সেবা বৃদ্ধিতে প্রকল্প বহর
ছবি সংগৃহীত
চট্টগ্রাম নগরীর জনসংখ্যা ও নগরায়ণ দ্রুত বাড়ছে। এর সঙ্গে বাড়ছে নিরাপদ পানির চাহিদা এবং বর্জ্যপানি ব্যবস্থাপনার চাপ। বর্তমান চাহিদা পূরণের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ নগরের প্রয়োজন মাথায় রেখে পানি উৎপাদন বাড়ানো, পুরোনো সরবরাহব্যবস্থা আধুনিকায়ন, স্যুয়ারেজ নেটওয়ার্ক সমপ্রসারণ এবং ডিজিটাল গ্রাহকসেবা চালুর দিকে এগোচ্ছে চট্টগ্রাম ওয়াসা। বর্তমান পরিকল্পনায় পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন খাতে একাধিক প্রকল্প ও উদ্যোগ রয়েছে। এর মধ্যে কিছু প্রকল্প বাস্তবায়নের বিভিন্ন পর্যায়ে, আবার কিছু রয়েছে সম্ভাব্যতা যাচাই, অর্থায়ন ও প্রস্তুতিমূলক পর্যায়ে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রাম নগরীর পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হবে।
কর্ণফুলী পানি শোধনাগারে সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ
নগরীর পানির ঘাটতি কমাতে কর্ণফুলী পানি শোধনাগার এলাকায় অতিরিক্ত পানি শোধনের সক্ষমতা তৈরির উদ্যোগ রয়েছে। চট্টগ্রাম নগরীতে বর্তমানে দৈনিক পানির চাহিদা প্রায় ৬৫ কোটি লিটার। বিপরীতে ওয়াসার উৎপাদন প্রায় ৫০ কোটি লিটার। এর সঙ্গে পাইপলাইন লিকেজের কারণে প্রতিদিন প্রায় ৯ কোটি লিটার পানি অপচয় হয়। ফলে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি সিস্টেম লস কমানোও ওয়াসার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এই পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত ১০ কোটি লিটার পানি উৎপাদন সক্ষমতা তৈরির লক্ষ্যে জাইকার সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। কর্ণফুলী পানি শোধনাগার এলাকায় অতিরিক্ত ১০০ মিলিয়ন লিটার পানি শোধনের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা নিয়ে জাইকা বাংলাদেশ অফিসের প্রতিনিধিদের সঙ্গে ওয়াসার মতবিনিময় হয়েছে।
পতেঙ্গায় ভান্ডালজুড়ির পানি আনার উদ্যোগ: পতেঙ্গার দীর্ঘদিনের সুপেয় পানির সংকট নিরসনে নেওয়া উদ্যোগটিও ওয়াসার গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প-উদ্যোগের অংশ। ৩৯, ৪০ ও ৪১ নম্বর ওয়ার্ডে প্রতিদিন পানির চাহিদা প্রায় ১০ কোটি লিটার হলেও বর্তমানে সেখানে প্রায় চার কোটি লিটার পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। সংকট কমাতে বোয়ালখালীর ভান্ডালজুড়ি পানি সরবরাহ প্রকল্প থেকে অতিরিক্ত প্রায় দুই কোটি লিটার পরিশোধিত পানি পতেঙ্গায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এজন্য কর্ণফুলী নদীর তলদেশের টানেলের ইউটিলিটি ডাক্ট ব্যবহার করে পাইপলাইন স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ওয়াসার পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী ছয় মাসের মধ্যে এ উদ্যোগ বাস্তবায়নের লক্ষ্য রয়েছে।
পতেঙ্গার পানি সংকটে নেদারল্যান্ডসের সহযোগিতা: পতেঙ্গার পানি সংকট সমাধানে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার আরেকটি উদ্যোগ রয়েছে নেদারল্যান্ডসকে ঘিরে। নেদারল্যান্ডস সরকারের সম্কূর্ণ অনুদানে ৪০ ও ৪১ নম্বর ওয়ার্ডের দীর্ঘদিনের সুপেয় পানির সংকট নিরসনে একটি পাইলট প্রকল্প ও প্রি-ফিজিবিলিটি স্টাডি পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে নেদারল্যান্ডস দূতাবাসের পানি ও জলবায়ুবিষয়ক প্রথম সচিবের সঙ্গে চট্টগ্রাম ওয়াসার আলোচনা হয়েছে।
আগামী দিনের পানি উৎপাদন সক্ষমতা: বর্তমান প্রকল্পগুলোর বাইরে ভবিষ্যৎ চাহিদা বিবেচনায় পানি উৎপাদন সক্ষমতা আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। হালদা, কর্ণফুলী ও ভান্ডালজুড়িকে ঘিরে বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে দৈনিক আরও ৫০ কোটি লিটার পানি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা সামনে রাখা হয়েছে। এর মধ্যে এক্সিম ব্যাংকের অর্থায়নে দৈনিক ৩০ কোটি লিটার ক্ষমতার নতুন পানি শোধনাগার নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে। ভবিষ্যতে আরও ২০ কোটি লিটার সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ রাখার কথা বলা হয়েছে।
পুরোনো পাইপলাইন থেকে স্মার্ট পানি সরবরাহ ব্যবস্থা: পানি উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি সরবরাহব্যবস্থার দক্ষতা বাড়ানোকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পুরোনো ও জরাজীর্ণ পাইপলাইন প্রতিস্থাপন, ডিসট্রিক মিট্রেড এরিয়া (ডিএমএ) চালু, স্মার্ট মিটার স্থাপন এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মূল লক্ষ্য হলো পানি সরবরাহের দক্ষতা বাড়ানো এবং সিস্টেম লস কমানো। উৎপাদিত পানির একটি বড় অংশ যদি পাইপলাইনের লিকেজে হারিয়ে যায়, তাহলে শুধু নতুন শোধনাগার নির্মাণ করে ঘাটতি পুরোপুরি দূর করা সম্ভব নয়। তাই উৎপাদন ও বিতরণ—দুই দিকেই একসঙ্গে বিনিয়োগের প্রয়োজন রয়েছে।
নগরজুড়ে স্যুয়ারেজ সম্ক্রসারণ: চট্টগ্রাম ওয়াসার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় নগরজুড়ে স্যুয়ারেজ ব্যবস্থার সমপ্রসারণও রয়েছে। হালিশহর থেকে শুরু করে পর্যায়ক্রমে অন্যান্য ক্যাচমেন্ট এলাকায় স্যুয়ারেজ ব্যবস্থা সমপ্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
পরিকল্পিত স্যানিটেশন ব্যবস্থার লক্ষ্য শুধু বর্জ্যপানি সরিয়ে: নেওয়া নয়; পরিবেশ, জলাশয় ও নগরবাসীর জনস্বাস্থ্যের বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া।
ডিজিটাল গ্রাহকসেবার দিকে অগ্রযাত্রা
পানি সরবরাহের অবকাঠামোর পাশাপাশি গ্রাহকসেবাতেও পরিবর্তনের পরিকল্পনা রয়েছে। বিলিং ব্যবস্থার উন্নয়ন থেকে শুরু করে ওয়ান-স্টপ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালুর মাধ্যমে ওয়াসার সেবাকে আরও প্রযুক্তিনির্ভর করার লক্ষ্য রয়েছে। আগামী চার থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে ওয়াসার গ্রাহকসেবা আরও ডিজিটাল ও সহজ করার পরিকল্পনার কথা নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রকল্পগুলোর সম্মিলিত লক্ষ্য: চট্টগ্রাম ওয়াসার এসব প্রকল্পকে আলাদা আলাদা উদ্যোগ হিসেবে দেখার চেয়ে একটি সমন্বিত পানি ও স্যানিটেশন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখাই গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে নতুন পানি শোধনাগার ও অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি হবে, অন্যদিকে পুরোনো পাইপলাইন ও সরবরাহ ব্যবস্থার আধুনিকায়নের মাধ্যমে সিস্টেম লস কমানোর চেষ্টা থাকবে। একই সঙ্গে উত্তর কাট্টলীর মতো এলাকায় আধুনিক পয়ঃশোধনাগার ও বর্জ্যপানি নেটওয়ার্ক গড়ে তুলে ধীরে ধীরে নগরজুড়ে স্যানিটেশন ব্যবস্থার বিস্তারের পরিকল্পনা রয়েছে।