শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৯ আশ্বিন ১৪৩৩

হাফিজুর রহমান হীরা, বরিশাল ব্যুরো

প্রকাশ: ২০:৩২, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ২০:৩২, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বহুমুখী চাপে বাংলাদেশের অর্থনীতি

‘জ্বালানি-ঝুঁকি, মূল্যস্ফীতি ও ধীর প্রবৃদ্ধির শঙ্কা’

‘জ্বালানি-ঝুঁকি, মূল্যস্ফীতি ও ধীর প্রবৃদ্ধির শঙ্কা’

ছবি সংগৃহীত

একদিকে বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয়ের অনিশ্চয়তা, অন্যদিকে দেশে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি—এ দুইয়ের অভিঘাতে নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে। এর সঙ্গে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল বিনিয়োগ, ব্যাংক খাতের চাপ, ঋণের উচ্চ ব্যয় এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা যোগ হওয়ায় চলতি অর্থবছরে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের গতি প্রত্যাশার তুলনায় ধীর হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। সংস্থাটি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৪ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৪ শতাংশে নামিয়েছে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশে উঠতে পারে বলেও সতর্ক করেছে সংস্থাটি।

এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংকও আপাতত সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। গত ২৩ সেপ্টেম্বর মুদ্রানীতি কমিটির বৈঠকে নীতি সুদহার ৯ দশমিক ৫ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। কেন্দ ীয় ব্যাংকের মতে, মূল্যস্ফীতি নিম্নমুখী হলেও তা এখনো ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ৭ দশমিক ৫ শতাংশের লক্ষ্যমাত্রার ওপরে। এর ওপর আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, দেশে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং সম্ভাব্য নতুন জাতীয় বেতনকাঠামোর প্রভাব মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে। ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির ওপর এসব অভিঘাতের প্রকৃত প্রভাব পর্যবেক্ষণ করেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়ার পথে হাঁটছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

অর্থনীতিবিদদের কাছে বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে প্রবৃদ্ধির গতি আরও কমে যাওয়া এবং প্রবৃদ্ধি বাড়াতে নীতিগত শিথিলতা আনলে আবার মূল্যস্ফীতির চাপ বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি। অর্থাৎ অর্থনীতি এখন এমন এক ভারসাম্যের মধ্যে রয়েছে, যেখানে একটি সমস্যার সমাধানে নেওয়া পদক্ষেপ অন্য একটি সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। জ্বালানি বাজারে নতুন অনিশ্চয়তা

বিশ্ব অর্থনীতির জন্য জ্বালানি বাজার এখনো বড় ঝুঁকির উৎস। গত ২৩ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের আশপাশে ছিল। আগের দিনের তুলনায় কিছুটা কমলেও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, সরবরাহব্যবস্থার অনিশ্চয়তা এবং ডিজেল সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগের কারণে বাজারে অস্থিরতা রয়েই গেছে। একই সময়ে ইউরোপীয় গ্যাস অয়েলের প্রিমিয়ামও রেকর্ড উচ্চতায় উঠেছে।

বাংলাদেশের মতো জ্বালানি আমদানি-নির্ভর অর্থনীতিতে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে তার প্রভাব শুধু পরিবহন খাতে সীমাবদ্ধ থাকে না—বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পের উৎপাদন ব্যয়, কৃষির সেচ, পণ্য পরিবহন, নৌ ও সড়ক যোগাযোগ থেকে শুরু করে খাদ্যপণ্যের বাজার পর্যন্ত এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দীর্ঘ সময় উঁচু থাকলে মূল্যস্ফীতি কমানোর প্রচেষ্টা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

বিশ্বব্যাংক আগেই সতর্ক করেছিল, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশে আমদানি ব্যয় বাড়তে পারে, মূল্যস্ফীতির চাপ তীব্র হতে পারে এবং জ্বালানি ভর্তুকির কারণে সরকারের আর্থিক পরিসর সংকুচিত হতে পারে। পাশাপাশি রপ্তানি ও রেমিট্যান্সে নেতিবাচক প্রভাব পড়লে দেশের অর্থনীতিতে বাড়তি চাপ তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এডিবির সর্বশেষ পূর্বাভাস বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে থাকা চ্যালেঞ্জের একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র তুলে ধরেছে। সংস্থাটি বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৭ শতাংশ হতে পারে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে তা বেড়ে চার শতাংশে দাঁড়ানোর পূর্বাভাস দেওয়া হলেও আগের পূর্বাভাসের তুলনায় এটি কম। উচ্চ ঋণব্যয়, জ্বালানি সংকট, বিনিয়োগে দুর্বলতা, ব্যাংক খাতের চাপ এবং বৈশ্বিক চাহিদার অনিশ্চয়তা দেশের রপ্তানী শিল্প ও বেসরকারি বিনিয়োগের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এডিবির মতে, চলতি অর্থবছরে সেবা ও কৃষি খাত অর্থনীতিকে কিছুটা সহায়তা করতে পারে। প্রবাসী আয়নির্ভর ভোগও প্রবৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হতে পারে। তবে মূল্যস্ফীতি দীর্ঘস্থায়ী হলে মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যাবে, যার প্রভাব পড়বে অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর পড়তে পারে।

