বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪ আশ্বিন ১৪৩৩

শেখ সাদী খান

প্রকাশ: ২৩:০৩, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

চট্টগ্রামের মহাসড়ক উন্নয়নে একনেকে ১৪৫৯ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন

চট্টগ্রামের মহাসড়ক উন্নয়নে একনেকে ১৪৫৯ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন

ছবি সংগৃহীত

চট্টগ্রাম সড়ক জোনের আওতাধীন জেলা মহাসড়কগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং যোগাযোগব্যবস্থা আধুনিকায়নের লক্ষ্যে একনেক সভায় অনুমোদিত হয়েছে ‘চট্টগ্রাম সড়ক জোনের আওতায় জেলা মহাসড়কসমূহ যথাযথমান ও প্রশস্ততায় উন্নীতকরণ (৩য় পর্যায়)’ শীর্ষক প্রকল্প। সম্পূর্ণ সরকারি (জিওবি) অর্থায়নে ১৪৫৯ কোটি ৩৫ লাখ ৩৫ হাজার টাকা ব্যয়ে এই মেগা প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) অধীনে এই আঞ্চলিক গুচ্ছ প্রকল্পটি ১ জুলাই ২০২৬ থেকে ৩০ জুন ২০৩০ মেয়াদে মাঠপর্যায়ে তদারকি করবে সওজের চট্টগ্রাম সড়ক বিভাগ।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রাম জোনের আওতাধীন ছয়টি সড়ক বিভাগের মোট ১৬টি ক্ষতিগ্রস্ত জেলা মহাসড়কের সংস্কার ও উন্নয়ন করা হবে এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য। এর আওতায় চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান জেলার মোট ২৪৩ দশমিক ৫৬৮ কিলোমিটার সড়ক যথাযথ মান ও প্রশস্ততায় উন্নীত করা হবে। প্রকল্পটির মাধ্যমে বিভাগীয় শহর চট্টগ্রামের সঙ্গে চার পার্বত্য ও পর্যটন জেলা রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান ও কক্সবাজারের সরাসরি নিরবচ্ছিন্ন, নিরাপদ ও ব্যয়সাশ্রয়ী সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে, যা ওই অঞ্চলের পর্যটনশিল্প এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

প্রকল্পটি সমপ্রতি (সেপ্টেম্বর, ২০২৬) একনেক সভায় পাস হয়েছে এবং এর পর্যায়ক্রমিক দরপত্র (টেন্ডার) আহ্বান ও ঠিকাদার নিয়োগের প্রক্রিয়া চলমান, তাই সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের নিয়ম অনুযায়ী, এই আঞ্চলিক গুচ্ছ প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক পূর্ণকালীন প্রকল্প পরিচালক (পিডি) এখনো চূড়ান্তভাবে পদায়ন বা চূড়ান্ত করা হয়নি। প্রাথমিক প্রাতিষ্ঠানিক ধাপ হিসেবে বর্তমানে সওজের চট্টগ্রাম সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীই এর প্রারম্ভিক কার্যক্রম তদারকি করছেন।

চট্টগ্রাম সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ মাইদুল ইসলাম শেয়ার বিজকে বলেন, ‘যেহেতু প্রকল্পটি সমপ্রতি (সেপ্টেম্বর, ২০২৬) একনেক সভায় পাস হয়েছে এবং এর পর্যায়ক্রমিক দরপত্র (টেন্ডার) আহ্বান ও ঠিকাদার নিয়োগের প্রক্রিয়া চলমান, তাই সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের নিয়ম অনুযায়ী এই আঞ্চলিক গুচ্ছ প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক পূর্ণকালীন প্রকল্প পরিচালক (পিডি) এখনো চূড়ান্তভাবে পদায়ন বা চূড়ান্ত করা হয়নি। প্রাথমিক প্রাতিষ্ঠানিক ধাপ হিসেবে বর্তমানে সওজের চট্টগ্রাম সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীই এর প্রারম্ভিক কার্যক্রম তদারকি করছেন।’

তিনি আরও বলেন, যেহেতু প্রকল্পটি সমপ্রতি একনেকে অনুমোদন পেয়েছে, এরপর জিও জারি হবে। জিও জারির পর আমরা এস্টিমেট সাবমিট করব। এরপর সেটা টেন্ডারে যাবে, এভাবেই আপাতত কাজ এগিয়ে চলছে। এগুলো শেষ হতেও সময় লাগবে।

সড়ক ও যোগাযোগ বিশেশজ্ঞরা জানান, প্রকল্পটির মাধ্যমে চট্টগ্রামের ১৬টি জেলা মহাসড়কের প্রায় ২৪৪ কিলোমিটার সড়ক পুনর্নির্মাণ ও প্রশস্ত করা হবে। এতে করে  গ্রামীণ ও আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থাকে উন্নত করবে, যা স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও পণ্য পরিবহনকে আরও গতিশীল করবে। এছাড়া উন্নত সড়ক অবকাঠামোর কারণে যাতায়াতের সময় এবং যানবাহনের জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে। সড়কগুলো পর্যাপ্ত প্রশস্ত করা এবং বাঁক সংস্কারের মাধ্যমে মহাসড়কে দুর্ঘটনার হার অনেক কমে আসবে বলে মন্তব্য করেন তারা।  

