রোববার, ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ১৮ আশ্বিন ১৪৩৩

রামিসা রহমান

প্রকাশ: ২৩:৪৫, ১৯ আগস্ট ২০২৬ | আপডেট: ০৯:৩৮, ২০ আগস্ট ২০২৬

সিগারেটের দাম কমাতে স্বাধীনতা চায় বিএটি 

তবে কি এনবিআর জনস্বাস্থ্য ও রাজস্ব আয়ের বিরুদ্ধে যাবে!

তবে কি এনবিআর জনস্বাস্থ্য ও রাজস্ব আয়ের বিরুদ্ধে যাবে!

শেয়ার বিজ

সিগারেটের নির্ধারিত মূল্যস্তরের মধ্যে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে নিজেদের মতো করে দাম নির্ধারণের সুযোগ চেয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাছে প্রস্তাব দিয়েছে ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ (বিএটি)। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, বর্তমান মূল্য নির্ধারণ কাঠামোয় প্রয়োজনীয় নমনীয়তা না থাকায় বৈধ সিগারেটের বিক্রি কমে যাচ্ছে। এর সুযোগ নিয়ে তুলনামূলক কম দামের অবৈধ ও কর ফাঁকি দেওয়া সিগারেটের বাজার বাড়ছে। তাই এনবিআরের নির্ধারিত মূল্যস্তর অপরিবর্তিত রেখেই প্রতিটি স্তরের মধ্যে উৎপাদকদের পণ্যের দাম সমন্বয়ের সুযোগ দেওয়া হলে বৈধ বাজারে বিক্রি বাড়বে এবং সরকারের রাজস্বও বাড়তে পারে।
এনবিআর বিএটির প্রস্তাব অনুমোদন করলে বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবার কোনো প্রতিষ্ঠিত সিগারেট ব্র্যান্ডের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য (এমআরপি) সরকারি অনুমোদনে কমানোর ঘটনা ঘটবে।
চলতি বছরের ৭ জুন এসআরও নং ১২৯-আইন/২০২৬/৩৩৪-এর ৩ নম্বর ধারায় চলমান কোনো ব্র্যান্ডের এমআরপি কমানো যাবে না বলে উল্লেখ রয়েছে।
তবে বিএটির এই প্রস্তাব সামনে আসার পরই প্রশ্ন উঠেছে, রাজস্ব বাড়ানোর যুক্তিতে একটি তামাক কোম্পানিকে সিগারেটের দাম কমানোর সুযোগ দেওয়া হলে এর প্রভাব জনস্বাস্থ্যের ওপর কী হবে। কারণ সিগারেটের মূল্য ও কর নির্ধারণ শুধু সরকারের রাজস্ব আহরণের বিষয় নয়, তামাকজাত পণ্যের ব্যবহার নিরুৎসাহিত করাও এর অন্যতম উদ্দেশ্য। ফলে বিএটির ব্যবসায়িক স্বার্থ এবং সরকারের দীর্ঘমেয়াদি তামাক নিয়ন্ত্রণ নীতির মধ্যে সম্ভাব্য সংঘাত এখন আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে।
চলতি বছরের ১৬ জুলাই এনবিআর চেয়ারম্যানের কাছে দেওয়া এক চিঠিতে বিদ্যমান মূল্যনীতি পুনর্বিবেচনার প্রস্তাব দেয় বিএটি বাংলাদেশ। চিঠিতে প্রতিষ্ঠানটি দেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, কৃষি, উৎপাদন, সরবরাহব্যবস্থা এবং সরকারি রাজস্বে তামাকশিল্পের ভূমিকার কথা তুলে ধরে। বিএটির বক্তব্য, তারা এনবিআরের নির্ধারিত মূল্যস্তর পরিবর্তনের দাবি করছে না। বরং প্রতিটি মূল্যস্তরের সর্বনিম্ন সীমা ঠিক রেখে ওই সীমার মধ্যে বাজার পরিস্থিতি, ভোক্তার চাহিদা ও প্রতিযোগিতার বাস্তবতা বিবেচনায় উৎপাদকদের দাম নির্ধারণের সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব করেছে।
প্রতিষ্ঠানটির দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে তাদের সিগারেট বিক্রির পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে কমেছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বিএটির সিগারেট বিক্রির পরিমাণ ছিল ৭৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন শলাকা। ওই অর্থবছরে সিগারেট খাত থেকে মূল্য সংযোজন কর, সম্পূরক শুল্ক ও অন্যান্য কর বাবদ সরকারের রাজস্ব ছিল ৩৩ হাজার ২৪০ কোটি টাকা। পরের অর্থবছর ২০২৪-২৫ সালে সিগারেট বিক্রি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে ৫১ দশমিক ৩ বিলিয়ন শলাকায় নেমে আসে। ওই বছর সরকারের রাজস্ব দাঁড়ায় ৩২ হাজার ৪৩০ কোটি টাকা।
তবে পরের বছর অর্থাৎ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে একটি ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। ওই বছরে বিএটির সিগারেট বিক্রির পরিমাণ আরও কমে ৪৯ দশমিক ৩ বিলিয়ন শলাকায় নেমে এলেও সরকারের রাজস্ব বেড়ে ৩৬ হাজার ৯৭২ কোটি টাকায় পৌঁছায়। অর্থাৎ বিক্রির পরিমাণ কমার মধ্যেও কর ও মূল্য কাঠামোর কারণে সরকারের রাজস্ব বেড়েছে। এই পরিসংখ্যানই বিএটির যুক্তিকে কিছুটা জটিল করে তুলেছে। কারণ বিক্রি কমলেই রাজস্ব কমবে—এমন সরল সম্পর্ক সবসময় দেখা যাচ্ছে না।
বিএটির নিজস্ব হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট-পরবর্তী বর্তমান মূল্য কাঠামো বহাল থাকলে তাদের সিগারেট বিক্রির পরিমাণ আরও কমে ৪৬ দশমিক ৩ বিলিয়ন শলাকায় নেমে আসতে পারে। সে ক্ষেত্রে সরকারের সম্ভাব্য রাজস্ব ৩৪ হাজার ৫৩৯ কোটি টাকা হতে পারে বলে প্রতিষ্ঠানটি পূর্বাভাস দিয়েছে। অন্যদিকে এনবিআরের নির্ধারিত মূল্যস্তরের মধ্যে উৎপাদকদের দাম সমন্বয়ের সুযোগ দেওয়া হলে সিগারেট বিক্রির পরিমাণ ৫৪ দশমিক ২ বিলিয়ন শলাকায় উঠতে পারে বলে দাবি করেছে বিএটি। একই সঙ্গে সরকারের রাজস্ব ৩৭ হাজার ৯৫১ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে বলেও তাদের হিসাব।
কোম্পানিটির হিসাবে, মূল্যস্তরের মধ্যে সীমিত স্বাধীনতা দেওয়া হলে বর্তমান কাঠামোর তুলনায় সিগারেট বিক্রি প্রায় ৭ দশমিক ৯ বিলিয়ন শলাকা বাড়তে পারে। একই সঙ্গে সরকারের রাজস্ব বাড়তে পারে প্রায় ৩ হাজার ৪১১ কোটি টাকা। বিএটির মূল যুক্তি এখানেই। প্রতিষ্ঠানটি বোঝাতে চাইছে, তাদের পণ্যের দাম বাজারের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য করার সুযোগ দেওয়া হলে শুধু কোম্পানির বিক্রি নয়, সরকারের রাজস্বও বাড়বে।

বিএটি বাংলাদেশের বক্তব্য
বিএটি বাংলাদেশের একজন মুখপাত্র শেয়ার বিজকে বলেন, ‘বিএটি বাংলাদেশ পিএলসি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত নিয়ন্ত্রক কাঠামোর আওতায় কার্যক্রম পরিচালনা করে এবং প্রযোজ্য আইন ও বিধিবিধান পরিপালনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এনবিআরের এক কর্মকর্তা শেয়ার বিজকে বলেন, একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক কৌশল বাস্তবায়নের জন্য সরকার দীর্ঘদিনের একটি নীতিগত কাঠামো পরিবর্তন করবে কি না, সেটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ধূমপান নিরুৎসাহিত করা এবং রাজস্ব আহরণ—দুই দিক বিবেচনায় নিয়েই প্রতি বছর সিগারেটের মূল্য ও কর কাঠামো পুনর্নির্ধারণ করা হয়। অতীতে কোনো প্রতিষ্ঠিত সিগারেট ব্র্যান্ডকে সরকারি অনুমোদনের মাধ্যমে নির্ধারিত মূল্যস্তরের মধ্যে কম দামে বিক্রির বিশেষ সুযোগ দেওয়ার নজির নেই। বিএটির আবেদন অনুমোদিত হলে সেটি দেশের তামাক করনীতিতে নতুন একটি দৃষ্টান্ত তৈরি করতে পারে বলেও তিনি মনে করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ আল-আমিন শেয়ার বিজকে বলেন,  রাষ্ট্রের করনীতি কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের বিক্রয় পূর্বাভাস বা ব্যবসায়িক কৌশলের ওপর নির্ভর করে পরিবর্তন করা উচিত নয়। তার মতে, অবৈধ সিগারেট যদি মূল সমস্যা হয়ে থাকে, তাহলে সমাধান হওয়া উচিত আইন প্রয়োগ, কর প্রশাসন শক্তিশালী করা এবং বাজার তদারকি বৃদ্ধি করা; কর কাঠামো শিথিল করা নয়।
তিনি আরও বলেন, কোনো একটি কোম্পানি যদি বলে, দাম কিছুটা কমানোর সুযোগ পেলে তাদের বিক্রি বাড়বে এবং সরকারের রাজস্বও বাড়বে, তাহলে সেটি মূলত একটি সম্ভাব্য ব্যবসায়িক পরিস্থিতির হিসাব। কিন্তু সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হয় সামগ্রিক অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য, রাজস্বনীতি এবং বাজার ব্যবস্থাপনার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে। ফলে একটি প্রতিষ্ঠানের বিক্রয় ও রাজস্ব পূর্বাভাসকে রাষ্ট্রীয় নীতি পরিবর্তনের একমাত্র ভিত্তি করা কতটা যুক্তিসংগত, সেটি নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
কিন্তু এই হিসাব নিয়ে প্রশ্নও কম নয়। কারণ এগুলো বিএটির নিজস্ব ব্যবসায়িক পূর্বাভাস। মূল্য কমলে বিক্রি ঠিক কতটা বাড়বে, বাড়তি বিক্রির কতটা বৈধ বাজারে থাকবে, অবৈধ সিগারেটের বাজার কতটা কমবে এবং শেষ পর্যন্ত সরকারের রাজস্বে কতটা প্রকৃত বৃদ্ধি হবে—এসব বিষয়ে স্বাধীন মূল্যায়ন ছাড়া কোম্পানির পূর্বাভাসকে চূড়ান্ত বাস্তবতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
এরই মধ্যে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সিগারেটের মূল্যস্তর বাড়ানো হয়েছে। নতুন কাঠামো অনুযায়ী ১০ শলাকার নিম্নস্তরের সিগারেটের ন্যূনতম মূল্য ৬২ টাকা, মধ্যম স্তরে ৯২ টাকা, উচ্চ স্তরে ১৬০ টাকা এবং প্রিমিয়াম স্তরে ২১০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ সরকার সরাসরি সিগারেটের দাম বাড়ানোর পথেই এগিয়েছে। 
এই অবস্থায় বিএটির পক্ষ থেকে মূল্যস্তরের ভেতরে দাম কমানোর সুযোগ চাওয়া নীতিগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ সরকার যেখানে কর ও মূল্য বাড়িয়ে তামাকজাত পণ্যের ব্যবহার নিরুৎসাহিত করার চেষ্টা করছে, সেখানে উৎপাদকরা যেন একই মূল্যস্তরের মধ্যে নিজেদের মতো করে দাম কমাতেপ্রথম পৃষ্ঠার পর
 পারেন—এমন সুযোগ তৈরি হলে সরকারের সেই নীতির কার্যকারিতা কতটা থাকবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে।
বিশেষ করে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে সিগারেটের দাম কমানোর বিষয়টি খুবই সংবেদনশীল। সিগারেট সহজলভ্য ও তুলনামূলক সস্তা হলে এর ব্যবহার বাড়ার ঝুঁকি থাকে। আর তামাক ব্যবহারের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতা, চিকিৎসা ব্যয়, কর্মক্ষমতা হ্রাস এবং পরিবারের ওপর আর্থিক চাপের মতো বিষয় জড়িত। ফলে সিগারেট বিক্রি বাড়িয়ে কয়েক হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব পাওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও এর বিপরীতে স্বাস্থ্য খাতে ভবিষ্যৎ ব্যয় কতটা বাড়তে পারে, সেই হিসাবও নীতিনির্ধারণের সময় বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
বিএটি অবশ্য সরাসরি দাম কমিয়ে বাজার সমপ্রসারণের কথা বলছে না। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, তাদের মূল লক্ষ্য বৈধ বাজারকে টিকিয়ে রাখা। তাদের মতে, বৈধ সিগারেটের দাম এবং অবৈধ বা কর ফাঁকি দেওয়া সিগারেটের দামের মধ্যে ব্যবধান যত বাড়ে, ভোক্তাদের একটি অংশ তত বেশি অবৈধ পণ্যের দিকে চলে যেতে পারে। এতে বৈধ উৎপাদকদের বিক্রি কমে এবং সরকারও রাজস্ব হারায়।