স্বস্তির জায়গায় রেমিট্যান্স ও রিজার্ভ থাকার কারণে অর্থনীতির পুরো চিত্র নেতিবাচক নয়। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং রেমিট্যান্স প্রবাহে সামপ্রতিক সময়ে কিছুটা স্বস্তি এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে ১৬ সেপ্টেম্বর দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৬ দশমিক ৩২ বিলিয়ন ডলার। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বিপিএম৬ পদ্ধতিতে হিসাব করলে রিজার্ভ ৩১ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন ডলার।

এডিবিও বলছে, শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহ ও তুলনামূলক বেশি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাংলাদেশের বৈদেশিক খাতের স্থিতিশীলতাকে সহায়তা করছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা সত্ত্বেও রেমিট্যান্স প্রবাহ আপাতত স্থিতিস্থাপক থাকার প্রত্যাশা করছে সংস্থাটি। তবে এই স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে পর্যাপ্ত বৈদেশিক অর্থপ্রবাহ, নমনীয় বিনিময় হার এবং বিচক্ষণ সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেছে এডিবি।

ডলারের বিপরীতে টাকার বাজারেও সামপ্রতিক সময়ে তুলনামূলক স্থিতিশীলতা দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২৩ সেপ্টেম্বরের স্পট রেফারেন্স রেট অনুযায়ী, দিনের শেষ পর্যায়ে এক ডলারের বিপরীতে টাকার হার ছিল ১২৩ দশমিক ১৬৭৬ টাকা।

তবে বিনিয়োগে গতি ফেরেনি তাই রিজার্ভ ও রেমিট্যান্সে স্বস্তি এলেও অর্থনীতির অভ্যন্তরীণ ভিত্তি নিয়ে উদ্বেগ রয়ে গেছে। বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, বাংলাদেশের বেসরকারি বিনিয়োগ দীর্ঘদিন ধরে দুর্বল। ব্যাংক খাতের আর্থিক দুর্বলতা, অর্থায়নের সীমিত সুযোগ, অবকাঠামোগত সমস্যা এবং ব্যবসা পরিচালনার উচ্চ ব্যয় নতুন বিনিয়োগের পথে বাধা তৈরি করছে। বিশ্বব্যাংকের এপ্রিলের মূল্যায়নে ২০২৫ সালের শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের অনুপাত ৩০ দশমিক ৬ শতাংশে পৌঁছানোর কথা বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। অন্যদিকে রাজস্ব আদায়ও বড় চ্যালেঞ্জ। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত সাত শতাংশের নিচে নেমে যায়, যা দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন ব্যয় ও সরকারের আর্থিক সক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি করেছে। অর্থনীতির এই দুর্বল জায়গাগুলো সংস্কার না করতে পারলে শুধু বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি বা রেমিট্যান্সের ভালো প্রবাহ দিয়ে টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা কঠিন হতে পারে। এডিবিও আর্থিক খাত, জ্বালানি নিরাপত্তা, সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা এবং ব্যবসার পরিবেশে দ্রুত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতি সুদহার ৯ দশমিক ৫ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্তটি অর্থনীতির বর্তমান দ্বৈত সংকটেরই প্রতিফলন। একদিকে উচ্চ সুদহারের কারণে উদ্যোক্তাদের ঋণ নেওয়ার ব্যয় বাড়ছে এবং বিনিয়োগে তার প্রভাব পড়ছে। অন্যদিকে সুদহার দ্রুত কমালে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টায় নতুন চাপ তৈরি হতে পারে।

গত জুলাইয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ছয় বছরের মধ্যে প্রথমবার নীতি সুদহার কমিয়ে ১০ শতাংশ থেকে ৯ দশমিক ৫ শতাংশ করেছিল। আগস্টে নতুন হার কার্যকর হয়। কিন্তু মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে জ্বালানি মূল্য ও আন্তর্জাতিক বাজারের নতুন ঝুঁকি দেখা দেওয়ায় কেন্দ ীয় ব্যাংক আপাতত আরও অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

মূল্যস্ফীতি ও কর্মসংস্থান: সব মিলিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এক ধরনের রূপান্তর পর্বের মধ্যে রয়েছে। বৈদেশিক খাতে রেমিট্যান্স ও রিজার্ভ কিছুটা স্বস্তি দিলেও অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ, ব্যাংক খাত, জ্বালানি সরবরাহ এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা।

বিশ্বব্যাংক ও এডিবির সামপ্রতিক মূল্যায়নে একটি বিষয় স্পষ্ট—বাহ্যিক অভিঘাত মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়াতে বাংলাদেশের অর্থনীতির অভ্যন্তরীণ ভিত্তি শক্তিশালী করা জরুরি। এডিবি বলছে, দ্রুত সংস্কার না হলে বহিরাগত ধাক্কা ও অভ্যন্তরীণ সীমাবদ্ধতা পুনরুদ্ধারের পথকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলতে পারে।

এখন বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে তাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন শুধু প্রবৃদ্ধি কত শতাংশ হবে তা নয়; বরং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি কীভাবে বিনিয়োগ বাড়ানো যাবে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা যাবে, ব্যাংক খাতকে স্থিতিশীল করা যাবে এবং জ্বালানি ও বৈদেশিক বাণিজ্যের ধাক্কা সামলে অর্থনীতিকে টেকসই পথে রাখা যাবে। আগামী মাসগুলোতে সরকারের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা ও সংস্কারের গতি সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর অনেকটাই নির্ধারণ করবে।