চট্টগ্রাম-দোহাজারী রেল প্রকল্প
২ হাজার ৩০০ কোটি টাকার লোকোমোটিভ কেনার উদ্যোগ
ছবি সংগৃহীত
চট্টগ্রাম-দোহাজারী ৫৯ দশমিক ৯৩ কিলোমিটার দীর্ঘ মিটারগেজ রেলপথকে ডুয়েল গেজে রূপান্তরের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে একই রেলপথে মিটারগেজ ও ব্রডগেজ ট্রেন চলাচলের সুযোগ তৈরি হবে। এতে চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে দেশের উত্তর, পশ্চিম ও মধ্যাঞ্চলের রেল যোগাযোগ আরও সহজ ও কার্যকর হওয়ার পাশাপাশি দক্ষিণ চট্টগ্রামে শিল্প, বাণিজ্য, কৃষি ও পর্যটনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলবে, কমবে পণ্য পরিবহনে সময় ও ব্যয়; পাশাপাশি সড়কপথের ওপরও চাপ কমবে।
একই প্রকল্পের যোগাযোগব্যবস্থা আরও গতিশীল ও আধুনিক করতে ২ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ব্যয়ে লোকোমোটিভ (ইঞ্জিন) কেনার বড় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং এই মেগা প্রকিউরমেন্টের অংশ হিসেবে আগামী ১৪ অক্টোবর দেশি-বিদেশি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানা যায়।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণ চট্টগ্রামের যোগাযোগব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পণ্য পরিবহন আরও সহজ ও দ্রুত হবে। কমবে পরিবহন সময় ও ব্যয়। এর ফলে শিল্প, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, কৃষি ও পর্যটন খাতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে।
প্রকল্প পরিচালক মো. আসাদুল হক শেয়ার বিজকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম-দোহাজারী সেকশনে যাত্রী ও মালামাল পরিবহন সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য শক্তিশালী লোকোমোটিভের বিকল্প নেই। আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে সম্পূর্ণ স্বচ্ছতার সঙ্গে এই ক্রয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য আমরা উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করেছি। এতে দেশি-বিদেশি অভিজ্ঞ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো অংশ নিতে পারবে।’ তিনি আরও আশা প্রকাশ করেন যে, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই এই প্রক্রিয়া শেষ করে রেল বহরে নতুন ইঞ্জিন যুক্ত করা হবে।
প্রকল্প পরিচালক মো. আসাদুল হক বলেন, চট্টগ্রাম-দোহাজারী রেলপথ ডুয়েল গেজে রূপান্তর হলে দেশের রেল যোগাযোগের সক্ষমতা বাড়বে। এতে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে সময় ও ব্যয় কমবে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের যোগাযোগ আরও কার্যকর হবে।
তিনি আরও বলেন, দক্ষিণ চট্টগ্রামের শিল্প, কৃষি, পর্যটন ও বাণিজ্যে এ প্রকল্প নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলবে। তবে উন্নয়নের পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। স্থানীয় জনগণের মতামত ও উদ্বেগ বিবেচনায় নিয়ে চূড়ান্ত ইআইএ প্রতিবেদন তৈরি করা হবে।
এদিকে প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা জানান, ডুয়েল গেজে রূপান্তরের পাশাপাশি প্রকল্পের আওতায় বিদ্যমান সেতু, কালভার্ট, ড্রেনেজ ব্যবস্থা, স্টেশন, প্ল্যাটফর্ম, লুপ লাইন, লেভেল ক্রসিং, সিগন্যালিং ও টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা আধুনিকায়ন করা হবে। প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা অবকাঠামোও উন্নত করা হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে সড়কপথের ওপর চাপ কমবে। পাশাপাশি যানজট ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমার পাশাপাশি কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে পরিবেশবান্ধব পরিবহনব্যবস্থাও শক্তিশালী হবে।
এছাড়া ভূমি অধিগ্রহণের বিষয়ে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, প্রচলিত আইন অনুযায়ী ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। জমি, স্থাপনা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, গাছপালা ও ফসলের ক্ষতিও বিবেচনায় নেওয়া হবে। প্রকল্প এলাকায় স্থানীয়দের অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থাপনা কমিটি (জিআরসি) গঠন করা হবে। এতে বাংলাদেশ রেলওয়ে, উপজেলা প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, পরিবেশ অধিদপ্তর ও স্থানীয় এনজিও প্রতিনিধিরা থাকবেন।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ডুয়েল গেজ চালু হলে দক্ষিণ চট্টগ্রামে যাত্রীসেবার মান বাড়ার পাশাপাশি শিল্প ও বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে। চট্টগ্রাম বন্দরনির্ভর শিল্প ও কৃষিপণ্য পরিবহন সহজ হবে এবং কমবে পরিবহন ব্যয়। তবে স্থানীয় বাসিন্দারা প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় ভূমি অধিগ্রহণ, জলাবদ্ধতা, শব্দদূষণ ও স্থানীয় মানুষের যাতায়াতের বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন।
এদিকে প্রকল্পের নথিতে দেখা যায়, বাংলাদেশ সরকার, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) থেকে ‘৩০টি মিটার গেজ (এমজি) ডিজেল ইলেকট্রিক (ডিই) লোকোমোটিভ সংগ্রহ এবং কমিশনিং, ট্রায়াল রান ও প্রশিক্ষণসহ সংশ্লিষ্ট সেবাসমূহ’ বাবদ অর্থায়ন পেয়েছে। এছাড়া এডিবির যোগ্য উৎস দেশগুলোর দরদাতাদের জন্য দরপত্র উন্মুক্ত বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
নথিতে দেখা যায়, বাংলাদেশ রেলওয়ে (‘ক্রেতা’) ‘৩০টি মিটার গেজ (এমজি) ডিজেল ইলেকট্রিক (ডিই) লোকোমোটিভ সংগ্রহ এবং কমিশনিং, ট্রায়াল রান ও প্রশিক্ষণসহ সংশ্লিষ্ট সেবাসমূহ’ ক্রয়ের জন্য যোগ্য দরদাতাদের কাছ থেকে সিলমোহরযুক্ত দরপত্র আহ্বান করছে আগামী ১৪ অক্টোবরের মধ্যে।
রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, ‘৩০টি মিটার গেজ (এমজি) ডিজেল ইলেকট্রিক (ডিই) লোকোমোটিভ সংগ্রহ’ প্রকল্পে দরদাতাকে বিগত ১০ বছরের মধ্যে প্রধান সরবরাহকারী হিসেবে কমপক্ষে চারটি চুক্তি সফলভাবে সম্পন্ন করার অভিজ্ঞতা থাকতে হবে, যেগুলোর মধ্যে তিনটি চুক্তির মোট মূল্য ১১০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বা তার বেশি। এছাড়া একটি চুক্তির ন্যূনতম মূল্য ১২৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার হবে। অর্থাৎ বিগত দিনে কাজের চুক্তিগুলো একই প্রকৃতির ও সরবরাহের অভিজ্ঞতার অনুরূপ হবে (ডিজেল ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ, ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ, ডিএমইউ এবং ইএমইউ হতে হবে)।
রেলপথ ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা এই উদ্যোগকে সময়োপযোগী বললেও এর টেকসই বাস্তবায়নের ওপর জোর দিয়েছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, চট্টগ্রাম-দোহাজারী লাইনে ট্রেনের সংখ্যা বাড়াতে এবং কক্সবাজার পর্যন্ত রেলযোগাযোগ নির্বিঘ্ন রাখতে আধুনিক লোকোমোটিভের সংযোজন জরুরি ছিল।
পরিবহন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে মানসম্মত ইঞ্জিন সংগ্রহ নিশ্চিত করা উচিত। পাশাপাশি লোকোমোটিভগুলোর দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ এবং যন্ত্রাংশ প্রাপ্তি সহজ করার শর্ত দরপত্র চুক্তিতে রাখা আবশ্যক এবং এই প্রকল্পটির সুফল পেতে ক্রয় প্রক্রিয়া বিলম্বিত না করে দ্রুত কার্যাদেশ দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা।