সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২ আশ্বিন ১৪৩৩

​​​​​​​নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২৩:৩১, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ইপিএস কমেছে, তবুও এনভয় টেক্সটাইলে লভ্যাংশ বেড়েছে

ইপিএস কমেছে, তবুও এনভয় টেক্সটাইলে লভ্যাংশ বেড়েছে

ছবি সংগৃহীত

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বস্ত্র খাতের কোম্পানি এনভয় টেক্সটাইলের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ব্যবসায় মুনাফা আগের অর্থবছরের তুলনায় কমেছে। তবে মুনাফায় সামান্য পতন হলেও শেয়ারহোল্ডারদের জন্য নগদ লভ্যাংশ বাড়িয়েছে কোম্পানিটির পরিচালনা পর্ষদ। সর্বশেষ অর্থবছরের জন্য ৩২ দশমিক ৫০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দেওয়ার সুপারিশ করেছে পর্ষদ, যেখানে আগের অর্থবছরে লভ্যাংশ ছিল ৩০ শতাংশ। একই সঙ্গে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদ মূল্য ও পরিচালন কার্যক্রম থেকে নগদ প্রবাহও বেড়েছে। ফলে মুনাফা কমার বিপরীতে লভ্যাংশ ও নগদ প্রবাহে উন্নতির চিত্র দেখা গেছে।

কোম্পানির ২০২৫-২৬ অর্থবছরের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুমোদনের পর পরিচালনা পর্ষদ লভ্যাংশের এ সিদ্ধান্ত নেয়। গত ২৭ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত পর্ষদ সভায় ৩০ জুন ২০২৬ সমাপ্ত অর্থবছরের আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা ও অনুমোদন করা হয়। পর্ষদের সুপারিশ করা লভ্যাংশ শেয়ারহোল্ডারদের অনুমোদনের জন্য আগামী ৫ ডিসেম্বর বার্ষিক সাধারণ সভায় (এজিএম) উপস্থাপন করা হবে। লভ্যাংশের জন্য যোগ্য শেয়ারহোল্ডার নির্ধারণে ২৬ অক্টোবর রেকর্ড ডেট নির্ধারণ করা হয়েছে।

এনভয় টেক্সটাইলের ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কর-পরবর্তী নিট মুনাফা হয়েছে প্রায় ১৩৮ কোটি টাকা। আগের অর্থবছর ২০২৪-২৫-এ কোম্পানিটির নিট মুনাফা ছিল ১৪০ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে নিট মুনাফা কমেছে প্রায় ২ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। শতাংশের হিসাবে এ পতন প্রায় দুই শতাংশ। মুনাফা কমলেও কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ শেয়ারহোল্ডারদের নগদ রিটার্নের পরিমাণ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

মুনাফা কমার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কমেছে শেয়ারপ্রতি আয় বা ইপিএসও। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কোম্পানিটির ইপিএস হয়েছে ৮ টাকা ২৪ পয়সা। আগের অর্থবছর ইপিএস ছিল ৮ টাকা ৪০ পয়সা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে শেয়ারপ্রতি আয় কমেছে ১৬ পয়সা। নিট মুনাফা কমার সঙ্গে ইপিএসেও এ পতন এসেছে।

তবে মুনাফা কমলেও লভ্যাংশের চিত্র ভিন্ন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য ৩২ দশমিক ৫০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ সুপারিশ করেছে কোম্পানিটি। ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের প্রতিটি শেয়ারের বিপরীতে এ লভ্যাংশের পরিমাণ ৩ টাকা ২৫ পয়সা। আগের অর্থবছরে কোম্পানিটি ৩০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দিয়েছিল, অর্থাৎ প্রতিটি শেয়ারে ৩ টাকা। সে হিসাবে এবার লভ্যাংশ বেড়েছে ২ দশমিক ৫০ শতাংশ পয়েন্ট বা শেয়ারপ্রতি ২৫ পয়সা।

এনভয় টেক্সটাইলের লভ্যাংশের ধারাবাহিকতা দেখলেও এবারকার সিদ্ধান্তের বিষয়টি স্পষ্ট হয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কোম্পানিটি ৩০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছিল। তার আগের ২০২৩-২৪ অর্থবছরে লভ্যাংশ ছিল ২০ শতাংশ নগদ। ফলে দুই বছরের ব্যবধানে প্রস্তাবিত নগদ লভ্যাংশ ২০ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩২ দশমিক ৫০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কোম্পানিটির মুনাফাও আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছিল।

তবে চলতি হিসাববছরের চিত্রে মুনাফার প্রবৃদ্ধি কিছুটা কমেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কোম্পানিটির নিট মুনাফা ছিল প্রায় ১৪১ কোটি টাকা, যা আগের অর্থবছরের প্রায় ৬০ কোটি টাকার তুলনায় বড় ধরনের বৃদ্ধি ছিল। ওই বছর ইপিএসও বেড়ে ৮ টাকা ৪০ পয়সায় দাঁড়িয়েছিল। ফলে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ইপিএস সামান্য কমে ৮ টাকা ২৪ পয়সায় নামলেও আগের অর্থবছরের তুলনায় ঘোষিত লভ্যাংশ বাড়িয়েছে কোম্পানিটি।

এনভয় টেক্সটাইলের সর্বশেষ আর্থিক ফলাফলের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো পরিচালন কার্যক্রম থেকে নগদ অর্থপ্রবাহ। মুনাফা কমলেও কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি নিট পরিচালন নগদ প্রবাহ বা এনওসিএফপিএস উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে কোম্পানিটির এনওসিএফপিএস হয়েছে ১৪ টাকা ৮৮ পয়সা। আগের অর্থবছরে এ পরিমাণ ছিল ৪ টাকা ৭৭ পয়সা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে শেয়ারপ্রতি পরিচালন নগদ প্রবাহ বেড়েছে ১০ টাকা ১১ পয়সা। শতাংশের হিসাবে এ বৃদ্ধি ২০০ শতাংশেরও বেশি।

মুনাফা এবং নগদ প্রবাহ একই বিষয় নয়। কোনো কোম্পানির হিসাবভুক্ত মুনাফা কমলেও ব্যবসার প্রকৃত কার্যক্রম থেকে নগদ অর্থপ্রবাহ বাড়তে পারে। আবার মুনাফা বেশি হলেও নগদ প্রবাহ দুর্বল হতে পারে। এ কারণে এনভয় টেক্সটাইলের ক্ষেত্রে মুনাফা কমার পাশাপাশি পরিচালন নগদ প্রবাহের বড় উত্থান আর্থিক ফলাফলের একটি আলাদা দিক হিসেবে সামনে এসেছে।

পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীরা সাধারণত কোম্পানির ইপিএস, লভ্যাংশ, এনএভিপিএস এবং এনওসিএফপিএস—সবগুলো সূচক বিবেচনা করেন। এনভয় টেক্সটাইলের সর্বশেষ ফলাফলে এ চারটি সূচকের মধ্যে ইপিএস কমলেও বাকি তিনটির মধ্যে লভ্যাংশ ও নগদ প্রবাহ বেড়েছে এবং এনএভিপিএসও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে।

কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য বা এনএভিপিএসও আগের বছরের তুলনায় বেড়েছে। ৩০ জুন ২০২৬ শেষে এনভয় টেক্সটাইলের এনএভিপিএস দাঁড়িয়েছে ৬০ টাকা ৩৩ পয়সায়। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এনএভিপিএস ছিল ৫৮ টাকা ৩২ পয়সা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদ মূল্য বেড়েছে ২ টাকা ১ পয়সা। অর্থাৎ কোম্পানির নিট সম্পদভিত্তিক অবস্থানে কিছুটা উন্নতি হয়েছে। মুনাফা সামান্য কমলেও সম্পদমূল্য বৃদ্ধির ফলে শেয়ারপ্রতি এনএভিপিএসের পরিমাণ বেড়েছে।

এদিকে কোম্পানির আর্থিক ফলাফলের সঙ্গে বাজারমূল্যের তুলনাও বিনিয়োগকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী ২৮ সেপ্টেম্বর এনভয় টেক্সটাইলের শেয়ারদর ৩ দশমিক ২৯ শতাংশ কমে ৭০ টাকা ৫০ পয়সায় লেনদেন শেষ হয়েছে। অর্থাৎ ৬০ টাকা ৩৩ পয়সা এনএভিপিএসের বিপরীতে বাজারদর ছিল ৭০ টাকা ৫০ পয়সা।

এনভয় টেক্সটাইল বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী বস্ত্র খাতের একটি পরিচিত প্রতিষ্ঠান। কোম্পানিটি ডেনিম কাপড় উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত এবং ময়মনসিংহের ভালুকার জামিরদিয়ায় এর কারখানা অবস্থিত। কোম্পানিটির উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রম দেশের বস্ত্র খাতের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত।

এর আগে ২০২৫ সালে কোম্পানিটি জানিয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের ক্রেতাদের কাছ থেকে অর্ডার বৃদ্ধির পাশাপাশি আগ্রাসী বিপণন কার্যক্রমের কারণে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ব্যবসায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছিল। ওই বছর কোম্পানির নিট মুনাফা প্রায় ১৪১ কোটি টাকায় পৌঁছায় এবং ৩০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ সুপারিশ করা হয়।

সর্বশেষ অর্থবছরে সেই উচ্চ মুনাফার তুলনায় কিছুটা কম আয় হলেও শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ বাড়িয়েছে পরিচালনা পর্ষদ। ফলে কোম্পানিটির ব্যবসায়িক ফলাফল মূল্যায়নের ক্ষেত্রে শুধু মুনাফা কমার বিষয়টি নয়, নগদ প্রবাহ, সম্পদমূল্য ও লভ্যাংশের পরিবর্তনও বিবেচনায় আসছে।

এনভয় টেক্সটাইলের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের আর্থিক প্রতিবেদন এবং ৩২ দশমিক ৫০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ শেয়ারহোল্ডারদের অনুমোদনের জন্য আগামী ৫ ডিসেম্বর বার্ষিক সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হবে। সভাটি হাইব্রিড পদ্ধতিতে সকাল ১১টায় অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। লভ্যাংশ পাওয়ার যোগ্য শেয়ারহোল্ডার নির্ধারণে ২৬ অক্টোবর রেকর্ড ডেট নির্ধারণ করেছে কোম্পানিটি।

এজিএমে লভ্যাংশ অনুমোদনের পাশাপাশি কোম্পানির নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনসহ অন্যান্য আলোচ্য বিষয় শেয়ারহোল্ডারদের সামনে উপস্থাপন করা হবে। লভ্যাংশ ঘোষণার পর চূড়ান্ত অনুমোদন এজিএমের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে।

এ ছাড়া কোম্পানিটির নাম পরিবর্তনের প্রস্তাবও এজিএমে তোলা হবে। পরিচালনা পর্ষদ ‘এনভয় টেক্সটাইল লিমিটেড’ নাম পরিবর্তন করে ‘এনভয় টেক্সটাইল পিএলসি’ করার প্রস্তাব করেছে। শেয়ারহোল্ডারদের অনুমোদন সাপেক্ষে এ পরিবর্তন কার্যকর হবে।

এনভয় টেক্সটাইলের সর্বশেষ আর্থিক ফলাফলে সবচেয়ে বেশি আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে মুনাফা কমার পরও লভ্যাংশ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত। সাধারণভাবে একটি কোম্পানির লভ্যাংশ নির্ধারণে নিট মুনাফা গুরুত্বপূর্ণ হলেও শুধু ওই একটি সূচকের ওপর লভ্যাংশ নির্ভর করে না। কোম্পানির নগদ অর্থপ্রবাহ, সঞ্চিত মুনাফা, ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ পরিকল্পনা, তারল্য পরিস্থিতি এবং পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্তও এতে ভূমিকা রাখে।

এনভয় টেক্সটাইলের ক্ষেত্রে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে নিট মুনাফা প্রায় ২ কোটি ৮৯ লাখ টাকা কমেছে। ইপিএস কমেছে ১৬ পয়সা। বিপরীতে এনওসিএফপিএস বেড়েছে ১০ টাকা ১১ পয়সা এবং এনএভিপিএস বেড়েছে ২ টাকা ১ পয়সা। একই সঙ্গে নগদ লভ্যাংশ ৩০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩২ দশমিক ৫০ শতাংশ করার সুপারিশ করেছে পরিচালনা পর্ষদ।

ফলে কোম্পানিটির সর্বশেষ আর্থিক চিত্রে একদিকে মুনাফা ও ইপিএসে সামান্য চাপ থাকলেও অন্যদিকে পরিচালন নগদ প্রবাহ ও নিট সম্পদমূল্যে উন্নতি হয়েছে। এর সঙ্গে শেয়ারহোল্ডারদের জন্য বাড়তি নগদ লভ্যাংশ দেওয়ার সিদ্ধান্তও যুক্ত হয়েছে।

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির আর্থিক ফলাফল মূল্যায়নের ক্ষেত্রে তাই শুধু ইপিএসের ওঠানামা নয়, লভ্যাংশের ধারাবাহিকতা, নগদ প্রবাহ, সম্পদমূল্য এবং কোম্পানির ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক সক্ষমতাও বিবেচনায় নেওয়া হয়। এনভয় টেক্সটাইলের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ফলাফলে এসব সূচকের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন গতিপথ দেখা গেছে। এখন ঘোষিত লভ্যাংশের চূড়ান্ত অনুমোদন এবং পরবর্তী সময়ে এর বিতরণই হবে শেয়ারহোল্ডারদের জন্য পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।