স্থানীয় বাসিন্দা, যাত্রী এবং পরিবহন সংশ্লিষ্টরা জানান, চট্টগ্রামের বিভিন্ন জেলা সড়কের বর্তমান অপ্রতুল প্রশস্ততা ও ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থার কারণে প্রতিনিয়ত তীব্র যানজট তৈরি হয়। স্থানীয় জনগণের মতে, প্রকল্পটির মাধ্যমে সড়কগুলো প্রশস্ত ও পুনর্নির্মাণ করা হলে তাদের দীর্ঘদিনের যাতায়াত কষ্ট এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা জ্যামে আটকে থাকার দুর্ভোগ দূর হবে।  অতিরিক্ত ট্রাফিক এবং সরু রাস্তার কারণে এসব রুটে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। স্থানীয় চালক ও যাত্রীদের প্রত্যাশা—সড়কে ড্রেন, কালভার্ট এবং সুরক্ষা অবকাঠামো নির্মাণের ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে এবং নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত হবে।

এছাড়া বন্দর নগরী চট্রগ্রামের ব্যবসায়িক ও স্থানীয় পণ্য উৎপাদনকারীদের মতে, জেলা সড়কগুলোর মানোন্নয়ন হলে প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে চট্টগ্রাম বন্দর নগরীতে পণ্য পরিবহন দ্রুত, সহজ এবং সাশ্রয়ী হবে এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ প্রকল্প পাস হওয়াকে স্বাগত জানানোর পাশাপাশি এটি যেন নির্দিষ্ট মেয়াদের মধ্যে মানসম্মতভাবে শেষ হয়, সেই দাবি জানিয়েছেন। অতীতে বিভিন্ন প্রকল্পের ধীরগতির অভিজ্ঞতা থেকে তারা যথাসময়ে কাজ সমাপ্ত করার ওপর জোর দিচ্ছেন।

এর আগে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ থেকে ১৪৮৩ দশমিক ৭১৮৩ কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে প্রকল্প প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হলে গত ৭ মে পিইসি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ডিপিপি পুনর্গঠন করায় ২৪ দশমিক ৩৬৪৮ কোটি টাকা ব্যয় হ্রাস পেয়ে চূড়ান্ত প্রাক্কলিত ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১৪৫৯ দশমিক ৩৫৩৫ কোটি টাকা। প্রকল্প নথির তথ্য অনুযায়ী, ২৪৩ দশমিক ৫৬৮ কিলোমিটার সড়কের মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত ৪৮ দশমিক ৩৭২ কিলোমিটার পুনর্নির্মাণ, ১৪২ দশমিক ৬৩ কিলোমিটার প্রশস্তকরণ, ১৬৩ দশমিক ৭২৪ কিলোমিটার মজবুতিকরণ এবং ২৩১ দশমিক ৬১৮ কিলোমিটার সার্ফেসিং করা হবে। জলাবদ্ধতা-প্রবণ এলাকায় ১১ দশমিক ৯৫ কিলোমিটার রিজিড পেভমেন্ট (আরসিসি সড়ক) নির্মাণ করা হবে। এ ছাড়া প্রকল্পের আওতায় ১৬৪টি আরসিসি বক্স কালভার্ট (৫৯১ দশমিক ৫৭ মিটার) নির্মাণসহ বিপুল পরিমাণ সসার ড্রেন, ইউ-ড্রেন, রিটেইনিং ওয়াল এবং ঢাল রক্ষায় কংক্রিট স্লোপ প্রটেকশনের কাজ হাতে নেওয়া হয়েছে। ১ দশমিক ১০ একর ভূমি অধিগ্রহণের জন্য ক্ষতিপূরণ বাবদ ৬২৪ দশমিক ১৬ লাখ টাকা ও ইউটিলিটি স্থানান্তরের জন্য থোক ৪৮১৮ দশমিক ৩৫ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

প্রকল্পের আওতাভুক্ত উপজেলাগুলোর মধ্যে রয়েছে—চট্টগ্রামের রাউজান, রাঙ্গুনিয়া, সন্দ্বীপ, পটিয়া, বোয়ালখালী, চন্দনাইশ, আনোয়ারা; কক্সবাজারের উখিয়া, চকরিয়া, কুতুবদিয়া; রাঙামাটির কাউখালী, রাজস্থলী, বাঘাইছড়ি; খাগড়াছড়ি সদর ও পানছড়ি এবং বান্দরবান সদর, লামা, আলীকদম, রামু ও নাইক্ষ্যংছড়ি।

পরিকল্পনা কমিশন জানিয়েছে, জুন ২০২২-এর নির্দেশিকা অনুযায়ী, প্রকল্পের ব্যয় ৫০ কোটি টাকার ঊর্ধ্বে হওয়ায় এটি একনেক কর্তৃক অনুমোদনযোগ্য। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে এলাকার উৎপাদিত কৃষিজ ও শিল্প-কলকারখানার পণ্য বন্দরনগরী চট্টগ্রামসহ সারাদেশে স্বল্প সময়ে পরিবহন করা সম্ভব হবে, যা সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের যোগাযোগ, পরিবহন ও পর্যটন খাতের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ।