তিন বছরের কার্যক্রমে বিএসইসির তদন্ত
এটিসি শরিয়াহ ফান্ডে কারসাজির অভিযোগ
ছবি সংগৃহীত
বিনিয়োগ বিধিমালা পরিপালন, পোর্টফোলিও ব্যবস্থাপনা, লেনদেনের ধরন ও ফান্ডের অর্থ ব্যবহারে অনিয়মের অভিযোগে বে-মেয়াদি এটিসি শরিয়াহ ইউনিট ফান্ডের প্রায় তিন বছরের কার্যক্রম বিশেষ তদন্তের আওতায় এনেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। ফান্ডটির বিরুদ্ধে অকার্যকর ও ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগ, সম্ভাব্য বাজার কারসাজি, অস্বাভাবিক ও চক্রাকার লেনদেন, স্ব-লেনদেন, দালালি কমিশনে অনিয়ম এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষকে ফান্ডের অর্থ থেকে অনিয়মতান্ত্রিকভাবে অর্থ দেওয়ার মতো অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতেই তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
এশিয়ান টাইগার ক্যাপিটাল পার্টনার্স অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট লিমিটেড পরিচালিত এটিসি শরিয়াহ ইউনিট ফান্ড দেশের উন্মুক্ত ইসলামি মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর মধ্যে অন্যতম পুরোনো। ফান্ডটি ২০১৬ সালে চালু হয় এবং প্রাথমিকভাবে ১০ কোটি টাকা তহবিল নিয়ে যাত্রা শুরু করে। বিএসইসির তথ্যেও ফান্ডটির অনুমোদনের তারিখ ২০১৬ সালের ১০ আগস্ট এবং সাবস্ক্রিপশন শুরুর সময়ের তথ্য রয়েছে।
বিএসইসির সামপ্রতিক তদন্তের আওতায় রাখা হয়েছে ২০২৩ সালের ৩১ আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সময়কে। অর্থাৎ প্রায় তিন বছর ধরে ফান্ডটির বিনিয়োগ, লেনদেন, অর্থ ব্যবস্থাপনা, পোর্টফোলিও পরিচালনা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিধিবিধান পরিপালনের বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হবে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত অভিযোগগুলোকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে বিবেচনার সুযোগ নেই। তবে অভিযোগগুলোর প্রকৃতি এবং দীর্ঘ সময়ের কার্যক্রম একসঙ্গে যাচাইয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন।
সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বিএসইসি। কমিটিতে রয়েছেন কমিশনের যুগ্ম পরিচালক মো. মোস্তাফিজুর রহমান, সহকারী পরিচালক মো. শাকিল আহমেদ এবং মো. হাসান। কমিটিকে ৬০ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তদন্তের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে ফান্ডটির বিনিয়োগ কার্যক্রম। এটিসি শরিয়াহ ইউনিট ফান্ডের অর্থ কোথায় এবং কীভাবে বিনিয়োগ করা হয়েছে, সেই বিনিয়োগ সংশ্লিষ্ট সময়ের প্রযোজ্য বিধিবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল কি না—তা যাচাই করবে তদন্ত কমিটি।
বিশেষ করে ফান্ডটির যাবতীয় বিনিয়োগ বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (মিউচুয়াল ফান্ড) বিধিমালা, ২০২৫-এর ষষ্ঠ তফসিলের বিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করে করা হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার নির্দেশ রয়েছে। এর মাধ্যমে ফান্ডের অর্থ বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নির্ধারিত সীমা, যোগ্যতা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং সংশ্লিষ্ট বিধিবিধান মানা হয়েছে কি না, সেটি যাচাই করা হবে।
মিউচুয়াল ফান্ডের ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে সংগৃহীত অর্থ নির্দিষ্ট নীতিমালা অনুযায়ী ব্যবস্থাপনা করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কারণ একজন সাধারণ বিনিয়োগকারী সরাসরি পোর্টফোলিওর প্রতিটি বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করেন না। তিনি সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানের পেশাগত ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভর করেন। ফলে ফান্ডের বিনিয়োগ সিদ্ধান্তে অনিয়ম থাকলে তার প্রভাব সরাসরি ইউনিটধারীদের ওপর পড়তে পারে।
এ কারণে এটিসি শরিয়াহ ইউনিট ফান্ডের ক্ষেত্রে কোন সময়ে কোন সম্পদে কত অর্থ বিনিয়োগ করা হয়েছে, বিনিয়োগের সময় সংশ্লিষ্ট সম্পদের অবস্থা কী ছিল এবং সেই বিনিয়োগের সিদ্ধান্তের পেছনে কী ধরনের যুক্তি ছিল—এসব বিষয় তদন্তে গুরুত্ব পাবে।
ফান্ডটির পোর্টফোলিওতে অকার্যকর সম্পদ বা এনপিএ, ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগ এবং মান কমে যাওয়া সম্পদ রয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের অন্যতম বিষয়। পাশাপাশি মোট বকেয়া দাবির কোনো স্থিতি রয়েছে কি না, তাও শনাক্ত করা হবে।
কোনো মিউচুয়াল ফান্ডের পোর্টফোলিওতে দীর্ঘ সময় ধরে অকার্যকর বা ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগ পড়ে থাকলে তা ফান্ডের সম্পদমূল্য এবং ইউনিটধারীদের সম্ভাব্য রিটার্নের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তাই ফান্ডের আর্থিক বিবরণীতে বিনিয়োগগুলোর মূল্যায়ন কীভাবে করা হয়েছে এবং প্রকৃত আর্থিক অবস্থার সঙ্গে সেই মূল্যায়নের সামঞ্জস্য কতটা রয়েছে, সেটিও তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
এ ক্ষেত্রে তদন্ত কমিটি বিনিয়োগের হিসাব, সংশ্লিষ্ট কোম্পানির আর্থিক অবস্থা, ফান্ডের পোর্টফোলিও বিবরণী এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য নথি পর্যালোচনা করতে পারে। কোনো বিনিয়োগের মূল্য কমে যাওয়ার পরও তা যথাযথভাবে চিহ্নিত বা হিসাবভুক্ত করা হয়েছে কি না, সেটিও যাচাইয়ের আওতায় থাকবে।
তদন্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোর একটি হলো ফান্ডটির লেনদেনের ধরন। বিএসইসির আদেশ অনুযায়ী, ফান্ডটির লেনদেনে বাজার কারসাজি, অস্বাভাবিক লেনদেন, চক্রাকার লেনদেন কিংবা স্ব-লেনদেনের মতো কোনো কার্যক্রম ছিল কি না, তা পরীক্ষা করবে তদন্ত কমিটি।
এ ধরনের অভিযোগ প্রমাণ করতে শুধু কোনো একটি লেনদেন দেখা যথেষ্ট নয়। সাধারণত সংশ্লিষ্ট সময়ের লেনদেনের ধারাবাহিকতা, ক্রেতা-বিক্রেতার পরিচয়, একই পক্ষ বা সংশ্লিষ্ট হিসাবের মধ্যে লেনদেনের পুনরাবৃত্তি, লেনদেনের সময় ও মূল্য এবং সংশ্লিষ্ট সিকিউরিটিজের বাজার পরিস্থিতিসহ বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ প্রয়োজন হয়।
ফলে এটিসি শরিয়াহ ইউনিট ফান্ডের ক্ষেত্রে কোন শেয়ারে কখন বিনিয়োগ করা হয়েছে, কখন বিক্রি করা হয়েছে, কোন ব্রোকার বা ডিলারের মাধ্যমে লেনদেন হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট লেনদেনের বিপরীতে ফান্ডের প্রকৃত বিনিয়োগ উদ্দেশ্য কী ছিল—এসব তথ্য যাচাই করা হতে পারে।
বিশেষ করে একই শেয়ার বা সিকিউরিটিজে ফান্ডের লেনদেনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্য কোনো পক্ষের লেনদেনের মিল পাওয়া যায় কি না, তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে এসব লেনদেনকে বাজার কারসাজি হিসেবে চূড়ান্তভাবে অভিহিত করার সুযোগ নেই।
ফান্ডটির বিরুদ্ধে স্ব-লেনদেন বা নিজেদের মধ্যে লেনদেনের অভিযোগও তদন্তের আওতায় এসেছে। এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে একই ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা সংশ্লিষ্ট পক্ষের নিয়ন্ত্রণাধীন একাধিক হিসাবের মধ্যে লেনদেন হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে। একই সঙ্গে সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি কিংবা সংশ্লিষ্ট কোনো পক্ষ ফান্ডের লেনদেন থেকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সুবিধা পেয়েছে কি না, সেটিও তদন্তে উঠে আসতে পারে।
এ ক্ষেত্রে শুধু ফান্ডের নিজস্ব নথি নয়, লেনদেনসংক্রান্ত হিসাব, ব্রোকারেজ তথ্য, ব্যাংক হিসাব এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের সঙ্গে সম্পর্কের তথ্যও গুরুত্বপূর্ণ হবে। কারণ প্রকৃত লেনদেনের উদ্দেশ্য ও অর্থপ্রবাহ বিশ্লেষণ ছাড়া কোনো লেনদেনের প্রকৃতি নির্ধারণ করা কঠিন।
এটিসি শরিয়াহ ইউনিট ফান্ডের শেয়ার লেনদেনে দেওয়া দালালি কমিশনও তদন্তের বাইরে থাকছে না। বিএসইসির নির্দেশনায় বলা হয়েছে, শেয়ার লেনদেনের বিপরীতে দেওয়া কমিশন যৌক্তিক ছিল কি না এবং তা প্রচলিত আইন ও নীতিমালা অনুসরণ করে দেওয়া হয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করা হবে।
মিউচুয়াল ফান্ডের ক্ষেত্রে লেনদেন ব্যয়ের একটি অংশ হিসেবে দালালি কমিশন গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অস্বাভাবিক বা অযৌক্তিক কমিশন দিলে তা শেষ পর্যন্ত ফান্ডের ব্যয় বাড়াতে পারে এবং বিনিয়োগকারীদের রিটার্নে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই কোন লেনদেনে কত কমিশন দেওয়া হয়েছে, কোন ব্রোকারকে দেওয়া হয়েছে এবং কমিশনের পরিমাণ সংশ্লিষ্ট লেনদেনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজবে তদন্ত কমিটি।
তদন্তের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো ফান্ডের নগদ অর্থ ও ব্যাংক হিসাব। ফান্ডের অর্থ থেকে সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি বা সংশ্লিষ্ট কোনো পক্ষকে অনিয়ম বা অবৈধভাবে অর্থ দেওয়া হয়েছে কি না, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করবে তদন্ত কমিটি।
এখানে ফান্ডের ব্যাংক হিসাব, নগদ অর্থের প্রবাহ, অর্থ উত্তোলন, অর্থ স্থানান্তর এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের সঙ্গে আর্থিক লেনদেন বিশেষভাবে পর্যালোচনা করা হতে পারে। কারণ মিউচুয়াল ফান্ডের অর্থ মূলত ইউনিটধারীদের অর্থ। ফলে সেই অর্থ ফান্ডের নির্ধারিত উদ্দেশ্যের বাইরে ব্যবহার করা হয়েছে কি না, হলে তার অনুমোদন ও হিসাব কী ছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া বিনিয়োগকারীদের স্বার্থের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
তদন্তের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানির নিজস্ব শেয়ার পোর্টফোলিও এবং এটিসি শরিয়াহ ইউনিট ফান্ডের পোর্টফোলিওর কার্যসম্পাদনের তুলনা। একই সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানের অধীনে পরিচালিত নিজস্ব পোর্টফোলিও এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অর্থে পরিচালিত ফান্ডের পোর্টফোলিওর মধ্যে বিনিয়োগ সিদ্ধান্তে অস্বাভাবিক পার্থক্য রয়েছে কি না, সেটি যাচাই করা হবে।
কোনো নির্দিষ্ট শেয়ারে ফান্ডের বিনিয়োগের সময়, মূল্য, বিক্রির সময় এবং সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব পোর্টফোলিওর সিদ্ধান্তের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে পারে। একই সঙ্গে দুই পোর্টফোলিওর ঝুঁকি, রিটার্ন ও বিনিয়োগ কাঠামোর তুলনাও করা হতে পারে।
শুধু সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানির কার্যক্রম নয়, ফান্ডটির সুশাসন ও তদারকিতে সংশ্লিষ্ট অন্য পক্ষগুলোর ভূমিকার বিষয়ও তদন্তের আওতায় রয়েছে। বহিস্থ নিরীক্ষক, সম্পদ ব্যবস্থাপক, ট্রাস্টি এবং জিম্মাদার তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেছেন কি না, সেটি খতিয়ে দেখবে তদন্ত কমিটি।
মিউচুয়াল ফান্ড কাঠামোয় সম্পদ ব্যবস্থাপকের পাশাপাশি ট্রাস্টি ও জিম্মাদারের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। এটিসি শরিয়াহ ইউনিট ফান্ডের প্রাথমিক কাঠামোতেও আইসিবিকে ট্রাস্টি ও কাস্টডিয়ান হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছিল।
অন্যদিকে নিরীক্ষকের দায়িত্ব হলো ফান্ডের আর্থিক বিবরণী যথাযথভাবে যাচাই করা এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে আর্থিক অনিয়ম বা ঝুঁকির বিষয় তুলে ধরা। ফলে তদন্তে কোনো অনিয়ম বা অসংগতি পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট পর্যায়ে তা শনাক্ত ও রিপোর্ট করা হয়েছিল কি না, তাও যাচাই হতে পারে।
তদন্তের আওতায় সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানির ফান্ড পরিচালনার সক্ষমতা ও কার্যকারিতাও মূল্যায়ন করা হবে। অর্থাৎ শুধু কোনো নির্দিষ্ট লেনদেনে অনিয়ম হয়েছে কি না, তা নয়; সামগ্রিকভাবে ফান্ড পরিচালনায় প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া এবং তদারকি কাঠামো কতটা কার্যকর ছিল, সেটিও দেখা হবে।
এটিসি শরিয়াহ ইউনিট ফান্ডকে ঘিরে এর আগে প্রকাশিত তথ্যেও ফান্ডটিকে একটি উন্মুক্ত ইসলামি মিউচুয়াল ফান্ড হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০১৬ সালে চালুর সময় ফান্ডটির মূলধনের লক্ষ্য ছিল ১০ কোটি টাকা, যার মধ্যে স্পনসর অংশ ছিল ১ কোটি টাকা এবং বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে সংগ্রহের লক্ষ্য ছিল ৯ কোটি টাকা।
পরবর্তী সময়ে ফান্ডটির আর্থিক ফল ও সম্পদ ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিভিন্ন তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব ওয়েবসাইটেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকের অনিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী প্রকাশের তথ্য রয়েছে।
এটিসি শরিয়াহ ইউনিট ফান্ডের তদন্ত এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন দেশের ইসলামি মিউচুয়াল ফান্ড খাতেও বিনিয়োগের সুযোগ, পোর্টফোলিও ব্যবস্থাপনা এবং রিটার্ন নিয়ে নানা আলোচনা রয়েছে। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে ইসলামি মিউচুয়াল ফান্ডের মোট ব্যবস্থাপনাধীন সম্পদের পরিমাণ ছিল প্রায় ৭৭১ কোটি টাকা বলে বিভিন্ন শিল্প বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। একই সময়ে উন্মুক্ত ইসলামি মিউচুয়াল ফান্ডের সংখ্যা ছিল ১৪টি এবং বন্ধ-প্রান্তিক ফান্ড ছিল চারটি।
বিশ্লেষকদের মতে, মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগকারীরা সরাসরি প্রতিটি বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। তাই সম্পদ ব্যবস্থাপকের ওপর আস্থা এবং সুশাসন এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ফান্ডের বিনিয়োগ, লেনদেন বা অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে দ্রুত ও স্বচ্ছ তদন্ত বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
তবে এটিসি শরিয়াহ ইউনিট ফান্ডের বিরুদ্ধে বিএসইসির তদন্তের সিদ্ধান্তকে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তদন্তের উদ্দেশ্যই হলো অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই, সংশ্লিষ্ট নথি ও লেনদেন পর্যালোচনা এবং প্রয়োজন হলে দায় নির্ধারণ করা।
বিএসইসির গঠিত তিন সদস্যের তদন্ত কমিটিকে ৬০ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। তদন্তে প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহ, ফান্ডের লেনদেন বিশ্লেষণ, ব্যাংক হিসাব পর্যালোচনা, পোর্টফোলিও পরীক্ষা এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য নেওয়ার মতো একাধিক ধাপ থাকতে পারে।
তদন্তে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্য কোনো অনিয়ম বা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এলে সেটিও অনুসন্ধানের আওতায় নেওয়ার নির্দেশ রয়েছে। ফলে তদন্তের পরিধি বিএসইসির আদেশে নির্ধারিত সাতটি বিষয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; নতুন কোনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেলে সেটিও বিবেচনায় আসতে পারে।
এটিসি শরিয়াহ ইউনিট ফান্ডের প্রায় তিন বছরের কার্যক্রম নিয়ে বিএসইসির এই বিশেষ তদন্ত সম্পদ ব্যবস্থাপনা খাতের নিয়ন্ত্রক তদারকির একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তদন্তে অভিযোগগুলোর কোনোটি সত্য প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রযোজ্য আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার পথ তৈরি হবে। আর অভিযোগের পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ না মিললে সেটিও তদন্ত প্রতিবেদনের মাধ্যমে স্পষ্ট হবে।
এখন মূল নজর ৬০ কার্যদিবসের তদন্ত প্রতিবেদনের দিকে। ফান্ডের বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত, লেনদেনের ধরন, অর্থের ব্যবহার, দালালি কমিশন, সংশ্লিষ্ট পক্ষের সঙ্গে আর্থিক সম্পর্ক এবং সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানির তদারকি—সবকিছুর সমন্বিত চিত্র তদন্তে কতটা উঠে আসে, তার ওপরই নির্ভর করবে পরবর্তী নিয়ন্ত্রক পদক্ষেপ।