কিন্তু এখানেও বড় প্রশ্ন হলো, অবৈধ সিগারেটের বাজার নিয়ন্ত্রণের সমাধান কি বৈধ সিগারেটের দাম কমানোর সুযোগ দেওয়া? নাকি অবৈধ উৎপাদন, চোরাচালান ও কর ফাঁকির বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ আরও কঠোর করা? অবৈধ পণ্যের বাজার যদি মূল সমস্যা হয়, তাহলে সীমান্তে নজরদারি, অবৈধ কারখানা বন্ধ, নকল ব্যান্ডরোল শনাক্তকরণ এবং কর ফাঁকির বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করার বিষয়টি সামনে আসা স্বাভাবিক।
সিগারেটের দাম কমিয়ে অবৈধ বাজারের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করার যুক্তি গ্রহণ করলে ভবিষ্যতে অন্য উচ্চশুল্ক পণ্যের উৎপাদকরাও একই ধরনের দাবি তুলতে পারেন। একটি কোম্পানির জন্য মূল্য নির্ধারণে বিশেষ নমনীয়তা তৈরি হলে তা অন্য শিল্পের জন্যও নীতিগত সুবিধা দাবি করার পথ খুলে দিতে পারে। ফলে বিএটির প্রস্তাব শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক সুবিধার বিষয় নয়, এর সঙ্গে করনীতির ধারাবাহিকতা ও সরকারের নীতিগত অবস্থানের প্রশ্নও জড়িত।
এদিকে চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে বিএটি বাংলাদেশের ব্যবসায়ও চাপের চিত্র দেখা গেছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি-মার্চ সময়ে কোম্পানিটির সিগারেট বিক্রির পরিমাণ প্রায় ১৪ শতাংশ কমে যায় এবং একই সময়ে মুনাফা কমে ৩৪ শতাংশ। কোম্পানির প্রকাশিত আর্থিক তথ্য নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে মূল্যস্ফীতি, উচ্চ করহার, দুর্বল ভোক্তা ব্যয় এবং তুলনামূলক কম দামের বিকল্প পণ্যের দিকে ঝুঁকে পড়াকে বাজারে চাপের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। 
অর্থাৎ বিএটির বর্তমান প্রস্তাব এমন এক সময়ে এসেছে, যখন প্রতিষ্ঠানটির দেশীয় সিগারেট বিক্রিতে চাপ তৈরি হয়েছে। প্রথম প্রান্তিকের ফলাফলেও সেই চাপের প্রতিফলন দেখা গেছে। ফলে মূল্যস্তরের মধ্যে দাম নির্ধারণের স্বাধীনতা চাওয়ার বিষয়টি কোম্পানির ব্যবসায়িক পরিস্থিতির সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত কি না, সেটি নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
অন্যদিকে সিগারেট থেকে সরকারের রাজস্বের পরিমাণও কম নয়। বিএটির দেওয়া হিসাবেই দেখা যাচ্ছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সিগারেট খাত থেকে সরকারের রাজস্ব ছিল ৩৬ হাজার ৯৭২ কোটি টাকা। এই বিপুল রাজস্বের কারণে সরকারকে একদিকে রাজস্ব আহরণ নিশ্চিত করতে হচ্ছে, অন্যদিকে তামাক ব্যবহারের ক্ষতিকর প্রভাবও বিবেচনায় নিতে হচ্ছে। ফলে সিগারেটের মূল্য নির্ধারণে সামান্য পরিবর্তনও একই সঙ্গে রাজস্ব ও জনস্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলতে পারে।
বিএটি তাদের প্রস্তাবে দেশের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে তামাকশিল্পের ভূমিকার কথাও তুলে ধরেছে। প্রতিষ্ঠানটির বক্তব্য অনুযায়ী, তাদের ব্যবসার সঙ্গে কৃষক, পরিবেশক, খুচরা বিক্রেতা, পরিবহনকর্মীসহ বিভিন্ন পর্যায়ের বিপুলসংখ্যক মানুষ যুক্ত। তাই তামাকশিল্পের ওপর নেওয়া নীতিগত সিদ্ধান্তের প্রভাব শুধু উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না।
তবে এর বিপরীতে জনস্বাস্থ্য বিবেচনাটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। একটি শিল্পে কর্মসংস্থান রয়েছে কিংবা সরকার বড় অঙ্কের রাজস্ব পায়—এ কারণে সেই শিল্পের পণ্যের ব্যবহার বাড়ানোকে রাষ্ট্রীয় নীতির লক্ষ্য বানানো যায় না। বিশেষ করে তামাকজাত পণ্যের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক সুবিধার পাশাপাশি স্বাস্থ্যঝুঁকির হিসাবও করতে হয়।
বিএটি তাদের চিঠিতে আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান আর্নস্ট অ্যান্ড ইয়ং বাংলাদেশের তামাক খাতের রাজস্ব বৃদ্ধির বিষয়ে তৈরি করা ১০ বছর মেয়াদি একটি পথনকশার কথাও উল্লেখ করেছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, ওই পথনকশায় বৈধ বাজারকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি ধাপে ধাপে সরকারের রাজস্ব বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। তবে এই ধরনের প্রস্তাব বাস্তবায়নের আগে এর জনস্বাস্থ্যগত প্রভাব কতটা এবং তামাক ব্যবহারের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব কী হতে পারে, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
সবশেষে মূল প্রশ্নটি থেকে যাচ্ছে, বিএটির প্রস্তাব যদি অনুমোদিত হয়, তাহলে সরকার কি সত্যিই অতিরিক্ত ৩ হাজার ৪১১ কোটি টাকা রাজস্ব পাবে? নাকি দাম কমার ফলে সিগারেটের ব্যবহার বাড়লেও রাজস্বের হিসাব কোম্পানির পূর্বাভাসের মতো হবে না? আরও বড় প্রশ্ন—বাড়তি রাজস্বের বিনিময়ে জনস্বাস্থ্যের ওপর যে সম্ভাব্য চাপ তৈরি হতে পারে, তার মূল্য কত?
কারণ বিএটির দেওয়া হিসাব বলছে, বর্তমান কাঠামো বহাল থাকলে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে তাদের সিগারেট বিক্রি ৪৬ দশমিক ৩ বিলিয়ন শলাকায় নেমে যেতে পারে। আবার মূল্যস্তরের মধ্যে দাম সমন্বয়ের সুযোগ পেলে তা বেড়ে ৫৪ দশমিক ২ বিলিয়ন শলাকায় উঠতে পারে। অর্থাৎ কোম্পানির কাঙ্ক্ষিত নীতির সফল বাস্তবায়ন হলে বিপুলসংখ্যক অতিরিক্ত সিগারেট বাজারে বিক্রি হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। সেই অতিরিক্ত বিক্রিই যদি রাজস্ব বৃদ্ধির প্রধান উৎস হয়, তাহলে সেটি জনস্বাস্থ্যের দৃষ্টিকোণ থেকে কতটা গ্রহণযোগ্য—এ প্রশ্নের উত্তরই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
বিএটি বাংলাদেশের প্রস্তাবকে শুধু বিক্রি ও রাজস্ব বাড়ানোর হিসাব দিয়ে দেখলে বিষয়টির পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। মূল্যস্তরের মধ্যে সিগারেটের দাম কমানোর সুযোগ দেওয়া হলে স্বল্প মেয়াদে বৈধ বাজারে বিক্রি ও রাজস্ব বাড়ার সম্ভাবনা কোম্পানিটি দেখালেও এর বিপরীতে তামাকের ব্যবহার বাড়ার ঝুঁকি এবং দীর্ঘমেয়াদি জনস্বাস্থ্য ব্যয়ের বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে। গবেষণাতেও বাংলাদেশের তামাক করনীতিতে দাম ও কর বাড়ানোকে একই সঙ্গে তামাক ব্যবহার কমানো এবং রাজস্ব বাড়ানোর কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে দেখানো হয়েছে। 
তাই অবৈধ সিগারেটের বাজারকে কারণ দেখিয়ে বৈধ সিগারেটের দাম কমানোর সুযোগ দেওয়া কতটা যৌক্তিক, সেটি নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। অবৈধ বাজার নিয়ন্ত্রণের জন্য আইন প্রয়োগ ও নজরদারি জোরদার করার পাশাপাশি সরকারের উচিত বিএটির দেওয়া অতিরিক্ত রাজস্বের হিসাব স্বাধীনভাবে যাচাই করা। শেষ পর্যন্ত কয়েক হাজার কোটি টাকা সম্ভাব্য অতিরিক্ত রাজস্বের চেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াচ্ছে—এই নীতিতে রাজস্ব বাড়বে, নাকি সিগারেটের সহজলভ্যতা বাড়িয়ে জনস্বাস্থ্যের ওপর আরও বড় চাপ তৈরি হবে।