়ায় ব্যবসায়ীরা তা পণ্যের দামের সঙ্গে সমন্বয় করছেন। ফলে বাজারে গিয়ে বাড়তি দাম গুনতে হচ্ছে ভোক্তাদের।
নিম্নআয়ের মানুষের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন। তাদের আয় সাধারণত নির্দিষ্ট এবং সীমিত। কিন্তু খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়লে একই আয়ে আগের মতো সংসার চালানো সম্ভব হয় না। ফলে অনেক পরিবারকে খাদ্যতালিকা ছোট করতে হচ্ছে। কেউ মাছ-মাংস কমিয়ে দিচ্ছেন, কেউ ডিম বা দুধের মতো প্রয়োজনীয় খাবারও নিয়মিত কিনতে পারছেন না।
শ্রমজীবী মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাড়িভাড়া ও খাবারের খরচ পরিশোধের পর হাতে খুব সামান্য টাকা থাকে। এর সঙ্গে যোগ হয় যাতায়াত, সন্তানের পড়াশোনা ও চিকিৎসা ব্যয়। হঠাৎ কোনো সদস্য অসুস্থ হলে ধারদেনা করতে হয়। চাকরি হারানো বা বেতন অনিয়মিত হয়ে পড়লে সেই সংকট আরও তীব্র হয়।
নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন শিল্প এলাকার শ্রমিকদের ভাষ্য—তারা কারখানা বন্ধ দেখতে চান না। নিয়মিত গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে উৎপাদন বাড়বে, কারখানাগুলো সচল থাকবে এবং কর্মসংস্থানও ধরে রাখা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে স্থিতিশীলতা আনার দাবিও জানিয়েছেন তারা।
অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন, শিল্প উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা এবং নিম্নআয়ের মানুষের ওপর জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপ কমাতে জ্বালানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয় জরুরি। শিল্পকারখানায় জ্বালানি সংকট দীর্ঘায়িত হলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি কর্মসংস্থানেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
রাবেয়া খাতুনের মতো হাজারো শ্রমজীবী মানুষের কাছে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—কাজ কোথায়, আয় কীভাবে বাড়বে এবং সংসারের খরচ কীভাবে মিটবে। কারখানা বন্ধ হয়ে গেলে শুধু একটি কর্মসংস্থান হারায় না; এর সঙ্গে একটি পরিবারের খাদ্য, বাসস্থান ও ভবিষ্যৎও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে। জ্বালানি সংকট ও বাড়তি জীবনযাত্রার ব্যয়ের এই চাপ তাই নারায়ণগঞ্জের নিম্নআয়ের মানুষের জন্য ক্রমেই বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে।