বিভিন্ন প্রকল্পের ১৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা দিয়ে তেল আমদানি
লোকসানে বিপিসি
ছবি সংগৃহীত
পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় দেশে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য রাখা ১৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যবহার করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। এর মধ্যে ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিটসহ (ইআরএল-২) বিভিন্ন প্রকল্পের অর্থ রয়েছে। এসব অর্থ পুনর্বিন্যাস করে গত কয়েক মাস জ্বালানি তেল আমদানি অব্যাহত রেখেছে রাষ্ট্রীয় সংস্থাটি।
জাতীয় সংসদের সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটির প্রথম বৈঠকে উপস্থাপনের জন্য তৈরি বিপিসির কার্যপত্রে এ তথ্য দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়, মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত ছয় মাসে জ্বালানি তেল আমদানি ও এলসি নিষ্পত্তিতে বিপিসির লোকসান হয়েছে প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম দ্রুত বেড়ে গেলেও দেশের বাজারে একই হারে দাম সমন্বয় না করায় এই লোকসান হয়েছে বলে জানিয়েছে বিপিসি।
বিপিসির চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম বলেন, প্রকল্পগুলোর অর্থ সংস্থাটির নিজস্ব তহবিলের অংশ। চলতি ও আগামী অর্থবছরে প্রকল্পগুলোর প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে অর্থ পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে। এতে প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রভাব পড়বে না।
বিপিসির হিসাবে, গত ফেব্রুয়ারিতে আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেলের গড় দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি ৮৬ ডলার। মার্চে তা বেড়ে ১৮৬ দশমিক ৫৯ ডলারে দাঁড়ায়। এপ্রিলে সর্বোচ্চ ২৮৪ দশমিক ৯৫ ডলারে ওঠে। সেপ্টেম্বর মাসে কার্যপত্র তৈরির সময় আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেলের গড় দাম ছিল ১৬৫ দশমিক ৮২ ডলার। এই সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার পাশাপাশি জাহাজভাড়া ও অন্যান্য আমদানি ব্যয়ও বেড়েছে। ফলে জ্বালানি আমদানিতে বিপিসির ব্যয় দ্রুত বেড়ে যায়। আগস্টে শুল্ক, কর ও পরিচালন ব্যয় বাদ দিয়েই বিপিসির জ্বালানি আমদানি ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ৭ হাজার ৬০৩ কোটি টাকা। গত বছরের একই মাসে এ ব্যয় ছিল ২ হাজার ৭৪১ কোটি টাকা।
দেশে ব্যবহূত পেট্রোলিয়াম পণ্যের বড় অংশই ডিজেল। বিপিসির হিসাবে, বছরে দেশে প্রায় ৭০ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি হয়। এর মধ্যে ডিজেলের পরিমাণ প্রায় ৪৫ লাখ টন। ২০২৬ সালে দেশে মোট পেট্রোলিয়াম পণ্যের চাহিদা প্রায় ৮৪ লাখ ২৬ হাজার টন এবং ডিজেলের চাহিদা ৪৪ লাখ ৭৩ হাজার টন হতে পারে বলে সরকারি হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
কার্যপত্র তৈরির সময় আন্তর্জাতিক বাজারদর ও ডলারের বিনিময় হার বিবেচনায় প্রতি লিটার ডিজেলের ব্যয় প্রায় ২০৫ টাকা পড়ছিল বলে বিপিসি জানিয়েছে। তখন দেশে ডিজেল বিক্রি হচ্ছিল ১১৫ টাকায়। সর্বশেষ মূল্য সমন্বয়ের পর ডিজেলের দাম ১৩৫ টাকা করা হলেও আন্তর্জাতিক বাজারদর অনুযায়ী বিপিসির পুরো ব্যয় উঠছে না। ২১ সেপ্টেম্বর চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা করে বাড়ানো হয়। বর্তমানে ডিজেল ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৫৫ টাকা, অকটেন ১৬৫ টাকা এবং পেট্রোল ১৬০ টাকা লিটারে বিক্রি হচ্ছে। এর আগে ১৯ এপ্রিল ডিজেলের দাম ১০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১৫ টাকা করা হয়েছিল। ১ জুন কেরোসিন, অকটেন ও পেট্রোলের দামও বাড়ানো হয়।
সর্বশেষ মূল্য সমন্বয়ের পরও প্রতি লিটার ডিজেলে বিপিসির প্রায় ৭০ টাকা পর্যন্ত ঘাটতি থাকছে বলে জানিয়েছে জ্বালানি মন্ত্রণালয়। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারের দাম পুরোপুরি অনুসরণ করে দাম বাড়ালে ভোক্তাদের ওপর আরও বড় চাপ তৈরি হতো। বিপিসির হিসাবে, আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১১০ ডলারের মধ্যে থাকলে দেশের বাজারে বর্তমান কাঠামোয় ডিজেল বিক্রি করে খরচ ওঠানো সম্ভব হবে।
২০২৪ সালের মার্চে দেশে জ্বালানি তেলের স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি চালু হয়। আন্তর্জাতিক বাজারের দাম ও অন্যান্য ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রতি মাসে দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয়ের কথা ছিল।
তবে পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতির পর আন্তর্জাতিক বাজারে দাম দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় প্রায় পাঁচ মাস দেশের বাজারে সেই অনুপাতে দাম সমন্বয় করা হয়নি। এর ফলে আমদানি ব্যয় ও বিক্রয়মূল্যের মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি হয়।
বিপিসির হিসাবে, গত মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত ছয় মাসে এই ব্যবধানের কারণে সংস্থাটির লোকসান দাঁড়ায় প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা। এর আগে মার্চ থেকে জুলাই পর্যন্ত পাঁচ মাসে লোকসানের পরিমাণ ২০ হাজার ৫৯৯ কোটি টাকার বেশি হয়েছিল বলে সংসদে দেওয়া তথ্যে জানানো হয়েছিল।
জ্বালানি আমদানির অর্থ জোগাতে বিপিসি এরই মধ্যে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য রাখা অর্থ ব্যবহার করেছে। এর মধ্যে ইআরএল-২সহ কয়েকটি প্রকল্পের অর্থ রয়েছে।
সেপ্টেম্বরের শুরুতে বিপিসির এক চিঠিতে বলা হয়, জ্বালানি আমদানির এলসি নিষ্পত্তির জন্য ১৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা প্রকল্পের হিসাব থেকে নেওয়া হয়েছে। অর্থ ব্যবহারের পর প্রকল্পগুলোর হিসাবে অবশিষ্ট ছিল প্রায় ১ হাজার ৬৮০ কোটি টাকা। একই সময়ে সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন প্রকল্পের জন্য আরও প্রায় ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে বলেও জানানো হয়েছিল।
এ ছাড়া এলপিজি ট্যাংক স্থাপনের জন্য জমি অধিগ্রহণে প্রায় ৫২৪ কোটি টাকা এবং সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং প্রকল্পের ঋণ পরিশোধে ডিসেম্বরের মধ্যে আরও ৬৯০ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে বলে বিপিসির ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।
উল্লেখ্য, চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট দেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার অন্যতম বড় প্রকল্প। প্রকল্পটির আনুমানিক ব্যয় ৩১ হাজার ৫৭ কোটি টাকা। গত ৩ সেপ্টেম্বর প্রকল্পটির জন্য ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকের সঙ্গে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের ঋণচুক্তি করেছে বাংলাদেশ। প্রকল্পটি ২০৩০ সালের নভেম্বরের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ইআরএল-২ চালু হলে বছরে আরও ৩০ লাখ টন অপরিশোধিত তেল পরিশোধনের সক্ষমতা তৈরি হবে। এতে ইস্টার্ন রিফাইনারির মোট পরিশোধন সক্ষমতা ১৫ লাখ টন থেকে বেড়ে ৪৫ লাখ টনে উন্নীত হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দেশের পেট্রোলিয়ামজাত পণ্যের চাহিদার প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ শতাংশ স্থানীয়ভাবে পূরণ করা সম্ভব হবে বলে সরকারি হিসাবে জানানো হয়েছে।
বর্তমানে দেশের বড় অংশের পরিশোধিত জ্বালানি আমদানিনির্ভর হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে দাম ও সরবরাহ পরিস্থিতির পরিবর্তন সরাসরি দেশের আমদানি ব্যয়ে প্রভাব ফেলে। ইআরএল-২ চালু হলে দেশে অপরিশোধিত তেল এনে স্থানীয়ভাবে পরিশোধনের সক্ষমতা বাড়বে।
বর্তমানে বিপিসি ও এর আওতাধীন কোম্পানিগুলোর ৬৪টি ডিপো ও স্থাপনায় মোট ১৬ লাখ ২৭৩ টন জ্বালানি তেল সংরক্ষণের সক্ষমতা রয়েছে। পণ্যভেদে এই মজুত দিয়ে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ দিনের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব বলে বিপিসির কার্যপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। সরকার এই সক্ষমতা ধাপে ধাপে ৯০ দিনে উন্নীত করার পরিকল্পনা করেছে। সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে মজুত সক্ষমতা ৭১ দিনে এবং ২০২৭ সালের মধ্যে ৯০ দিনে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। এ জন্য নতুন ডিপো নির্মাণ, অব্যবহূত ট্যাংক সংস্কার এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের উদ্বৃত্ত ট্যাংক ভাড়া নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চলতি বছর জ্বালানি মজুত বাড়াতে সরকার আরও ৪ লাখ ৮০ হাজার টন জ্বালানি তেল আমদানির সিদ্ধান্ত নেয়। এর মধ্যে ৩ লাখ ৯০ হাজার টন ডিজেল ও ৯০ হাজার টন জেট ফুয়েল। এ আমদানিতে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ৭ হাজার ৬৭৩ কোটি টাকা।
জ্বালানি আমদানির ব্যয় বাড়ার ফলে বিপিসির নগদ অর্থের ওপরও চাপ তৈরি হয়েছে। আগস্টে সংস্থাটির আমদানি ব্যয় এক বছর আগের একই সময়ের তুলনায় প্রায় তিন গুণ হয়েছে। সেপ্টেম্বরের শুরুতে বিপিসি জ্বালানি আমদানির অর্থায়ন নিয়ে নতুন করে চাপের কথা জানিয়ে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগকে চিঠি দেয়।
এর আগে মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত লোকসানের অর্থ ফেরত দিতে সরকারের কাছে ভর্তুকি চেয়েছিল বিপিসি। তবে সেপ্টেম্বরের ওই চিঠি অনুযায়ী, তখনও অর্থ ছাড় হয়নি। এই অবস্থায় নিজস্ব তহবিল থেকে জ্বালানি আমদানির ব্যয় মেটাতে হয়েছে সংস্থাটিকে। বিপিসির চেয়ারম্যান এর আগে জানিয়েছিলেন, দেশে বর্তমানে জ্বালানি তেলের সংকট নেই এবং ডিসেম্বর পর্যন্ত সরবরাহ নিয়ে সংস্থাটি নিরাপদ অবস্থানে রয়েছে।
সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটির বৈঠকে দেশে জ্বালানি সংকট তৈরির কারণ নিয়েও আলোচনা হয়েছে। সংকটের সময় ও পরবর্তী সময়ে সরবরাহব্যবস্থা একই থাকার পর শুধু জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পর কীভাবে সংকটের অবসান হলো, সে বিষয়ে বিপিসির কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে কমিটি। এ ছাড়া দেশে বর্তমানে জ্বালানি তেলের চাহিদা কত, কী পরিমাণ সংরক্ষণ সক্ষমতা রয়েছে এবং ভবিষ্যতের চাহিদা মোকাবিলায় কী প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পরবর্তী বৈঠকে দিতে বলা হয়েছে। জনগণের জন্য জ্বালানির দাম সহনীয় রাখতে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা তৈরির সুপারিশও করেছে কমিটি।
খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, একদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য ও আমদানি ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে দেশের বাজারে মূল্য সমন্বয়ের কারণে ভোক্তা পর্যায়ে দামের চাপ তৈরি হচ্ছে। একই সময়ে জ্বালানি মজুত বাড়ানো, ইআরএল-২ বাস্তবায়ন এবং অন্যান্য অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য বিপিসির বড় অঙ্কের অর্থের প্রয়োজন হচ্ছে। এসব ব্যয় সামলে নিয়মিত আমদানি অব্যাহত রাখাই এখন সংস্থাটির বড় আর্থিক ব্যবস্থাপনার বিষয় হয়ে উঠেছে।